তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
ধারাবাহিক
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ পর্ব# ১৯
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
আরামপ্রিয় নই, অ্যালার্মপ্রিয়
সে ছিল আমাদের এক অ্যানালগ শৈশব। থার্মোমিটার, ঘড়ি, ফোন, সবই অ্যানালগ , আর এই একটি ব্যাপারে আমি ক্যাংলাস গোত্র ছাড়া। অ্যানালগে আমি বরাবরই অপারগ। জীবনে অ্যানালগ থার্মোমিটারে আমি জ্বর দেখতে পারিনি, ঘড়িতে অ্যালার্মও দিতে পারিনি। অংকে ও বিজ্ঞানে তুখোড় হয়েও। আর আমার মা হদ্দ হিউম্যানিটিজের হয়েও এইসব কাজে তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত ছিল। এমন হয়েছিল, কারো জ্বর মাপার বা ভোরে অ্যালার্ম দেবার কাজ আমার ওপর আসতে পারে- এমন ক্ষীণতম সম্ভাবনাও আমাকে সন্ত্রস্ত করে ফেলত। যখন জ্বর মাপতে অস্বীকার করতাম, লোকে যে আমাকে অমানুষ ও হৃদয়হীন ভাবত তাতে সন্দেহ নেই। তাদের কী করে বোঝাব, পারদের ওঠানামার সঙ্গে আমার চোখ কিছুতেই ওঠানামা করতে পারে না। পারদের গারদে আটক হতে তার কোন ইচ্ছেই নেই। সে স্বাধীন, সে কোথায় তাকাবে তা আমার হাতেই নেই।
অ্যালার্মের ক্ষেত্রেও সমস্যা আমার হাতের। সে প্রথমে খুঁজেই পায় না কোন নবটা অ্যালার্মের, তারপর যদি খুঁজে পায়, তবে সেটা এমন সবলে ঘোরাতে থাকে যে অচিরেই প্যাঁচ কেটে অ্যালার্ম স্তব্ধ হবার ব্যবস্থা পাকা হয়ে যায়।
এরকম শোচনীয় যখন অবস্থা তখন বাজারে এল ডিজিটাল ঘড়ি। চল্লিশ টাকায় ফুটপাথে ঢালাও বিক্রি হত। যদিও সে ঘড়ি আমি কোনদিন পরার বাসনা করিনি, ভাল লাগত না তেমন, কিন্তু জীবনে সেই প্রথম নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিঞ্চিত আশাবাদী হয়ে উঠি। মনে হয় যেদিন সব ডিজিটাল হয়ে যাবে সেদিন আমি সবকিছুই করে ফেলতে পারব। জ্বর দেখতে বা অ্যালার্ম দিতে আমার কোন অসুবিধে হবে না। আমার মতো এত উৎসাহের সঙ্গে কেউ মনে হয় ডিজিটাল যুগকে বরণ করেনি।
আর মোবাইলে অ্যালার্ম দিতে শুরু করে আমার আর থামার উপায় রইল না। সেই খাতা গল্পের উমার মতো। লিখতে শিখে সে যেমন যত্রতত্র লিখেছিল আমিও তেমনি পৃথিবীর সব ইভেন্টে অ্যালার্ম দিতে লাগলাম সংক্ষিপ্ত সাংকেতিক বাক্যে। যে সঙ্কেত পরে আমার নিজেরই উদ্ধার করা সম্ভব নয়।
সারাদিন অজস্র অ্যালার্ম আমার ফোনে সেট করা থাকে। আর তার অধিকাংশই আমি ভুলে যাই। বা কাজ হয়ে গেলে অফ করতে ভুলে যাই। প্রধান অতিথির ভাষণ দেবার সময়ে আচমকা বেজে উঠে তারা আমাকে ভয়ানক দ্বিধায় ফেলে। অনেক সময়ই সেসব নামহীন। বেনামি চিঠির মতো। তাই বুঝতেই পারি না কীসের কেন কী জন্য? কোন ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কাকে ফোন করার ছিল, কাকে ঘুম থেকে তোলার ছিল- কিছুই স্মরণে আসে না।
কিছু আবার নাম দেখেই বেশ বোঝা যায় যে আমি ঠিক কোন ব্যাপারে নিজেকে মনে করাতে চেয়েছিলাম। যেমন মুম্বাই টিকিট। মাম্পি ফেসিয়াল। লাইব্রেরি রিটার্ন। কল ডেন্টিস্ট। -এগুলো খুব সরল সোজা। পড়লেই বোঝা যায় এদের উদ্দেশ্য কী। মুম্বাই যেতে হবে। ষাট দিন আগে ট্রেনের টিকিট কাটতে হবে, তাই অ্যালার্ম দিয়ে রাখা। মাম্পি নাম্নী বিউটিসিয়ানকে কল করতে হবে , একটা ফেসিয়াল না নিলেই নয়। দাঁত থাকলেই সমস্যা , তাই ডেন্টিস্টকে দেখাতে হবে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট দরকার, লাইব্রেরির বই তিনখানা আনা যায়, পনের দিন পর ফোনে রিনিউ করা যায়, আরও পনের দিন পরে সশরীরে গিয়ে রিনিউ করতে হয়। ডেট ভুলে গেলে ফাইন জমে যায় অনেক। তা ক্যাংলাস পার্টিকে তো সেজন্য অ্যালার্ম দিয়ে রাখতেই হবে লাইব্রেরি রিনিউয়ের জন্য ।
কিন্তু কিছু কিছু অ্যালার্ম অত্যন্ত রহস্যময়, তা এতই সাংকেতিক যে যে ব্যক্তি তা রচনা করেছে, সে নিজেই মনে করতে পারে না এগুলো কী এবং কেন? সেসবের মর্মোদ্ধারের জন্য কোডিং এক্সপার্টকে ডাকতে হয় বুঝি।
ধরা যাক দুপুর ১টা ৩৯ মিনিটে হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে ওঠে পনির রুকু। আঁতকে উঠি। আমি কি কোন মাফিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি কাউকে সুপারি দেব বলে? সুপারি আমি অনেকের নামেই দিতে চাই, খুবই চাই, কিন্তু বিশ্বাস করুন এখনো অব্দি তা নিয়ে কোন উদ্যোগ নিইনি। বিখ্যাত ল্যাদেই আমার সব উদ্যম নষ্ট করেছে , আজ অব্দি কোন মাফিয়া তো দূর কোন পাপিয়ার নম্বরও জোগাড় করে হয়নি। অথচ এরকম নাম যা সোনা পাপ্পু, শ্মশান স্বপন বা হাতকাটা কার্তিকের কথা মনে পড়ায়- তা আমার ফোনে কেন? ক্রমে ক্রমে স্মরণে আসে রুকু নাম্নী কোন ভুলোমন বালিকাকে আমি পনির কেনার দায়িত্ব দিয়েছি এবং তাকে তাগাদা দিতে আমার যাতে মনে থাকে সেইজন্য ঐ অ্যালার্ম সেট করেছি। বোঝা গেল? নাহ্ এ কোন জটিল ব্যাপার নয়। তবে অনেক সরল বাক্য ভুল সময়ে এলে জটিলতা ও ধন্ধের সৃষ্টি করতে পারে বৈকি। যেমন ধরা যাক কোন সভায় ভারি বক্তিমে দিচ্ছি, তখন অ্যালার্ম বেজে উঠল ফ্রিজ চালা! ভাবা যায়!। সভাস্থলে একটা এসিই ঠিক মতো কাজ করে না, যদিও বা থাকে, সেখানে আমি একটা আস্ত ফ্রিজ কোথায় পাই? আর যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই একটা ফ্রিজ আছেই আশেপাশে, তাহলেও কি বক্তৃতা থামিয়ে সেটা চালাতে যাওয়া আমার উচিত কাজ হবে? কিন্তু এদিকে যে আমাকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে ;ফ্রিজ চালা! চালাতে যেতেও পারি না (কোথায় কতদূরে সে ফ্রিজ তা জানা নেই বলেই) এদিকে না চালালে যে ফ্রিজের অভ্যন্তরের রান্নাবান্না মাছ মাংস পচে যাবে (কারই বা রান্না কারই বা মাছ মাংস তাও জানা নেই) – এই আতান্তরে পড়ে আমার এতক্ষণ খই ফোটা মুখে কেমন যেন তালা পড়ে যায়। বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যত, কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার, নতুন পাঠক কি তৈরি হচ্ছে- সবেতেই ফ্রিজ ঢুকে পড়ে। ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায় যে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যত ফ্রিজে ঢুকে যায়, কবিতায় দেখা যায় সব চিত্রকল্পই ফ্রিজের, ভবিষ্যতের পাঠকও ফ্রিজ চালাতে গিয়ে বাংলা বই পড়ে উঠতে পারেন না। এসবই হচ্ছে মুছতে ভুলে যাওয়া অ্যালার্ম ভুল সময়ে বেজে উঠে কী কী বিপত্তি ঘটাতে পারে- তার উদাহরণ।
আর রহস্যময় সাংকেতিক অ্যালার্ম ? তাও আছে।
সকাল দশটা চারে সেট করা সাজিদ ঝিঙে ঢেড়স মিষ্টি আলু এরকম একটা। যদি কেউ উঁকি মেরে দেখেন তবে কিছুতেই ভেবে পাবেন না একটা মানুষ সাজিদ একই সঙ্গে কী করে ঝিঙে ঢেড়স এবং মিষ্টি আলু হতে পারে। আমি একটা মানুষকে এত জটিল করে দিচ্ছি কেন? সে কি আমার কোন উপন্যাসের চরিত্র যার স্প্লিট পার্সনালিটি? আসলে তা না, মানে অতটাও না, এখনো অব্দি আমাকে কোন গল্প উপন্যাসের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য মনে রাখতে অ্যালার্ম দিতে হয়নি। ওসব আমি দিব্যি মনে রাখি। এ আমার একান্তই সাংসারিক গোপন কথা। সাজিদ হচ্ছে আমাদের সব্জিওলা, যার কাছ থেকে আমাকে ঐ তিনটি সবজি নিতেই হবে। নিতেই হবে মানে নিতেই হবে।
এইরকম আর একটি অ্যালার্ম হচ্ছে ১০ টা ৫১ য় বাজা- ঘি দেওয়া। পেঁয়াজ আদা রসুন বাটা। তেল ভরা। এত অবাক হবেন না। আসলে তিনটে পৃথক কাজ তিনটি আলাদা আলাদা ব্যাক্তির জন্য- একসঙ্গে লিখে একটু ঘেঁটে দেওয়া হয়েছে।
১ মেয়ে হস্টেল যাবে, তাকে সঙ্গে ঘি দিয়ে দিতে হবে
২ গৃহ সহায়িকাকে দিয়ে পেঁয়াজ আদা রসুন বাটাতে হবে
আর ঐ তিন নম্বরটা? তেল ভরা মানে কি? আমিও উদ্ধার করতে পারি না। এতে লোকের সন্দেহ জাগতে পারে, আমি অত্যন্ত রইস ব্যক্তি, যার গাড়ি আছে, এবং যাকে গাড়ির তেল ভরার কথা মনে রাখার জন্য অ্যালার্ম দিতে হয়। বিশ্বাস করুন আমার গাড়ি তো দূরের কথা একটা স্টোভ অব্দি নেই তেল ভরার জন্যে। তাহলে আমি কেন এটা লিখেছি কিছুতেই বুঝতে পারি না। নাকি প্যাকেট কেটে শিশিতে তেল ঢালার কথা আমি বলতে চেয়েছি? ঢালা আর ভরা কি এক? ক্রমে ব্যকরণ কৌমুদীর অরণ্যে হারিয়ে যেতে থাকি।
এই অব্দি পড়েই আপনারা যথেষ্ট উত্যক্ত হয়েছেন এবং ভেবেছেন কী যাচ্ছেতাই একটি মহিলা, যাকে তেল ভরা/ঢালা র মতো তুচ্ছ বিষয়ের জন্যেও অ্যালার্ম সেট করতে হয়, একটা ঝিঙে ঢেড়স কেনার কথাও যে মনে রাখতে পারে না!
দেখুন আমি ভুলো হতে পারি, কিন্তু কুঁড়ে মানে আরামপ্রিয় নই, আমি অ্যালার্মপ্রিয়, যে যেকোন বিষয়ের জন্য অ্যালার্ম দিতে ভালবাসে এবং মনে রাখতে পারে না। এবং মনে রাখতে পারে না বলে ‘কল হারাধনবাবু’ লেখা থাকলে বিষয়টি বুঝতে সেই হারাধনবাবুকে ফোন করে বলতে পারে ‘আচ্ছা দেখলাম , আমার ফোনে আপনাকে কল করার অ্যালার্ম দেওয়া আছে, একটু বলুন না প্লিজ আপনাকে আমি খামোখা কী কারণে ফোন করতে চাইব? প্লিজ হেল্প’
বলা বাহুল্য সেই হারাধনবাবু এর পর কোনদিন আমার ফোন ধরেননি, আপনাদের কাছে এমন ফোন এলে আপনারাও এমন করবেন নিশ্চয়।
এটা যখন লিখছি তখন আচমকা অ্যালার্ম বাজে। ফোনে লেখা ভেসে ওঠে ডি থ্রি খাও! এ সেই পনির রুকুর মতোই রহস্যময় ও সন্দেহজনক। তবে কি আমি আমার নিজেরই অজান্তে দাউদের তিন নম্বরের সঙ্গে কিছু বড় চক্রান্ত সাঁটছি? কিন্তু খাও! হায় আমি কি এতই ক্ষমতাবান যে দাউদ অবতারকেও খেয়ে নিতে পারি?
তখনি হাড়ে মট করে শব্দ হয়, আর অমনি মনে পড়ে হায় আল্লা, এ যে মাসে মাসে সেবন করার ভিটামিন ডি! খেতে যাই তাহলে। হাড় একটু মজবুত হলে পরের ক্যাংলাস নিয়ে আবার আসব!