Email: editors.kokshopoth@gmail.com
October 10, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ দ্বিতীয় ভাগ

Oct 9, 2026

ধারাবাহিক মায়াগদ্য
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ দ্বিতীয় ভাগ
পর্ব #২৩

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

এই বাজারে লেখকই এমন পণ্য , যার জন্য কোন ওটিপি জেনারেট হয় না

 

 বাঙ্গালির মতো চিন্তাশীল জাত আমি দুটি দেখিনি। এবং তারা সব বিষয়ে যে শুধু চিন্তা করে তাই নয়, সবসময়েই এগিয়ে ভাবে। ঐ যে মহামতি গোখলে না ওয়াগলে কে যেন কী বলিয়াছিলেন। প্রেম করলে এরা জিজ্ঞেস করে কবে বিয়ে করছিস? বিয়ের পর মাস ঘুরতে না ঘুরতে জিজ্ঞেস করে কবে নতুন খবর পাচ্ছি? একটি হলে বলে একটা টাকা কোন টাকাই নয়, একটা বাচ্চা কোন বাচ্চাই নয়, রীতিমতো গ পিটে যায় আরেকটা বাচ্চা উৎপাদনের। দ্বিতীয় বাচ্চাও হয়ে গেল, তখন তারা খেপে উঠবে তাদের কেমন স্কুলে দেওয়া হল তাই নিয়ে। স্কুল পেরোলে কলেজ এবং কলেজ শেষ হলেই সবচেয়ে হট টপিকে তারা চলে আসবে ‘ ছেলে/ মেয়ে কী করে? কত পায় টায়?’ আর আপনাকেই যদি এখনো এই প্রশ্ন শুনতে হয় ‘মশায়ের কী করা হয়?’ তবে কিন্তু রাগ করবেন না, এর মানে আপনি এখনো ফুলকচিটি আছেন। আপনার এখনো কাজ করার বয়স ও যোগ্যতা আছে, আপনি এখনো যথেষ্ট প্রমিজিং ও হ্যাপেনিং।

 

সত্যিই তারা এইগুলো ভেবেই প্রশ্ন করে কিনা আমি জানি না, কিন্তু আমি এইরকম করেই ভাবি। নাহলে হে বন্ধু, এ নরক সহিতে কি পারিতাম?

 

 

 

‘কী করো? কোথায় যাও?’ এ প্রশ্ন তো জন্ম থেকেই শুরু হয়ে যায়। আমাদের ছিল মোড়ে মোড়ে কেবিসি প্রশ্নমালা। স্কুলের ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যাচ্ছি বাঁধা রিকশায় চড়ে, মোড়ে মোড়ে উৎকণ্ঠিত জনগণ দাঁড়িয়ে থাকত কোথায় যাচ্ছি জানতে। প্রথম প্রথম ভারি অবাক লাগত। পরে এতেই অভ্যস্ত হয়ে যাই। মেয়েদের স্কুলের সামনে যেসব ছেলেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিহীন দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের যে জ্ঞানতৃষ্ণা খুব বেশি, আর্যভট্ট –আর্কিমিদিস তুল্য , তা দিব্যি বুঝতে পারি। সেই সময় আমি বা আমার রিকশাসঙ্গিনী  দুজনেই প্রতিদিন অবিচলিত ভাবে ওদের প্রশ্নের উত্তরে স্কুলে যাচ্ছি বলে যেতাম। তবে বাকি মেয়েরা আমাদের মতো বিন্দাস টাইপ ছিল না।

 

কেউ যদি বলত ‘এরা কোন চালের ভাত খায় রে’ সেসব মেয়েরা অমনি বলত ‘তোর মা বোন যে চালের ভাত খায়।‘

 

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                            এর পর যখন মায়া মফস্বলের মায়া কাটিয়ে কলকাতায়  যাতায়াত শুরু হল উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে, তখন লেডিজ কামরার ডেলি পাষণ্ড হয়ে জীবনে প্রথম ‘ওরা’ আর ‘আমরার’ তফাত বোঝা গেল। আমরা একদল যাই সুবিধাভোগী শ্রেণির মেয়েরা, তারা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, চাকরি করি, সুবেশিনী, সুভাষিণী, আর একদল সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি, সব্জিমাসীই, (গৃহকর্ম সহায়িকাদের ট্রেনের টাইম আলাদা) সাধারণত, শিয়ালদা যাদবপুর বালিগঞ্জে সবজি বিক্রি করতে যাচ্ছে বা পেয়ারা, পুরুষশাসিত ভেন্ডর কামরায় তাদের উঠতে দেওয়া হয় না, তারা এসে জোটে মহিলা ডিব্বায়, আর তাদের সবজি বা পেয়ারার ঝাঁকা ঠেসে রাখে গেটের মুখে, আর উঠতে নামতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, জামা ছেঁড়া এ এক নিত্য সমস্যা। ফলে রোজ সকালে ট্রেনে উঠেই শুরু হয়ে যায় দ্বৈরথ।

 

আমাদের অস্ত্র হচ্ছে ওদের কারো কাছে টিকিট নেই। আমরা বলি ‘টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠেছ, আবার ঝগড়া করছ?’ ওরা তার উত্তরে স্রেফ একটি কথা বলে আমাদের চুপ করিয়ে দ্যায়। তা হল ‘ঘড়ি পরে চশমা চোখে ব্যাগ কাঁধে কোথায় যাচ্ছ আমরা জানি না ভেবেছ?’ এরপর আমরা , সদ্য ডিম ফোটা, স্কুল থেকে কলেজে যাওয়া উচক্কা তরুণীর দল এমন কথায় পরাস্ত হয়ে সিটে বসে পড়ি। আমাদের গন্তব্য নিয়ে  সমাজ যে এমন কথা বলতে পারে তাও আবার মেয়েদের মুখেই, এই অভিজ্ঞতা প্রথম জীবনে। এরপর তো এসব অভ্যেস হয়ে গেল। মৃণাল সেনের ‘একদিন প্রতিদিন’ আমাদেরই তো গল্প। একটি মেয়ে রাত করে ফিরলে বা কোন রাতে কোন কারণে আটকে গিয়ে ফিরতে না পারলে সমাজ  ও পরিবার কেউ তাকে ছাড়ে না, খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে দ্যায়।

 

এর একটা এক্সট্রিম গল্প বলি। সাহিত্য অকাদেমিতে যখন কাজ করি তখন আমার থেকে অনেক কম বয়সী মেয়ে আসত দূর মফস্বল থেকে। সে বাড়ি থেকে আটটার আগে বেরত, ফিরতে প্রায় নটা হত।  মেয়েটি কেন অত রাতে ফেরে, কোথা থেকে ফেরে এ নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই পাড়াপড়শির চিন্তার অন্ত ছিল না। মেয়ে মরে গেলেও যেতে পারে, কিন্তু তার নৈতিক চরিত্র যেন ঠিক থাকে। মেয়েটির মাকে ঠারেঠোরে শুধোনো শুরু হল মেয়ে এত রাতে ফেরে কেন? কোথায় যায়?

 

মা এত ভেতরের চোরা স্রোত না বুঝেই বললেন ‘মেয়ে সাহিত্য অকাদেমিতে কাজ করে। সেখানে ১০-৬ টা অফিস। তাই এত দেরি হয়।‘

 

সাহিত্য অকাদেমি! সে কী জিনিস? খায় না মাথায় দ্যায় – এইরকম ভাব ফুটে উঠেছিল পড়শিদের চোখেমুখে।

 

মা মেয়েকে বলেছিলেন ‘বুঝলি, তুই কোথায় চাকরি করিস সেটা ওরা কেউ বুঝতে পারছে না, বলছে ওটা কী? ঐ অকাদেমি না কী ওটা ঠিক কী?’

 

২৪ বছরের মেধাবী তরুণীটি ঠাণ্ডা চোখে মার দিকে তাকিয়ে বলেছিল ‘ওদের বলো ওটা একটা ব্রদেল। ওখানেই আমি কাজ করি’

 

 

 

অনেকদিন আগের কথা, কিন্তু এখনো মনে পড়লে কুলকুল করে হাসি পায়। মেয়েরা কোথায় কাজ করতে যায় ? সমাজের কৌতূহলের এর থেকে মোক্ষম জবাব আর হয় না!

 

 

 

কাজে গেলেও প্রশ্ন, আবার না গেলেও। সে জুটেছে আমার ভাগ্যে। দুনিয়ার সব উলটপুরাণ এই ক্যাংলাসের কপালেই ঘটে। যখন কপালে কেউটে কামড়াল আর আম্মো হুশ করে সরকারি চাকরিটা ছেড়ে দিলাম, তখন আমার আর কোন নেমন্তন্ন বাড়ি যাবার জো রইল না। সবে হয়তো  একটা  ফিশ ফ্রাই বা চিকেন টিক্কায় কামড় দিয়েছি, অমনি    উদবিগ্ন জনগণ আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে বলতে শুরু করল ‘ছি ছি, তুই নাকি এখন কিছুই করিস না! এত পড়াশোনা করে বাড়ি বসে আছিস! হাউস ওয়াইফ হবি শেষ অব্দি’

 

আমি ক্ষীণ কণ্ঠে বলতে চেষ্টা করি ‘আরে সবাই তো দিনের শেষে বাড়ি ফিরে হাউজ ওয়াইফ বা হাউজ হাজবেন্ড। আর আমি তো লিখি। পেশাদার লেখক হব বলেই তো চাকরি ছেড়েছি’

 

তার জবাবে লোকে যা বলে তাতে আমার আবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘটা সেই ঘটনাটা না মনে  পড়ে যায় না। সেই যে ফেসবুক যুগের বহু বছর পূর্বে রবীন্দ্রনাথ রেল পথে ভ্রমণ করিতেছিলেন, তখন নোবেল লাভ হইয়া গিয়াছে। সেইসময় দুটি অপার জ্ঞানতৃষ্ণাকাতর বাঙালি বাবু তাঁহাকে শুধাইলেন ‘মশায়ের কী করা হয়?’ রবীন্দ্রনাথ বলিলেন ‘আমি লিখি’ বাবু দুটি ক্ষুব্ধ হইয়া বলিয়া উঠিলেন লেখেন তো বুঝলাম কিন্তু করেনটা কী?’

 

 

 

এর পর আমি ‘বল মা তারা দাঁড়াই কোথা?’ কেউ কেউ আবার বেশ প্রাগ্রসর। তিনি বাজারের সব কাটতি প্ত্রিকার ফিরিস্তি দিয়ে বলেন ‘এর একটাতেও তো তোমার লেখা দেখি না হে। কোথায় লেখো তুমি?’

 

আমি কড় গুনে গুনে বলি ‘বর্ধ্মান বার্তা, পুরুলিয়া প্ত্র, চাকদা চলতি হাওয়া…

 

আর সেই শুনে যা ছিছিক্কার হয়, তার পর থেকে ‘আমি লিখি’ বলাটা খুব খুব রিস্কি হয়ে যায়। 

 

সেলফ এমপ্লয়েড বলাই যায়, তবে তার নানা মানে হতে পারে, লোকের বাড়িতে বাসন মাজা, দরজায় দরজায় গিয়ে সাবান গুঁড়ো বিক্রি থেকে শুরু করে সুপারি কিলার অব্দি তার বিস্তৃতি। মনে রাখবেন পাঠক, এর প্রতিটা কাজই সমাজে অনুমোদিত, সুপারি কিলার, বাসন মাজুনি বা নাছোড়বান্দা বেচুবাবু -বিবি হলেও সমাজে তার ইজ্জত আছে, কিন্তু আমি লেখক, ওটাই আমার কাজ- একবার ভরা বাজারে বুক ঠুকে ব্লুন দিকি, কেমন আপনি মাঈ কা লাল বা লালি দেখি তো? সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে শ্মশানের নীরবতা নেমে আসবে,  সবাই চলে যাবার জন্যে উশখুশ করবে, মানে যেমন পাসিং দা পিলো খেলায় সেই কালান্তক বালিশটিকে অন্যের কোলে ঠেলে দিতে ব্যগ্রতা দেখা যায়, তেমনি আপনাকেও ঠেলে অন্যদের কাছে পাঠানোর তাড়া দেখা দেবে। আগে আগে ছেলেরা বলে খালাস হতে পারত ‘আপনার লেখা আমার মিসেস খুব পড়েন’ এখন আর সে জো নেই। সেই মিসেস রাও উন্নততর হইয়াছেন। তাঁরা আর বই পড়েন না। রিল দেখেন আর নিত্য নতুন দ্রব্য খরিদ করে ওটিপি আউড়ে যান সারাদিন। এই বাজারে লেখকই এমন পণ্য , যার জন্য কোন ওটিপি জেনারেট হয় না।

 

তাই ‘আমি কী করি’ নিয়ে গভীর ভাবতে থাকি নবকুমারের মতোই। কী বললে পাবলিকের মারধোর খেতে হয় না, একটু মানইজ্জত নিয়ে এই বাইনারি সমাজে বাঁচতে পারি। ভাবতে ভাবতে কোভিড কাল আসে। পৃথিবীটা উলটেপালটে যায়। বন্যার জল সরে যাবার পর যেমন পলি, তেমনি কোভিড শেষ হবার পর দেখা যায় সে ভাল কিছু রেখে গেছে। অন্তত আমার জন্যে তো বটেই।

 

এখন কেউ জিগ্যেস করলে বুক চিতিয়ে বলতে পারি আমি ওয়ার্ক ফ্রম হোম করি। ক্যাংলাস কুলের দিব্যি, এই তিনটে ইংরেজি শব্দ শুনলেই লোকের চোখে  যে সম্ভ্রমটা ফুটে ওঠে তার জন্যে অমরত্ব  তুচ্ছ করাই যায়!

 

জীবন ফাইনালি সর্টেড!

1 Comment

  • Darrrrrruuun

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *