Email: editors.kokshopoth@gmail.com
October 7, 2026
Kokshopoth

সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা

Oct 2, 2026

নিয়মিত কলম
সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা
পর্ব# ১৮

সাম্য রাইয়ানের জন্ম বাঙলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায়। ২০০৬ থেকে সম্পাদনা করছেন শিল্প-সাহিত্যের অন্যতর লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু। কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছেন নতুন ধরনের আখ্যানধর্মী গদ্য৷

সাম্য রাইয়ানকে নিয়ে ভারতের  সাহিত্য পত্রিকা ‘তারারা’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মনমানচিত্র’, ভারতের ‘এবং পত্রিকা’ তাকে নিয়ে বিশেষ একক সংখ্যা ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘নিসর্গ’ বিশেষ মূল্যায়ন (ক্রোড়পত্র) প্রকাশ করেছে৷ ভারতের নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার সাম্য রাইয়ান প্রসঙ্গে ‘সাম্যপুরাণ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট [গদ্য, ২০১৪]; বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা [কবিতা, ২০১৫]; মার্কস যদি জানতেন [কবিতা, ২০১৮]; হলুদ পাহাড় [কবিতা, ২০১৯]; চোখের ভেতরে হামিং বার্ড [কবিতা, ২০২০]; লোকাল ট্রেনের জার্নাল [গদ্য, ২০২১]; লিখিত রাত্রি [কবিতা, ২০২২] ও হালকা রোদের দুপুর [কবিতা, ২০২৩]; জলের অপেরা [কবিতা, ২০২৪]; সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের [উপন্যাস, ২০২৫]৷ সম্পাদিত গ্রন্থ: উৎপলকুমার বসু [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২২]; জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধ সংকলন, ২০২৩]; শম্ভু রক্ষিত: পাঠ ও বিবেচনা [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২৫]।

গুলসারি হাঁটছে

 

বইয়ের সঙ্গে বিনিময়ের আছে গভীর সম্পর্ক। ‘বন্ধুর’ সম্পর্ক এ বন্ধুর সাথে। কেননা, অধিকাংশ সময়ই তা আর ফিরে আসে না, কারন বিনিময়টা সচরাচর একপাক্ষিক হয়। বই হারাতে হারাতে এখন নিজের সংগ্রহ ফাঁকা হওয়ার জোগাড়! প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় বই আর খুঁজে পাই না। নিজেকে বলি, ঢের হয়েছে চোরসেবা, এবার ক্ষান্ত দে বাপ। কষ্টের পয়সা খরচ করে চোরেদের হাতে বই তুলে দেওয়া এবার বাদ দে।

 

একটা গল্প বলি। বছর দুই আগে হলো কি, বিদেশি লেখকের পুরনো চারটে বই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, কাঁটাতার পেরিয়ে, চড়া মূল্য দিয়ে সংগ্রহ করলাম। বইগুলো বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার আগেই এক ‘ভদ্রলোক’ গায়েব করে দিলেন। অনেকদিন বাদে যখন ফেরত চাইলাম, প্রথমে বললেন, বইগুলো আমার নয়। আমি ভেতরের স্বাক্ষরের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কিছুদিন পর বললেন, তিনি ওগুলো ফেরত দেবেন না, দুষ্প্রাপ্য বই হওয়ায় ওগুলো উনি রেখে রেখে পড়বেন। এত সরলভাবে একজন মানুষ বই আত্মসাৎ করতে পারে, তখনও আমার বিশ্বাস হয়নি। মনে মনে কান ধরে তওবা করলাম। আর জীবনে না।

 

তবু এইসব কি আর বন্ধ থাকে? টুকটাক চলতেই থাকে। বইয়ের প্রতি দুর্বলতা বই হারানোর ভয়কেই হারিয়ে দেয়। বন্ধুকে বই দিতে ইচ্ছে করে। শত্রুকেও বই দিতে ইচ্ছে করে। কেউ বই পড়তে শুরু করেছে শুনলে নিজের ট্রাঙ্কের দিকে তাকাই। মনে হয়, এই বইটা ওকে দেওয়া যায়। ওই বইটা হয়তো তার ভালো লাগবে। তারপর বেরিয়ে পড়ে বই, হাত বদল হয়।

 

ইদানীং রাফিভাই মারফত অর্ণব জুটেছে সঙ্গে। সে বই পড়তে শুরু করেছে। কী বই দিই? নতুন পাঠকের উপযোগী বই পাওয়া আমার জন্য এক বিরাট সমস্যা কারন ঐসব তো কবেই লোকে হাপিশ করে দিয়েছে। তবুও খুঁজে খুঁজে এমন দুয়েকটা যা পাই টুকটাক তা-ই দিই, যাতে অন্তত ক্ষুধা না মরে যায়। এইই চলছে জীবনের পঠনক্রিয়া। সেদিন খুঁজতে খুঁজতে বেরিয়ে এল চিঙ্গিস আইৎমাতভের বিদায় গুলসারি, অনুবাদক অরুণ সোম।

 

বহু বছর আগে পড়েছিলাম। এবার হাতে নিতেই গল্পটা ছায়াছবির মতো মনে পড়ল। একজন বৃদ্ধ আর এক ক্লান্ত ঘোড়া বরফের মধ্যে চলতে চলতেই জীবনের পৃষ্ঠাগুলো উন্মুক্ত হতে থাকে আমাদের সামনে। কিছু বই এমনই যে, পড়ার পর ভুলে যাই; মনে হয় ভুলে গেছি। অনেকদিন বাদে আবার হাতে নিতেই তার ভেতর থেকে একে একে বেরিয়ে আসে দৃশ্যাবলী। এমনকি হারিয়ে ফেলা বয়সও ফিরে আসে। আইৎমাতভের ‘বিদায় গুলসারি’ তেমনই।

 

তানাবাই তখন বৃদ্ধ। তার সঙ্গে গুলসারি; যে একসময়কার দুরন্ত, দ্রুতগামী, দারুণ এক ঘোড়া, এখন বয়সের ভারে ক্লান্ত। তাদের শেষ যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে তানাবাইয়ের স্মৃতিও ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায়। বর্তমানের পথ আর অতীতের জীবন পাশাপাশি চলতে থাকে। একটা ঘোড়া ভবিষ্যতের দিকে এগুতে থাকে, আর মানুষটি অতীতের দিকে।

 

স্মৃতিকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে সাধারণত দিনতারিখ খুব একটা মনে থাকে না; চেহারা ভুলে যাই, কথাবার্তার বেশির ভাগই হারিয়ে যায়। কিন্তু কোনো একটা ঘ্রাণ, কোনো গান বা পুরনো কোনো বই হঠাৎ স্মৃতি উস্কে দেয়। তখন মনে হয়, বর্তমানের ভেতরেই অতীত বসে থাকে, একটি নিপুণ টোকার অপেক্ষা করে। আরণ্যক টিটোর কবিতা মনে পড়ে, “একটি নিপুণ টোকা / আমুল বদলে দিতে পারে সবকিছু। / আসুন একটি টোকা মারি।” তানাবাইয়ের জন্য গুলসারি সেই নিপুণ টোকা।

 

তানাবাইয়ের জীবনে গুলসারি এসেছিল যুদ্ধের পর। যখন সে তরুণ। কাজ করে, ঘোড়ার সঙ্গে থাকে। পাহাড়ি জীবন, পশুপালন, শ্রম, সম্পর্ক, প্রেম, ঝগড়া, স্বপ্ন, রাজনৈতিক বিশ্বাস, সবকিছু মিশে যায় তার জীবনে। একসময় নিজের জীবন থেকে গুলসারিকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

 

আমরা সাধারণত গৃহপালিত প্রাণীকে ‘সম্পত্তি’ হিসেবে বিবেচনায় অভ্যস্ত। গরু, ছাগল, বেড়াল, ঘোড়া, কুকুর যা-ই হোক না কেন, তার সাথে আমাদের মালিকানার সম্পর্ক। কিন্তু আইৎমাতভ প্রশ্নটা পাল্টে দিলেন। গুলসারি কি শুধু তানাবাইয়ের ঘোড়া? নাকি তানাবাইও কোনোভাবে গুলসারির মানুষ? এই সম্পর্কের মধ্যে মালিকানা নেই তা নয়। কিন্তু তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সঙ্গ। দুজনেই একে অপরের জীবনের সাক্ষী—বন্ধু।

 

তানাবাই যখন তরুণ, তখন শরীর শক্তপোক্ত; মনে প্রবল বিশ্বাস— সমাজ বদলাবে, গণমানুষের জীবন বদলাবে, শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে, নতুন পৃথিবী তৈরি হবে, এই স্বপ্ন তার মধ্যে কাজ করে। কিন্তু নতুন পৃথিবী তৈরি করার যে ব্যবস্থা, তার মধ্যেই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে ক্ষমতা, পদ, লোভ, সন্দেহ, অন্ধ আনুগত্য এবং আমলাতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা।

 

রাষ্ট্রের অনেক ক্ষমতা। সে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতরেও ঢুকে পড়তে পারে। তানাবাইয়ের বিপর্যয় ঘটে এখানেই। সে যে নয়া বন্দোবস্তের জন্য লড়েছিল, সেই নয়া বন্দোবস্তের কাছেই একসময় নিজেকে অপরিচিত মনে হয়।

 

উপন্যাসটির সবচেয়ে মর্মন্তুদ জায়গা গুলসারির বার্ধক্য। একসময় যে প্রাণী দৌড়াত, তার পা এখন কাঁপে। যে মানুষ পাহাড়ে ছুটে বেড়িয়েছে, তার শরীরেও এখন ক্লান্তি। গুলসারি আর তানাবাই পাশাপাশি বৃদ্ধ হয়। একজন মানুষের বার্ধক্য, আরেকটি প্রাণীর বার্ধক্য একই ফ্রেমে এসে দাঁড়ায়। আমরা বুঝতে পারি, বন্ধুত্বের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত বিদায়ের আগের সময়টা। যখন জানি, আর বেশিদিন নেই। কিন্তু কিছুই করার নেই।

 

আমাদের জীবন থেকে কত মানুষ চলে গেছে। কত সম্পর্ক শেষ হয়েছে, বন্ধুত্ব ভেঙে গেছে। কেউ শহর বদলেছে, কেউবা দেশ। তারপর একসময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে নি। অথচ বহু বছর পর একটি নিপুণ টোকা স্মৃতির দরজায় এসে লাগে। কোনো পুরনো গান, কোনো গন্ধ বা কোনো বই আমাদের এমনতর স্মৃতির কাছে নিয়ে যায়, যার কথা আমরা মনে রাখিনি।

 

তানাবাইয়ের স্মৃতিও আনন্দ-বেদনা একসঙ্গে নিয়ে আসে। কেননা তার রাজনৈতিক জীবনে গৌরব আছে, ভুলও আছে। তার যৌবনের স্বপ্ন, বিশ্বাস, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক-সংঘাত সব একসাথে হাজির হয়। কিন্তু অতীত তাকে ক্ষমা কিংবা অভিযুক্ত কোনোটিই করে না। স্রেফ সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।

 

অর্ণবকে বইটা দেওয়ার সময় গুলসারির কথাই মনে পড়ছিল। আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অনুপস্থিত মানুষ এবং হারিয়ে যাওয়া সময়। বই দিতে গিয়ে যেন নিজেরই পুরনো সময় হাতে তুলে দিলাম। অর্ণব যখন বইটা পড়বে, হয়তো তার কাছে গুলসারি অন্য কোনো অর্থ নিয়ে হাজির হবে। আমার গুলসারি আর তার গুলসারি হবে ভিন্নতর।

 

উপন্যাসের শেষে গুলসারি দৌড়াতে পারে না। তানাবাইও আগের মানুষ থাকে না। যেমন আমাদেরও শরীর, শহর, সম্পর্ক, বিশ্বাস, সবকিছু একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। আর তার মধ্য দিয়েই গুলসারি হাঁটছে, তানাবাই হাঁটছে, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, সাথে আমরাও…।

1 Comment

  • আমিই সেই অর্ণব।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *