Email: info@kokshopoth.com
July 3, 2026
Kokshopoth

সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা

Jul 3, 2026

সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা
পর্ব# ৭

সাম্য রাইয়ানের জন্ম বাঙলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায়। ২০০৬ থেকে সম্পাদনা করছেন শিল্প-সাহিত্যের অন্যতর লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু। কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছেন নতুন ধরনের আখ্যানধর্মী গদ্য৷

সাম্য রাইয়ানকে নিয়ে ভারতের  সাহিত্য পত্রিকা ‘তারারা’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মনমানচিত্র’, ভারতের ‘এবং পত্রিকা’ তাকে নিয়ে বিশেষ একক সংখ্যা ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘নিসর্গ’ বিশেষ মূল্যায়ন (ক্রোড়পত্র) প্রকাশ করেছে৷ ভারতের নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার সাম্য রাইয়ান প্রসঙ্গে ‘সাম্যপুরাণ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট [গদ্য, ২০১৪]; বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা [কবিতা, ২০১৫]; মার্কস যদি জানতেন [কবিতা, ২০১৮]; হলুদ পাহাড় [কবিতা, ২০১৯]; চোখের ভেতরে হামিং বার্ড [কবিতা, ২০২০]; লোকাল ট্রেনের জার্নাল [গদ্য, ২০২১]; লিখিত রাত্রি [কবিতা, ২০২২] ও হালকা রোদের দুপুর [কবিতা, ২০২৩]; জলের অপেরা [কবিতা, ২০২৪]; সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের [উপন্যাস, ২০২৫]৷ সম্পাদিত গ্রন্থ: উৎপলকুমার বসু [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২২]; জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধ সংকলন, ২০২৩]; শম্ভু রক্ষিত: পাঠ ও বিবেচনা [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২৫]।

সুবিমল মিশ্রের গরু ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব

 

“যখন দেশে ওষুধের কারখানা দরকার তখন সেখানে বেশি বেশি কসমেটিকস তৈরির জন্য মন্ত্রীদের গরুরাই উদ্বুদ্ধ করে, মানুষকে অভুক্ত রেখে মারণাস্ত্র বানাবার পরামর্শ গরুরাই দিয়ে থাকে।” সুবিমল মিশ্রের লেখা এই একটা বাক্যই প্রচলিত রাষ্ট্রচিন্তা পদ্ধতি উল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমান বাস্তবতায় যা আর সুররিয়াল নেই, ডার্ক রিয়েলিটি হয়ে গেছে।

 

‘গরু এক ধরনের চতুষ্কোণ প্রাণী’ গল্পে সুবিমল মিশ্র যে গরুর কথা লিখেছিলেন, সেটা অভিধানের গরু নয়। যেমন অরওয়েলের শূকর নিয়ে লেখা আসলে শূকর নিয়ে নয়। কাফকার পোকাও পোকা নয়। গরুকে আমরা জানি তৃণভোজী, কালারব্লাইন্ড। কিন্তু সুবিমল বলছেন, না, “লুকিয়ে লুকিয়ে এরা খবরের কাগজ বা সংবিধানের দুমড়ানো পাতা চিবোতে ভালোবাসে।” আমি এই লাইনটা পড়ে হেসেছি। কিন্তু বাস্তবতা আতঙ্কের। যে ক্ষমতা সংবাদপত্র খেয়ে ফেলে, সংবিধান খেয়ে ফেলে, ভাষা খেয়ে ফেলে, সে শেষ পর্যন্ত মানুষকেও খেয়ে ফেলে।

 

মহৎ সাহিত্য কখনো অভিধানের সংজ্ঞায় আটকে থাকে না। তেমনটা হলে মহাভারত হতো একটা পারিবারিক মামলা, কাফকা হতেন পোকামাকড়বিজ্ঞানী, আর অরওয়েল পশুপালন বিভাগের কর্মচারী। গরু আসলে একধরনের রাজনৈতিক প্রাণী। দুই পা থাকলেও গরু। চার পা থাকলেও গরু। স্যুট পরলেও গরু। ইউনিফর্ম পরলেও গরু। কখনো ভোট চায়, কখনো ট্যাঙ্ক চালায়। সুবিমল এই কথাটাই লিখেছিলেন। ১৯৭৭ সালে। আধা শতাব্দী আগে লিখিত গল্প, অথচ কত জীবন্ত, যেন মাত্রই লেখা হয়েছে।

 

“মানুষকে অভুক্ত রেখে মারণাস্ত্র বানাবার পরামর্শ গরুরাই দিয়ে থাকে।” কী আশ্চর্য! পৃথিবীর নানা দেশে সময় সময় এমন নেতাদের দেখা যায়, যারা নাগরিককে বলেন, আরও একটু কষ্ট করুন, একটু কম খান, একটু বেশি সহ্য করুন, কিন্তু আরেকটু বেশি কর দিন, আমরা প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াবো।

 

আমি প্রতিরক্ষার বিরোধী নই। রাষ্ট্রের অস্ত্র থাকবে। সীমান্তও থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে জনগণের পেটের নিরাপত্তা নাই, তার কাছে সীমান্ত আর সিংহাসনের প্রতিরক্ষার গুরুত্ব কতটুকু?

 

ক্ষমতাসীনরা তখন ক্ষুধার সংজ্ঞা পাল্টে দেয়।অনাহার হয়ে যায় জাতীয় আত্মত্যাগ। মৃত্যু হয়ে ওঠে সম্মানজনক ক্ষতি। ভাষার ওপর দখল মানে মানুষের মস্তিষ্কের ওপর দখল। তাই সুবিমল গরুদের দিয়ে প্রথমেই কাগজ আর সংবিধান চিবিয়েছেন। খুব সচেতনভাবে।

 

মাঝে মাঝে দেখি, কোনো কোনো নেতা খুব সহজ গলায় বলেন, মানুষ একবেলা না খেলেও চলবে, কিন্তু অস্ত্র চাই। শুনে আমার সুবিমলের গরুগুলোর কথা মনে পড়ে। তারা মানুষকে না খাইয়ে মারণাস্ত্র বানানোর পরামর্শ দিত।

 

যে কোনোদিন না খেয়ে থাকেনি, তার কাছে অনাহার রোম্যান্টিক হতে পারে। যার ফ্রিজভর্তি খাবার আছে, সে দেয় ত্যাগের বক্তৃতা। বুর্জোয়াদের যুদ্ধে সর্বদা দেখবেন, রক্ত দেয় গরিবেরা, সিদ্ধান্ত নেয় ধনীরা। কামান টানে কৃষকের ছেলে। মন্ত্রী হয় ধনীর দুলাল।

 

সুবিমল আরও লিখছেন, “গরু পরমত আদৌ সহ্য করেনা।” এই একটা বাক্যের ভেতরে সংসদ, টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়— স-ব ঢুকে গেছে। আমি যা বলছি তাই ঠিক। বাকিরা দেশদ্রোহী। এই যুক্তি নতুন নয়। একসময় ধর্মের নামে হয়েছে। একসময় জাতির নামে। এখন নিরাপত্তার নামে। কাল অন্য কোনো নামে হবে। গল্পে আছে, “এরা বলে ‘যা আমি বলছি তাই ঠিক এবং তাই তোমাকে করতে হবে।’ গরুর জগতে প্রশ্ন করা সবসময়ই বারণ।”

 

ক্ষুধার্ত মানুষকে যদি বলা যায়, তোমার অনাহার একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব, তাহলে সে নিজের ক্ষুধার সাথে আপস করতে শুরু করে। এ এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো মানুষকে তার নিজের যন্ত্রণা নিয়েও অপরাধবোধে ভোগানো।

 

সুবিমল লিখছেন, “গরুরা অবশ্যই জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে অথবা ইচ্ছে করলে যখন তখন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর সামর্থ রাখে।” যখন কেউ ভাবতে ভয় পায়, তখনই আসল জরুরি অবস্থা। যখন কেউ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, তখনই প্রকৃত কারফিউ। যখন সবাই একই বাক্য মুখস্থ বলতে শুরু করে, তখনই ক্যাপিটালিজমের অভ্যুত্থান সফল হয়।

 

আরেকটা জায়গা দেখুন। “গরুরা একটা বিষয়ে খুব সজাগ। তাদের মধ্যে কেউ বই পড়লে বা অন্যরকম ভাবনাচিন্তা করলে তাদের বিপজ্জনক বলে ঘোষণা করা হয়।” ক্ষমতার কাছে বই বিপজ্জনক। কবি বিপজ্জনক। বিশ্ববিদ্যালয় বিপজ্জনক। ক্ষুধার্ত মানুষের চেয়েও বিপজ্জনক চিন্তাশীল মানুষ। কারণ ক্ষুধার্ত মানুষ ভাত চায়। চিন্তাশীল মানুষ জানতে চায়, ভাত গেল কোথায়? এই প্রশ্নটাই বিপজ্জনক। তাই বই নিষিদ্ধ হয়। শিক্ষক সন্দেহভাজন হয়। কবি রাষ্ট্রদ্রোহী হয়। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে অদক্ষ কেরানী তৈরির কারখানা।

 

সুবিমল লিখছেন, “গরুর পেটে শুধু নাড়িভুঁড়ি থাকেনা, থাকে সব রকমের খচড়ামি বুদ্ধি।” এই লাইনটা অসাধারণ। ক্ষমতার বুদ্ধি সবসময় জটিল হয় না। অনেক সময় শিশুসুলভ। শুধু একটা হিসাব জানে—মানুষকে ভয় দেখাও। ভয় পেলে সে প্রশ্ন করবে না। ভয় পেলে সে অধিকার ভুলে যাবে। ভয় পেলে সে ক্ষুধাকেও ভাগ্য বলে মেনে নেবে।

 

গল্পের শেষ বাক্যটা আশাজাগানিয়া। “তবে একথা ঠিক যে গরুদের মুক্তির উপায় একদিন গরুরা নিজেরাই ঠিক করবে।” মুক্তি বাইরে থেকে আসে না। মানুষ যদি একদিন বলে, আমার সন্তান না খেয়ে থাকবে না, হাসপাতাল ওষুধহীন থাকবে না, শিক্ষা ভিক্ষা করবে না, তারপর যা অস্ত্র বানানোর বানাও, তখনই গরুর রাজত্বে ফাটল ধরবে। আর সেইদিন রাষ্ট্র জনগণকে একথা বলতে সাহস পাবে না যে, তুমি আজ একবেলা না খেয়ে থাকো, আমি ততক্ষণে আরও কিছু অস্ত্র বানিয়ে নিই।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *