তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
ধারাবাহিক মায়াগদ্য
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ দ্বিতীয় ভাগ
পর্ব #২২
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
টাকাকড়িগুলো হাওয়া খাবে বলে
এবারের বিষয় কিন্তু সিরিয়াস, হাসির কিছুই নেই। টাকা নিয়ে কেউ হাসে? আমাদের বাঙালি বাড়িতে অন্নপ্রাশনে দেখবেন একটা ভারি বিশ্রী প্রথা আছে- টাকা আর কলম ধরা হয় বাচ্চার সামনে , মনে হয় মাটির ডেলাও থাকে, খেয়াল হচ্ছে না ঠিক। কোন নেমন্তন্নে গিয়ে খুঁটিয়ে আচার অনুষ্ঠান দেখার জন্যে যে ধীশক্তি লাগে, তা এই ক্যাংলাসের নেই, তা তো আপনারা এতদিনে জেনেই গেছেন। আমার তো ঐ টাকা আর কলমটাই মনে পড়ছে। একটা থালায় সাজিয়ে সেসব শিশুটির সামনে ধরা হয়, আর সে কী ধরবে, তার জন্যে অধীর আগ্রহে সাত গুষ্টির লোক অপেক্ষা করে। আহা বেচারা মানব শিশুটি, সে জানেই না, আজ থেকেই সে চলে আসছে জাজমেন্টাল সমাজের স্ক্যানারের সামনে। সে যাই ধরবে, তাই নিয়ে খাপ পঞ্চায়েত বসে যাবে।
টাকা ধরলে সবাই কলকলিয়ে বলে উঠবে ‘দেখলি দেখলি কী শাহেনশা ছেলে, জন্মেই কেমন টাকা চিনে ফেলেছে। ‘
(আর এরাই ছেলে/মেয়ে বড় হয়ে রোজগার না করতে পারলে ঝাঁপিয়ে পড়বে অপদার্থ বলে।
‘তা হবে না? কোন বাড়ির ছেলে দেখতে হবে না? ওর ঠাকুর্দা বরাবর ভাঁড়ার বার করে দিত নিজের হাতে, রোজ একটা করে আলু দশ জনের পরিবারে। আর মাংস দুশো গ্রামের বেশি আসেনি কোনদিন’
‘আর সেই ডিমের কেসটা বল? ওর ঠাকুমা বাড়িতে গেস্ট এলে সুতো দিয়ে ডিম সেদ্ধ ভাগ করত বরাবর। মাঝে মাঝে সুতো চাইতে আসত কিনা আমার ঠাকমার কাছে, তাই জানি’
আরেকজনের অমনি মনে পড়বে একটা প্রাসঙ্গিক গল্প। কবে এক গাঁয়ের কৃপণ পাশের গাঁয়ের কৃপণের খ্যাতি শুনে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, সেই সময় সেই মহদাশয় ব্যক্তি বাড়ি ছিল না, তার মেয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করেছিল। বাড়ি ফিরে সে বৃত্তান্ত শুনে লোকটা মেয়েকে বলে ‘ভাল করে খাতির করেছিলি তো অতিথিকে?’ মেয়েটি বলে সে হাওয়ায় আঙুল ঘুরিয়ে রসগোল্লা এঁকে বলেছে ‘নিন আপনি রসগোল্লা খান।‘ সেই শুনে লোকটি রেগে মেয়ের গালে ঠাস করে এক চড় কষিয়ে দ্যায়। মেয়ে তো হতভম্ব ! সে তো আর সত্যি রসগোল্লা খাওয়ায় নি। তার বাবা এদিকে রেগে কাঁই’ তুই আমার নাম ডোবাবি দেখছি! অত বড় করে রসগোল্লা আঁকলি কেন?’
এই গল্প বলে সে এই শিশুটির বাড়ির কৃপণতার কথা আর একটু বিশদে বলতে যাবে, ততক্ষণে হয়তো শিশুটি কলম ধরে ফেলেছে । তখন সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে ‘হাউ সুইট! দেখ দেখ কলম ধরেছে ! পণ্ডিতের বংশ কিনা’
আবার কেউ কেউ বলবে ‘ সেই কলম পেষা কেরানির লাইফ বাছলি বাপধন’
শিশুটি যদি শিশু না হইত তবে কিছুই ধরিত না। কিন্তু কলম ধরলে এত আদিখ্যেতার কী আছে তাও বুঝি না। যখন পৃথিবীটা কার বশ? জপে যেতেই হবে, তখন টাকাকড়ি নিয়ে এত হতচ্ছেদ্দা কি ভালো?
কয়েকদিন আগে বেশ কৌতুককর এক ঘটনা ঘটল। হয়েছে কি, বহু বছর সালোয়ার কামিজ বানাই নি, রেডিমেডেই চলে যায়। সম্প্রতি এক উপহার পাওয়া পিস বানাতে দিলাম, আর বানিয়ে আসার পর সবিস্ময়ে দেখলাম সালোয়ারের পকেট বানিয়ে দিয়েছেন টেলর। মাপ দেবার সময় পুট কত, গলা কত ইত্যাদি আমার কাছে জানতে চাইলেও পকেটের ব্যাপারে কিন্তু টেলর কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। এটা বাই ডিফল্ট করে দিয়েছেন। সারা বালিকাবেলা যখন লেডিজ ওনের কাকুর বানানো চুড়িদার পরেছি, তখন এ বস্তুটি মেয়েদের সালোয়ারে কক্ষনও দেখিনি। ছোট্ট একটি পকেট, কত কী যে বলে দিল। মেয়েরা অর্থনৈতিক জীব তাহলে এতদিনে! তাদের টাকাকড়ি রাখার জন্য পকেট লাগে। পকেট বা জেব এবং পয়সা এতকাল এসব তো পুরুষের কুক্ষিগত ছিল। শাড়ির পকেট নেই বলে কম হাসি ঠাট্টা হয়নি। মেয়েদের ছিল রুমালে বাঁধা পয়সা, কিংবা ছোট্ট বটুয়া যা আবার মেয়েরা ব্লাউজের মধ্যে লুকিয়ে বাসে ট্রামে চড়ত, সবার সামনে কী করে বার করে যে এরা- ভেবে কতদিন অস্বস্তিতে পড়েছি। দূরে কোথাও বেড়াতে যেতে হলে পেটিকোটের কোমরে একটা গোপন কুঠুরি বানিয়ে নিতেন অনেকেই। কিন্তু না, সালোয়ারের পকেট কোনদিন আমার চোখে পড়েনি। এই ছোট ছোট জিনিসগুলিই বলে দেয় সমাজ পাল্টাচ্ছে।
ধনী সুখে করে ধর্মকর্ম
গরিবের পড়ে মাথার ঘর্ম।
তুমি রানী, আছে টাকা শত শত,
খেলাছলে কর দান ধ্যান ব্রত–
তোমার তো শুধু হুকুম মাত্র,
খাটুনি আমারি দিবসরাত্র।
তবুও তোমারি সুযশ, পুণ্য–
আমার কপালে সকলি শূন্য।
একটা সময় ছিল সকাল থেকে রাত অবদি এটাই বলে চলতাম। ক্লাস এইটে পড়তে একবার নাটকের ভূত মাথায় চেপেছিল। মেয়েদের স্কুল। তাই নাটক করার জন্য বাছলাম লক্ষ্মীর পরীক্ষা। অনেক রোল আছে। মূলভূমিকা ক্ষীরির আর আছেন রানী কল্যাণী, একদম শেষে লক্ষ্মীর প্রবেশ। সেটা সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ রোল, ধনের দেবী- এইসব জপিয়ে জপিয়ে সুন্দরী সহপাঠিনীদের রিহার্সাল করানো হচ্ছিল। কিন্তু কেন জানি না, একদিন দুদিন রিহার্সাল দিয়েই তারা বেঁকে বসছিল। আবার নতুন লক্ষ্মী, আবার তাদের নিয়ে মহড়া, আবার লক্ষ্মীর পলায়ন। আজ মনে হচ্ছে, লক্ষ্মী না জোটার জন্যেই সে নাটক আর কোনদিন মঞ্চস্থ হতে পারেনি। নাটক না হলেও একটা বড় শিক্ষা পেলাম যে লক্ষ্মী চঞ্চলা, বিশেষ করে আমার কপালে।
এর আগে বাবা কতবার ‘পুরস্কার’ কবিতাটি পড়ে শুনিয়েছেন। যেখানে ভাঙ্গা ঘরে জগত বিস্মৃত হয়ে কবিতা লিখছেন কবি আর কবিপত্নী ঝংকার দিয়ে বলছেন ‘ভারতীরে ছাড়ি করো এইবেলা লক্ষ্মীর উপাসনা’ দীর্ঘ এই কবিতাটি পড়তে পড়তে বাবার গলা বুজে আসত, আর আমার চোখ ঝাপসা হত, এমনকি শেষ পঙক্তিতে এসে,
‘বাঁধা পল এক মাল্য বাঁধনে
লক্ষ্মী সরস্বতী’
তখন কবি ও কবিপত্নীর প্রেম ছাপিয়ে আমার কাছে বড় হয়ে উঠত লক্ষ্মী আর সরস্বতী এক জায়গায় বাঁধা পড়েন কিনা এই প্রশ্ন। কী অদ্ভুত ভাবে সারা জীবন এই প্রশ্নেই দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। আর কবিপত্নী হব না এ তো বালিকা বেলাতেই ঠিক করা ছিল, তাই যাবতীয় গঞ্জনা নিজেকেই দিয়ে থাকি। কিন্তু বালিকাবেলায় এই না হওয়া নাটকটি কিন্তু আরো একটি জরুরি শিক্ষা দিয়ে গেছে। যখন রানির অনুগ্রহ প্রত্যাশী অনেকগুলি নারী নিজেদের মধ্যে রানির অবিবেচনার কথা আলোচনা করছিল-
‘না না, তাই বলি হও-নাকো দাতা–
তা বলে খাবে কি বুদ্ধির মাথা?
যত রাজ্যের দুঃখী কাঙাল
যত উড়ে মেড়ো খোট্টা বাঙাল
কানা খোঁড়া নুলো যে আসে মরতে
বাচ-বিচার কি হবে না করতে?
তৃতীয়া।
দেখ্-না ভাই, সে গোপালের মাকে
দু টাকা দিলেই খেয়ে পরে থাকে,
পাঁচ টাকা তার মাসে বরাদ্দ–
এ যে মিছিমিছি টাকার শ্রাদ্ধ।‘
তখন সার কথা বলেছিল
চতুর্থ নারীটি-
‘আসল কথা কি, ভালো নয় থাকা
মেয়েমান্ষের এতগুলো টাকা’
শাড়িগুলি তারা উনানে বিছায় হাঁড়ি গুলো রাখে আলনায়
কোন দোষ পাছে ধরে নিন্দুকে নিজে থাকা তারা লোহা সিন্দুকে
টাকাকড়ি গুলি হাওয়া খাবে বলে রেখে দেয় খোলা জানলায়
লীলা মজুমদারের খেরোর খাতায় জেঠাইমার অর্থনীতির জ্ঞান বেশ গোলমেলে ছিল। আলু কম দামে কিনতে গাড়ির তেল পুড়িয়ে দূরের বাজারে গিয়ে বেশি দামে একগাদা আলু কিনে আনেন, আবার গরুর দুধ জ্বাল দেবার সময় জল ঢেলে গেরস্তর সাশ্রয়ের কথা ভাবেন। একই রকম অর্থনীতির জ্ঞান দেখেছি আমার মায়ের। ছানা কাটার জল না ফেলে ঐ জল দিয়ে চরম টক ছানার ডালনা রেঁধে সাশ্রয় করা আমার মাতৃদেবীকে জপিয়ে আবার অনেক জীবনে স্কুলের মুখ না দেখা জনগণ স্কুলের বই কেনার টাকা নিয়ে যেত অনায়াসে। যাকে বলা যায় ব্জ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো। কিংবা বলা যায় -কড়িতে কড়া, কাহনে কানা / বুড়িতে চতুর কাহনে কানা।
সেই মাকে পরে, অনেক উপকৃতর কৃতঘ্নতা দেখে বলতে শুনেছি জীবনে শেষ পর্যন্ত নগদ টাকা সত্যি আর হরিনাম সত্যি।
তা সেই জ্ঞান যদি মরার সময়ে না হয়ে শিশুকালেই হয়ে যায়, তাতে কার পাকা ধানে মই দেওয়া হল, ক্যাংলাস মাথায় ঢোকে না বাপু!
1 Comment
মনে পড়ল পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের সেই দৃশ্যটি, হরিহর হন্যে হয়ে ঘুরছে। দশঘরায় মন্ত্রদান হল না। ঐ চিঠি পড়ে ক্যামেরা সর্বজয়ার মলিন মুখের মাধুরীকে উপস্থিত করে, আর তখন এক ভিখারি গান ধরে:
দয়া কর নিজগুণে
আমি পাই যদি মার অভয় চরণ
রাখব হৃদি পদ্মাসনে
কাজ কী মা সামান্য ধনে
কলম ধরলে যে বিদ্বান হয় না, ক্যাংলাসরা জানে। এই পর্বে অনেক শিক্ষে আছে 🙏