Email: editors.kokshopoth@gmail.com
September 26, 2026
Kokshopoth

গল্পঃ রাশেদ রহমানের গল্পঃ  আশ্বিনা বাউ

Sep 18, 2026

রাশেদ রহমানের গল্পঃ আশ্বিনা বাউ

জন্ম ০৫ নভেম্বর’১৯৬৭,রসুলপুর,টাঙ্গাইল। পিতা: জহির উদ্দিন মন্ডল|মাতা:জয়নব বেগম। শিক্ষা:বিএসএস (অনার্স), এমএসএস (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)।পেশা:সাংবাদিকতা, বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক পূর্বাকাশ।প্রকাশনা :কাব্যগ্রন্থ : ৩টি,গল্পগ্রন্থ : ২০টি,উপন্যাস : ৩টি    

পুরস্কার :১.টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ তরুণ লেখক পুরস্কার’২০১৪। ২.শওকত ওসমান সাহিত্য পুরস্কার (২ জানুয়ারি ২০১৯, বিষলক্ষার ছুরি) ৩.সব্যসাচী আবু কায়সার পুরস্কার (১ মে ২০২৩)

সম্পাদনা :

উতঙ্ক ( সাহিত্যের ছোটকাগজ)  

 

আশ্বিনা বাউ শুরুর অপেক্ষায় থাকে নরেশ রাহা। এটা তার দীর্ঘকালের অভ্যেস। ভাদ্র পড়লেই নরেশ রাহার মনে পড়ে— সামনেই আশ্বিন। আশ্বিনের বাতাস নরম, কোমল; বাসমতি চালের মতো, শেফালি ফুলের মতো সুগন্ধী। শালুক নদের ওপার থেকে আসে এই বাতাস। এই বাতাসে ভেসে আসে ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ধ্বনি; জগজ্জননীর শরীরের সুঘ্রাণ। কিন্তু কোথায় আশ্বিনা বাউ? কোথায় ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের সুমধুর ধ্বনি? কোথায় জগৎমাতার শরীরের ঘ্রাণ? নরেশ রাহা সারাদিন বারবাড়ি কামরাঙাগাছের ছায়ায় বসে পাটি বোনে। শীতলপাটি বোনার নিখুঁত কারিগর হিসেবে চারদিকে, গ্রাম পার করে শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে তার নামডাক। যেমন দ্রুত চলে তার হাত, তেমনি তার পাটির অঙ্গসজ্জা। নানা জাতের ফুল-পাখি-প্রাণীর আকৃতি পাটিতে ফুটিয়ে তোলে, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। হাটে-বাজারে নরেশ রাহার শীতলপাটির প্রচুর সমাদর। বিক্রিবাট্টাও হয় বেশ। কিন্তু ভাদ্র ফুরিয়ে আসতে শুরু করলেই নরেশ রাহার হাতের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। পাটির অঙ্গসজ্জা ফোটে না। মন উতলা। কবে শুরু হবে আশ্বিনা বাউ? কবে বাতাসে ভেসে আসবে ঢাকের বাদ্য? মায়ের শরীরের সুঘ্রাণ? নরেশ রাহা বাতাসে কান পেতে থাকে। বাতাসে কান পাতলেই তার মনে হয়, এটা যে বিভ্রম, মায়া— তাও সে বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না; ওই তো আশ্বিনা বাউ শুরু হয়েছে, শালুক নদের জলে মৃদু-মৃদু ঢেউ উঠছে; কিছুক্ষণের মধ্যেই নদ পার হয়ে ওই বাউ বাঁশকাইল পাটিতাপাড়া এসে যাবে। সঙ্গে আসবে মাতৃরূপেণ দেবী-দুর্গার শরীরের ঘ্রাণ, দুর্গার আশীর্বাদ, স্নেহ-মমতা…।

উমাদেবী যে আর কখনোই পাটিতাপাড়া আসবে না, এ গ্রামে আসার পথই যে রুদ্ধ; এখানে উমার পিত্রালয় নেই, মাতা-পিতা, ভাই-বোন নেই; বন্ধু-স্বজন নেই; উমাকে আদর-সোহাগ করার কেউ নেই, যত্ন করে পাতে খাবার তুলে দেওয়ার নেই কেউ, গ্রামে একাকী বৃদ্ধ নরেশ রাহা, আর তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধা স্ত্রী কমলা— তাদের বাড়িতে উঠে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না; নরেশ রাহা এটাই মেনে নিতে পারে না। আশ্বিনা বাউ শুরুর অপেক্ষায় থাকে…।

গ্রামে এখন একঘর হিন্দু— নরেশ দম্পতি। নরেশের ছেলে, ছেলেবউ, দুটি নাতি-নাতনি আছে। কিন্তু তারা কেউ বাড়িতে থাকে না। শহরে বসতি গেড়েছে। নরেশের বাড়িটি— ‘বাড়ি তো নয় পাখির বাসা/ ভেন্নাপাতার ছানি/ একটুখানি বৃষ্টি হলেই/ গড়িয়ে পড়ে পানি…।’ বাড়িতে একটিমাত্র টিনের দোচালা ঘর। সেই ঘরের টিনের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ে। ঘরের টিনের বেড়ায় শতছিদ্র। ঘরের পুরনো কাঠের খামখোটায় উলু ধরেছে। কে জানে, কবে ভেঙে পড়ে নরেশের ঘরটি। অথচ একদিন, কী দিন ছিল তার! বাড়িতে বারান্দাসমেত বড়োসড়ো চৌচালাঘর। গজারিকাঠের খুঁটি ঘরে। আলাদা রসুইঘর। বাড়ির অদূরে পাকা টাট্টি। তখনকার দিনে গ্রামে হাতেগোনা কয়েকটি বাড়িতে পাকা টাট্টি ছিল, তার একটি ছিল নরেশ রাহার বাড়িতে। চকে পৈত্রিকসূত্রেপ্রাপ্ত অল্পকিছু জমিও ছিল। তাও বিক্রি করতে হয়েছে। এখন সম্বল শুধু ভিটেবাড়িটুকু। নরেশ রাহা আশ্বিনা বাউ শুরুর অপেক্ষা করতে-করতে ভাবে— কী থেকে যে কী হয়ে গেল! এই দুনিয়া, এই ঘরসংসার— এসব কিছুই না। কেউ কারও না। সবই ফাঁকিজুকি, প্রবঞ্চনা…।

নরেশ রাহার মনে আছে, কুষ্ঠিও করা ছিল, পরে মায়ের কাছে শুনেছে, কিন্তু সেই জন্মপত্রিকা ঘরে কোথাও আছে কি নেই, নরেশ রাহা পত্রিকাটি অনেক খুঁজেছে, পায়নি; পেলে ভালো হতো; তারপরও নরেশ রাহা জানে, ১৯৪০ সালে তার জন্ম; তার জন্মের একবছর পরে দেশে-দেশে যুদ্ধ লাগে। বিশ্বযুদ্ধ। তখন বৃটিশ আমল, নরেশ রাহা পরবর্তীতে যে-বাংলাদেশ পায়, সেই বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, বিহার— সর্বত্র যুদ্ধের শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছিল; বৃটেন ও জাপান ছিল যুদ্ধের প্রধান দুই পক্ষ; ভারত-বাংলাদেশ ছিল বৃটেনের পক্ষে। সবসময় জাপানি বোমা-পড়ার আতঙ্কে থাকতো মানুষ। যুদ্ধকালে, নরেশ রাহা একবছরের শিশু, ওর মা-বাবা বোমা-পড়ার সাইরেন বাজতেই দুধের শিশুকে নিয়ে বাংকারে ঢুকে পড়তো। নরেশ রাহা এই যে দুধের শিশু, বাংকারে ঢুকে প্রাণে বেঁচেছিল, সেই নরেশ রাহা আবার বাংকারে ঢুকে প্রাণে বাঁচে, তখন বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে…।

কোলের শিশু, নরেশ রাহার বয়স তখন তিন, দেশে-দেশে তখনো যুদ্ধ চলছে। খবর আসে নানাভাবে— চট্টগ্রামে বোমা পড়ছে, কুমিল্লায় বোমা পড়ছে; সর্বত্র বোমাতঙ্ক। তৎকালীন পূর্ববাংলার বিশাল একটা অংশ যেন যুদ্ধক্ষেত্র! বাঙালি নেতা সুভাস বসু ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন; নরেশ রাহা সবই শুনেছে পরবর্তীতে, শৈশব-কৈশোরে, মা-বাবার মুখে; এবং যুদ্ধচলাকালেই দেশে দুর্ভিক্ষ লেগেছিল, ১৯৪৩ সালে। দেশের রাস্তাঘাটে, গাঁয়ে কি শহরে; ঢাকা কি কোলকাতা— সবখানে অনাহারী মানুষের লাশ পড়ে থাকতো; নরেশ রাহার দাদা-দাদি, পিসি-মাসি, খুড়ি-খুড়ো— পাটিতাপাড়ার আরও অগুনতি মানুষ সেই দুর্ভিক্ষে মারা যায়, নরেশ রাহা এ-সবও পরে মা-বাবার মুখে শুনেছে। ভাগ্য ভালো, ঈশ্বর সহায় ছিল— ওই মহাদুর্ভিক্ষে, মন্বন্তরে নরেশ রাহার মা-বাবা কোনোমতে বেঁচে ছিল, শিশু নরেশ রাহাও বেঁচে গেছিল মৃত্যুর মুখ থেকে…। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, পথেঘাটে মানুষের লাশ— কিন্তু ৩১ বছর পর, ১৯৭৪ সাল; নরেশ রাহার বয়স তখন ৩৪, বাংলাদেশে আবার দুর্ভিক্ষ এসেছিল, এবারও পথেঘাটে— বিশেষ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম— অগণিত লাশ খেয়েছিল কুকুর-শিয়ালে; তখন বৃটিশ-শাসিত ভারত নয়, পাকিস্তান নয়; স্বাধীন বাংলাদেশ; স্বাধীন বাংলাদেশের স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এইসব লাশ দেখেছেন, কিন্তু তিনি অনাহারী মানুষের লাশে পরিণত হওয়া, শিয়াল-শকুন-কুকুরের খাদ্য হওয়া ঠেকাতে ব্যর্থ হন; নরেশ রাহা স্বাধীন বাংলাদেশের এই খেতে না-পাওয়া মানুষের মৃত্যুও দেখেছে। না-খেতে পাওয়া মানুষের মৃত্যু তখন আর শুধু রংপুর, কুড়িগ্রাম, চিলমারী নয়; বাঁশকাইল কি নগদাশিমলা কি গোপালপুরের রাস্তাঘাটেও ক্ষুধাজর্জর মানুষের লাশ পড়ে থাকতো। এইসব হাভাতে মানুষ, অনাহারী মানুষের লাশ দেখতে-দেখতেই নরেশ রাহা বুড়ো হয়েছে…।

নরেশ রাহা এখন থুত্থুড়ে বুড়ো। দীর্ঘকায়, ছ’ফুট লম্বা, সুপারিগাছের মতো একহারা গড়ন ছিল নরেশ রাহার। বয়সের ভারে ন্যূব্জ নরেশ রাহার পিঠ এখন অতিশয় বৃদ্ধ বকের পিঠের মতো বেঁকে গেছে। পিঠবাঁকা বক যেমন মাছ ধরতে পারে না, নরেশ রাহাও যে সোজা হয়ে, শিরদাঁড়া খাড়া করে হাঁটবে, সেই সামর্থ আর তার নেই। তবুও তাকে হাঁটতে হয়, বসতে হয়; ছানিপড়া চোখ, চোখে সবকিছু ঝাপসা দেখে; অন্ধপ্রায় চোখেই পাটি বুনতে হয়; সেই পাটি বিক্রি করতে যেতে হয় গোপালপুর কি ঝাওয়াইল কি পাকুটিয়া বাজারে। লাঠি ঠুকে-ঠুকে পথে হাঁটাচলা, তাও গোপালপুর কি ঝাওয়াইলের মতো দূরের পথ, কী যে কষ্ট, নরেশ রাহাই তা শুধু জানে, তবুও তাকে যেতে হয়। পাটি বিক্রি না-হলে বউ নিয়ে তাকে না-খেয়ে থাকতে হবে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত বউ, বাড়ির পেছনের খালের মতো জীর্ণ-বিশীর্ণ শরীর, তবুও সে রান্নাবান্নাটা করে; পাটি বিক্রি করে কিছু অর্থ না-পেলে চাল-ডাল, বাজার-সদাই, বউয়ের ওষুধপথ্য— কিছুই যে কেনা যাবে না, তাই তো নরেশ রাহা অশীতিপর বৃদ্ধ হলেও এখনো পাটি বোনে, সেই বোনা-পাটি হাটে-বাজারে ঘুরে-ঘুরে বিক্রি করে…।

 

যখন নরেশ রাহা কেবল কিশোর, বয়স বারো কি তেরো, গ্রামে বৃটিশ সরকার স্কুল প্রতিষ্ঠা করে— বাঁশকাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়। সাধারণত ছয়-সাত বছরের শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়, নরেশ রাহার বয়স বেশি, বারো-তেরো, তবুও সে স্কুলে ভর্তি হয়। তাছাড়া নতুন স্কুল, ছাত্র-ছাত্রীর সংকট; শিক্ষকরাও, যাদের বয়স কিছুটা বেশি, তাদেরও স্কুলে ভর্তি হতে উৎসাহিত করেন। দেখা গেল— নরেশ রাহার মাথা খুব ভালো। স্মৃতিশক্তিও প্রখর। স্কুলে শিক্ষকরা যা পড়ান— সব মনে রাখতে পারে। নরেশ রাহা অল্পদিনেই বাংলা-ইংরেজি-সংস্কৃত পড়তে শিখে গেল। স্কুলে তখন দু’জনমাত্র শিক্ষক— ভবতোষ রায় আর হিরন্ময় চক্রবর্তী। ভবতোষ রায় প্রধান শিক্ষক, হিরন্ময় চক্রবর্তী পণ্ডিত। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত পড়ান হিরন্ময় চক্রবর্তী। ভবতোষ রায় অংকের পাঠ দেন। নরেশ রাহা স্কুলে বয়সে সবচে’ বড়ো, দুষ্টুমিতেও ওস্তাদ। তবুও সে দুই শিক্ষকেরই প্রিয় ছাত্র। ভালো ছাত্র দুষ্টু হলেও সবাই তাকে ভালোবাসে, আদর করে, স্নেহ করে। পণ্ডিতমশাই তো নরেশ বলতে অজ্ঞান। আহা! কী মেধাবী ছেলে একখানা? দুবছরেই সংস্কৃত শিখে ফেললো। রামায়ণ-মহাভারত পড়তে পারে। আর গলায় কী সুর! হ্যাঁ, নরেশ রাহার গলায় জাদুকরি, মনোমুগ্ধকর সুর ছিল। তার কাছে রামায়ণ-মহাভারত শোনার জন্য গ্রামের ছেলে-বুড়ো অনেকেই ভিড় করতো। রাতের বেলা নরেশ রাহার মা গঙ্গাদেবী বাড়ির উঠোনে শীতলপাটি বিছিয়ে দিতো। নরেশ রামায়ণ-মহাভারত পড়ে শোনাতো। দর্শক-শ্রোতাদের চোখে ভর করতো জল। রামায়ণ কি মহাভারত শুনতে-শুনতে রাত নিঝুম হয়ে এলে পণ্ডিতমশাই বলতেন— ‘বাবা নরেশ, এবার একটা গীত শোনাও বাবা। রামায়ণ শুনতে-শুনতে মনটা উতলা হয়ে উঠেছে, এবার গীত শুনে মনটা শীতল করে ঘুমুতে যাই। ওই যে, ওই গীতটা— রাধা যমুনায় ডুবে মরতে চায়…।’

নরেশ রাহা রামায়ণ বন্ধ করে গলায় গান তুলতো— ‘আমি মরিব, যমুনার জলে ডুবিয়া মরিব, সখা/ প্রেম বিহনে এ-জীবন রাখিয়া কী করিব/ আমি মরিব/ আমি যমুনার জলে ডুবিয়া মরিব, সখা…।’

বাঁশকাইল পাটিতাপাড়ায় তখন প্রায় দু’শো ঘর হিন্দু-বসতি। ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল ছিল ক’ঘর; ছিল হাইলা দাস, কামার-কুমার, জেলে-মালি, মুচি-মেথর, ব্যবসায়ী সাহা; তবে অধিকাংশই ছিল পাটিজীবী। গ্রামের প্রত্যেক বাড়ির সামনে-পেছনে বড়ো-বড়ো পাটিবেতের খেত। গ্রামের পেছন দিয়ে যে সরু খালটি গোপালপুরের দিকে গেছে, সেই খালপারেও বিস্তৃত চকজুড়ে পাটিবেতের সমাহার। বাড়ির পুরুষ-নারী, ছেলে-বুড়ো সবাই পাটি বোনে। অধিকাংশই শীতলপাটি। বাঁশকাইল পাটিতাপাড়ার পাটিশিল্পীদের শীতলপাটি বোনার সুঁইাম সর্ববিদিত। এই পাটি ঢাকা যায়, কোলকাতা যায়, দিল্লি-আগ্রা যায়। কথিত আছে, নরেশ রাহার প্রপিতামহ পরেশ রাহার বোনা শীতলপাটি দিল্লির সম্রাটের দরবারে জায়গা পেয়েছিল। পাটিজীবীরা জোতদার কিংবা ব্যবসায়ী সাহাদের মতো টাকাওয়ালা না-হলেও বেশ সচ্ছল। পাটিতাপাড়ায় প্রতিবছরই চার-পাঁচটি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন থাকে। মণ্ডপে-মণ্ডপে ঢাকের বাড়ি, কাঁসরঘণ্টাধ্বনি, উলুজোকার— সে যে কী সমারোহ! বরুণ সাহার বাড়ির পূজার জেল্লাই সবচে’ বেশি চোখে পড়ে। কোলকাতা থেকে শিল্পী এনে মণ্ডপ ও প্রতিমা গড়া— এতো আর চাইলেই সবাই পারে না। কার এতো টাকা আছে? কিংবা টাকা হয়তো আছে, কিন্তু টাকা খরচ করার মতো বড়ো মন আছে কার? শুধু কি চোখ ধাঁধানো মণ্ডপ ও প্রতিমা নির্মাণ আর অগুনতি মানুষের ভোজের পেছনে অঢেল টাকা খরচ? না, বরুণ সাহা আরও কিছু করে। পূজার আনন্দকে সিঁদুরের মতো রাঙিয়ে তুলতে যাত্রাপালার আয়োজন করে। পাঁচদিন পূজা, যাত্রাপালাও পাঁচদিন। বরুণ সাহার বাড়িটা হাটখোলার মতো বড়ো। বাড়ির একপাশে প্যান্ডেল করা হয়। মহালয়ার দিন উদ্বোধন করা হয় প্যান্ডেল তৈরির কাজ। কোলকাতা থেকে যাত্রাদল আসে। রাধাকৃষ্ণ, নলদয়মন্তী, কারবালার রক্ত, ময়ূর সিংহাসন, আলোমতি-প্রেমকুমার, সাগরভাসা, রহিম বাদশা-রূপবান, মহুয়া-নদের চাঁদ, প্রেমের সমাধি তীরে— ইত্যাদি যাত্রাপালা রাতভর চলে। পালার ফাঁকে ফাঁকে নৃত্যগীত। সোনাগাছির মেয়েদের উদ্দাম নৃত্যগীত দেখে-শুনে দর্শক-শ্রোতারা যে আনন্দ উপভোগ করে, তা তাদের হৃদয়ে গেঁথে থাকে পুরো বছর। বছর ঘুরে আবার পূজা আসে, আবার যাত্রাপালার আসর বসে বরুণ সাহার বাড়িতে…।

একবার বরুণ সাহার শখ জাগলো— সে নিজে গ্রামে একটা যাত্রাদল গঠন করবে। ফিবছর কোলকাতা থেকে দল আনা, টাকা তো যায়ই, তা না-হয় ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু ঝকমারিও তো কম না। বিশাল লটবহর সাথে নিয়ে দল আসে, দলের লোকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা, তাদের দেখভাল ও নিরাপত্তা দেওয়া, এমনিতেই দেশের পরিস্থিতি অন্যরকম, কিছুদিন আগে দেশে নির্বাচন হয়ে গেল, যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীর কাছে হেরে মুসলিম লীগের প্রার্থী জঙ্গলে ঢুকে গোখরো সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছে, বলা তো যায় না, কখন কী ঘটে যায়! সবদিক বিবেচনা করলে নিজেরা দল গঠন করাই উত্তম। এক সন্ধ্যায় গ্রামবাসীকে বাড়িতে ডাকলো বরুণ সাহা। নিজের অভিপ্রায় জানালো। সবাই বেজায় খুশি। হোক, যাত্রাদল গঠন করা হোক। দলের নাম ঠিক হলো— বাসন্তী অপেরা। বরুণ সাহার স্ত্রীর নাম বাসন্তী…।

একজন দাঁড়িয়ে বললো— ‘বরুণদা, একটা কথা কবার চাই…।’

কী কথা? কইয়া ফালাও…।

বৌদির নামে যে দলের নাম রাখলা, বৌদি কিছু মনে করবো না তো? যদি আপত্তি করে…।

তাই তো! তুই ঠিক কথাই কইছস নির্মল। যা, ভেতরে গিয়া তর বৌদিরে ডাইকা আন…।

খবর এরই মধ্যে বরুণ সাহার স্ত্রীর কানে গেছে। সে বৈঠকে এসে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বললো— ‘আপনেরা সগলে খুশি তো আমিও খুশি। আমার কোনো আপত্তি নাই…।’

কোলকাতা কি ঢাকা কিংবা যশোর-দিনাজপুর— দেশের বড়ো-বড়ো শহরে যাত্রাদল আছে। কোলকাতার যাত্রাদলে যেমন সোনাগাছির মেয়েরা অভিনয় করে, অন্য শহরের দলগুলোতেও সোনাগাছির মেয়েদের মতো মেয়ে আছে। কিন্তু গ্রাম-দেশে তো যাত্রাপালায় অভিনয় করার মতো মেয়ে নেই। সেকালে গ্রামের মেয়েরা যাত্রাপালায় অভিনয় করবে— এটা সম্ভবও ছিল না। ছেলেরাই মেয়ে সেজে অভিনয় করে। দেখেশুনে উঠতি যুবক-শ্রেণির চার-পাঁচটি ছেলে, যাদের নারীচরিত্রে অভিনয়ের জন্য ঠিক করা হলো— নরেশ রাহা তাদের একজন…।

নরেশ রাহা দীর্ঘদেহি, একহারা গড়ন, বাঁশির মতো নাক, হরিণের মতো চোখ— সব মিলিয়ে গোলাপফুলের মতো ডগমগে চেহারা; আর গানের গলা, ঠিক যেন লতা মঙ্গেশকর। প্রথম বছরই রাধাকৃষ্ণপালায় রাধার চরিত্রে অভিনয় করে দর্শক-শ্রোতাদের মাত করে দিলো নরেশ। দর্শকরা বাড়ি ফেরার সময় বলতে-বলতে গেল— রাধার অভিনয় করলো যে-মেয়েটি, ও সোনাগাছির মেয়ে, ভাড়ায় এসেছে…।

সেই থেকে নরেশ রাহা যাত্রাপালার মেয়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্তত দশবছর পর্যন্ত, নরেশ রাহা তখন মধ্যবয়সি, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি— সে তখনো যাত্রাপালায় অভিনয় করতো। যথারীতি নারীচরিত্রে— মধ্যবয়সি নারীর চরিত্র— মা, খালা-মাসি, ফুপু-পিসি, দাদি-দিদা, নানি-ঠাক্মা— ইত্যাদি। যাত্রাপালার নায়িকা চরিত্রে তো বটেই, মধ্যবয়সি এসব নারীর চরিত্রেও তার অভিনয় ছিল সোনাগাছির মেয়েদের মতোই নিটোল, নিখুঁত; মনোলোভা, আলোক-সঞ্চারী…।

একবার এক ঘটনা ঘটলো। ঘটনাটি ভারি চমকপ্রদ…!

হেমনগরের জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরীর কানে খবর গেছে— বাঁশকাইল পাটিতাপাড়ার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বরুণ সাহা যাত্রাদল গড়েছে— বাসন্তী অপেরা। দলটি নাকি বেশ সাড়াও ফেলেছে। দলের শিল্পী সবাই এলাকার মানুষ। ছেলেরাই মেয়ে সেজে নারীচরিত্রে অভিনয় করে। তাদের অভিনয় নাকি মেয়েদের মতোই নিখুঁত। বুকে মালাই বেঁধে স্তন বানিয়ে সাজগোজ করে যখন মঞ্চে নামে, তারা মেয়ে না ছেলে, তাও নাকি বোঝা যায় না। জমিদার হেমচন্দ্রের বাড়িতেও দুর্গাপূজায় যাত্রার আসর বসে। একটানা সাতদিনের আসর। জমিদার মনস্থ করেছেন, বাসন্তী অপেরার আসর বসাবেন বাড়িতে। কিন্তু দুর্গপূজায় তো বাসন্তী অপেরা পাওয়া যাবে না। বরুণ সাহার নিজের দল, পূজায় নিজের বাড়িতেই পালার আয়োজন থাকে। হেমচন্দ্র চৌধুরী বাঁশকাইল পাটিতাপাড়া বরুণ সাহার কাছে লোক পাঠালেন— মাঘিপূর্ণিমায় জমিদারবাড়িতে তিনদিনের যাত্রাপালার আসর বসাতে চান, দলের লোকদের থাকা-খাওয়া, রোজ, সম্মানী, উপহার— ঈশ্বরের কৃপায় কোনো কিছুরই ঘাটতি থাকবে না। মাঘিপূর্ণিমায় বাসন্তী অপেরার কোথাও বায়না ছিল না, তদুপরি জমিদারের নিমন্ত্রণ! হেমনগরের জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরীর প্রভাব-প্রতিপত্তি, বিলাস-ব্যসন, ঠাটঠমক সম্পর্কে সকলেরই জানা, সেখানে পালা গাইতে আপত্তি কিংবা শঙ্কার কিছু নেই। পালা গাওয়ার শঙ্কা যা আছে তা দেশের সবখানেই। মুসলিম লীগ ভোটে হারার পর থেকেই পাগলা কুত্তার মতো আচরণ করছে। কোথাও কোথাও, কানে আসে, মুসলিম লীগের পাণ্ডারা আক্রমণ করেছে যাত্রার আসরে। তবে হেমনগর জমিদারবাড়িতে যাত্রার আসরে কেউ আক্রমণ করার সাহস দেখাবে, এটা কল্পনাতীত…।

মাঘিপূর্ণিমার রাতে, প্রথম রজনীর যাত্রাপালা— রাধাকৃষ্ণ। ভগবান কৃষ্ণ ও রাধার প্রেম-বিরহের কাহিনি এ পালার উপজীব্য। নরেশ রাহা রাধার অভিনয় করে। তার সংলাপ, তার গীত— স্বয়ং রাধা যেন স্বর্গ থেকে মঞ্চে নেমে আসে। নরেশ রাহার অভিনয়ে মুগ্ধ দর্শক-শ্রোতার, বিশেষত নারী দর্শকদের চোখ সারারাতই থাকে জলে টইটম্বুর…।

ঘটনা ঘটলো পরদিন সকাল এগারোটার দিকে…।

সারারাত পালা গেয়ে দলের লোকেরা ভোরবেলা ঘুমিয়েছিল। ঘুম ভাঙতে-ভাঙতে সকাল দশটা। তারপর প্রাতকৃত্যাদি সেরে, জমিদারবাড়ির পুকুরে স্নান করে সবাই নাস্তা করতে বসেছে। বরুণ সাহা আগেই উঠেছিল। সে নাস্তা সেরে তখন দলের লোকদের নাস্তা খাওয়ার তদারকি করছিল। ঘুমঘুম চোখে বরুণ সাহার কাছে এলো রমেন চৌধুরী। হেমচন্দ্র চৌধুরীর ভাইপো। রমেনের চোখ রক্তাভ। রাতে আকণ্ঠ মদ্যপান করেছে। জমিদারবাড়ির ছেলে বলে কথা! মদ্যপান তাদের শরীরের পোশাকের মতো। এটা ছাড়া চলে না। যা-হোক, রমেন বললো— ‘বরুণবাবু, একটা কথা ছিল…।’

রমেন জমিদারের ভাইপো, বরুণ সাহা সম্ভ্রম বজায় রেখে বললো— ‘কী কথা, ছোটবাবু…?’

যাত্রাপালায় রাধা-চরিত্রে অভিনয় করলো যে-মেয়েটি, ও কোথায়? ওকে ডাকুন। আমি ওর সঙ্গে কথা বলবো…।

মেয়ে! বরুণ সাহা যেন ঝুপ করে আকাশ থেকে পড়লো। থতমত খেয়ে বললো— ‘আমার দলে কোনো মেয়েছেলে নাই ছোটবাবু। ছেলেরাই মেয়ে সেজে নারীচরিত্রে অভিনয় করে। রাধা সেজেছিল নরেশ…।’

ছলচাতুরি করবেন না, বরুণবাবু। আমি শুনেছি, রাতে ম্যালা দর্শক বলাবলি করলো— আপনি মেয়েটিকে কোলকাতা থেকে ভাড়া করে এনেছেন। আমি রাধাকে বিয়ে করতে চাই…।

এসব আপনি কী বলছেন, ছোটবাবু! আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না…।

ঘোঁট পাকালে ভালো হবে না বলছি, বরুণবাবু। রাধাকে ডাকুন। তালবাহানা করলে ওকে আমি তুলে নিয়ে যাবো…।

নরেশ রাহার যাত্রা-জীবন এভাবেই চলছিল। মেয়ে সেজে মঞ্চে অভিনয়, নৃত্য, গীত…!

মাঝে-মধ্যে নরেশ রাহার মনে হতো— পাটিতাপাড়ার ভবেশ রাহার পুত্রটি কি তবে নারীতে রূপান্তরিত হলো? বেছে নিল নারী-জীবন? এরকম কি কোথাও হয়— পুরুষ নারীতে, নারী পুরুষে রূপান্তরিত? ভগবানের দুনিয়ায় কতো কিছুই তো ঘটে! এটাও ঘটতে পারে। অসম্ভব কিছু না। কিন্তু নরেশের তো শারীরিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ভবেশ রাহার পুত্র তো জলজ্যান্ত পুরুষমানুষই আছে। নারী সেজে যাত্রামঞ্চে শুধু অভিনয় করে, এই যা। অথচ দ্যাখো কী কাণ্ড— জমিদারের ভাইপো রাধারূপী নরেশকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গেল? যেখানেই পালা হোক— দর্শকরা কানাঘুষা করে— মেয়েটি সোনাগাছি থেকে ভাড়া করে আনা। নরেশের ভাগ্যে কি কোনো নারী আছে, কে জানে…!

নরেশ রাহা যে নারীতে রূপান্তরিত হয়নি, তাকে দেখেও যে নারীরা আকৃষ্ট হয়— তার প্রেমে পড়ে— তার প্রমাণ কিন্তু পরে একসময় পাওয়া গেল…।

এটা ১৯৬৫ সালে সংঘটিত পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের কিছুকাল পরের কথা…।

নরেশ রাহা তখন পরিপূর্ণ যুবক। আশ্বিনা বাউ শুরুর অপেক্ষায় বারবাড়ি কামরাঙাগাছের নিচে বসে থাকলে, এখনো, এই ফাউ-জীবনেও নরেশ রাহার কদাচিৎ মনে পড়ে— যুদ্ধ চলেছিল মাত্র এগারোদিন— কাশ্মীর ফ্রন্টে, পূর্ববঙ্গ কিংবা পূর্বপাকিস্তান যে-নামেই ডাকা হোক না কেন, এই ভূখণ্ড থেকে সেটা বহুদূরে, পাকিস্তানের এই অংশে কোনো যুদ্ধ ছিল না; ভারত এদিকে কোথাও আক্রমণও করছিল না, তবুও এই বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ভয় ও শঙ্কা ছিল, শুধু আইয়ুব খানের পাণ্ডাদের মধ্যে দেখা যেতো প্রবল জোশ ও উচ্ছ্বাস। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারতকে গিলে ফেললো আর কি! আইয়ুব খান দিল্লির কুতুব মিনারের চূড়ায় বসে চা খাবেন— এটা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু যুদ্ধ এগারোদিনেই থেমে গেল। আইয়ুব খান কুতুব মিনারের চূড়ায় বসে চা খেতে পারলেন না। আফসোস। এই যুদ্ধে কে জিতেছিল— পাকিস্তান নাকি ভারত— এটা বলা যাবে না, বলার সুযোগও নেই, কারণ অধিকাংশ যুদ্ধই যেমন মোড়লদের মধ্যস্থতায় বন্ধ হয়ে যায়, এই যুদ্ধও তেমনি হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু আইয়ুব খান ও মুসলিম লীগের চেলাচামুণ্ডারা ঢাক-ঢোল বাজিয়ে বলতে লাগলো— যুদ্ধে পাকিস্তান জিতেছে। তাদের লাফালফি ও উৎসব ছিল দেখার মতো। এই উৎসবের অংশ হিসেবেই পাকুটিয়ায় যাত্রাপালার আয়োজন। পাকুটিয়ায় ক’ঘর মুসলিম জোতদার ছিল, আয়োজন তাদের উদ্যোগেই। বাসন্তী অপেরার সাথে বায়না হয়েছিল…।

প্রথম রজনিতে, হিন্দুদের উদ্যোগে আসর হলে, ‘রাধাকৃষ্ণ’ মঞ্চায়ন অবধারিত। পাকুটিয়ায় মুসলমানদের উদ্যোগ, তাই ‘কারবালার রক্ত’ গাওয়া হলো। নরেশ রাহা ‘বিবি সখিনা’র অভিনয় করে। বাসন্তী অপেরার সুঁইাম শুনে বাড়ির লোকদের সাথে এই পালা দেখতে এসেছিল হারু পণ্ডিতের ষোড়শীকন্যা কমলা। সখিনার অভিনয় দেখে কাঁদছিল অনেক দর্শক। কাঁদলো কমলাও। এখানেও কেউ কেউ বলছিল বটে, মেয়েটি কোলকাতা থেকে ভাড়ায় এসেছে, তবে বিশদ খোঁজখবর করার পর স্থির হয়, যে-লোকটি সখিনার অভিনয় করছে সে কোলকাতার মেয়ে তো নয়ই, সে মেয়েছেলেই নয়, দিব্যি ছেলেমানুষ, মেয়ে সেজেছে। কমলা কাঁদতে-কাঁদতেই সখিনার প্রেমে পড়ে গেল। সেজেছে মেয়ে, কিন্তু দেখতে যেন শিবঠাকুর! পরদিন বিকেলেই নরেশ রাহা ও কমলাকে যাত্রাপালার মুখ্য আয়োজক মোল্লা জালাল উদ্দিনের পুকুরপাড়ে ঘনিষ্ঠরূপে বসে গল্প করতে দেখা গেল। এবং অচিরেই তা রাষ্ট্র হয়ে গেল গ্রামে…।

হারু পণ্ডিতের মাথায় বাড়ি। তারা ঠাকুরবাড়ির মানুষ। ব্রাহ্মণ।… আর কমলা কি না একটা নিচুজাতের যাত্রা-করা লোকের সাথে বসে গল্প করে? হারু পণ্ডিত মেয়ের পায়ে শেকল পরিয়ে দিলো…।

প্রেম কোনোকালেই জাত-ধর্ম মানেনি। জাত-ধর্মের হিসেব করে প্রেম হয়ও না। কমলা কীভাবে যেন পায়ের শেকল ছিঁড়ে নরেশ রাহার সাথে পালিয়েছিল— কমলার সেই পলায়ন-আখ্যান উপজীব্য করে কাব্য লিখেছিল হাটুরে-কবি গরিবুল্লাহ সরকার, কাব্যের নাম— ‘নরেশ-কমলার প্রেম কাহিনি’— হাটে-বাজারে প্রচুর বিক্রি হতো এই কবিতার বই…।

কোথায় পাকুটিয়া? কোথায় বাঁশকাইল পাটিতাপাড়া? যোজন-যোজন দূরের পথ— কাঁচা, ভাঙাচোরা। কোথাও গর্ত, কোথাও কাদাপানি। রাতের অন্ধকারে দুর্গম এই পথ কমলা পাড়ি দিয়েছিল নরেশ রাহার পিঠে চড়ে। কমলা যেন এখনো নরেশ রাহার পিঠেই বসে আছে— মনের অজান্তেই, আশ্বিনা বাউ শুরুর অপেক্ষা করতে-করতে নরেশ রাহা কদাচিৎ বলে ফেলে— ‘কমলা আছিস তো? আমার পিঠ-ঘাড় শক্ত করে জাপটে ধর…।’

পাটিতাপাড়ায় পূজা নেই। কিন্তু আশ্বিন তো এসে গেছে, নাকি? নরেশ রাহার কানে হঠাৎ-হঠাৎ যেন মিহিসুরে ঢাকের বাদ্য বাজে। শালুক নদের ওপার থেকে ভেসে আসে এই সুর…।

গ্রামে হিন্দু-বসতি আর আছেটা কে, যে পূজা করবে? গ্রামে নরেশ রাহার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে নিঃসঙ্গ বসতি। তার ছেলে দীনেশ পর্যন্ত গ্রামে থাকলো না! দীনেশ মা-বাবাকে শহরে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। নরেশ রাহা মাথা পাতলো না। গ্রাম ছাড়লো না। নরেশ রাহা যা বলেছে, কমলাও তাই বলেছে— নিজের গ্রাম, নিজের মাটি; নিজের গ্রাম-মাটি ত্যাগ করা মহাপাপ…।

এই যে গ্রামে একঘর হিন্দু-বসতি, অথচ পাটিতাপাড়ায় প্রায় দু’শ’ঘর হিন্দু ছিল, দিনে-দিনে যে সবাই গ্রামত্যাগ করলো, গ্রামটি যে হিঁদু-শূন্য হয়ে গেল— এ তো আর একদিনে হয়নি। গ্রাম হিঁদু-শূন্য হতে অন্তত ত্রিশ বছর লেগেছে। ১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধকালে পাটিতাপাড়ার হিন্দুদের গ্রামত্যাগ শুরু, সর্বশেষ গ্রাম ছাড়লো অরুণ সাহা, বাসন্তী অপেরার স্বত্বাধিকারী বরুণ সাহার নাতি— ২০০১ সালের নির্বাচনের পর। বাকি ছিল নিমাই কর আর নরেশ রাহার পরিবার। দুইঘর বসতি নিয়ে তো আর গ্রাম হয় না। তাই বলা ভালো, অরুণ সাহা গ্রাম ছাড়ার পরই পাটিতাপাড়া গ্রামটি হিঁদু-শূন্য। নিমাই কর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি দেহত্যাগের পর তার ছেলে তাপস কর মা ও স্ত্রীকে নিয়ে গ্রাম ছাড়ে। তার পরপরই স্ত্রী সন্তান-সমেত গ্রাম ছাড়লো দীনেশ। এখন গ্রামে শুধুই নরেশ রাহা আর তার পিঠের বোঝা কমলা…।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই পাকিস্তানি হানাদারদের প্রথম চোখ পড়লো হিন্দুদের ওপর। হিন্দুরাই যেন ওদের মূল-শত্রু। হিন্দুদের প্ররোচনায়ই যেন শেখ মুজিব তাদের পবিত্র পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। গোপালপুর থানায় হানাদারদের ঘাঁটি। ওরা প্রত্যেকদিন, গ্রামে-গ্রামে রাজাকাররা ওদের সহযোগিতা করে, বাঁশকাইলেও রাজাকার আছে, রাজাকারদের সাথে নিয়ে হানাদাররা গ্রামে-গ্রামে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করে জ্বলতে দেখা যায়। নির্বিচার হত্যা ও অগ্নিসংযোগের পর হানাদার-রাজাকাররা মুরগি ধরার মতো যুবতি-মেয়েদের ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। বাড়ির উঠানে, রাস্তায়, নদী ও খাল পারে, ক্যাম্পের সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে লাশ…।

১৩ জুলাই, ১৯৭১…।

সেদিন পাটিতাপাড়ায় ছিল গা-পোড়া রোদ। দুপুরবেলা। গ্রামের অধিকাংশ লোক তো যুদ্ধ শুরুর পরপরই গ্রাম ছেড়েছিল, গরিব-গুবরো যারা বাড়িতে ছিল, দিবানিদ্রায় মগ্ন ছিল তারা। এরই মধ্যে, পাটিজীবীরা টেরই পায়নি কখন গ্রামে হানাদার ঢুকেছে, তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হানাদাররা আক্রমণ শুরু করে। ঘরে-ঘরে ঢুকে গুলি, ব্রাশফায়ার, অগ্নিসংযোগ…।

গ্রামের চৌদ্দজন পাটিশিল্পী সেদিন শহিদ হয়েছিল। নরেশ রাহার বৃদ্ধ বাবা-মা, কিরণ সাহা, তার ছোটভাই হিমাদ্রি সাহা, নিতুন কর— সবার নাম এখন নরেশ রাহার মনেও পড়ে না। দুলাল করের ছোট বোনটাকে ধরে নিয়ে মন্দিরের সামনে ফেলে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছিল। আরও ক’বাড়ির ক’টি মেয়েকে ধরে কোথায় যে নিয়ে গেল খোঁজ পাওয়া গেল না। দীনেশের বয়স তখন দুই। নরেশ রাহা কীভাবে যে স্ত্রী আর সন্তান নিয়ে সেদিন পালাতে পেরেছিল, কীভাবে বেঁচে গেছিল— তাও মনে করতে পারে না এখন। তার চোখে শুধু ভাসে একটি শ্মশানের ছবি। গ্রামে ফিরে এসে দেখেছিল— পাটিতাপাড়া গ্রাম নয়, একটি জীবন্ত শ্মশান…!

গাড়ির চাকা যেমন ঘোরে, ইতিহাসের চাকাও তেমনি ঘোরে। শ্মশানেও ফোটে ফুল। স্বাধীনতার পর পাটিতাপাড়া আবার জেগে উঠেছিল। যারা পালিয়ে ইন্ডিয়া গেছিল তারা ফিরে আসলো। শ্মশানপুরিতে সবাই মিলে তুললো নতুন-নতুন ঘর। উঠানে বসে বুনতে লাগলো পাটি। ভাগ্যিস বাড়ির ঘরগুলো পুড়ে ছাই হলেও খেতের পাটিবেত অক্ষত ছিল…।

নতুন দেশে নতুন স্বপ্ন ফুটে উঠতে লাগলো শীতলপাটিতে। কিন্তু পাটিতাপাড়ার মানুষের কপালে এই সুখ বেশিদিন সইলো না। স্বাধীনতার পর বছর ঘুরতে না-ঘুরতেই দেশে ডাকাত ও গণবাহিনীর উপদ্রব। ওদের চোখও প্রথমেই পড়লো হিন্দুদের ওপর…।

ডাকাত আসে রাতে। গণবাহিনীর লোকেরা দিনেই আসে…।

গ্রামের যারা বড়ো ব্যবসায়ী, টাকাওয়ালা লোক— বরুণ সাহা, কৃষ্ণ সাহা— ওদের বাড়িতে প্রতিমাসে একবার করে ডাকাতি হয়। যারা একটু বড়ো বেতখেতের মালিক কিংবা শীতলপাটি বুনিয়ে, বিক্রি করে বেশ ভালোই দু’পয়সা রোজগার করে তাদের বাড়িতে ডাকাতি হয় দুমাস পরপর। ’৭২ সালের শেষের দিকে কি ’৭৩ সালের প্রথমদিকে হবে, নরেশ রাহা ঠিক মনে করতে পারে না— গণবাহিনীর লোকেরা বরুণ সাহার গলা কেটে গ্রামের তেরাস্তার মোড়ে বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখলো। বরুণ সাহা নাকি শ্রেণিশত্রু। তখন এই ‘শ্রেণিশত্রু’ কথাটি খুব শোনা যেতো। কিন্তু নরেশ রাহা জানতো না, এখনো জানে না— ‘শ্রেণিশত্রু’ কী জিনিস…?

ডাকাত আসে। গ্রামে বসতি কমে…।

গণবাহিনী আসে। গ্রামে বসতি কমে…।

ডাকাত ও গণবাহিনী আসে, বাঁশকাইল পাটিতাপাড়া গ্রাম হিঁদু-শূন্য হতে থাকে…।

তারপর আসে নির্বাচন। এই জীবনে নরেশ রাহা কতোবার যে নির্বাচন দেখলো— হিসাব নেই। নির্বাচন এলেই পাটিতাপাড়ায় যে-ক’ঘর মানুষ আছে, তাদের দমবন্ধ হয়ে আসে। তারা জানে, নির্বাচন শেষে— ভোটে যারাই জিতুক কিংবা হারুক, পাটিতাপাড়া আক্রান্ত হবে। কারও ঘড়বাড়ি ভাংচুর হবে, কারও ঘরে আগুন দেওয়া হবে, রামদা’র কোপে কারও হাত-পা কাটা পড়বে। বিজয়ীরা তোলপাড় করবে— মালাউনের বাচ্চারা সব ভোট আমাদের দেয় নাই, দিলে ভোটের ব্যবধান আরও বাড়তো। পরাজিতরা বলবে— মালাউনরা আমাদের একটা ভোটও দেয় নাই, দিলে, ভোটের যে পার্থক্য, আমরাই জিততাম…।

সেই ১৯৭৩ সাল থেকেই, যখন জাসদ-গণবাহিনী কেবল নেমেছে মাঠে, সে-বছর তারা ভোটে হেরে পাটিতাপাড়ায় আক্রমণ করেছিল; তারপর থেকে যখন যারা নির্বাচনে জিতেছে বা হেরেছে; একই ঘটনাই ঘটেছে। নরেশ রাহা এসব দেখে আসছে। নির্বাচন এলে, ভোট শেষে, যেন এটাই রীতি, নিয়তি; পাটিতাপাড়া আক্রান্ত হবেই। গ্রামে আগুন ও রক্ত দেখা যাবেই…।

নরেশ রাহা কামরাঙাগাছের ছায়ায় বসে-বসে ভাবে— নিমাই মাস্টার যেদিন দেহত্যাগ করে স্বর্গে গেলেন— সেদিন তাঁর সৎকার করতে গিয়ে কী কষ্টেই না তারা পড়েছিল! গ্রামে হিন্দু-সম্প্রদায়ের পুরুষ-মানুষ বলতে দু’জন— নরেশ রাহা নিজে আর নিমাই মাস্টারের ছেলে তাপস, মাত্র দু’জন মানুষ মিলে কারও মৃতদেহের সৎকার করা অসম্ভব। মৃতদেহের সৎকার করার জন্য বাঁশ লাগে, চলাখড়ি লাগে; আরও কত কী— পুরোহিত ও শ্মশানবন্ধুও লাগে। কিন্তু পাটিতাপাড়ায় আর হিন্দু লোকজন নেই, কোথায় পুরোহিত, কোথায় শ্মশানবন্ধু— কে করে সব আয়োজন? মানুষ না-হয় দু’চারজন পাওয়া যাবে, কয়েকটি মুসলমানবাড়ি থেকেও কেউ-কেউ এসেছে, আরও দু’চারজন আসছে; বাঁশকাটা, গাছ কেটে চলাখড়ি বানানো, এসব হয়তো তারাই করে দেবে; হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, শেষপর্যন্ত সবাই মানুষ তো; হিন্দুর মরদেহের সৎকারে মুসলমানরাও কেউ-কেউ এগিয়ে আসবে, এতে সন্দেহ-শঙ্কার কিছু নেই; দেখা গেল বাঁশকাইল মসজিদের ইমাম মওলানা নিয়ামতউল্লাহও আসছে; সব ভগবানের ইচ্ছা; কিন্তু আরও একটি বড়ো সমস্যা সামনে এলো, পাটিতাপাড়ার শ্মশানঘাটটিও নেই, সেটিও বেদখল হয়ে গেছে। এই যে নিমাই মাস্টারের সৎকারে সহযোগিতা করার জন্য মওলানা নিয়ামতউল্লাহ এসেছে, আরও অনেক মুসলমান এসেছে; পাটিতাপাড়ার হিন্দুদের শ্মশানঘাটটি কিন্তু আবার ক’জন মুসলমানই বেদখল দিয়েছে। তারা শ্মশানের জমি ভাগাভাগি করে নিয়েছে, সেখানে এখন সবজিবাগান…।

সবই ঘটেছে নরেশ রাহার চোখের সমুখে। এইসব দেখে, নিমাই মাস্টারের মৃতদেহের সৎকার-সংকট দেখে নরেশ রাহার চোখ ফেটে জল আসে। কিন্তু এসব দেখে যাওয়া ছাড়া তার আর করার কিছু নেই। নিমাই মাস্টারের সৎকারের আয়োজনের মধ্যেই, কথা নেই, বার্তা নেই; কোনো ইঙ্গিত পর্যন্ত নেই, হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নামলো…।

নরেশ রাহার মৃত্যুর পর কে করবে তার সৎকার, সে কীভাবে পাবে স্বর্গে যাওয়ার পথ, এটা মনে হতেই জলে টইটুম্বুর হয়ে ওঠে তার দু’চোখ…।

 

পাদটীকা :

নিঃসঙ্গ গ্রাম, নিঃসঙ্গ বসতি। আশ্বিনা বাউয়ের দেখা নেই। নরেশ রাহা যাত্রাপালার রাধার মতো হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো— ‘মা দুর্গা, তোমার কি দয়ামায়া বলে কিছু নেই? আমরা কী পাপ করেছি যে, তুমি আর আমাদের গায়ে আসবে না? হিঁদু-শূন্য গাঁয়ে কি তোমার আসতে নেই? তোমার অসাক্ষাতে মা তোমার সন্তান যে আর প্রাণে বাঁচে না…।’

কোত্থেকে যেন কান্নার শব্দের মতো ভেসে আসছিল আশ্বিনা বাউ…!

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *