অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১১-তিস্তা
ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১১-তিস্তা
তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।
আয়না
অনেকদিন পরে নিজের জন্য একটা শার্ট কিনতে বেরিয়েছিলাম। অফিসে জয়েন করার পর থেকেই ভাবছিলাম, দু-একটা জামা কেনা দরকার। আলমারিতে জামা আছে। তবু কিছু কিছু কেনাকাটা প্রয়োজনের জন্য হয় না। নিজের জীবনে আবার একটু ফিরে আসার জন্য হয়।
সেদিন অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে হঠাৎ মনে হল, আজই একটা শার্ট কিনব। কোনো বিশেষ কারণ ছিল না। বেতন পাওয়ার দিন নয়। পরদিন কোনো অনুষ্ঠানও নেই। নতুন শার্ট পরে অফিসে যাওয়ার তাড়াও নেই। তবু বেরিয়ে পড়লাম।
কিছু কিছু সিদ্ধান্ত মানুষ কারণ ভেবে নেয় না। সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর কারণ খুঁজতে শুরু করে। সেদিনও হয়তো তেমনই কিছু হয়েছিল। শপিং মলে ঢোকার সময় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। কাচের দরজা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়া মুখে লাগল। ভেতরে মানুষের ভিড় ছিল, কিন্তু কোনো কোলাহল নেই। সবাই নিজের নিজের দরকার নিয়ে ব্যস্ত। কেউ জুতো দেখছে, কেউ বাচ্চার জামা, কেউ ফোনে কথা বলতে বলতে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে যাচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ ঘুরলাম। দোকানের পর দোকান। একই রকম আলো, একই রকম সাজানো জামা, একই রকম হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিক্রেতারা। সবকিছু এত গোছানো যে, নিজের ইচ্ছেটাকেও খুব ছোট মনে হচ্ছিল। একটা দোকানে ঢুকলাম। একজন বিক্রেতা এগিয়ে এল। কী চাই জিজ্ঞেস করল।
আমি বললাম, “শার্ট দেখছি।”
বিক্রেতা কয়েকটা শার্ট বের করে কাউন্টারের ওপর রাখল। সাদা, হালকা নীল, ধূসর, চেক। আমি একটার পর একটা হাতে নিলাম, আবার রেখে দিলাম। কোনোটা খারাপ লাগছিল না, কিন্তু কোনোটা দেখে মনে হচ্ছিল না, এটাই চাই। শেষে একটা নীল শার্ট পছন্দ হল।
বিক্রেতা বলল, “স্যার, ট্রায়াল করে নিন।”
শার্টটা হাতে নিয়ে ট্রায়াল রুমের দিকে চলে গেলাম। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করলাম। জামাটা পরে সামনে তাকাতেই একটু থমকে গেলাম। সামনে একটা বড় আয়না। দুপাশেও দুটো। তিনটে আয়নায় একই সঙ্গে আমাকে দেখা যাচ্ছে। সামনে থেকে একরকম। ডান দিক থেকে আরেকরকম। বাঁ দিক থেকে অন্যরকম। সামান্য ঘুরতেই আরও কয়েকটা প্রতিফলন তৈরি হল। একজন মানুষ। অথচ একটাও পুরো একরকম নয়।
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর শরীরটা একটু ঘোরালাম। সামনের আয়নায় মুখটা বদলে গেল। পাশের আয়নায় দাঁড়ানো মানুষটাও যেন বদলে গেল। আরও একটু ঘুরতেই একটা মুখ আড়াল হল, আরেকটা সামনে এল। মনে হল, আমি যত নড়ছি, তত নতুন নতুন মানুষ তৈরি হচ্ছে। প্রতিবারই নতুন একজন অর্জুন সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। হঠাৎ খেয়াল হল, বাড়ির আয়নায় তো নিজেকে এভাবে কখনও দেখি না।
বাড়িতে একটা আয়না। তার সামনে দাঁড়ালে নিজের মুখটা দেখা যায়। প্রতিদিন একই মুখ। সকালে ঘুম থেকে উঠে, অফিসে যাওয়ার আগে, চুল আঁচড়ানোর সময়, দাড়ি কাটার সময়—একই মুখ এতবার দেখা
হয় যে, আলাদা করে তাকে দেখার প্রয়োজনই থাকে না। কিন্তু এই তিনটে আয়না সেই ধারণাটাকে একটু গোলমাল করে দিল।
সামনের মানুষটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ডান দিকের মানুষটাও। বাঁ দিকের মানুষটাও। তিনজনের মুখ আমার। অথচ তিনজনকে একসঙ্গে দেখে মনে হচ্ছে, প্রত্যেকের মধ্যেই সামান্য হলেও একটু পার্থক্য আছে। সামনের মুখটা চেনা। পাশের দুটো যেন একটু অপরিচিত।
আমি আরও কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। কপালটা দেখলাম। চোখ দেখলাম। ঠোঁটের কাছে সামান্য ভাঁজ। ডান দিকের মুখটাকে হঠাৎ একটু ক্লান্ত মনে হল। বাঁ দিকের মুখটাকে তুলনায় কম বয়স্ক বলে মনে হল। অথচ দুটোই একই মুখ। কোনোটাই ভুল নয়। আবার কোনোটাকেই পুরোপুরি ঠিক বলে মনে হল না।
আমি মাথাটা সামান্য বাঁকিয়ে দিলাম। তিনটে মুখও একসঙ্গে বাঁকিয়ে দিল। আমি হাত দিয়ে চুলটা ঠিক করলাম। তিনটে মুখও একই সঙ্গে চুল ঠিক করল। এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত লাগল। মনে হল, নিজের মুখ সম্পর্কে আমার ধারণাটাও হয়তো খুব একপেশে। অন্য মানুষরাও কি আমাকে এভাবেই দেখে? আমি নিজেকে যে মুখে চিনি, অন্য কেউ কি সেই মুখেই আমাকে চেনে?
অফিসে আমি যে মানুষ, বন্ধুর কাছে কি সেই একই মানুষ? যে সহকর্মী আমাকে প্রতিদিন দেখে, তার কাছে আমার মুখের কোন দিকটা বেশি পরিচিত? কলেজের অর্জুন আর আজকের অর্জুনের মধ্যে কতটা মিল আছে?
একজন মানুষ কি আদৌ নিজেকে সম্পূর্ণ দেখতে পায়? নাকি নিজের সম্পর্কে তার ধারণাটা তৈরি হয় অন্য মানুষের চোখে দেখা অসংখ্য টুকরো থেকে?
কেউ আমার সঙ্গে কথা বলার সময় আমার চোখের দিকে তাকায়। কেউ হাঁটার সময় পাশ থেকে দেখে। কেউ হয়তো আমাকে খুব কাছে থেকে চেনে। কেউ শুধু দূর থেকে দেখেছে কয়েকবার। প্রত্যেকের কাছে আমার একটা আলাদা মুখ তৈরি হয়। একই মানুষ। অসংখ্য মানুষে বিভক্ত।
কেউ আমাকে ভালো মানুষ ভেবেছে। কেউ হয়তো ঠিক তার উল্টোটা। কেউ দয়ালু ভেবেছে, কেউ নিষ্ঠুর। কোনোটাই কি মিথ্যে? আমি জানি না।
হয়তো সবগুলোই সত্যি। কারণ একই মানুষের ভেতর একাধিক মানুষ থাকা তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং সেটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতি বদলালে আচরণ বদলায়। সম্পর্কের বদল হলে কথাবার্তা বদলে যায়। সময় বদলালে মানুষের নিজেরও বদল ঘটে। কিন্তু তারপরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়।
যে মানুষটাকে আমি নিজে বলে জানি, সে কে? সামনের আয়নায় তাকিয়ে থাকা মানুষটা? নাকি ডান দিকেরটা, যার মুখটা হঠাৎ আমার কাছে একটু বেশি ক্লান্ত বলে মনে হচ্ছে? নাকি বাঁ দিকেরটা, যার মুখে এমন একটা অভিব্যক্তি আছে, যেটা নিজের মুখে আমি আগে কখনও খেয়াল করিনি।
বাইরে কারও পায়ের শব্দ হল। আমি শার্টটার দিকে তাকালাম। ভালোই লাগছে। আবার আয়নার দিকে চোখ গেল। তিনটে মুখই স্থির। এখন সবাই তারা আমার দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ মনে হল, নিজেকে এই দেখা আর নিজের মধ্যে থাকা—দুটো কি এক জিনিস? ভাবনাটা খুব বেশি দূর এগোনোর আগেই বাইরে থেকে বিক্রেতার গলা এল।
“স্যার, ফিটিং ঠিক আছে তো?”
নিজের চোখের সঙ্গে চোখ মেলাতে গিয়েও আমি আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। বললাম, “হ্যাঁ”।
বেরিয়ে আসার আগে আর একবার পিছন ফিরে তাকালাম। তিনটে আয়নায় তিনজন অর্জুন দাঁড়িয়ে আছে। আরও একটু নড়তেই তাদের সংখ্যা যেন বেড়ে গেল। তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বিক্রেতা হাসিমুখে এগিয়ে এল।
“পছন্দ হয়েছে?”
বললাম, “হ্যাঁ।”
“প্যাক করে দেব?”
আমি কিছু বললাম না। শার্টটা আবার হাতে নিলাম। এই সময় পাশের কাউন্টার থেকে একটা ছেলের গলা শুনলাম। সে তার বাবার জন্য শার্ট দেখছিল। মাঝবয়সি ভদ্রলোক। পাশেই দাঁড়িয়ে বারবার একই শার্টের হাতা উলটে দেখছিলেন। ছেলে একটা রঙ পছন্দ করে বাবার গায়ে ধরল। দৃশ্যটা খুব সাধারণ। তবু কেন জানি না, আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। বিক্রেতা জিজ্ঞেস করল, “স্যার, বিল করে দিই?”
এবার বললাম, “হ্যাঁ।”
বিল মিটিয়ে শার্টটা হাতে নিলাম। আর একবার তাকালাম ট্রায়ালরুমের দিকে। হঠাৎ মনে হল, বাইরে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে-ই কি আসল অর্জুন? নাকি ট্রায়াল রুমের ভিতরে এখনও দাঁড়িয়ে আছে আরও কয়েকজন? কেন জানিনা হাসি পেল। ধুর কি সব ভাবছি!
দোকান থেকে বেরিয়ে মলের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম। বাইরে তখন সন্ধ্যা আরও গাঢ় হয়েছে। রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। মানুষজন যে যার দিকে যাচ্ছে। আমি আস্তে হাঁটছিলাম। একটা দোকানের কাচের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ নিজের মুখটা দেখতে পেলাম। থামলাম না। হাঁটতে হাঁটতেই দেখলাম—কাচে আমার সঙ্গে আরেকজন মানুষও এগিয়ে যাচ্ছে।
আমি হাঁটতে থাকলাম। সঙ্গে আর একজন অর্জুন…