Email: info@kokshopoth.com
July 3, 2026
Kokshopoth

অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ৭- তিস্তা

Jul 3, 2026

ধারাবাহিক
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ৭- তিস্তা

তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।

এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।

কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।

ম্যাজিক

 

টাকি থেকে ফেরার পর প্রায় তিন সপ্তাহ কেটে গেছে। এর মধ্যে বিশেষ কিছু ঘটেনি লেখার মতো। মানুষ ভাবে জীবনে সবসময় কিছু না কিছু ঘটে। আসলে বেশিরভাগ দিনই কিছু ঘটে না। অথবা এত ছোট ছোট জিনিস ঘটে যে তাদের আলাদা নাম দেওয়া যায় না। দিনের শেষে মনে হয়— আজকের দিনটা আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি ছিল, শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখটা বদলেছে।    

আজ অফিস থেকে চারটে নাগাদ বেরিয়ে এসেছি। কাজ শেষ হয়নি অবশ্য। কয়েকটা ফাইল ল্যাপটপে নিয়ে এসেছি, বাড়ি গিয়ে খুলব। জুনের শেষের বিকেল। রোদ এখনও পুরোপুরি সরেনি, কিন্তু তার ধারটা ভোঁতা হয়ে এসেছে। রাস্তায় মানুষের ভিড় বাড়ছে। অফিসফেরত মুখগুলোকে আলাদা করা যায় না। প্রত্যেকেই যেন একই জায়গা থেকে বেরিয়ে একই দিকে যাচ্ছে।   

বাসস্ট্যান্ডে যথারীতি লোক দাঁড়িয়ে। কারও হাতে শপিংব্যাগ, কারও কাঁধে ল্যাপটপ, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ শুধু সামনে তাকিয়ে। প্রত্যেকেরই বাড়ি ফেরার তাড়া। অথচ সেই তাড়ার মধ্যেও একটা অদ্ভুত স্থিরতা। বাস এলে সবাই একসঙ্গে নড়ে ওঠে, আবার থেমে যায়। যেন একটা অদৃশ্য সংকেতের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ!  

বাসে উঠে জানলার ধারে একটা সিট পেয়ে গেলাম। অনেক দিন পরে। আগে জানলার ধারে বসতে ভালো লাগত। এখন বিশেষ কিছু মনে হয় না। জানলার বাইরে শহর একইরকম গতিতে পিছিয়ে যেতে থাকে— দোকানের সাইনবোর্ড, ফলওয়ালা, ওষুধের দোকান, মোড়ে দাঁড়ানো ট্রাফিক পুলিশ, ফুটপাথে প্লাস্টিক বিছিয়ে বসা মানুষ। প্রতিদিন দেখি। তবু যেন দেখা হয় না। যেন চোখের সামনে দিয়ে নয়, অভ্যাসের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে সবকিছু।  

সম্ভবত বয়স বাড়ার একটা সুবিধা আছে। মানুষ নিজের মনের ওঠানামা নিয়ে খুব বেশি নাটক করে না। খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হয় না। আবার খুব বেশি ভেঙেও পড়ে না। ভালো লাগলে ভাবে, থাকুক। খারাপ লাগলে ভাবে, এটাও কেটে যাবে। মাঝখানের যে বিশাল অঞ্চল— যেখানে না আনন্দ, না দুঃখ— সেখানেই আসলে বেশিরভাগ সময় কেটে যায়। আগে এটাকে একঘেয়েমি বলতাম। এখন মনে হয়, এটাই সম্ভবত স্বাভাবিক জীবন।

বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। বাড়ি ফিরতে সাত-আট মিনিট লাগে। এই রাস্তা বহু বছরের চেনা। কোথায় গর্ত আছে, কোন দোকান কখন বন্ধ হয়, কোন মোড়ে সন্ধেবেলায় চা বেশি বিক্রি হয়…সবটাই জানা। এতটাই জানা যে আলাদা করে আর খেয়াল করতে হয় না। মানুষ অচেনা জিনিসের দিকে তাকায়; চেনা জিনিসকে শুধু ব্যবহার করে।  

কিছুটা হাঁটতেই মোড়ের কাছে একটা ভিড় চোখে পড়ল। কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। দু-তিনটে বাচ্চা। দুজন রিকশাওয়ালা। পাশের ফার্মেসির কর্মচারী। আর কয়েকজন পথচলতি মানুষ। মাঝখানে একজন লোক।

        প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো কোনও গণ্ডগোল হয়েছে। তারপর দেখলাম, না। লোকটার সামনে মাটিতে একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের চাদর পাতা। তার ওপর তাসের প্যাকেট, কয়েকটা কয়েন, লাল-নীল রঙের বল আর একটা পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ। বুঝলাম লোকটা জাদুকর।

জাদুকর শব্দটা শুনলে যে ছবি মাথায় আসে, তিনি তেমন নন। মাথায় লম্বা টুপি নেই। ঝলমলে পোশাকও নয়। সাধারণ একটা হালকা নীল শার্ট। বারবার ধোয়ার ফলে রং ফিকে হয়ে গেছে। গাঢ় ধূসর প্যান্ট। পায়ে সস্তার স্যান্ডেল। শার্টের ডান হাতাটা কনুইয়ের একটু ওপর পর্যন্ত গোটানো। বাঁ হাতার বোতাম নেই। কবজির শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

তিনি কাউকে ডাকছিলেন না। কেবল তাসগুলো আঙুলের ফাঁকে ধীরে ধীরে এমনভাবে সাফল করছিলেন— যেন জানেন, যে দাঁড়ানোর, সে ঠিক এসে দাঁড়াবে।

আমি প্রথমে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। তারপর থেমে গেলাম। কেন দাঁড়ালাম, জানি না। সম্ভবত ভিড়ের একটা নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ আছে। সব ভিড়ের উদ্দেশ্য জানা যায় না। তবু মানুষ থেমে যায়। কৌতূহলও বোধহয় সংক্রামক।

একসময় জাদুকর তাসগুলো পাখার মতো মেলে ধরলেন। সামনে দাঁড়ানো সাত-আট বছরের একটা ছেলেকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। বললেন একটা তাস তুলে নিতে। ছেলেটা একটু ইতস্তত করে একটা তাস তুলে নিল। সবাইকে দেখিয়ে আবার সেটাই গুচ্ছের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। জাদুকর খুব ধীরে ধীরে তাসগুলো মেলতে লাগলেন। তাস টা কোথাও নেই। 

তিনি হাত দুটো উলটে দেখালেন। নিজের শার্টের পকেটটাও দেখালেন— খালি। তারপর ছেলেটার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে তাকে ঘুরিয়ে দিলেন। এবং তার জামার কলারের ভেতর থেকে বার করে আনলেন সেই তাস! বাচ্চাগুলো একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠল। একটা ছোট মেয়ে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাস টার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল তাস নয়, সে আশ্চর্য কিছু দেখছে! 

আমি খেয়াল করলাম, জাদুকর দর্শকদের দিকে কম, বাচ্চাদের মুখের দিকে বেশি তাকাচ্ছেন। ট্রিক সফল হয়েছে কি না, সেটা যেন হাততালিতে নয়, চোখের বিস্ময়ে মাপছেন।

এরপর তিনি একটা চকচকে কয়েন হাতে নিলেন। কয়েনটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরছিল। এত সহজে ঘুরছিল যে মনে হচ্ছিল, ধাতুর নয়, যেন হালকা কিছু— কাগজ অথবা প্লাস্টিক। মুহূর্তের মধ্যে সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল। ভিড়ের ভেতর একটা চাপা গুঞ্জন উঠল। একজন বলল, 

“হাতেই আছে।”

জাদুকর শুনেও শুনলেন না। তিনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটা ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন। ছেলেটার কান ছুঁয়ে হালকা টান দিতেই কয়েনটা বেরিয়ে এল। ছেলেটা অবাক হয়ে নিজের কান ছুঁয়ে দেখল। আবার হাততালি।

রিকশাওয়ালাদের একজন হেসে বলল,

 “আমার কানটাও দেখুন তো।”

লোকজন হেসে উঠল। জাদুকর এবার সত্যিই তার কানের দিকেও হাত বাড়ালেন। কিছু বেরোল না। তিনি নিজেই হেসে বললেন,

“আজ বোধহয় শেষ হয়ে গেছে।”

        এই প্রথম জাদুকরের মুখে পুরো হাসিটা দেখলাম। হাসিটা অদ্ভুত। খুব উজ্জ্বল নয়, আবার ক্লান্তও নয়। বরং অনেকদিন ধরে একই কাজ করতে করতে মানুষ যে ধরনের সহজ হাসি শিখে ফেলে, সে রকম।

এরপর তিনি ব্যাগ থেকে একটা দড়ি বের করলেন। দড়িটা টানটান করে ধরলেন। মাঝখানটা একটা ছোট কাঁচি দিয়ে কেটে ফেললেন। দুটো আলাদা অংশ সবাইকে দেখালেন। তারপর হাতের তালুর মধ্যে কয়েকবার পাক খাইয়ে আবার দড়িটা টানলেন। দড়িটা অক্ষত! পাশে দাঁড়ানো একজন মধ্যবয়স্ক লোক ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“ওসব হাতসাফাই।” 

বাকিরা কেউ কিছু বলল না। লোকটাও না। কোথাও একটা কৌশল তো অবশ্যই আছে। এবং সম্ভবত সবাই তা বোঝে। তবু কৌশলের সম্ভাবনা বিস্ময়কে নষ্ট করে দেয় না। বরং মানুষকে আরও মন দিয়ে দেখতে শেখায়। জাদুকর ইতিমধ্যে পরের খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

তাসগুলো গুছিয়ে রাখলেন। কয়েনগুলো মুঠো করে তুলে আবার রেখে দিলেন। হাত দুটো একবার আলতো করে ঝেড়ে নিয়ে চারদিকে তাকালেন। তাঁর মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। একটা খেলা শেষ হচ্ছে, আরেকটা শুরু হবে—এইটুকুই।

ভিড়টাও অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে আছে। কেউ ঘড়ি দেখছে না। কেউ মোবাইল বের করেনি। কেউ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও দেয়নি। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন প্রত্যেকেই নিজের নিজের গন্তব্য একটু পিছিয়ে দিয়েছে। ঠিক তখনই টের পেলাম, আমিও আর পথচলতি একজন মানুষ নই। কখন যে দর্শকদের ভিড়ে মিশে একজন দর্শক হয়ে গেছি, নিজেও টের পাইনি। আমিও অপেক্ষায়। ম্যাজিক দেখার অপেক্ষায়।  

অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটবেলায় প্রথম ম্যাজিক দেখার কথা।

কোথায় দেখেছিলাম, ঠিক মনে নেই। সম্ভবত কোনো পাড়ার অনুষ্ঠান। শীতকাল ছিল। বাঁশ বেঁধে ছোট্ট একটা মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। সামনে প্লাস্টিকের চেয়ার। আমি অনেক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মানুষ এত বেশি ছিল যে মাঝেমধ্যে শুধু জাদুকরের মাথাটুকুই দেখা যাচ্ছিল।

তিনি একটা রুমাল থেকে পায়রা বের করেছিলেন! 

আজ এত বছর পরে জানি, সেটারও নিশ্চয়ই একটা কৌশল ছিল। কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে সত্যিই এমন কিছু মানুষ আছে, যারা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ নিজের রুমাল নিয়ে বসে ছিলাম। ভাঁজ করলাম। মুঠোয় চেপে ধরলাম। বারবার খুলে দেখলাম। কিছুই বেরোল না। তবু হতাশ লাগেনি। বরং মনে হয়েছিল, নিশ্চয়ই আমি ঠিকমতো পারছি না। ছোটবেলায় বিশ্বাসও খুব সরল থাকে। মনে হয় পৃথিবী কখনও ভুল করতে পারেনা। কাজেই ব্যর্থতার সব দায় নিজের ওপরই বর্তায়।

পরে ধীরে ধীরে অন্যরকম জানা শুরু হল। স্কুলের বড় ছেলেরা বলল, সবই  হাতের কারসাজি। কেউ বলল, আঙুলের গতি। কেউ বলল, চোখকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল। শুনে অবাক হইনি। বরং একটু গর্বই হয়েছিল। মনে হয়েছিল, বড় হওয়া মানেই বুঝি এইসব রহস্য ধরে ফেলা। তারপর লক্ষ্য করলাম, শুধু ম্যাজিক নয়, আরও অনেক কিছুরই ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে।

রামধনু কেন হয়। গ্রহণ কীভাবে লাগে। বজ্রপাতের আগে বিদ্যুৎ কেন দেখা যায়। যেগুলো একসময় অলৌকিক বলে মনে হত, একে একে সেগুলোরও কারণ জানা হয়ে গেল। তখন মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা বোধহয় ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। যে জায়গায় একসময় বিস্ময় ছিল, সেখানে এখন তথ্য। যেখানে প্রশ্ন ছিল, সেখানে উত্তর। এতে সুবিধে হয়েছে অনেক। অন্ধবিশ্বাস কমেছে। ভয়ও কমেছে।

সম্ভবত এটাই বড় হওয়ার একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। জ্ঞান বাড়ে। বিস্ময় একটু একটু করে জায়গা ছাড়ে। তবে পুরোপুরি না। এই যেমন এখন। আমি জানি, জাদুকর অলৌকিক কিছু করছেন না। তবু চোখ সরাতে পারছি না। এই যে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটা— প্রতিবারই তার চোখ গোল হয়ে যাচ্ছে, গলার কাছে আটকে যাচ্ছে শ্বাস, তারপর হাততালি! মনে হল, শুধু কৌতূহলের না, বিস্ময়েরও বোধহয় সংক্রামক হওয়ার ক্ষমতা আছে।

শেষ খেলাটা সবচেয়ে ছোট। আমি খেয়াল করলাম, এবার আমি আর জাদুকরের হাতের দিকে তাকিয়ে নেই। আমি তাকিয়ে আছি দর্শকদের চোখের দিকে।   

একটা লাল বল মুঠোর ভেতর নিয়ে জাদুকর হাত বন্ধ করলেন। তারপর হাত খুলে দেখালেন, বলটা নেই। ডান হাত দেখালেন। বাঁ হাতও। তারপর সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাচ্চার শার্টের পকেট থেকে বলটা বের করে আনলেন।

এবার হাততালিটা একটু জোরেই পড়ল। জাদুকর মাথা নত করে একবার চারদিকে তাকালেন। কোনো বিজয়ীর ভঙ্গি নয়, কোনো নাটকীয় অভিবাদনও নয়। যেন এতক্ষণ ধরে যে কাজটা করছিলেন, সেটা শেষ হয়েছে— এইটুকু জানিয়ে দিলেন মাত্র।

তারপর মাটিতে রাখা প্লাস্টিকের বাটিটা সামনে এগিয়ে দিলেন। কোনো কথা বললেন না। কেউ দশ টাকা দিল। কেউ কুড়ি। একজন পঞ্চাশ টাকার নোট ভাঁজ করে রেখে দিল। কয়েকজন চুপচাপ চলে গেল। তারা খেলা দেখেছে, কিন্তু বাটির সামনে দাঁড়াল না। কেউ আবার পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ খুঁজে শেষে মাথা নেড়ে সরে গেল। সম্ভবত খুচরো ছিল না। বা ছিল!

জাদুকর কাউকেই আলাদা করে দেখলেন না। কে দিল, কে দিল না— সেটা তাঁর অভিব্যক্তির  কোথাও ধরা পড়ল না। আমি পকেট থেকে কুড়ি টাকা বের করে বাটিতে রাখলাম। জাদুকর শুধু একবার মাথা নাড়লেন। ধন্যবাদ বললেন না। বলবার প্রয়োজনও ছিল না। 

খেলা শেষ হলে যেমন মঞ্চের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। এখানেও তেমনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তিনি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে শুরু করলেন। তাসের প্যাকেটটা ব্যাগে গেল। দড়িটা ছোট করে পাকিয়ে রাখলেন। কয়েনগুলো একসঙ্গে তুলে একটা টিনের কৌটোর মধ্যে ফেললেন। ধাতুর ঠোকাঠুকির ছোট্ট শব্দ হল। লাল বলটা শেষবারের মতো হাতে নিয়ে একটু চেপে দেখলেন। তারপর সেটাও ব্যাগে। পুরো কাজটাই এমনভাবে করছিলেন, যেন এ-ও খেলারই অংশ। শুধু দর্শক আর দেখছে না। এই সময়টাতেই তাঁকে প্রথমবার একটু ক্লান্ত মনে হল।

খেলা দেখানোর সময় তাঁর হাতের গতি ছিল দ্রুত, চোখ ছিল সজাগ। এখন কাঁধ দুটো একটু নেমে এসেছে। ব্যাগটা তুলতে গিয়ে একবার হাত বদলালেন। তারপর আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

ঠিক তখনই একটা পাঁচ-ছয় বছরের মেয়ে দৌড়ে এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল— কিছু বলল না, শুধু নিজের ছোট্ট মুঠো খুলে একটা চকচকে দুই টাকার কয়েন এগিয়ে দিল।

জাদুকর কয়েনটা নিলেন না। হেসে বললেন,

“এটা তোমার কাছেই থাক।” 

মেয়েটা মাথা নাড়ল। তারপর আবার হাত বাড়িয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ড দুজনেই স্থির। শেষ পর্যন্ত  জাদুকর কয়েনটা নিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার মাথায় আলতো করে হাত রাখলেন। কোনো ম্যাজিক হল না। কিছু অদৃশ্যও হল না। তবু ওই মুহূর্তে মনে হল, এই খেলার শেষ ট্রিকটা সম্ভবত এটাই।

এরপর আর দাঁড়িয়ে থাকার কোনো কারণ ছিল না। রিকশাওয়ালারা নিজেদের রিক্সার দিকে ফিরে গেল। ফার্মেসির কর্মচারী দোকানে ঢুকে পড়ল। বাচ্চাগুলো রাস্তার ওপারে বেলুনওয়ালাকে ঘিরে ধরেছে। তাদের বিস্ময় ইতিমধ্যে নতুন ঠিকানা খুঁজে নিয়েছে। মোড়টা ধীরে ধীরে আগের মতো হয়ে গেল। যেন কিছুই ঘটেনি। শুধু ফুটপাথের ওপর কয়েক মুহূর্ত আগে একটা ছোট্ট বৃত্ত ছিল, যেখানে অল্প কিছু মানুষ কয়েক মিনিটের জন্য নিজেদের দৈনন্দিন জীবন থেকে বেরিয়ে কোনো অলৌকিক জগতে ঢুকে পড়েছিল।

আমিও হাঁটতে শুরু করলাম। আর পেছন ফিরে দেখিনি। আজ অনেক দিন পরে মনে হল, পৃথিবী এখনও মাঝেমধ্যে থামিয়ে দিতে পারে কোনো যুক্তি ছাড়াই।

হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনেই হেসে ফেললাম…!  

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *