Email: editors.kokshopoth@gmail.com
September 27, 2026
Kokshopoth

তিস্তা-র ধারাবাহিক আখ্যান

Sep 18, 2026

তিস্তা-র ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৫

তিস্তার  নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘
এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এবং হচ্ছেনও না। উপভোগ করছেন। এ’টুকুই আমাদের প্রাপ্তি।  

লিফট

​আজ অফিস থেকে বেরোনোর সময় লিফটে বেশ ভিড় ছিল। 

বিকেল সাড়ে পাঁচটা। এই সময়টাই অফিস-লিফটের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। সারাদিনের কাজের পর সবাই একসঙ্গে বাড়ি ফেরার জন্য হাঁসফাঁস করে। সতেরো তলায় লিফটের স্টিলের ভারী দরজাটা হালকা শব্দ করে খুলতেই দেখি ভেতরে প্রায় সব জায়গা ভর্তি। এত মানুষ একসঙ্গে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে যে ভেতরের হাওয়াটাও সামান্য ভারী ও গরম।

তবু দরজার সামনে দাঁড়ানো দুজন একটু সরে দাঁড়িয়ে সামান্য জায়গা করে দিল। ভেতরে ঢুকে আমিও একপাশে, স্টিলের ঠান্ডা দেয়ালটার গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

লিফটে মানুষ খুব কম কথা বলে।   

একসঙ্গে এত কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ কেউ কারও দিকে তাকায় না। স্পর্শ এড়ানোর একটা অদ্ভুত, অলিখিত নীরব চেষ্টা থাকে সবার মধ্যে। কেউ যদি ভুল করেও আর-একজনকে ছুঁয়ে ফেলে, অমনি নিঃশব্দে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সবাই নিজের নিজের গন্তব্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। বা বলা ভালো, লিফটের ডিসপ্লেতে জ্বলতে থাকা লাল ডিজিটাল সংখ্যাগুলোর দিকে। কোন তলায় নামবে, সেই সংখ্যাটা সবার মাথায় ঘড়ির কাঁটার মতো টিকটিক করে। কথাটা আগে কখনো এভাবে ভেবে দেখিনি। আজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো, আমিও তো তাই করি। 

কেউ লিফটে উঠলে আমি কখনো তার মুখের দিকে সরাসরি তাকাই না। মানুষটার চোখ কেমন, তার কপালে চিন্তার ভাঁজ আছে কিনা, সারাদিন পর সে কতটা ক্লান্ত—সেসব দেখা হয় না। আমার নজরও সোজা চলে যায় বোতামের প্যানেলটার দিকে। দেখি, সে কত নম্বরের বোতামটা টিপল।

যে বোতামের লাল আলোটা জ্বলে ওঠে, আমি যেন মনে মনে সেই সংখ্যাটা দিয়েই মানুষটাকে চিনে নিই। যেন একটা মানুষকে জানার জন্য তার গন্তব্যটাই যথেষ্ট। সে কোথায় যাচ্ছে—এটুকু জানলেই যেন তার পুরো অস্তিত্বটা কিছুটা জানা হয়ে গেল। সাত তলা মানে সে হয়তো অ্যাকাউন্টসে কাজ করে, বারো তলা মানে আইটি, তিন তলা মানে সার্ভিস ডেস্ক। আমরা মানুষকে তার আসল পরিচয়ে নয়, তার গন্তব্যের ডিজিটে চিনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

 অথচ এই ডিজিটাল সংখ্যাগুলোর আড়ালে অদৃশ্য হয়ে থাকে একেকটা আস্ত মানুষের জটিল, অব্যক্ত গল্প। সাত তলার অ্যাকাউন্টসের লোকটার মন হয়তো আজ বাড়িতে অসুস্থ সন্তানের দিকে পড়ে আছে, কিংবা বারো তলার মেয়েটির নির্ভাবনা মুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভেঙে যাওয়া কোনো সম্পর্কের বিষণ্ণতা। কিন্তু সেই গভীরতায় ঢোকার কোনো অবকাশ এই কয়েক সেকেন্ডের যাত্রায় নেই। আমরা খুব সাবধানে অন্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা এড়িয়ে চলি। কারণ অচেনা মানুষের উদ্বেগের মুখোমুখি হওয়া মানেই নিজের চারপাশের তৈরি করা নিরাপত্তার দেয়ালটাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।

আমার পাশে দাঁড়ানো লোকটার হাতে একটা ভারী ফাইল। অন্য পাশে একজন তরুণী একমনে ফোনে মেসেজ টাইপ করে যাচ্ছে। আঙুলগুলো দ্রুত চলছে স্ক্রিনের ওপর, কিন্তু মুখটা একদম এক্সপ্রেশনলেস। কারও হাতে ল্যাপটপের ব্যাগ, কারও হাতে অর্ধেক খাওয়া জলের বোতল। কেউ চোখ বন্ধ করে ওপরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে—সারাদিনের ক্লান্তিটুকু ভেতরে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে সম্ভবত।

কেউ আবার লিফটের কাচের আয়নায় নিজেকে দেখছে। আয়নাটা এমনভাবে দুই দেওয়ালে লাগানো যে, দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি হয়। সামান্য তাকালেই একসঙ্গে অসংখ্য প্রতিফলন দেখা যায়। একই মানুষের বহু ছবি। অথচ এতগুলো চোখের উপস্থিতি সত্ত্বেও কেউ কারও চোখের দিকে তাকাচ্ছে না। সবাই এড়িয়ে যাচ্ছে অন্য একটা জ্যান্ত মানুষের চোখ। সবাই শুধু আয়নায় নিজের মুখটুকু গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। চুলটা একটু ঠিক করছে, জামার কলারটা সোজা করছে, অথবা মুখের ওপর জমে থাকা দিনের ছাপটুকু মুছে নিচ্ছে রুমাল দিয়ে।   

একজন ১২-তে নামলেন। তারপর ৯। তারপর ৭। ​প্রত্যেকটা মানুষ নিজের একটা সংখ্যা নিয়ে ভেতরে ঢোকে। আর ঠিক সময় এলে নিজের সেই সংখ্যাটা নিয়েই আবার নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়। মাঝখানের সময়টুকুতে তারা যেন শুধু একটা সংখ্যাকে আঁকড়ে ধরে অপেক্ষা করে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, মানুষের জীবনটাও কি ঠিক এই লিফটার মতোই? আমরা কি সবাই কোনো না কোনো গন্তব্যের বোতাম টিপে রেখেছি? কেউ চাকরি। কেউ টাকা। কেউ বাড়ি। কেউ ভালোবাসা। কেউ অবসর। ​তারপর সারাজীবন এক তলা থেকে আরেক তলায় নামতে নামতে, বা উঠতে উঠতে ভাবি—এই তো, এবার ঠিক পৌঁছে যাব। এবার হয়তো আমার সেই কাঙ্ক্ষিত তলাটা আসবে।  

মাঝে মাঝেই লিফটটা থামে কোনো তলায়, লাল আলো জ্বলে ওঠে। ভারী স্টিলের দরজাটা মৃদু শব্দ করে খুলে যায়। কেউ একজন নেমে যায়, তার জায়গায় নতুন কেউ উঠে আসে।     

খুব অল্প সময়ের জন্য আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকি। কেউ কারও নাম জানি না। কখনো কখনো একই মানুষকে প্রতিদিন দেখি। একই সময়ে। একই লিফটে। তবু কথা হয় না। সম্ভবত পরিচিত হওয়ার জন্য মানুষের যতটা সময় লাগে, লিফটের কাছে ততটা সময় নেই।

গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছতে পৌঁছতে লিফটের ভেতরের সেই দমবন্ধ করা ভিড়টা আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে গেল। সংখ্যাগুলো এক এক করে কমতে কমতে এসে ঠেকেছে ‘জি’-তে। আবার সেই হালকা শব্দ, তারপর দরজাটা দু-পাশে সরে গেল।

ভেতরের বাকি মানুষগুলো এক এক করে বেরিয়ে কেউ গেল ফুটপাথের দিকে, কেউ বা পার্কিং লটের দিকে। সবাই যে যার রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল। আর কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকাল না। আমি একদম শেষে ছিলাম। ধীরে সুস্থে বেরোলাম।   

বাইরে এসে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো, লিফটের সবচেয়ে অদ্ভুত আর ভীতিজনক ব্যাপারটা কিন্তু তার এই উপর-নিচে ওঠানামা করাটা নয়। ​সবচেয়ে অদ্ভুত হলো—আমরা নিজেরা এক পা-ও না হেঁটে, কোনো শারীরিক ক্লান্তি ছাড়া এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাই। কোনো শক্তি খরচ না করে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে।

আমরা হয়তো ভাবি গন্তব্যটা আমাদেরই নিয়ন্ত্রণে, কারণ কাঙ্ক্ষিত বোতামটা তো আমিই চেপেছি। কিন্তু সত্যি বলতে, একবার ওই স্টিলের বাক্সে পা দেওয়ার পর পুরো নিয়ন্ত্রণটাই চলে যায় এক অদৃশ্য যান্ত্রিক ব্যবস্থার হাতে। আমরা কেবল একটা অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভর দিয়ে নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। জীবনের গতিপথটাও তো ঠিক এমনই। আমরা ধরে নিই নিজেদের ইচ্ছেমতো জীবন সাজাচ্ছি, কিন্তু বাস্তবতার যে লিফটে আমরা সওয়ার হয়ে আছি, তার ভেতরের মাঝখানের ওই অন্ধ যাত্রাটুকুর ওপর আমাদের বিন্দুমাত্র হাত থাকে না। আমরা শুধু এক অনিশ্চিত অপেক্ষাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকি, পরবর্তী দরজার ওপাশে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে তা না জেনেই।

ভারী দরজা দুটো বন্ধ হয়ে যায়। একটা সম্পূর্ণ অন্ধকার, বন্ধ স্টিলের বাক্স। ভেতরের কৃত্রিম আলোটা ​হয়তো জ্বলে, কিন্তু বাইরের বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে তার সমস্ত যোগাযোগ তখন বিচ্ছিন্ন। তারপর কয়েক সেকেন্ড পর হঠাৎ করে আবার দরজা খুললেই চারপাশের চেনা দৃশ্যটা এক লহমায় বদলে যায়। অন্য একটা তলা। অন্য কিছু মানুষ। সম্পূর্ণ অন্য একটা পরিবেশ।     

জীবনের কিছু কিছু বড় ও মারাত্মক পরিবর্তনও কি ঠিক এই লিফটের মতোই নয়? 

কখন যে একটা সময় শেষ হয়ে নিঃশব্দে আরেকটা সময় শুরু হয়ে যায়, আমরা নিজেরা হেঁটে সেই দূরত্ব পেরোই না বলেই হয়তো সময়মতো টের পাই না। কোনো বড় শব্দ হয় না। কোনো আগাম নোটিশ আসে না। কেউ এসে কাঁধে হাত দিয়ে সতর্ক করে বলে না— ‘শোনো, এবার থেকে তোমার জীবনের সবকিছু অন্যরকম হতে চলেছে।’

শুধু একদিন কোনো এক অজানা মুহূর্তে জীবনের বন্ধ দরজাটা নিঃশব্দে খুলে যায়। আমরা সেই বন্ধ বাক্সটা থেকে বাইরে পা দিই, বেরিয়ে আসি। তারপর চারদিকে তাকিয়ে হঠাৎ চমকে উঠে বুঝতে পারি—আমরা আর আমাদের সেই পুরোনো, চেনা জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই।

অফিস বিল্ডিংটা পেছনে ফেলে বাড়ি ফেরার রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতেও মাথার ভেতর কেবল লিফটই অধিকার করে রইল। 

সতেরো তলা থেকে একদম নিচে নেমে আসতে আমার এক মিনিটও সময় লাগেনি। সতেরোটা বিশালাকার তলা। মাঝখানে কতটা শূন্যতা, কতটা উচ্চতা—অথচ নেমে আসতে সময় লাগল মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড। 

জীবনের ফেলে আসা কতগুলো বছরও কি বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে ঠিক এরকমই লাগে না?

খুব দ্রুত। খুব অল্প সময়ের ব্যবধান। একটা দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার পর মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। একটার পর একটা অদৃশ্য দরজা খোলে। কেউ আমাদের জীবনে আশা নিয়ে ওঠে; কেউ আবার নিরাশ করে নেমে চলে যায়। আমরা শুধু নিজের মনে বেছে নেওয়া বোতামটা চেপে স্টিলের দেয়ালটা ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। 

অপেক্ষা করি—কখন যে আবার সেই বোবা দরজাটা খুলে যাবে, আর আমাদের নামতে হবে, তা আমরা নিজেরাও জানি না।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *