Email: editors.kokshopoth@gmail.com
September 25, 2026
Kokshopoth

সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা

Sep 25, 2026

নিয়মিত কলম
সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা
পর্ব# ১৭

সাম্য রাইয়ানের জন্ম বাঙলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায়। ২০০৬ থেকে সম্পাদনা করছেন শিল্প-সাহিত্যের অন্যতর লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু। কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছেন নতুন ধরনের আখ্যানধর্মী গদ্য৷

সাম্য রাইয়ানকে নিয়ে ভারতের  সাহিত্য পত্রিকা ‘তারারা’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মনমানচিত্র’, ভারতের ‘এবং পত্রিকা’ তাকে নিয়ে বিশেষ একক সংখ্যা ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘নিসর্গ’ বিশেষ মূল্যায়ন (ক্রোড়পত্র) প্রকাশ করেছে৷ ভারতের নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার সাম্য রাইয়ান প্রসঙ্গে ‘সাম্যপুরাণ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট [গদ্য, ২০১৪]; বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা [কবিতা, ২০১৫]; মার্কস যদি জানতেন [কবিতা, ২০১৮]; হলুদ পাহাড় [কবিতা, ২০১৯]; চোখের ভেতরে হামিং বার্ড [কবিতা, ২০২০]; লোকাল ট্রেনের জার্নাল [গদ্য, ২০২১]; লিখিত রাত্রি [কবিতা, ২০২২] ও হালকা রোদের দুপুর [কবিতা, ২০২৩]; জলের অপেরা [কবিতা, ২০২৪]; সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের [উপন্যাস, ২০২৫]৷ সম্পাদিত গ্রন্থ: উৎপলকুমার বসু [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২২]; জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধ সংকলন, ২০২৩]; শম্ভু রক্ষিত: পাঠ ও বিবেচনা [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২৫]।

বাদল সরকার এবং থিয়েটারের মুক্তি

 

অন্য কিছু একটা করবো বলে সবাই চরস খেলাম, কেউ চুল কাটিনি

লাল বইটা লুকিয়ে পড়ার সময় ভবিষ্যতের কথা কেউ ভাবিনি

রাস্তায় সার্ত্রের নাটকের পোস্টার মেরে, বব ডিলানের বঙ্গানুবাদটা করে

বাদল সরকারের মিছিলে দাঁড়িয়ে হারিয়ে গেলাম কে কোথায়!

(শীতকালের চিঠি/ অঞ্জন দত্ত)

 

বাদল সরকারের ‘মিছিল’ আমি দেখিনি, তাঁর কোনো নাটকের সামনে দাঁড়িয়ে হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও নেই। তবু এই হারিয়ে যাওয়ার কথাটাই বারবার মনে পড়ে। অঞ্জন দত্তের শীতকালের চিঠিতে যে সময়ের স্মৃতি উঠে এসেছে, সেখানে চরস, লাল বই, সার্ত্রের নাটকের পোস্টার, বব ডিলানের বঙ্গানুবাদ আর শেষে বাদল সরকারের নাটক মিলে এমন একটি প্রজন্মের অস্থিরতার ছবি তৈরি হয়, যে প্রজন্ম জানত না ঠিক কী করবে, কোথায় যাবে, ভবিষ্যৎ কেমন হবে। তবু প্রচলিত জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতেও রাজি ছিল না।

 

বাদল সরকারকে নিয়ে লিখবার শুরুতেই আমার নিজের সঙ্গে একটা ছোট হিসাব মিটিয়ে নেওয়া দরকার। প্রথমত, আমি তাঁর নাটক দেখিনি। দ্বিতীয়ত, তাঁর অভিনয় বা নির্দেশনাও দেখিনি। এমনকি দর্শকের মধ্যে বসে কোনো নাটকের অকস্মাৎ শরীরী অভিঘাত অনুভব করিনি। কাজেই বাদল সরকারকে নিয়ে লিখতে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতার গল্প বানিয়ে নেওয়ার কোনো মানে নেই। আমার কাছে বাদল সরকার এসেছেন অন্য পথ ধরে, তাঁর সাক্ষাৎকার, নাট্যবিষয়ক প্রবন্ধ, তাঁর নিজের থিয়েটার সম্পর্কে করা আত্মজিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে। বিশেষ করে The Changing Language of Theatre, The Third Theatre, Voyages in the Theatre, সামিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন পড়তে পড়তে যে বাদল সরকারকে পাওয়া যায়, তিনি আমার কাছে মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো বিখ্যাত নাট্যকারের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। তিনি থিয়েটার করেছেন, আবার সেই থিয়েটারকে প্রশ্ন করেছেন; একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন, পরে সেই পদ্ধতির মধ্যেই পুরোনো ধারণার সীমাবদ্ধতা আবিষ্কার করেছেন।

 

The Changing Language of Theatre প্রবন্ধে লক্ষ্য করি, শুরুতেই তিনি নিজের পরিচয়, নিজের সময়, সামাজিক অবস্থান এবং থিয়েটারের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। একজন নাট্যকার কী লিখবেন, তার আগে তিনি কোথা থেকে লিখছেন, কার জন্য লিখছেন; যে সমাজে দাঁড়িয়ে লিখছেন সেই সমাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, ব্যবহৃত ভাষা কতটা তাঁর নিজের, তাঁর থিয়েটার কতটা তাঁর সময়ের বাস্তবতা থেকে জন্ম নিচ্ছে, এই প্রশ্নগুলো না করলে শিল্পী নির্দিষ্ট ফ্রেমের মধ্যেই ঘুরপাক খাবেন।

 

একজন শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিসেবে তিনি প্রেক্ষাগৃহের থিয়েটারের সুবিধাগুলো জানতেন। কিন্তু সেই সুবিধার মধ্যেই তিনি বিচ্ছিন্নতা দেখতে পেয়েছিলেন। থিয়েটার দর্শকের কাছে পৌঁছানোর বদলে দর্শককে নিজের কাছে টানছে, আর সেই টেনে আনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে টিকিট, প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, অর্থ এবং শ্রেণির সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। ফলে থিয়েটার যত সুন্দরভাবে তৈরি হচ্ছে, ততই কখনো কখনো মানুষের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই দ্বন্দ্ব তাঁকে তৃতীয় পথ খুঁজতে বাধ্য করেছিল। যে পথের নাম ‘থার্ড থিয়েটার’। অবশ্য থার্ড থিয়েটার মানেই পথের নাটক নয়। পরবর্তী সময়ে বাদল সরকার নিজেই ‘থার্ড থিয়েটার’-এর বদলে ‘ফ্রি থিয়েটার’ শব্দটির দিকে এগিয়েছিলেন। খোলা মাঠে এ থিয়েটার দর্শকের সঙ্গে অভিনেতার নতুন সম্পর্ক নির্মাণ করে। তখন শরীর হয়ে ওঠে থিয়েটারের প্রধানতম উপকরণ। ১৯৯২ সালের সাক্ষাৎকারে বাদল সরকার বলেছিলেন, প্রচলিত থিয়েটারের সাজসজ্জা থেকে বেরিয়ে এলে অভিনেতাকে তাঁর নিজের শরীরের সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করতে হয়, আর তার জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রশিক্ষণ।

 

বাদল সরকার মানেই থার্ড থিয়েটার, থার্ড থিয়েটার মানেই মঞ্চের বাইরে অভিনয়, কম খরচ, খোলা জায়গা, শরীরের ব্যবহার, দর্শক ও অভিনেতার দূরত্ব কমিয়ে আনা, বাণিজ্যিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান। কথাগুলো সত্য, কিন্তু এ সত্য বড় সংক্ষিপ্ত। ফলে, বাদল সরকারকে ‘থার্ড থিয়েটার’ শব্দটির মধ্যে আটকে ফেললে তাঁর সামগ্রিক চিন্তার লড়াইয়ের পরিসর হারিয়ে যায়। তাঁর সাক্ষাৎকারগুলোতে দেখা যায়, প্রয়োজনে নিজের পুরোনো ধারণাকে ভাঙতেও তিনি প্রস্তুত।

 

‘থার্ড থিয়েটার’ ধারণাটিও তাঁর কাছে ‘চূড়ান্ত’ মতবাদ নয়, এক্সপেরিমেন্ট। এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, শুরুতে তিনি থার্ড থিয়েটারকে শহুরে ও গ্রামীণ থিয়েটারের এক ধরনের সংশ্লেষ হিসেবে ভাবতেন; পরে বুঝেছিলেন, কোনো বিকল্প থিয়েটারকে যদি সত্যিই বিকল্প হতে হয়, তাহলে তাকে অন্য দুই ব্যবস্থার যান্ত্রিক সমন্বয় এড়িয়ে যেতে হবে। এরপর তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে থিয়েটারের স্বাধীনতা, কম খরচে চলতে পারা, স্থির অবকাঠামোর ওপর নির্ভর না করা এবং বাণিজ্যিকতার বাইরে থাকা। আর সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, দর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন।

 

তিনি যখন প্রেক্ষাগৃহের দিকে তাকালেন, তখন স্থাপত্যের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো সম্পর্কের বিন্যাস। মঞ্চে অভিনেতা, নিচে দর্শক; অভিনেতার ওপর আলো, অন্ধকারে নির্দিষ্ট আসনে বসা দর্শক; অভিনেতা কথা বলবেন, দর্শক শুনবেন। এই ব্যবস্থা এত পুরোনো, এত স্বাভাবিক যে আমরা তাকে প্রায় প্রকৃতির নিয়ম বলে ধরে নিয়েছি। কিন্তু বাদল সরকার সেখানে কৃত্রিমতা দেখলেন। ভাবলেন, প্রচলিত এ পদ্ধতিই অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি করছে। তাঁর নিজের ভাষায়, প্রেক্ষাগৃহের সীমাবদ্ধতা থেকেই তাঁর মধ্যে যোগাযোগ, স্থান এবং অভিনেতা ও দর্শকের সম্পর্ক নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছিল। থিয়েটারের স্বাতন্ত্র্য তিনি দেখতে পেয়েছিলেন তার জীবন্ত উপস্থিতি এবং সরাসরি মানুষে মানুষে যোগাযোগের সম্ভাবনায়।

 

মানুষের সামনে মানুষ। এর জন্য এত আয়োজন কেন? বাদল সরকার মঞ্চের আয়োজন কমাতে শুরু করলেন। সেট নেই, আলো কম, প্রপস প্রায় নেইই, পোশাকের বাহুল্য নেই, হলরুম নেই, টিকিট পদ্ধতি নেই। তিনি চেয়েছিলেন থিয়েটার তার সবচেয়ে মৌলিক সম্পদ মানুষ, শরীর, কণ্ঠ, সময় ও স্থানের কাছে ফিরে যাক।

 

তাঁর কাছে শরীরের গুরুত্ব এখানেই। যখন প্রেক্ষাগৃহের যাবতীয় যন্ত্রপাতি সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন অভিনেতার শরীর আর শুধু চরিত্র ধারণ করার মাধ্যম থাকে না; সেটিই হয়ে ওঠে দৃশ্য, শব্দ, স্থান এবং সংকেতের প্রধান বাহন। বাদল সরকার অভিনেতার শরীরকে প্রশিক্ষিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন, কারণ তাঁর ধারণায় মঞ্চের অলংকার সরিয়ে দিলে অভিনেতার নিজের শরীরকেই অনেক বেশি কাজ করতে হবে। কিন্তু ভাষাকে তিনি বাতিল করেননি। তাঁর থিয়েটার নিয়ে পরবর্তীতে বরং দেখা যায়, শরীর, শব্দ, সুর, অঙ্গভঙ্গি এবং ভাষাকে পরস্পরের পরিপূরক করে তোলাই তাঁর নিরীক্ষার বিষয় ছিল।

 

শরীর কোনো ফ্যাশন নয়, নির্ভরতার প্রশ্ন। যত বেশি বাহ্যিক উপকরণ কমবে, অভিনেতাকে তত বেশি নিজের ওপর নির্ভর করতে হবে। এই নির্ভরতা আসলে শিল্পীর স্বাধীনতার সঙ্গেও যুক্ত। একটি নাটক যদি বিশাল সেট ছাড়া না হয়, নির্দিষ্ট হলরুম আর বিপুল অর্থ ছাড়া না হয়, তাহলে সেই নাটকের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ হতে বাধ্য। বাদল সরকার সেই সীমাটাকেই ভাঙতে চেয়েছিলেন। যদিও জানতেন, তাঁর থিয়েটারের শরীরনির্ভরতা নিয়ে আপত্তি উঠতে পারে। তাঁকে বলা হয়েছিল, শারীরিক অভিনয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভাষাকে পিছিয়ে দেয়, আর শারীরিক বিন্যাস কখনো এমন এক ধরনের প্রদর্শনীতে পরিণত হতে পারে যা সাধারণ দর্শকের কাছে দূরবর্তী হয়ে পড়ে।

 

তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বনির্ভর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ধারণা। তিনি এমন একটি থিয়েটার চেয়েছিলেন যা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সরকারি অনুদান কিংবা বড় অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হবে না। ১৯৯২ সালের সাক্ষাৎকারে তিনি মানুষের স্বেচ্ছা-অবদানের কথা বলেছিলেন। এই বক্তব্যের অর্থ শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নয়; এর মধ্যে শিল্পের স্বাধীনতার ব্যাপারও ছিল। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন শিল্পকে অর্থ দেয়, তখন সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শিল্পের পরিসর, দর্শক এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ার ওপর তার প্রভাব তৈরি হতে পারে। বাদল সরকার সেই নির্ভরতার বাইরে থাকার পথ খুঁজেছিলেন।

 

সে পথ সরল ছিল না। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন, টাউন প্ল্যানিং নিয়ে কাজ করেছেন, বিদেশে থেকেছেন, প্রচলিত প্রেক্ষাগৃহের জন্য নাটক লিখেছেন এবং সেই নাটকগুলোর সাফল্যও পেয়েছেন। অর্থাৎ যে থিয়েটারকে পরবর্তী জীবনে তিনি প্রশ্ন করবেন, তার ভেতরেই ছিলো তার অবস্থান। ভেতরে ঢুকে, তার নিয়মকানুন বুঝে, সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা অনুভব করার পরই অন্যদিকে সরে গেছেন। এপ্রসঙ্গে তাঁর নিজের লেখায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে প্রয়োজন, ব্যবহার, যোগাযোগ ও মানুষের কাছে পৌঁছানোর তাগিদ।

 

এখানে ‘মানুষ’ শব্দটি সরলরৈখিক নয়। পরবর্তী সময়ে মনুজেন্দ্র কুণ্ডুর বিশ্লেষণ থেকে এই অস্বস্তিকর প্রসঙ্গটি সামনে আসে যে, বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটার প্রেক্ষাগৃহের দেয়াল ভাঙলেও ‘জনগণ’ ধারণার সঙ্গে তার সম্পর্ক সরল ছিল না; শিক্ষা, সংস্কৃতি, মধ্যবিত্ত বোধ এবং দর্শকের যোগ্যতা নিয়ে যে সামাজিক বিভাজন, তার কিছু অংশ থার্ড থিয়েটারের ভেতরেও থেকে গিয়েছিল।

 

থার্ড থিয়েটার সত্যিই কতটা ‘জনগণের’ থিয়েটার হতে পেরেছিল, তাঁর নাট্যভাষা কতটা বৃহত্তর মানুষের কাছে উন্মুক্ত হতে পেরেছিল, তাঁর কর্তৃত্ব কীভাবে দলীয় কাঠামোর মধ্যে কাজ করত, প্রকৃতপ্রস্তাবে এসব প্রশ্ন তাঁর উত্তরাধিকারকেই আরো বাস্তব করে তোলে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত মনুজেন্দ্র কুণ্ডুর গবেষণায় থার্ড থিয়েটারের ভেতরের এই বিরোধ, লেখকের কর্তৃত্ব এবং ‘জনগণ’ থেকে দূরত্বের প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

 

একথা সত্য, থার্ড থিয়েটার সব সমস্যার সমাধান করেনি। তাঁর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁর দর্শক আসলে কতটা বিস্তৃত ছিল, গ্রাম ও শহরের দর্শকের সঙ্গে তাঁর থিয়েটারের সম্পর্ক আদৌ একই ছিল কি না, শরীরনির্ভর অভিনয়ের ভাষা কতটা সর্বজনগ্রাহ্য, স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো কতদিন টেকসই, এসব প্রশ্নও আছে। গবেষণায় থার্ড থিয়েটারের পরিসর, সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষত শহুরে দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের থার্ড থিয়েটার ধারণার পরিবর্তনের কথা অকপটে বলেছিলেন। তাঁর কথায় বোঝা যায়, তিনি কোনো ‘মডেল’ আবিষ্কার করে তার প্রচার করতে চাননি; কাজ করতে করতে ধারণা বদলেছেন। চিন্তার এই ওপেন এন্ডেড পদ্ধতিটাই তাঁর সবচেয়ে আধুনিক গুণগুলোর একটি। এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, নিজের ধারণাকে বারবার সম্পাদনা করেছেন এবং ভবিষ্যতের জন্যেও উন্মুক্ত রেখেছেন। তাঁর কাছে থিয়েটার একটি চলমান প্রশ্নের মতো, যার উৎসমুখে ছিল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা।

 

সে যোগাযোগ কেবল কথা পৌঁছে দেওয়া নয়। একটি বক্তৃতাও কথা পৌঁছে দেয়। সংবাদপত্র, পোস্টার কিংবা লিফলেটও একই কাজ করে। থিয়েটারের বিশেষত্ব হচ্ছে মানুষের শারীরিক উপস্থিতি। অভিনেতা-দর্শক মুখোমুখি। একই সময়, একই স্থান; কোনো সম্পাদনা নেই, দ্বিতীয় সুযোগ নেই। একটি ভুল কিংবা ভুলে যাওয়া সংলাপও সেই মুহূর্তের অংশ। দর্শকের অস্বস্তি কিংবা অভিনেতার শরীরের ক্লান্তিও সেই মুহূর্তের অংশ। এই জীবন্ত অনিশ্চয়তাই থিয়েটারকে অন্য শিল্প থেকে আলাদা করে তোলে। বাদল সরকার এই অনিশ্চয়তাকে আরো জ্যান্ত করে তুলতে চেয়েছিলেন।

 

কনসেপচুয়ালি তিনি ছিলেন রাজনৈতিক। নাটক কীভাবে তৈরি হবে, সেটিও তাঁর কাছে রাজনৈতিক প্রশ্ন। কে সেখানে থাকবে, কে থাকবে না, কে কথা বলবে, কে শুনবে, কার জন্য জায়গা তৈরি হবে, শিল্পী কতটা অর্থের ওপর নির্ভরশীল থাকবেন, দর্শকের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব কতটা, এগুলো সবই রাজনৈতিক। ‘মিছিল’ নিয়ে গবেষণায় তার পারফরম্যান্সের ধরন, দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক এবং জনপরিসরের রাজনীতি অনুসন্ধান করা হয়েছে।

 

একসময় তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। তাঁর সাক্ষাৎকারে এই রাজনৈতিক যাত্রার কথা পাওয়া যায়। পার্টি রাজনীতি থেকে সরে আসার পর তাঁর রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো থিয়েটারের ভাষা পেল। শিল্পের মালিক কে, দর্শক কে, অর্থ কোথা থেকে আসে, শিল্পীর স্বাধীনতা কোথায়, প্রতিষ্ঠান কীভাবে শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর মানুষকে ‘দর্শক’ বানানোর প্রক্রিয়ার মধ্যেই বা কী ধরনের সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক চিন্তারই সম্প্রসারণ নয় কি!

 

তাঁর The Changing Language of Theatre পড়তে গিয়ে তাই থিয়েটারের ভাষার পাশাপাশি নিজের ভাষা নিয়েও ভাবতে হয়। আমরা যে ভাষায় লিখছি, সেটি কার ভাষা? আমাদের পাঠক কারা? আমরা যে মানুষটির কথা বলছি, সে কি আমাদের ভাষার ভেতরে সত্যিই উপস্থিত, নাকি আমরা তার হয়ে কথা বলার একটা সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছি?

 

এমন নয় যে, বাদল সরকার এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর দিয়েছেন। বরং না দিয়ে ভালোই করেছেন। এক জায়গায় পৌঁছে আরেক জায়গা সন্দেহ করা, নিজের তৈরি ভাষার মধ্যে নতুন ভাষার সম্ভাবনা খোঁজা, প্রতিষ্ঠিত নাট্যব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আবার নিজের বিকল্প ব্যবস্থাকেও পরীক্ষা করা, এই চলমানতার মধ্যেই তাঁর শিল্পীসত্তা জীবন্ত।

 

মঞ্চ ভেঙে ফেলা যায়, লাইট বন্ধ করা যায়, চেয়ার সরিয়ে দেওয়া যায়, নাটক নিয়ে দূর-দূরান্তে যাওয়া যায়; কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছানোর কোনো প্রযুক্তিগত সমাধান নেই। সেখানে শিল্পীর নিজের শরীর, ভাষা, অহংকার, শ্রেণিগত অবস্থান, রাজনৈতিক বিশ্বাস, নিরাপত্তা, সবকিছু একসঙ্গে উপস্থিত হয়। বাদল সরকার ঠিক সেই জায়গাতেই থিয়েটারকে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর সেখানেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *