তিস্তা-র ধারাবাহিক আখ্যান
তিস্তা-র ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৮
তিস্তার নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এবং হচ্ছেনও না। উপভোগ করছেন। এ’টুকুই আমাদের প্রাপ্তি।
লাইন
ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম। মাসের প্রথম সপ্তাহ। ভিড় থাকবে জানা কথা, তবু ভেবেছিলাম সকাল সকাল গেলে চটপট কাজ সেরে বেরোনো যাবে।
দরজা দিয়ে ঢুকেই দেখলাম একটা লম্বা লাইন। ক্যাশ কাউন্টারের সামনে প্রায় পনেরো-ষোলো জন দাঁড়িয়ে। এসির মৃদু শব্দ ও ঠান্ডা শান্ত আবহের মধ্যেও ব্যাঙ্কের ভেতরের হাওয়াটা কেমন থমথমে। সবাই চুপচাপ নিজের পালার অপেক্ষায়। আমি গিয়ে সবার শেষে দাঁড়ালাম।
আমার সামনে একজন প্রবীণ লোক। গায়ে ফিকে হয়ে আসা শার্ট, বগলে চেপে ধরা একটা পুরোনো প্লাস্টিকের ফাইল। ফাইলে কয়েকটা পাসবই উঁকি মারছে। তাঁর সামনে আরও কয়েকজন। কেউ একমনে মোবাইলের স্ক্রিন স্ক্রল করছে, কেউ বারবার হাতঘড়ি দেখছে। একজন লোক পাশের জানলার গ্রিল ধরে বাইরের রাস্তার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে।
ব্যাঙ্কের দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা এসির শব্দের সঙ্গে মিশে একঘেয়ে এক সুর তৈরি করছিল। ক্যাশ কাউন্টারের কাচের ওপারে বসে থাকা ক্যাশিয়ারের হাতের আঙুলগুলো দ্রুত চললেও, এই অলস লাইনের গতিতে তার তেমন কোনো প্রভাব পড়ছিল না। সময়টা যেন এই চার দেয়ালের ভেতর এসে কিছুটা আঠালো হয়ে গেছে। আমরা সবাই কেবল মেঝের নির্দিষ্ট দূরত্বটুকু অতিক্রম করার জন্য ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোচ্ছি। লাইন এগোচ্ছিল খুব ধীরে। প্রতিটি মানুষের সরার সঙ্গে সঙ্গে মেঝের ওপর জুতোর ঘষা খাওয়ার হালকা একটা খসখস শব্দ হচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর পিছন থেকে একজোড়া হনহন করা পায়ের শব্দ পেলাম। একজন লোক আমাকে পাশ কাটিয়ে সোজা সামনে চলে গেল। প্রথমে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারিনি।
লোকটার গায়ে গাঢ় রঙের টি-শার্ট, কপালে ঘামের ফোঁটা। সে কাউকে কোনো তোয়াক্কা না করে, একেবারে সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা আরও পাঁচ-ছয় জন মানুষকে পাশ কাটিয়ে, কাউন্টারের কাছাকাছি থাকা দুজন মানুষের মাঝখানের সামান্য আলগা ফাঁকটুকুতে সোজা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কেউ কিছু বলল না। লাইনের বাকি মানুষজন যেমন শান্ত দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনই রইল। যেন এটাই খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমি একটু গলা চড়িয়ে বললাম, “দাদা, লাইনটা তো পেছনে। সবাই দাঁড়িয়ে আছে।”
লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে আমার দিকে তাকাল। চোখে কোনো অপরাধবোধ বা দ্বিধা ছিল না। বেশ অনায়াসে বলল, “একটু তাড়া আছে ভাই। সামান্য জমা দেব, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব না।”
তারপর আবার আগের মতো সামনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আমি আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আমার সামনে দাঁড়ানো প্রবীণ লোকটা একবার পিছন ফিরে তাকালেন। তাঁর চোখে কোনো রাগ ছিল না, বিরক্তিও না। শুধু এক ধরণের ভারী ক্লান্তি। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য মাথা নাড়লেন—যেন বলতে চাইলেন, ‘থাক, ছেড়ে দাও।’
আমিও চুপ করে গেলাম। নিঃশব্দে হাত দুটো পকেটে পুরে নিলাম। আসলে আমরা প্রতিদিন এমন বহু অন্যায় দেখেও অভ্যাসের বশে চোখ ফিরিয়ে নিই। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেয়ে চুপ করে নিজের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা, আমরা বেশি নিরাপদ মনে করি। লোকটার অন্যায়ভাবে ঢুকে পড়া যতটা না বিরক্তির ছিল, তার চেয়েও বেশি অস্বস্তিকর ছিল চারপাশের এই নির্বিকার সইয়ে নেওয়ার মানসিকতা।
কিছুক্ষণ পর লোকটা কাউন্টারে পৌঁছে গেল। ক্যাশিয়ার নোট গুনে নিলেন। তার কাজ হয়ে গেল। সে কোনো দিকে না তাকিয়ে কাচের ভারী দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। লাইন আবার ধীর গতিতে এগোতে শুরু করল…।
অদ্ভুত ব্যাপার! লোকটা চলে যাওয়ার পরও লাইনের কেউ তাকে নিয়ে আর একটা শব্দও বলল না। যেন লোকটার আসা আর চলে যাওয়া—দুটোই খুব স্বাভাবিক। মনে হলো, এই দৃশ্যটা আমরা সবাই চিনি। প্রতিদিন নানা রূপকে আমরা এর মুখোমুখি হই।
বাসে ওঠার সময়।
স্টেশনে টিকিট কাটার সময়।
হাসপাতালের আউটডোরে।
রেশন দোকানে।
কোনো দর্শনীয় জায়গায়।
এমনকি শ্মশানের বৈদ্যুতিক চুল্লির সামনেও।
লাইন মানে তো শুধু দাঁড়িয়ে থাকা বা সময়ের অপেক্ষা নয়। লাইন মানে হলো একটা অলিখিত, অদৃশ্য নিয়ম নিঃশব্দে মেনে নেওয়া—আমার আগে যে এসেছে, তার অধিকার আগে। তার পর আমার। তারপর আমার পিছনের মানুষটার।
এই সামান্য শিষ্টাচারটুকু মানতে পারলেই একটা বিশৃঙ্খল ভিড় শৃঙ্খলিত হয়ে মানুষের সমাজে পরিণত হয়। নইলে সবাই শুধু নিজেরটুকু কনুই দিয়ে ঠেলে ছিনিয়ে নিতে থাকে।
কাউন্টারের সামনে আবার একজন এগিয়ে এলেন। তাঁর কাজ শেষ হতে সময় লাগছিল। পাসবই প্রিন্ট করা নিয়ে সমস্যা। আমার পিছনের লোকটা বিরক্ত হয়ে ঘড়ঘড় করে নিঃশ্বাস ফেলছিলেন। আমারও অফিসে পৌঁছনোর তাড়া ছিল। তবু লাইনে দাঁড়িয়ে রইলাম।
হঠাৎ মনে হলো, মানুষকে ছোটবেলা থেকেই তো লাইনে দাঁড়াতে শেখানো হয়।
স্কুলে সকালের প্রার্থনার সময়—উচ্চতা অনুযায়ী লাইন।
টিফিনের সময় ক্যান্টিনের সামনে।
স্কুলবাসে ওঠার মুখে।
পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে।
আমরা ছোটবেলা থেকে শিখি—আগে অন্যজন, তারপর আমি। আগে নিয়ম, তারপর নিজের সুবিধা। কিন্তু বড় হতে হতে কখন যেন সেই শিক্ষাটা অলক্ষে হারিয়ে যায়। তখন আমরা শুধু সুযোগ খুঁজি। সামান্য আলগা ফাঁক পেলেই কনুই চালিয়ে এগিয়ে যাই।
কেউ দেখছে না তো?
কেউ তো বাধা দেবে না!
আমার একটু ব্যক্তিগত সুবিধা হলে অন্যের কী এমন ক্ষতি?
হঠাৎ মনে হলো, সভ্যতা হয়তো খুব জটিল কোনো দর্শন বা জ্ঞান নয়। সম্ভবত সভ্যতা হলো—নিজের আগে অন্য একজনের যে স্বাভাবিক পাওনাটুকু আছে, এই সহজ সত্যটুকু নিঃশব্দে মেনে নেওয়া।
কাউন্টারে আমার নম্বর এলো। টাকা আর স্লিপটা দিলাম। কড়া নোটের গন্ধ আর ক্যাশ মেশিনের শব্দের মধ্যে কাজ শেষ হলো। রসিদটা পকেটে নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে এলাম।
বাইরে বেশ রোদ। পিচ গলে যাওয়া গরম। রাস্তার মোড়ে একটা নীল রঙের বাস দাঁড়িয়ে ছিল। দরজায় হুড়মুড় করে লোকজন উঠছে। কন্ডাক্টর চেঁচাচ্ছে। কেউ ধাক্কা দিচ্ছে, কেউ নামার চেষ্টা করছে, কেউ তাড়াহুড়ো করছে।
আমি ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সেই বিশৃঙ্খল দৃশ্যটা দেখলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে বড় আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তো আসলে কোনো নিয়ম বা লাইন মেনে আসে না।
কে কার আগে জন্মাবে, তার কোনো লাইন নেই।
কে আগে ভালোবাসা পাবে, আর কে সারাজীবন শুধুই পাওয়ার আশায় বসে থাকবে—তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী নেই।
কে কখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়বে, আর কে সুস্থ থেকে যাবে—সেখানে কোনো লাইন মানা হয় না।
কেউ খুব অল্প বয়সে সব হিসেব চুকিয়ে হঠাৎ চলে যায়।
কেউ সারাজীবন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু পায় না। আর কেউ কোনোদিন লাইনে না দাঁড়িয়েও না চেয়েও অনায়াসে সব পেয়ে যায়।
জীবন কখনো কাউন্টারের ওপাশ থেকে ডেকে বলে না—‘আপনার নম্বর এসেছে, এগিয়ে আসুন।’
আমি বাসস্টপের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ব্যাঙ্কের সেই ধাক্কা মেরে ঢুকে পড়া লোকটার মুখ আর মনে পড়ছিল না। মনে হচ্ছিল, আমরা লাইনে দাঁড়াতে শিখি কেবল বেঁচে থাকার সাময়িক প্রথাটুকু টিকিয়ে রাখতে, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। কিন্তু জীবন আমাদের কোনোদিন কোনো লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখে না। সে তার নিজের খেয়ালে চলে।
হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার মোড়ে এসে থামলাম। ট্রাফিক সিগন্যালে লাল আলো জ্বলতেই একঝাঁক গাড়ি আর মানুষ পাশাপাশি এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই একটা অদৃশ্য লাইনে আটকে গেল।
আমি ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, যে লোকটা আজ লাইনে ফাঁক পেয়ে আমার সামনে চলে গেল, সে হয়তো ভেবেছিল কয়েক মিনিট জিতে গেল। সে ভেবেছিল কিছুটা সময় ছিনিয়ে নেওয়াটাই আসল সাফল্য। কিন্তু জীবনের কাছে কোনো জেতা-হারা নেই। আমরা কেউ এই থমকে থাকা ট্রাফিক লাইনের চেয়ে বেশি স্থায়ী নই। সময় ঠিক তার মতো করে সবাইকে একই বিন্দুতে এনে দাঁড় করায়। সেখানে কোনো তাড়া নেই, কোনো আগে বা পিছে নেই।
সবুজ আলো জ্বলতেই গাড়িগুলো হুড়মুড় করে পেরিয়ে গেল। মানুষগুলো ছড়িয়ে পড়ল যার যার রাস্তায়। জীবনে আর কতটা পথ বাকি রইল, আর কে আমার আগে বা পরে গেল—সেই হিসেবটুকু পেছনের ফুটপাথেই ফেলে রেখে সিগন্যাল পেরিয়ে আমি নিজের ছায়ার ওপর পা ফেলে হাঁটতে লাগলাম…