Email: editors.kokshopoth@gmail.com
October 8, 2026
Kokshopoth

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পরের দিন

Oct 2, 2026

সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়ের গল্পঃ
জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পরের দিন

সৌমাল্য-র নিজের কথায়ঃ

“বাংলা ভাষার এক গদ্য ও কবিতালেখক, এ’ছাড়া সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়ের অন্য কোনো পরিচয় আছে কি? বর্ধমান-নিবাসী যদিও, কিন্তু বিশ্বাস, বাস করেন মাটির তলায়। লেখা ও গ্রন্থপাঠ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে মানসিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন বহুদিন। মনে করেন কাম্যুর সংগে রক্তের কিছু গোপন যোগ থেকে গেছে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, সৌমাল্য মুখোপাধ্যায় এক দ্বীপের ভগ্নাংশ, আত্মভুক পোকামাকড়দের সংগে স্বরচিত আন্ডারগ্রাউন্ডে বেঁচে।”

আমাদের বিচারে, সৌমাল্য এক বিরল মনোযোগী পাঠক-ও বটেন। আমাদের যতটুকু জানা, সৌমাল্য এক তরুণ নিবিড় চিন্তাবিদ! তাঁর রচনার, সে কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-নিবন্ধ যাই হোক, মূল প্রতিপাদ্য, উপস্থিত থাকে এক সংশয়াত্মা!

১

 

এই যে কাঠের চেরায়টায় স্থাণু বসে থাকার পরেও আমার শরীরে মুহুর্মুহু জেগে ওঠে বল্গাহীন অশ্বের ভাবটি, এবং প্রহৃত অশ্বেরই মতো বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে— অথবা নিজেকে ছুঁড়ে দিতে— ইচ্ছা হয় সাদা পৃষ্ঠার দুগ্ধফেননিভ দেয়াল-পরিখায়— এটা কি অসুখ? রুগ্ন দুটি হাতে, কন্ঠায়, ভ্রুমধ্যে, এবং সবশেষে মস্তিষ্কে— লেখার দুর্বোধ্য তাগিদ ঘনিয়ে ওঠে: যেন সাগরের জল অলক্ষ্যে ঢুকে পড়েছে জন-অধ্যুষিত গঞ্জে, গরু-বাছুর ভেসে যাচ্ছে, নারীদের চিৎকার, অথর্ব লোলচর্ম বুড়ির আতঙ্কিত চোখদুটি দেখা যাচ্ছে জলের এই উতরোলের মধ্যেও। এমনই তারস্বরে ‘বাঁচাও’ ধ্বনি শুনতে পাই ভেতরে— সন্তরণপটু নই, কিন্তু সাঁতারের প্রাথমিকটুকু তো শিখেছি— ঝাঁপিয়ে পড়বো কি জলে? কিন্তু তারপর? কী লিখবো? কোন সেই অনির্দিষ্ট সংকেত যা দুলছে বাতাসে, ফিসফিসে ডাক প্রত্যহ শুনতে পাচ্ছি যার। এই প্রশ্ন জরুরি। কিন্তু তারও ঈষৎ পূর্বে অন্য এক সিদ্ধান্তেও অটল হতে হয়, যে-লেখাটি শুরু করবো সেটিও সদ্যোজাত রক্তচিহ্নিত ভ্রুণের মতো পথিমধ্যে সন্তর্পণে ফেলে দিয়ে চলে যাবো না তো? প্রকৃতপ্রস্তাবে আগে বুঝতে হবে, এই অস্বস্তি— যা ক্রমে লাল খুনে চোখ নিয়ে হিংস্র অঙ্গসঞ্চালনে উঠে দাঁড়াচ্ছে শরীরের মধ্যে— সরল চোখে যা লিখনের প্রেরণা বলেই মনে হচ্ছে আমার, তা সত্যিই লিখন-বাসনা তো? ভুল করছি না তো আমি? হতে পারে এ কোনো ব্যাধি। এ কি কোনো ব্যাধি? মনোবিকার? যদি সৃজন-প্রেরণা হয়, তাহলে শিল্পের যে প্রথম উদ্ধত দাবি নিঃশর্তে পূরণ করতে হয় সমস্ত কবিযশঃপ্রার্থীকে, সমস্ত আত্মমগ্ন চিত্রকরকে, সমস্ত তন্নিষ্ঠ সুরকারকে— ধৈর্য— সেই ধৈর্যের এমন ক্রূর অভাব আমার সর্বাঙ্গকে নুইয়ে দেয় কেন বারবার? ঠিক বললাম না। এ তো ঠিক ধৈর্যের অভাবও নয়। প্রথম বাক্য লেখার সঙ্গে-সঙ্গেই কোন অদৃশ্য দেবতার চাবুক পড়ে পিঠে আমার; দৈবকন্ঠ শোনা যায়— ‘শেষ করো, দ্রুত শেষ করো, আরও দ্রুত, সওয়ারিহীন বল্গাহীন নিরাশ্রয় অশ্বের মতো ছোটো, শেষ করে ফেলো লেখাটা’। 

—”দ্বৈপায়নদা আছেন?”

প্রথমটায় চমকে উঠলাম। আচমকা নিজের নাম শুনলেই ভয় হয়, চমকে উঠি। কে ডাকছে? যেন সম্ভাব্য আততায়ী! যেন হন্তারক দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষায়। তারই গলা বেয়ে ছিটকে আসছে এ-ডাক। আর কিছুক্ষণ— তারপরই গোপন কিংখাব থেকে বেরিয়ে আসবে ছুরি, তারপরই শূন্যে লাফ! ব্যাস! আয়নায় তাকিয়ে দেখেছি, সাধারণত আমার চোখের দৃষ্টিটাই ভয়ার্ত হরিণের। যেকোনো মুহূর্তেই শিকারীর ছায়া সে দেখতে পাবে— এমনই সন্ত্রস্ত দেহ ও মন নিয়ে বেঁচে-থাকা, খাদ্য-সংগ্রহ, সন্তানপালন। 

দুই মুহূর্ত সময় লাগল বুঝতে— দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ; গলাটাও চেনা— অঙ্কন। 

ঘরে ঢুকতেই এক বিনম্র সুগন্ধের মৃদু ঝাপট নাকে এসে লাগল আমার। সারা দেহ জুড়ে, অঙ্কনের, পারিপাট্যের ঢল নেমেছে। পরিচ্ছন্ন, সুস্নাত। পরনে পাঞ্জাবী। ধুতি। দুইই সাদা। পাট করে আঁচড়ানো চুল। আঙুলে পাথরের আঙটি। রোদ ঝিলিক মারছে তাতে। 

বেশবাসের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে তেমনি পরিপাটি কন্ঠে বলে উঠল অঙ্কন— “খবরটা শুনেছেন দ্বৈপায়নদা?”

—”কী খবর বলো তো?”

—”গতকাল জীবনানন্দ দাশ মারা গেলেন।”

—”সে কী! তবে যে সেদিন শুনলাম অবস্থা স্থিতিশীল এখন। ধীরে-ধীরে ভালো হয়ে উঠছেন।”

—”আপনি বোধহয় কয়েকদিন আগে শুনেছেন। প্রথমটায় তেমনটাই মনে হয়েছিল। ডাক্তারও কিঞ্চিৎ আশা দিয়েছিলেন। ভূমেনরা তো পালা করে দেখাশোনা করছিলই। কিন্তু কিছু করা গেল না।”

—”কীভাবে যে দুর্ঘটনাটা ঘটল! ট্রামের মতো এমন ধীরগতি এক যান!”

অক্টোবর মাসের এহেন তাজা এক সকালে টাটকা একটি মৃত্যুসংবাদ নিয়ে এসেছে অঙ্কন। সংবাদটি ধীরে সন্তর্পণে প্রবেশ করল আমার ভেতর। কিঞ্চিৎ যে দুঃখ হল না তা-ও নয়। তবে দুই চোখ জুড়ে আমি শুধুই তাকিয়ে রইলাম অঙ্কনের দিকে— যেন রোদের বান ডেকেছে। শীতের স্বাস্থ্যোজ্জ্বল রৌদ্রের মতো দেখাচ্ছে অঙ্কনকে, স্নান সেরেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, এখনও দু-একটি কেশাগ্রে জলকণা টলটল করছে। মৃত্যুসংবাদটি আমার মাথার মধ্যে থিতিয়ে বসেছে ততক্ষণে। কিন্তু তবুও আমার দুই চোখ জুড়ে শুধুই অঙ্কনের রূপ, স্বাস্থ্য, প্রাণের সংযত প্রাচুর্য, বহুবিচ্ছুরিত জীবন। মৃত্যুর তথ্যটি তার ছোট লেজ নিয়ে যে মাথার মধ্যে নড়ছে না তা কিন্তু নয়; কিন্তু বুদ্ধি নামক অঙ্গুরীয়টিকে সেই তথ্য-মৎস্য গিলে খেতে পারছে না কিছুতেই। মৃত্যুসংবাদ কিছুতেই বিমূঢ় করতে পারছে না আমায়। পরিবর্তে অঙ্কনের যৌবন ধকধক করে জ্বলছে সকালের প্রকাশ্য আলোয় আমার চোখের সামনে। 

জীবনানন্দ দাশের কবিতার সঙ্গে পরিচয় অনেকদিনের। বুদ্ধদেব তখন ‘প্রগতি’ বার করতেন ঢাকা থেকে। আমার বয়সই বা কত তখন! সেখানেই জীবনানন্দের ‘বোধ’— সেই চমৎকার কবিতাটি পড়েছিলাম। প্রথম পাঠেই বেশ চমকে গেছিলাম বলতে হয়। তখন ‘কল্লোল’ চলছে রমরমিয়ে। সেখানেও পড়েছি জীবনানন্দের লেখা। তারপর সঞ্জয়ের ‘পূর্বাশা’য়। ‘কবিতা’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটির কথা মনে আছে এখনও। বুদ্ধদেবের সম্পাদনায় প্রথম সংখ্যাটিতেই স্থান পেয়েছিল জীবনানন্দের কবিতা। সঙ্গে আরও কিছু লেখা— প্রেমেনবাবু, সঞ্জয়বাবু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথের— কবিতাই সে পত্রিকার মুখ্য দৃশ্য— দৃশ্যান্তরও; গদ্যের কাছ থেকে হৃত সম্মান ফিরিয়ে নিতে যেন কবিতা এতদিনে সজাগ হয়ে উঠেছে। সে এক ঘটনা। মনে হয় এই সেদিন। তখনও লেখক-মহলে আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত। আঃ, কী ভালো ছিল সেই দিনগুলি। কী নির্ভার। দেখতাম অনতিদূরে সুধীন্দ্রনাথ হেঁটে যাচ্ছেন— ‘পরিচয়’-এর আড্ডায় যাচ্ছেন হয়তো— আমি তাঁকে চিনি, কিন্তু তিনি চেনেন না আমায়। ওই তো— ওই বড়ো রাস্তায় কতবার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি অন্নদাশঙ্করকে— দেখেছি দূর থেকে। কাছে গিয়ে কথা বলার প্রশ্নই ওঠেনি। কিন্তু নিজেরই দোষে ধীরে-ধীরে অপরিচিত থাকার এমন দুর্লভ সুযোগটি আমি হারিয়ে ফেললাম। পরপর প্রকাশ পেল আমার তিনটি বই। একটি প্রবন্ধের ও দুটি কবিতার। এবং আশ্চর্যভাবে সেই প্রবন্ধ-পুস্তক ও দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থটি ভালো লেগে গেল বুদ্ধদেবের। একদিন আমায় ডেকে পাঠালেন কবিতাভবনের বাড়িতে। সেই থেকেই স্বনামখ্যাত সাহিত্যিকদের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা শুরু। বুদ্ধদেবের দৌলতে যেতে শুরু করলাম একের পর একটি সভায়। পরিচিতি বাড়লো। কিন্তু সমস্যাও হল একটি— বুদ্ধদেবের বাড়ি থেকে ফিরে আমি বুঝতে পারলাম এক আশ্চর্য বদল আমার শরীরে ঘটতে চলেছে। হ্যাঁ, পূর্বাভাস আমি সেদিনই পেয়েছিলাম। এবং হলও তাই। ক্রমে শরীরে এমন এক অস্বস্তি তৈরি হল, এমন এক অজ্ঞাত চাপ— যা আমায় বারবার সজোরে নিক্ষেপ করে— করতে চায়— ধবধবে অলিখিত পৃষ্ঠার মুখে; অথচ লিখতে দেয় না কিছুই। এই অসুখের সূত্রপাত সেদিন থেকেই। সেদিন থেকে আমি এমন একটি বাক্যও লিখতে পারিনি— যে বাক্যটিকে আমি সাহিত্যপদবাচ্য বলে মেনে নিতে পেরেছি। 

—”আচ্ছা দ্বৈপায়নদা, আজ এলাম। এখনও বাজার হয়নি, সেরে বাড়িতে ফিরতে হবে। বৌদিকে দেখছি না?”

—”বাপের বাড়ি গেছে। সন্ধ্যার দিকে ফিরবে।”

—”আচ্ছা।”

 

২

 

—আপনি কি জানেন, জীবনানন্দের বিবাহ-সন্ধ্যায় আমি উপস্থিত ছিলাম? 

খানিক অন্যমনস্ক ভাবেই বললেন বুদ্ধদেব। বেশ কিছুদিন পরে ওঁর বাড়িতে এলাম। আসা হয়নি মাস দেড়েক। ঈষৎ বিষণ্ণ দেখাচ্ছে যেন বুদ্ধদেবকে। শোকার্ত নয়, বিষণ্ণ। বন্ধুর মৃত্যুতে মানুষকে যেমন দেখায় ঠিক তেমনটা নয়— অন্য এক ধরণের বিষণ্ণতা। জানলা ভেঙে কিছু আলোও তার মুখে এসে পড়েছে। সকালের আলো। নরম। চিলতে ঠান্ডার ছোঁয়া তাতে। বস্তুত, মেঘ ও রৌদ্রের এক সংযত বিন্যাস এখন বুদ্ধদেব বসুর মুখে স্পষ্ট দেখা যায়। 

—এটা তো জানতাম না। 

খানিক অতিরিক্ত বিস্ময় দেখিয়ে বললাম। এমনটাই বলতে হয়। বিখ্যাত লোকের কাছে অজানিত তথ্য শুনলে এমনটাই বলা নিয়ম। 

—জানার কথাও নয়। বিয়ে হয়েছিল ঢাকার ব্রাহ্ম-সমাজে। তখনো আমি ঢাকা-নিবাসী। কলকাতায় আসিনি। 

চোখের সেই শানিত ঝিলিক দেখতে পাচ্ছি না কেন বুদ্ধদেবের আজ? যে বিদ্যুৎ ঠিকরে পড়ত দৃষ্টি থেকে, ওঁর— সেই বিদ্যুৎ নেই, শুধু মৃত আকাশ, মৃত, মেঘ নেই, আলো নেই— নিস্তব্ধ মণিদুটো তাকিয়ে রয়েছে সামনের দিকে। চোখের এই ভাষাটি ঠিক চেনা নয় আমার। 

—একটা কথা আজ সরাসরি জিগ্যেস করবো আপনাকে? জানি না উচিত হবে কিনা। 

—বলুন। 

—ইতিহাস আপনাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে, এমন ভয় হয় না কখনো? 

ঠিক করলাম কি জিগ্যেস করে? মুহূর্তের খেয়ালে বলে ফেলেছি। বা হয়তো খেয়ালটিকে প্রশ্রয় দিয়েছি সজ্ঞানে। ভেবে-চিন্তে এই প্রশ্ন করতে পারতাম না কখনোই। মুহূর্তের ঝোঁক ছাড়া এমন প্রশ্ন করা অসম্ভব। 

—কেন? 

নির্বিকার মুখেই বললেন বুদ্ধদেব। রাগ নয়, কৌতূহল নয়, অক্ষরহীন স্লেটের মতো নির্বিকার এক মুখ। বললাম, 

—৪৬ সালের আপনার সেই সম্পাদকীয়! জীবনানন্দের বিরুদ্ধে সে-তো শুধু পুনরাবৃত্তির অভিযোগ নয়। সম্পাদকীয়তে লিখলেন— জীবনানন্দ দাশ কী লিখছেন আজকাল। লিখলেন—”পাছে কেউ বলে তিনি এস্কেপিস্ট, কুখ্যাত আইভরি টাওঅরের নির্লজ্জ অধিবাসী, সেইজন্য ইতিহাসের চেতনাকে তার সাম্প্রতিক রচনার বিষয়ীভূত ক’রে তিনি এইটেই প্রমাণ করবার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন যে তিনি ‘পেছিয়ে’ পড়েননি। করুণ দৃশ্য, এবং শোচনীয়।” মুদ্রাদোষের অভিযোগ যদিও তার আগেই তুলেছেন। 

—জানি না। শুধু এটুকু জানি, আমি নিজের সঙ্গে শঠতা করিনি। আপনার নিশ্চয় মনে আছে দ্বৈপায়ন— জীবনানন্দ দাশের জন্যে প্রথম থেকে অক্লান্ত সংগ্রামটি কিন্তু আমিই করেছিলাম। এবং প্রায় কুড়ি বছর— একা। সেই লড়াই যখন শুরু হয়েছিল তখন আমিও বুদ্ধদেব ছিলাম না, জীবনানন্দও জীবনানন্দ হননি। 

—কিন্তু ভবিষ্যৎ যদি ভুল বোঝে, যদি ব্যক্তিগত অসূয়া খোঁজে, ঈর্ষা খোঁজে ওঁর সম্পর্কে আপনার মত পরিবর্তনে? 

—যদি নয়, আমি জানি তারা খুঁজবে। কিন্তু একবার ভাবুন দ্বৈপায়ন, ব্যক্তিগত অসূয়া যদি প্রসঙ্গ হত— তাহলে কি আমি প্রথম থেকেই এড়িয়ে যেতাম না লোকটিকে? আপনারা যে জীবনানন্দকে চেনেন, সেই জীবনানন্দকে আমি দেখছি সেই প্রগতির সময় থেকে। এবং তখন থেকেই দেখছি তিনি অসামাজিক। হ্যাঁ, অসামাজিক। নির্জনতার এক তীক্ষ্ণ সশস্ত্র কবচ শরীরে নিয়েই তিনি হেঁটে-চলে ফিরছেন, এবং তা যে আত্মরক্ষারই তাগিদে— সে আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম। আমি তো প্রথম ইস্তক তেমনটাই দেখছি তাঁকে। অন্তরঙ্গতা তাঁর সঙ্গে সম্ভব ছিল না। কখনোই। শামুকের খোলের মধ্যে তিনি প্রথম থেকেই বাস করতেন, স্বেচ্ছায়। অথচ তেমন এক আত্মসর্বস্ব লোকের জন্যে আমি দিনের পর দিন যুদ্ধ করলাম কেন? বন্ধুতা তো তাঁর সঙ্গে কখনোই ছিল না আমার। ছিল অচিন্ত্যর সঙ্গে, প্রেমেনের সঙ্গে। এক ধরণের সখ্য ছিল সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গেও। তাহলে কেন লড়লাম আমি ওঁর হয়ে? খেয়াল করে দেখবেন দ্বৈপায়ন, এমনভাবে মানুষ শুধু আত্মজ’র জন্যে লড়ে। উত্তর একটাই। তার লেখা— তার লেখার জন্যে। অন্য কোনো কারণ নেই। সেই আমারই যদি এক সময় এসে মনে হয় তার লেখা হয়ে উঠেছে পুনরাবৃত্তিপ্রবণ, পুনরুক্তিতে ভগ্নকায়— তা বলার অধিকার নেই কি আমার? নিজের অনুভবের প্রতি সৎ থাকার মৌলিক অধিকারটুকু অন্তত আমি হারাতে চাই না। আর ভবিষ্যতের কথা বলছেন? জীবনানন্দকে আক্রমণে-আক্রমণে ছিন্নভিন্ন করেছেন যে সজনীকান্ত দাস, সেই সজনীকান্তই প্রশ্নাতীত দ্রুততায় মুমূর্ষু জীবনানন্দের জন্যে হাসপাতালে ডেকে আনলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে— আপনি কি ভেবেছেন, ইতিহাস তা মনে রাখবে? নাহ্। মনে রাখবে শুধু সজনীকান্তের আক্রমণটুকুই। 

খানিক ক্লান্ত দেখালো বুদ্ধদেবকে। এই প্রথম ওঁর মুখে বয়সের লক্ষণ খেয়াল করলাম আমি। না, শুধু মুখে নয়। কন্ঠেও। ধীরে নীচু গলায় বললাম, 

—আজ উঠি। পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছে আপনাকে। 

উত্তর দিলেন না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেঝের দিকে। উঠে পড়লাম। আজ আর কথা সম্ভব নয়। দরজা খুলতে যাবো— এমন সময়ে বলে উঠলেন, 

—একটা কথা মনে রাখবেন দ্বৈপায়ন, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে সঞ্জয় ভট্টাচার্যের কাছে শয্যাগত জীবনানন্দ একটা কমলালেবু খেতে চেয়েছিলেন। কমলালেবুর মাংসটুকু শেষবারের মতো ছিবড়ে করে তার রস নিঙড়ে নিতে চেয়েছিলেন। মুখের মধ্যে। তালুর মধ্যে। জিহ্বায়। নরম কমলালেবুর রস। মৃত্যুর আগে তার অক্ষত দাঁতে চিপে, পিষে। 

 

৩

 

একটা কমলালেবু। তার রস মুখের মধ্যে পেতে চেয়েছিলেন জীবনানন্দ। মৃত্যুর আগে। হয়তো স্বাদ হবে একটু টক। আঃ, কী প্রগাঢ় বিস্বাদ। কী নিবিড় নিতল শান্তি। কতদিন পরে আজ ওই যন্ত্রণাটা টের পাচ্ছি না। ষাঁড়ের শিং নড়ছে না ভেতরে। আজ আমি নিজেকে ছুঁড়ে ফেলবো না নিথর নিস্তব্ধ মৃত সাদা পৃষ্ঠাগুলির পায়ে। কয়েদির শেকল আজ আলগা হয়েছে। মর্মরনির্মিত পৃষ্ঠায় ঘা-খেয়ে মুখ-চোখ আজ রক্তাক্ত হবে না বহুদিন পরে। স্বস্তি। অক্ষত মুখেই আজ সেই আগের মতো বসবো পৃষ্ঠা-দেবীর সামনে— লেখকের নির্দিষ্ট আসনে। শান্ত ভাবে। তারপর ধীরে কলম তুলে নেবো। ভাববো। প্রতিটি শব্দ। প্রতিটি যতি। বাক্যের নানান মোড়, বিবিধ বাঁক। বাক্যের গমক। বাক্যের গতি। স্থিতি। লয়। ভাববো ধৈর্য নিয়ে।

জীবনানন্দ দাশ কাল মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি একটি কমলালেবু খেতে চেয়েছিলেন। শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের বেডে শুয়ে। নশ্বর জীবনের সমূহ রক্তমাংসরস চুষে খেতে চেয়েছেন— যেমন জীবনে, তেমনি মৃত্যুর আগেও। অসামাজিক হতে কুন্ঠা বোধ করেননি জীবনানন্দ। অসভ্য হতে। অন্তর্মুখী হতে। নিজের ব্যাধির প্রতি সৎ থাকতে— নিজের স্বর্ণময়ী ব্যাধির প্রতি। তাঁর সশস্ত্র নীরবতা তাঁর সতীর্থদের বিব্রত করেছে, অস্বস্তিতে ফেলেছে— কখনো হয়তো বা অপমানিতও বোধ করেছেন তাঁরা। কিন্তু তাতে তাঁর এসে যায়নি কিচ্ছু। বেপরোয়া ক্ষিপ্রতায় প্রতি মুহূর্তে চুষে খেতে চেয়েছেন শুধু মুহূর্তেরই রস। রাক্ষসী যেভাবে রক্ত খায়। সময়ের গর্ত থেকে চুঁয়ে পড়ছে যে মধুবৎ বিষ। সেই ইতিহাসের রস। ব্যক্তি-মানুষের অভ্যন্তরে যে ঘটমান সন্ত্রাস— তারও রস। যেন প্রতিটি মুহূর্তই এক-একটি কমলালেবু। প্রতিটি মুহূর্তেই তিনি বেঁচে ছিলেন, মৃত্যুর আগে মানুষ যেভাবে বেঁচে ওঠে— তেমনই জাগ্রত হয়ে। মুমূর্ষু বাঘের মতো। এই অতীন্দ্রিয় জাগরণ তাঁর অসুখ— এই জাগরণই তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে দগ্ধ করেছে— অথচ ওই দগ্ধতা থেকে কখনো সরে আসতে চাননি তিনি। স্বধর্মচ্যুত হতে চাননি। 

জীবনানন্দ দাশ কাল মারা গেছেন। ব্যাধির প্রতিমার সামনে যিনি আমৃত্যু ঠায় বসেছিলেন, অসভ্য অসামাজিক ইতরের মতো। যেভাবে প্রবীণ সেবায়েত বিগ্রহের সামনে বসে, নিত্য পূজায়। আজ অনেকদিন পরে, আমিও, সাদা পৃষ্ঠার মুখোমুখি তেমনভাবে বসতে পারবো, অক্ষত শরীর নিয়ে, যে শরীর বিশিষ্ট লেখকদের সংস্রব চায় না, কমলালেবুর রস চুষে খেতে চায় কেবল।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *