গুচ্ছ কবিতা- সুকান্ত মণ্ডল
গুচ্ছ কবিতা- সুকান্ত মণ্ডল
জন্ম:১৯৯৭; ভূতনী দিয়াড়া, মালদা, পশ্চিমবঙ্গ।
গঙ্গার ধারে, প্রাকৃতিক মৃদু প্রতিধ্বনির মধ্যে শৈশব কাটানো কবি সুকান্ত মণ্ডল। বাবা সুধাংশু মণ্ডল ও মা শঙ্করী মণ্ডলের স্নেহে বড় হওয়া এই কবির স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন হয় মানিকচক শিক্ষা নিকেতন থেকে। এরপর গৌড় মহাবিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন, যেখানে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বৃত্তিময় অক্ষরে ফুটে উঠতে থাকে তাঁর কবিসত্তা। তারপর, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বইয়ের সঙ্গে লুকোচুরি, পথের সঙ্গে নির্জনে একা ঘুরে বেড়ানো, সেসবই তাঁর প্রিয় নেশা। লেখা তাঁর প্রকাশ, একাকীত্ব তাঁর ভ্রমণ, আর পথের প্রতিটা বাঁকে তিনি খুঁজে ফেরেন কবিতা।
১.
ধূলিঝড়
হঠাৎ করেই সমস্ত দিকনির্দেশ মুছে যায়।
চোখের ভিতরে প্রবেশ করে ধুলো,
আর স্মৃতির ভিতরে অনিশ্চয়তা।
হে পরিত্যক্ত কূপ, তোমার শ্যাওলাধরা দেওয়ালে
আটকে আছে বহুদিনের উচ্চারণহীন নাম।
কিছু পাখি উড়ে যায়। কিছু বৃক্ষ ভেঙে পড়ে।
আর কিছু মানুষ—
অবশিষ্ট ভগ্নাংশ নিয়ে ফিরে যায় সভ্যতার দিকে…
২.
অগ্নিশীত
অবসন্ন আলোকবর্ষ পেরিয়ে এলে
ছড়িয়ে পড়ে তামাটে নিস্তব্ধতা, গোপন ঢেউ।
ভাঙা সিঁড়ির ধাপে ধাপে জমা হয় অচেনা জীবনের পরাগ।
আমার নীরব কাহিনিকে আশ্রয় দিয়েছি
একটি জীর্ণ প্রদীপের ভিতরে,
সেখান থেকে জেগে ওঠে ম্লান চন্দনের আবেশ।
রাতভর শূন্য স্টেশনে অপেক্ষা করেন এক বিস্মৃত যাত্রী।
এভাবেই বিলম্বিত ট্রেনের সঙ্গে
কথা বলে সময় ও ধূলি।
যখন সমস্ত ঘোষণা শেষ হয়ে যায়,
একটি একাকী বাঁশির পাশে বসে থাকে দীর্ঘ প্রতীক্ষা
৩.
অনুবৃত্তি
প্রতিটি নির্বাসিত দৃশ্যের অন্তর্গত ছিল
এক সম্ভাব্য সবুজাভ কেন্দ্র,
যেখান থেকে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ছিল অনিদ্রার অক্ষরসমূহ।
দীর্ঘ অবরোধের পরে
অর্থেরা যখন নিজেদের খোলস ত্যাগ করে,
বিচ্ছুরিত হয়ে ওঠে বহুদিন অদেখা আলোকরেণুর বিবরণ।
প্রতিকূল সময়ের বিপরীতে হঠাৎ যদি ফিরে আসে মাটির গন্ধ;
পুনরায় দৃশ্যমান হয়—
কেবল কয়েকটি হাতের ছাপ,
কিছু ছাই
এবং অপেক্ষমাণ ছায়া।
৪.
প্রত্নতত্ত্ব
খননকার্য চলছিল বহুদিন।
মাটির নিচে পাওয়া গেল একটি অক্ষত নীরবতা।
বিশেষজ্ঞরা বললেন:
এটি প্রায় কয়েক সহস্রাব্দ পুরোনো।
আরও পাওয়া গেছে কিছু ভাঙা স্বপ্ন,
এবং একটি অসমাপ্ত চাঁদ।
আরও গভীরে নেমে আবিষ্কৃত হল মানুষের প্রাচীনতম ভয়।
কোনও জন্তু নয়, কোনও যুদ্ধ নয়।
বরং একটি আয়না
যেখানে কেউই দেখতে পায় না নিজের সম্পূর্ণ মুখ।
সেদিন সন্ধ্যায় পুরো খননক্ষেত্র জুড়ে
ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল ঘাস,
পৃথিবী যেন নিজের ক্ষতস্থান ঢেকে ফেলছে
অতীতের সব আলোকচিহ্ন দিয়ে!
৫.
কবি
আঙুলে অপ্রকাশিত শতাব্দীর কালি ও চন্দ্রগ্রহণের বিষণ্নতা।
পকেটে ঝনঝন করে পরিত্যক্ত শব্দ, নির্বাসিত উপমা।
এ শহরের সাহিত্যিক জলবায়ু
আর কেন্দ্রাভিমুখী মিছিলের মধ্যে,
আমি উপেক্ষার কাছ থেকে ধার করছি বেঁচে থাকার ব্যাকরণ
তিনি নির্দ্বিধায় ছড়িয়ে যাচ্ছেন ভাষার শেষ অবশিষ্ট আলো।
অথচ করতালি ও প্রতিষ্ঠার সমস্ত প্রহসন পেরিয়েও
আমরা কেউ-ই পৌঁছাতে পারছি না কবিতার প্রকৃত দরজায়।
আর অর্থ ও অনর্থের সীমারেখা জুড়ে,
ঝরে পড়ছে বর্ণমালা ও হারিয়ে যাওয়া পাঠশালা।