Email: info@kokshopoth.com
July 1, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ

Jun 26, 2026

ধারাবাহিক
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ পর্ব# ১৬

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

 

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

হারজিত

 

আজ থেকে প্রায় আট দশক আগের দক্ষিণ ২৪ পরগণার এক গ্রাম। বংকিমচন্দ্র একবার ঈশ্বর গুপ্তের গ্রামের কথা লিখতে গিয়ে বলেছিলেন ‘সে গ্রাম আর নাই। আর হইয়াও কাজ নাই’ এও সেরকম একটি গ্রাম।  বিনোদনের ব্যবস্থা এখনকার তুলনায় অন্য রকম। যাত্রা কবিগান চৈত্র গাজন এসব আছেই,  আবার যোগ হয়েছে ফুটবল খেলা। গ্রামে দস্তুরমত একটা ফুটবল দল তৈরি হয়ে গেছে, তারা আবার অন্য গ্রামে ম্যাচ খেলার ডাকও পায়।

আমার বাবা জন্মাবধি পেপটিক আলসারের রুগী। কবিরাজের স্বর্ণভস্ম, মুক্তাভস্ম  খেয়ে খেয়ে হদ্দ। শিবের দোর ধরে প্রাণ বেঁচেছে এমনটাই সবার বিশ্বাস, বোলসিদ্ধির পাতালফোঁড়া শিব, যার নাকি বোল বা বাক সিদ্ধ। সেই থেকেই গ্রামের নাম বোলসিদ্ধি। তাই বোধহয়, গ্রামের আর কিছু না থাক, সবার বাক্যির জোর খুব আছে।

ডিগডিগে রোগা ছেলেটির দুধ খাওয়া বারণ আর তাই স্বাভাবিকভাবেই  দুধে তার মারাত্মক আসক্তি। তার মা, মানে আমার না দেখা ঠাকুমা রান্নাঘরে তালা লাগিয়ে দুপুরে ঘুমোতে যান, কারণ আগল খোলা পেলেই সে বালক নিভন্ত আঁচে উনুনে বসানো রাক্ষুসে কড়াইয়ে ক্ষীরের মতো ঘন হয়ে আসা দুধ, দুধের সর মেরে দ্যায় চুরি করে। দরজায় তালা লাগার পরেও সে হার মানে না, বরং নেসেসিটি ইজ দা মাদার অব ইনভেনশন- দরজা দিয়ে ঢুকতে বাধা পেয়ে  তার বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনী প্রতিভার বিকাশ হয়। সে পেঁপের নল জানলার শিক দিয়ে গলিয়ে কড়াই থেকে চোঁ চোঁ করে দুধ টানতে থাকে মহানন্দে আর এর ফলে   পরের দিনই তার যায় যায় অবস্থা হয়। সেরে উঠে আবার যে কে সেই। সেই যে কথায় আছে না, চেপে ধরলে চিঁ চিঁ করে, ছেড়ে দিলে লাফিয়ে বেড়ায়!

 

এহেন হাড়জিরজিরে ছেলেকে কেউ খেলায় নেবে না বলাই বাহুল্য। কিন্তু তার আবার ফুটবল প্রীতি প্রবল।  নেই আঁকড়ের মতো লেগে থাকতে থাকতে দলের ক্যাপ্টেন তাকে দলে নিয়েই নেয়, কেন কে জানে।  সুস্থ থাকলে সে  খেলার নামে মাঠে গিয়ে  কাদা মেখে ভূত হয়ে বাড়ি ফেরে। তার ওপর ‘তুই তো বেশি ছোটাছুটি করতে পারবি না’ বলায় সে বলে ‘আমাকে তাহলে গোলকিপার করে দাও, একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকব।‘ এতেই বোঝা যায় সেইসময় গোলকিপারের গুরুত্ব তেমন ছিল না । এর প্রমাণ পাবেন ধন্যি মেয়ে সিনেমায়।

 

একবার দল দূরের এক গ্রামে ম্যাচ খেলার ডাক পেয়েছে, আর ঠাকুমা কিছুতেই যেতে দেবে না।     তবু বাবা খামখুটি মেরে পড়ে থাকে। তার নাকি সেইসময় একটা কোট ছিল, যাতে ছিল অনেকগুলো পকেট, সেইসব পকেটে  যা যা খাওয়া বারণ ছিল, সেইসব পাওয়া যেত। পাঁপড় ভাজা, মোটর ছোলা ভাজা, (মানে আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগের গ্রামবাংলায় একটা শিশুর মুখরোচক যা যা থাকা সম্ভব)। কমল মিত্রের গাউনের মতো দেখতে সেই কোট শীত গ্রীষ্ম বারমাস থাকত বাবার গায়ে।  এটা গায়ে দিলে তার জেদ আরও বেড়ে যেত, এমন শোনা যায়।  তবু ঠাকুমা কিছুতেই রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত  সে ফুটবল খেলার অনুমতি আদায় করল আল্টিমেট ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে। হঠাৎ দূরের গাব গাছের দিকে তাকিয়ে ‘মীনা আমাকে ডাকছে ‘ বলে। মীনা ছিল বাবার অকাল্মৃত জাঠতুতো ভাই। ব্যস ঐ একটি কথাতেই সবার মুখ শুকিয়ে যায়। মনে হয় অসুস্থ এই বালকটির খুব কাছেই ঘুরে বেড়াচ্ছে মৃত্যু। তাই সে দেখতে পায়  মীনাকে, যেও বালক অবস্থায় মারা গেছে কয়েক বছর আগে। যার ওপর ওত পেতে আছে যম, সে বালক কি আর বেশিদিন বাঁচবে? মায়ের বুক কেঁপে ওঠে ভয়ে। আহা, কদিন আর বাঁচবে, ওর ইচ্ছেয় বাধা দিয়ে লাভ নেই। এইভাবে ব্ল্যাকমেল করে বাবা  আদায় করে নেয়, যত বেয়াড়া আবদার। কেউ কিছু বলে না।

 

তবে তার আবদার সীমাহীন হতে শুরু করলে মা নড়েচড়ে বসেন। যে সে মা তো নন, বীণাপাণি দেবী। এঁর জিভে সরস্বতীর বাস।  অক্ষরজ্ঞানহীন হলে কি হবে, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এলে ফেল মেরে যায় কত বি এ , এম এ। কথার মারপ্যাঁচে তিনি ছিলেন তুলনাহীন।  জয়নগর মজিল্পুরের তর্করত্ন বাড়ির মেয়ে, পাঁচ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল, পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। কিন্তু ইনি ছিলেন আশ্চর্য শ্রুতিধর। তাঁর  ছেলেরা সামনে বসে যা-ই পড়ত, তিনি একবার শুনেই তা স্মৃতিবন্দী করে ফেলতেন, তাঁর প্রখর বুদ্ধিতে তিনি ধরেও ফেলতেন কোন জায়গা বাদ দিয়ে পড়লে। সেই বুদ্ধিতেই তিনি বুঝতে পারছিলেন তাঁর মেজ ছেলেটি ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে  অন্যায় দাবি আদায় করছে। তাই তিনিও তাকে টাইট দেওয়া শুরু করলেন। পাড়ায় ফুটবল খেলা মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু অন্য গ্রামে ম্যাচ খেলতে যাওয়ার কথায় বেঁকে বসলেন।

মুখের অপরূপ ভঙ্গি করে বললেন ‘তোর গায়ে নেই বল, তুই খেলবি বল!’  শব্দের যমক বা পান সৃষ্টিতে তিনি শিব্রামের অগ্রপথিক বলা যায়।

তার পরেও ছেলে তার জেদে অটল। খেলতে সে ঠিকই গেল দলের সঙ্গে। কী করে সে মার অনুমতি আদায় করল কে জানে। কেঁদে কেটে, নাকি মীনার শরণাপন্ন হয়ে তা আমি বলতে পারব না। 

তবে খেলতে গিয়ে কী হয়েছিল সেটা জানি। দুটো দলের মধ্যে ইতর বিশেষ তেমন তফাত ছিল না। তফাত করে দিল বাবা। সে ছিল বোলসিদ্ধি দলের গোলকিপার। গ্রামের ফুটবল ম্যাচ বলতে যে ধন্যি মেয়ে আর হাড়ভাঙ্গা গ্রামের কথাই মনে পড়ে যায়, তাতে অবাক হবার কিছু নেই।  সে ম্যাচেও একটা রদ্দি গোলকিপার ছিল।  যে সম্ভবত গোলকিপিং করার সময় তেলেভাজা খাচ্ছিল কিংবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমচ্ছিল । বাবাও সেরকম কিছু করছিল নিশ্চয়। গুনে গুনে তেরোটা গোল খেল । হাড়ভাঙ্গার মতো গ্রাম। জিতলে তো প্রাণ নিয়ে ফিরতে হত না, কিন্তু হেরেও রক্ষে নেই। দলে দলে লোক আসতে লাগল কে এই মহান গোলকি, যে ১৩টা গোল খেতে পারে, তাকে দেখতে।

তাতেও  শেষ না। বিজয়ী টিম বিজিত টিমের বিখ্যাত গোলকিকে  ঘিরে ধরে বলল ‘বল তোরা হেরে গেছিস।‘

বাবাও তো বীণাপাণির ছেলে। সে অটল হয়ে বলল ‘তোমরা জিতেছ’

‘বল তোরা হেরেছিস’

‘বলছি তো তোমরা জিতেছ!’

মারধর অব্দি গড়িয়েছিল শেষমেশ। তবু বাবাকে স্বীকার করাতে পারেনি যে তারা হেরে গেছে। সেই বালক  মার খেয়েছে, তবু হার মানেনি।

আজ এই মুহূর্তে গল্পটা মনে পড়ছে কেন, তা নিশ্চয় আপনাদের বলে দিতে হবে না।   হেরেও যারা হার স্বীকার করে না, তাদের এককথায় কী বলা যায় ব্লুন তো? হার মানা হার? বাবা একবার ভারত শব্দের ব্যুৎপত্তি শিখিয়েছিল। ভাল খেলিয়া পরাজিত –এককথায় ভারত। সেই সময় ভারতীয় ক্রিকেট দল মানে ভাল খেলবে কিন্তু শেষ অব্দি হেরে যাবে- এটাই ছিল নর্ম। ১৯৮৩ সব কিছু বদলে দিল। যদিও তারপরেও প্রচুর ধেড়িয়েছে, কিন্তু ঐ ভাল খেলিয়া পরাজিত ধরনের  মিনমিনে ব্যাপারটা আর ছিল না। তবে  শেষ দিন পর্যন্ত বাবার ফেভারিট খেলা ফুটবলই থেকে গেছিল। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচের দিনগুলোতে বাড়িতে যেন যুদ্ধকালীন থম্থমে পরিবেশ। কট্টর বাঙাল বিদ্বেষী বাবা বলত ‘উহহ সূর্যের আলো যেখানে পৌছয়নি, সেখানে  অব্দি বাঙ্গালরা পৌঁছে গেছে!’

কয়েক দশক পরে  আমার এই বাড়িতেও ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচের দিনগুলোতে একইরকম থমথমে পরিবেশ ঘনায়। আমরা পা টিপে টিপে চলি, আস্তে আস্তে  কথা বলি। যদি মোহনবাগান জিতে যায় তবে আর রক্ষে নেই। কট্টর ঘটি বাবার  না দেখা এবং কল্পনার অতীত কট্টর বাঙাল জামাইয়ের মুড পরের দিন গাদাগুচ্ছের মাছ না কেনা অব্দি ঠিক হচ্ছে না, এ একেবারে নিশ্চিত।

টিভি এল ছিয়াশি সালে, সে বছর বিশ্বকাপ। মারাদোনা নতুন ঈশ্বর। সারারাত জেগে খেলা দেখছি। ঘরে ভরতি লোক। আর গোলকি যে কত গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রথম বুঝলাম বিশ্বকাপ দেখে। ফাইনাল দেখে সবাই তৃপ্ত। বাবা হঠাৎ বলে উঠল ‘পরের বিশ্বকাপ আর আমি দেখতে পারব না।‘ পারেও নি।  কে জানে ওপরে গিয়ে সে আবার গোলকিপিং করছে কিনা! এখনো কি সে তেরোটা গোল খেয়েও হার মানতে চায় না?  নাকি ওপরের খেলার  হারজিতের নিয়মটা অন্যরকম?

2 Comments

  • মায়া-মফস্সল… প্রথম পর্বে যে বিন্দাস ক্যাংলাস পার্টিরা, যারা পুলিশের মোটা লাঠিকেও ভয় পেত না, দ্বিতীয় পর্বে তাদের চেতনার অনেকবেশি জাগরণ টের পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপট যেন পাঠকের ঘরের পাশেই। কত চেনা 🙏

    • বেশ মনোরম লেখা। গল্পের ছলে ঠাকুমা বাবা সবাই যেন স্মৃতিকে নাড়িয়ে দিয়ে গেলেন। পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *