Email: editors.kokshopoth@gmail.com
September 25, 2026
Kokshopoth

অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৬

Sep 25, 2026

তিস্তা-র ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৬

তিস্তার  নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘
এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এবং হচ্ছেনও না। উপভোগ করছেন। এ’টুকুই আমাদের প্রাপ্তি।  

গাছ

 

বাবা গাছটাকে প্রতিদিন নিয়ম করে জল দিত। 

গাছ বলতে বারান্দার কোণে রাখা একটা মানিপ্ল্যান্ট। সিমেন্টের টবে লাগানো। টবটার রং একসময় সাদা ছিল। বছরের পর বছর রোদে-জলে এখন ধূসর হয়ে গেছে। গায়ে কয়েকটা সরু চিড় ধরা দাগ। গাছের পাতাগুলো খুব ঘন নয়। দু-একটা লতা টবের কিনারা ছাড়িয়ে নেমে এসেছে।

বাবা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে বারান্দায় যেত। তারপর একটা পুরনো প্লাস্টিকের বোতলে জল নিয়ে গাছটার গোড়ায় ঢেলে দিত। আমি দেখতাম, কতখানি নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে গাছটায় রোজ জল দিত বাবা।  

বাবা এমনিতেই কিছু কাজ খুব নিয়ম করে করত। সকাল সাতটায় খবরের কাগজ পড়া। আটটায় এক কাপ চা। ন’টায় ব্রেকফাস্ট সেরে সুগারের ওষুধ খাওয়া। দুপুরে খাওয়ার পর ঘড়ি ধরে আধা ঘণ্টা শুয়ে নেওয়া। বিকেলে বারান্দায় পুরোনো বেতের চেয়ারটায় বসা। রাতে সোফায় বসে টিভিতে একের পর এক খবরের চ্যানেল দেখা। ​গাছে জল দেওয়াটাও সম্ভবত সেই তালিকারই একটা কাজ ছিল।   

মানুষ জীবনের অস্থিরতা কাটাতে বোধহয় কিছু নিজস্ব অভ্যাসের খাঁচা তৈরি করে নেয়। বাবাকে দেখে সবসময় মনে হতো, ওই বাঁধাধরা নিয়মগুলোই তাকে চারপাশের কোলাহল থেকে আগলে রাখত। সেই নিয়মের শিকড়গুলো যে গাছটার মতোই গভীর, তা আগে কখনো বুঝতে পারিনি।

বাবা মারা যাওয়ার পর প্রথম কয়েকদিন গাছটার কথা আমার মাথায় আসেনি। তখন এত কিছু করার ছিল। আত্মীয়স্বজন। ফোন। কাগজপত্র। শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা। বাজার। পুরোহিত। তারপর সবাই চলে গেল। বাড়িটা একটু স্বাভাবিক হওয়ার পর এক সকালে বারান্দায় গিয়ে দেখি, মানিপ্ল্যান্টটার টবের মাটি একেবারে শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। টবের গায়ে লালচে ধুলো জমেছে। মনে পড়ল— বাবা নেই।

রান্নাঘর থেকে একটা বোতল নিয়ে এলাম। জল ভরে গাছটার গোড়ায় ঢাললাম। প্রথম দিন নিজের অজান্তেই একটু বেশি জল দিয়ে ফেলেছিলাম। টব ছাপিয়ে জল বারান্দার মেঝেতে গড়িয়ে গেল।

পরদিন সকালে শুকিয়ে যাওয়া মেঝের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আসলে গাছে জল দেওয়ারও একটা নিজস্ব ছন্দ আছে। এরপর থেকে প্রতিদিন সকালে গাছটায় জল দিতে দিতে আমিও সেই ছন্দ রপ্ত করে ফেললাম। কাজটা করতে খুব বেশি সময় লাগে না। বোতল ভরতে এক-আধ মিনিট। বারান্দায় যেতে আরও কয়েক সেকেন্ড। তারপর জলটুকু ঢেলে দেওয়া। 

 

কিন্তু প্রতিদিন ধারাবাহিক ভাবে কয়েক সেকেন্ডের এই ছোট কাজটার মধ্যে দিয়ে, আমার সঙ্গে বাবার অদ্ভুত একটা সাঁকো তৈরি হয়ে গেল! এখন সেটা আমি করি, যে কাজটা এতদিন বাবা করত। একদিন জল দিতে দিতে হঠাৎ একলা দাঁড়িয়ে মনে হলো— গাছটা তো কিছুই জানে না। সে জানে না আগের মানুষটি কে ছিল। সে জানে না, যে হাতটা প্রতিদিন তার গোড়ায় জল ঢালত, সেই হাত এখন আর আসবে না। সে জানে না মৃত্যুর কথা। জানে না শোকের কথা। জানে না উত্তরাধিকার। তার কাছে শুধু জল। আজ জল এল। কালও হয়তো আসবে। কে সেই জলটুকু নিয়ে এল, সেটা তার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়। ​এই কথাটা ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে তার সবুজ পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

মানুষের কত হিসেব। কে কী করেছিল। কে কখন এসেছিল। কে শেষবার ফোন করেছিল। কে পাশে ছিল। কে ছিল না। কে কাকে ক্ষমা করেছিল। কে করেনি। একজন মানুষ চলে গেলে তার কাজগুলোও যেন সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস হয়ে যায়।

‘বাবা এই গাছটায় প্রতিদিন জল দিত’— এখন এই বাক্যটা আমার কাছে এক তীব্র, অবোধ্য স্মৃতি। ​কিন্তু গাছটার কাছে এটা কোনো স্মৃতিই নয়। তার কোনো ডায়েরি নেই। তার শুধু প্রতিদিন জল পাওয়া নিয়ে কথা। আমি নিজের মনেই একটু অবাক হলাম।

আমরা মানুষই বোধহয় কাজের সঙ্গে মানুষটাকেও বেঁধে রাখি। বাবা প্রতিদিন জল দিত বলেই আমি অবলীলায় গাছটাকে বাবার স্মৃতির সঙ্গে পুরোপুরি জুড়ে ফেলেছি। ​বাবা আজ নেই বলেই গাছটার দিকে তাকালেই প্রতিবার বাবার মুখটা আমার বুকের ভেতরে ভেসে ওঠে। কিন্তু গাছটার কোনো অতীত নেই, কোনো শোক নেই। এতে গাছটার কোনো নিষ্ঠুরতা নেই, অকৃতজ্ঞতাও নেই। ​বরঞ্চ এই শান্ত উদাসীনতাই তার সবচেয়ে বড় স্বাভাবিকতা। ​সে শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে নিরাসক্তভাবে জলটুকু শুষে নেয়। ​তারপর তার সবুজ পাতায় নতুন জীবনের আলো আসে।     

এক সকালে গাছে জল দিতে গিয়ে দেখি, একদম গোড়ার দিকে লতার খাঁজে নতুন একটা পাতা বেরিয়েছে। খুব ছোট। কাঁচা সবুজ রং। মোড়ানো। আগে কোনোদিন হয়তো খেয়ালই করিনি। আমি পাতাটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হল, বাবাকে এই খবরটা দিলে কী বলত? ​তারপর পরমুহূর্তেই নিজের এই বোকা ভাবনার উপর আমার নিজেরই একটু বিরক্তি হলো।

আমরা মানুষরা ভারি অদ্ভুত! প্রিয় মানুষটা আর নেই— এই নির্মম সত্যিটা স্পষ্ট জানার পরেও কত বছর ধরে মনে মনে তাকে জীবনের কতশত খবর দিতে থাকি…!

‘জানো, আজ গাছে নতুন একটা সবুজ পাতা এসেছে।’ 

‘আজ অফিসে বড্ড দেরি হয়ে গেল।’

‘আজ বিকেল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।’

‘আজ বাজারে দারুণ ইলিশ মাছ উঠেছে।’

‘মেজোকাকু ফোন করেছিল আজ।’

​        আমরা জানি এই কথাগুলো কোথাও পৌঁছয় না। শূন্যতায় হারিয়ে যায়। তবু সেই শূন্যতার সঙ্গেই রোজ কথা বলে চলি। রোজ তার রুচি ও পছন্দগুলোকে খুঁজে ফিরি বাড়ির আনাচে-কানাচে… মনের অলিতে গলিতে…! হয়তো অভ্যাসেরও একটা পরজীবন আছে।    

কয়েকদিন পরে টবটা একটু সরিয়ে বারান্দার অন্যদিকে রাখলাম। সেখানে সকালে বেশি আলো আসে। গাছটা একটু একটু করে সেইদিকে বাড়ছে। বুঝলাম, গাছেরও নিজের দিকে যাওয়ার একটা নিজস্ব গতি আছে। আমরা শুধু জল দিই। বাকি কাজটা সে নিজেই করে।    

কয়েক সপ্তাহ পর মনে হল, বাবা থাকলে গাছটাকে এতদিনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো বড় টবে লাগিয়ে দিত। ​পুরোনো সিমেন্টের টবটা বড্ড ছোট হয়ে গেছে। ​ভেতরে এর শিকড়গুলো কতদূর ছড়িয়ে গেছে কে জানে। নিশ্চয়ই দমবন্ধ হয়ে আসছে। ​বাবা এসব জিনিস খুব খুঁটিয়ে খেয়াল করত। ঘরের ছোটখাটো খুঁত বাবার চোখে পড়ত। ​আমি এসব সাধারণত খেয়াল করি না। অফিসে যাই, ফিরি, নিজের মতো থাকি। ​আমি শুধু নিয়ম মেনে জলটুকু দিই। 

তবু একদিন ছুটির দুপুরে বাজার থেকে একটা বড় মাটির টব আর কিছুটা সার মেশানো মাটি কিনে নিয়ে এলাম। কেন কিনলাম, সত্যি জানি না। হয়তো বাবার কোনো একটা অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য। কিংবা হয়তো নিজের অজান্তেই আমিও বাবার মতো করে ভাবতে শুরু করেছি। খেয়ালই করিনি, কখন যেন বাবার চোখ দিয়েই বারান্দার এই ছোট্ট পৃথিবীটাকে দেখতে শুরু করেছি। 

গাছটা পুরোনো টব থেকে সাবধানে নতুন টবে বসালাম। শিকড়গুলো টবের তলা থেকে খুব সাবধানে, ধীরে ধীরে উপড়ে তুলবার সময় মনে হচ্ছিল, একটু অসাবধান হলে বা টান লাগলে শিকড় ছিঁড়ে গাছটা হয়তো মরেই যাবে। শিকড় ছেঁড়ার ভয়টা আসলে গাছের চেয়ে আমারই বেশি ছিল। 

কাজটা শেষ করে হাত ধুয়ে বারান্দায় বসে রইলাম। হঠাৎ মনে হল, বাবাও তো একদিন এই গাছটাকে অন্য কোনো জায়গা থেকে এনে এই টবেই বসিয়েছিল। কোনো নার্সারি থেকে নাকি কোনো বন্ধুর বাড়ি থেকে গাছটা এনেছিল, আমার মনে নেই। কত বছর আগে, সেটাও আমার স্পষ্ট মনে নেই। শুধু এটুকু জানি— একটা সময় বাবা ছিল, এই গাছে নিয়মিত জল দিত। ​এখন আমি আছি, আমি জল দিই। ​গাছটা তার নিজের নিয়মেই একটু একটু করে বড় হচ্ছে। এই বদলটা শুধু আমার কাছে বড়। গাছটার কাছে নয়। গাছটার কাছে এর কোনো মূল্যই নেই। ​সে জল পেয়েছে। ​এইটুকুই তার কাছে পরম সত্য।

মানুষই শুধু হাত বদলের ইতিহাস মনে রাখে। গাছ রাখে না। তাই হয়তো গাছ এত সহজে বেঁচে থাকতে পারে। তার কাছে কেউ চলে যাওয়া মানে অন্য কারও আসা নয়। কোনো উত্তরাধিকার নয়। কোনো স্মৃতিফলক নয়। তার কাছে শুধু একটা নতুন সকাল। আর একটু জল। আমি বোতলটা বারান্দার কোণে রেখে দিলাম। পরদিন সকালে আবার জল দিতে হবে।

বাবা নেই।

গাছ আছে।

আমি আছি।

এই তিনটি সহজ কথার মধ্যে কোনটা বেশি স্থায়ী আর কোনটা সাময়িক, সেটা আমি আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

তবে পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে দেখলাম— নতুন ছোট পাতাটা গতকালের চেয়ে আরও একটু মেলে ধরেছে নিজেকে। আর তার পাশেই আর একটা নতুন কচিপাতা। 

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *