একটি আত্মগত গদ্যঃ লিখেছেন তৈমুর খান
একটি আত্মগত গদ্যঃ লিখেছেন তৈমুর খান
নয়ের দশকের কবি ও গদ্যকার। পেশা শিক্ষকতা। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কোথায় পা রাখি’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘বৃত্তের ভেতরে জল’, ‘জ্যোৎস্নায় সারারাত খেলে হিরণ্য মাছেরা’, ‘উন্মাদ বিকেলের জংশন’, ‘সভ্যতা কাঁপে এক বিস্ময়ের জ্বরে’, ‘স্তব্ধতার ভেতর এক নিরুত্তর হাসি’, ‘সর্বনাশের ডায়েরি’ ইত্যাদি। গদ্যের বই ‘কবির ভাঁড়ারের চাবি’ ‘মুক্তির দশক নব্বইয়ের কবি ও কবিতা’, ‘কবিতার বাঁক ও অভিঘাত : এক অন্বেষার পরিক্রমা’, ‘আত্মসংগ্রহ’,’আত্মক্ষরণ’, ‘আত্মস্বর,’ ‘এই কবিতাজীবন’ ইত্যাদি। পুরস্কার পেয়েছেন : কবিরুল ইসলাম স্মৃতি পুরস্কার, দৌড় সাহিত্য সম্মান, নতুনগতি সাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদি।
বাংলা ভাষা আমার প্রাণের ভাষা
জন্মের পর যেদিন প্রথম কথা বলেছিলাম সেদিন বাংলা ভাষাতেই উচ্চারণ করেছিলাম ‘মা’ শব্দটি। তারপর দ্বিতীয় শব্দটি ছিল ‘বাবা’। যদিও বাবা শব্দটির আদি উৎস Baba তুর্কি (Turkish)। মধ্যবর্তী মাধ্যম Bābā ফারসি (Persian) বর্তমান রূপ বাবা বাংলা (Bengali)। ‘মা’ শব্দটি সংস্কৃত মাতা (Mātā), প্রাকৃতে মাআ (Māā) এবং বাংলায় মা (Mā) হিসেবে এসেছে। বাংলা ভাষা বিভিন্ন ভাষার শব্দ নিয়েই তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই বাংলা ভাষার অস্তিত্ব দেশজ বা লোকজ ভাষা, সংস্কৃত বা তৎসম ভাষা, অর্ধতৎসম ভাষা বা বিদেশি ভাষা এবং প্রাকৃত ও বাংলা ভাষায় রূপান্তর যেভাবেই ঘটুক সেই ভাষা যে প্রাণের ভাষা হয়ে উঠেছে তা বলাই বাহুল্য। বাঙালি যেমন চিরদিন তার ভাষাকে আপন করে নিয়েছে, যেমন কোনো ভাষার দাসত্ব স্বীকার করে নিজস্ব সংস্কৃতি ও চেতনাকে বিসর্জন দেয়নি, তেমনি এই ভাষাকে কেন্দ্র করেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে আত্মবিসর্জন দিতেও দ্বিধাবোধ করেনি। সেই ভাষারই উত্তরাধিকারী হয়ে আমি আবার সমূহ চেতনায়, স্বপ্নে, জীবনযাপনে এবং আত্মপ্রকাশে একেই মাধ্যম করে তুলেছি।
খুব ছোটবেলায় ভাষা বোঝার যখন ক্ষমতা ছিল না তখনও এর পয়ারের ধ্বনিতরঙ্গে আন্দোলিত হয়েছি। পিতা যখন সুর করে পড়তেন পাঁচালিতে লেখা প্রাচীন সাহিত্য ‘বড় মওতনামা’, আলিফ-লাইলা, হাতেম-তাই, রামায়ণ-মহাভারত ইত্যাদি আরো বহু গ্রন্থ তখন তা শুনে শুনে নিজের মনের মধ্যেই একটি ভাষার জগৎ নির্মিত হতে থাকে। সেই জগতে একটা স্বপ্নময় বিচরণ করতে পারি অনায়াসে। উপলব্ধি ও কল্পনার সীমানা বাড়তে থাকে। রূপকথা থেকে বাস্তববোধ, লৌকিক থেকে অলৌকিক, জীবন থেকে মহাজীবনের ধারণা প্রাপ্ত হয়। ভাষা তখন থেকেই আমার মরমে তার অধিকার বিস্তার করতে থাকে। ভালোবাসার প্রাচুর্য তখন থেকেই জমা হতে থাকে। নিজেকে উৎসর্গ করি সেই ভাষার কাছেই।
আমার কাছে বাংলা ভাষা কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি আমার অস্তিত্ব, শিল্পসত্তা এবং সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার সাহিত্যিক জীবনের পরতে পরতে এই ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং দায়বদ্ধতা ফুটে উঠতে থাকে। একটা অনায়াস বিচরণ ও অধিকারবোধ জন্মায়। ভাষার শিকড় ও মাটির টান আমার মধ্যেই উপলব্ধি হয়। যেহেতু আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায়। স্বাভাবিকভাবেই লেখায় গ্রামীণ বাংলার সোঁদা গন্ধ, মেঠো পথ এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দ মিশে থাকে। ভাষা হয়ে ওঠে “মৃত্তিকা-সংলগ্ন ভাষা”। আমি বিশ্বাস করি, একজন লেখকের সার্থকতা তখনই, যখন তিনি নিজের মাটির ভাষাকে বিশ্বজনীন রূপ দিতে পারেন।
আমার আত্মপরিচয়, আমার অহংকার আমার এই বাংলা ভাষা। বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ এই আত্মপরিচয়ের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কবিতায় ভাষা কেবল শব্দসমষ্টি নয়, বরং তা একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এখানে ছন্দ, রূপক, চিত্রকল্প সবই তার এক একটি বিন্যাস। আমি মনে করি, বাংলা ভাষার শব্দগুলো আমার ধমনিতে রক্তকণিকার মতো প্রবাহিত হয়। স্পন্দন তোলে। শিহরন জাগায়।
একজন প্রাবন্ধিক হিসেবেও যখন কলম ধরি, তখন বাংলা ভাষার বিবর্তন, প্রয়োগ এবং নান্দনিকতা নিয়ে গভীর চিন্তার প্রকাশ আপনা থেকেই আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয় । বিশেষ করে সমকালীন বাংলা কবিতার ধারা এবং ভাষার বিবর্তন নিয়ে অসংখ্য প্রবন্ধের জন্ম হয়।
আমি ভাষার অহেতুক জটিলতার বিরোধী। আমি মনে করি, ভাষার সহজবোধ্যতা ও শৈল্পিক গভীরতার মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। সহজ করে লেখা বা বলার ক্ষমতা সবাই অর্জন করতে পারেন না। ভাষাকে অন্তর থেকে অনুধাবন না করলে বা হৃদয়ের উৎস থেকে উৎসারিত না হলে তা সম্ভব হয় না।
আমার লেখায় ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং দুই বাংলার অভিন্ন ভাষাসংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আপনার থেকেই জেগে ওঠে। আমি মনে করি, বাংলা ভাষা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি ‘অখণ্ড চেতনা’। তাই আমার রচনায় বারবার স্মরণ করিয়ে দিই যে, এই ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাস বিশ্বের দরবারে আমাদের গর্বিত করে
আমার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ এবং প্রবন্ধ সংগ্রহগুলোতে,যেমন: অন্ধকার ও আলোর পদাবলি, কবিতার নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদিতে ভাষার কারুকাজ লক্ষ করা যাবে। আমার কাছে শব্দ মানে কেবল অক্ষর নয়, বরং ‘শব্দই ব্রহ্ম’। সুতরাং শব্দের ব্যঞ্জনা দিয়ে এক নিঃসঙ্গ অথচ সাহসী জগৎ তৈরি করতে চাই।—
”ভাষা হলো এক বহমান নদী, যে তার বুকের ওপর দিয়ে বয়ে নিয়ে যায় সহস্র বছরের ইতিহাস আর হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস।” — এই দর্শনেই আমি কলম পরিচালনা করে থাকি। আমার কাছে সর্বদা এই সূত্রটিই সক্রিয়:
আবেগ> ভাষাকে মায়ের সমতুল্য মনে করা।
দর্শন >ভাষাকে অস্তিত্ব রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে দেখা।
শৈলী>তৎসম এবং দেশজ শব্দের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
লক্ষ্য>বাংলা সাহিত্যের লুপ্তপ্রায় লোকজ শব্দকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা।
বাংলা ভাষা আমার কাছে কোনো অর্জিত বিদ্যা নয়, বরং এটি আমার হৃদস্পন্দন বা ‘প্রাণের ভাষা’। নিরন্তর সাহিত্যচর্চা এই ভাষার শ্রীবৃদ্ধি ও সংরক্ষণের এক উজ্জ্বল প্রচেষ্টা মাত্র। আমার কবিতা ও প্রবন্ধ পরস্পর পরিপূরক। কবিতায় যে আবেগকে রূপ দিই, প্রবন্ধের তাত্ত্বিক আলোচনায় তাকেই সংজ্ঞায়িত করি। বাংলা ভাষার প্রতি আমার দায়বদ্ধতা বোঝাতে নিচের উদ্ধৃতি ও বিশ্লেষণগুলো লক্ষ করুন:
১. কবিতায় ভাষার প্রকাশ: “শব্দই একমাত্র আশ্রয়”
আমার কবিতায় বাংলা ভাষা কখনও কখনও এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধার মতো আবির্ভূত হয়। আমি শব্দকে কেবল অর্থ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখি না, বরং তাকে একটি ‘সজীব সত্তা’ হিসেবে দেখি:
“আমি শব্দের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাই একাকী—
আমার ভাষাই আমার মানচিত্র, আমার ঘরবাড়ি।
যেখানে বাংলা বর্ণমালাগুলো ঝিঁঝিঁ পোকার মতো ডাকে,
সেখানেই আমার জন্ম, সেখানেই আমার পরম শান্তি।”
এখানে নিজের অস্তিত্বকে বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে একীভূত করেছি। ‘মানচিত্র’ এবং ‘ঘরবাড়ি’ শব্দ দুটির ব্যবহার প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক সীমানার চেয়েও ভাষাগত সীমানাই আমার কাছে বড় পরিচয়।
২. প্রবন্ধে ভাষার দর্শন: “মৃত্তিকাসংলগ্নতা”
আমার বিভিন্ন তাত্ত্বিক প্রবন্ধে বাংলা ভাষার শেকড় এবং এর আধুনিক বিবর্তন নিয়ে অনেক সওয়াল রয়েছে। আমি মনে করি, বিদেশি প্রভাবের চেয়েও মাটির কাছাকাছি থাকা শব্দগুলোই বাংলা সাহিত্যকে দীর্ঘজীবী করে। আমার প্রবন্ধের বক্তব্য থেকে :
“বাংলা ভাষা কোনো কৃত্রিম অলঙ্কার নয়, বরং তা আমাদের যাপনের ঘাম ও শ্রমের নির্যাস। যখন কোনো কবি লোকজ শব্দের গহীনে ডুব দেন, তখনই তিনি প্রকৃত অর্থে মাটির ভাষা খুঁজে পান। বিশ্বায়ন হয়তো আমাদের ওপর অনেক বিদেশি শব্দ চাপিয়ে দেবে, কিন্তু প্রাণের আরাম খুঁজে পেতে আমাদের সেই ‘জল-হাওয়া-মাটি’র বাংলাতেই ফিরতে হবে।”
এই বক্তব্যে স্পষ্ট করেছি যে, আমি ভাষাকে আভিজাত্যের মোড়কে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের দর্পণ হিসেবেই দেখি।
গদ্যের বই ‘আত্মসংগ্রহ’ বা অন্যান্য কাব্যগ্রন্থেও বারবার উল্লেখ করেছি যে, একজন কবির মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু ভাষার মধ্য দিয়ে তাঁর চেতনা বেঁচে থাকে। বাংলা ভাষাকে “অন্ধকার ও আলোর পদাবলি”-র মূল সেতু হিসেবেই বিবেচনা করি।
3 Comments
বাংলা ভাষা নিয়ে কবির ব্যক্তিগত উপলব্ধির কথা আছে। তিনি নিজের লেখাগুলি উল্লেখ করে সুন্দরভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহারটি বুঝিয়ে দিয়েছেন। কবিতার সঙ্গে গদ্যও অসাধারণ লিখে থাকেন কবি।
কবির নিজস্বতা তার উপলব্ধির জগত। সহজ ও সরল উচ্চারণ কবির নিজস্বতা। মাটির সাথে নীবিড় যোগাযোগ কবিকে মোহময় করে তুলেছে। অকপট উচ্চারণ কবিকে পাঠকদের দরবারে আদর্শের সাথে সাথে তার
কবির নিজস্বতা তার উপলব্ধির জগত। সহজ ও সরল উচ্চারণ কবির নিজস্বতা। মাটির সাথে নীবিড় যোগাযোগ কবিকে মোহময় করে তুলেছে। অকপট উচ্চারণ কবিকে পাঠকদের দরবারে মান্যতা দিয়েছে। অনেক অনেক শুভেচ্ছা।