রাধাবল্লভ চক্রবর্তী-র কবিতাগুচ্ছ
রাধাবল্লভ চক্রবর্তী-র কবিতাগুচ্ছ
পশ্চিম মেদিনীপুরের বাসিন্দা। কবিতা লেখার চেষ্টা ও ইচ্ছে রয়েছে। ‘প্রতিভাহীন পাথর’ নামে প্রকাশিত একটি কবিতার বই রয়েছে। ২০২৬ এর কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ ‘মানচিত্রে ও অজান্তে’।
১
নিঃশ্বাস
তুমি যৌবনবতী কোনওমতে নও; তবুও তোমার মায়া আয়ত চোখের,
অসাড় সহজতা নিয়ে কথা হয়। আমার থাকা, না-থাকা
কতটা জীবন? কতটা রক্তপাত? কতখানি আলো? এখানে বোধি নেই,
প্রেম নেই, হাহাকার নেই; কী এক স্থবিরতা গ্রাস করেছে! কিশোরী
যেহেতু নও এখন তুমিও, ফ্রক পরা জীবনের কথা ভাবা অপরাধ, জানি…
তোমার ভিতর থেকে জরা আজ উঁকি দেয় খুব; তোমার ভিতর আজ প্রেত
খুঁজে পায় সন্তান; তোমার ছিল না কোনও দিনলিপি – এখনও কি নেই?
রোদের ভিতর ওরা শিকার ধরে চলে আজও। জলের মতন আমি?
ভীষণ আড়াল? আড়াল নিজেকে চেনে? কতটা ভাবায়? তোমার অন্ন-নুন,
অপার্থিবতা, আমাকে গৃহী করে রেখেছে তবে কি? নিজের হাতেই তবে
নিজেকে খুঁড়েছি? নিজেকে মুছেছি আর অবাক হয়েছি? এই কি জীবন ছিল?
এই কি বিষাদ? তোমাকে ভাবার মতো অপরাধ ঘটেছিল তাই?
#২
ঘাত
ধূমপান করে আজও চলে যায় যে যে বা যারা,
বিজ্ঞাপন তারা মানে না যে, নতুন এতে কী?
আমাদেরও মদভাণ্ড ভেঙেছে আমাদের ভুলে, আমাদের
অপরাধ আমাদের শোক হয়ে ধরা দেয় আজ। লজ্জার
প্রবণতা আদিম চেতনা, শরীরে শরীরে বাঁক যেন নদীময়
হয়ে গ্যাছে – তুমিও ভিন্ন নও, বিবিধ গাছের, বন্ধুর মতো
বা শত্রুর আচরণ করো। রীতি নেই, নীতি নেই, কেবল দেবতা –
পথ নেই, ঘাট নেই, কেবল মিছিল – মৃত্যুর ওপর একই মৃত্যুই
শুয়ে আছে ভেঙেচুরে যেন। এ-লেখা তোমারই মতো ব্রাত্যজনের –
সগৌরবে তা স্বীকার করে নেওয়া ভাল…
৩
একবিংশ
ওপরে-ওপরে সন্তান, ভেতরে-ভেতরে আমি পিতা
সারারাত জেগে থাকা, সারাদিন হাড়ভাঙা খেলা –
যা-কিছু বোঝে না কেউ, তা-ও খুব সংক্ষেপে বুঝে
নিতে হয়; এমনই কীর্তি আর দৈন্য এমনই, সাপ নয়,
ফোঁস নয়, অবশেষে যেন, বাতিল সাপের মৃত খোলস
হয়ে বেঁচে আছি। এইসব টিউশন অপমান করে, আমি
জানি, কিন্তু জানাব কাকে? ক্রমশ, ক্রমশ আমি নিচু চোখমুখে,
গভীর পাতালের দিকে ঢুকে গেছি। নিজেকে বাঁচানো আর
সাথে তোমাদেরও, বাঁচানোর দায়ভার রয়েছে যে, জানি তা,
হে পরিবার –
পরিবার মানে? (হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন –)
যে আমাকে বাঁচিয়ে রাখে; আমি যাকে মেরে ফেলি রোজ…
#৪
মন
মন যে কোথাও নেই, সে-কথা কি তোমার কখনওই
মনে থাকে না?
যা-কিছু হল না লেখা, তা-ই তবে শ্রেষ্ঠ কবিতা?
হাতের মুঠোয় যারা ধরা দেয় এসে,
তাদের জীবনে আছে গোপন ভায়োলেন্স, পাপ –
আমাকে বদলে যেতে সময় দিলে না, ঈশ্বর!
তোমার দখলদারি আমি তবু কেন ভালবাসি?
যা-কিছু ভাবিনি আগে, তা দিয়েই দেখি
আজীবনের পাতা কীভাবে, কখন ভরে যায়…
৫
আশার আশা
যে-আগুন তোমাকে পুড়িয়ে দেবে, তুমি সেই আগুনকে
পরীক্ষা করে নিতে চাও
আমার বানানভুলে সাক্ষী ছিল না যদি কেউ,
তবে কেন মিছিমিছি ওরা এত হাসাহাসি করে?
তোমার গভীর রাতে ফেরেস্তা নামে,
লোকালয় আঁকে আর ঘুরে চলে যায়
এখন মাঠের মানে অনেক কিছুই – রাজনীতি, শ্মশান বা কাঙালভোজন…
প্রতিটি ভূমিকায় আমিও ছিলাম – কালভার্ট পেরিয়ে পোড়ো মন্দিরে
আমিই বসেছি কোনও দেবতার জাগৃতি নিয়ে,
আমিই উড়ে গেছি পেঁচার সহিংসতা নিয়ে
কিছুতেই স্থির হতে পারিনি, জীবন!
আমাকে চাবুক মারো, ভালবাসো বা ক্ষমা করো –
শরীর খোঁজার ছলে মন খুঁজেছি
ভুলে গেছি – যে-আগুন আমাকে পোড়াবে,
তাকে তো পরীক্ষা করে নেওয়া এখনও বাকিই…
৬
চুপ
যেদিকে অন্ধ হয়ে ছুটে যাই আমি, সেদিকে খাদ নেই,
অন্ধকার শুধু –
তোমার ও সকলের ব্যস্ত জীবন –
তারই মাঝে সময় করে,
তুমি ভেবে নিচ্ছ একাকী এখন,
যাদের জীবন শুধু কেটে গেল মর্গে আর মড়া বয়ে,
তাদেরও জীবন আছে? তারাও কি জানে সেটা?
তাদেরও সংসার হয়?
নিজের মতন করে তোমার তো আরও কিছু ভেবে নেওয়া
উচিত ছিল –
নয় কি? ভাবতে পারোনি তবু, কেননা তোমার
সংশয়, দ্বিধা, শোক সহসা গড়ায়