Email: info@kokshopoth.com
April 18, 2026
Kokshopoth

অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়

Apr 17, 2026

 গদ্য

অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়

যুদ্ধের পায়চারি : পতনের শব্দ

 

আধুনিক যুদ্ধ, সভ্যতার অতি উজ্জ্বল সময়েও মানুষের ভেতরে লাটিম অন্ধকারকে ঘুরিয়েই চলেছে।

 

‘মারো নয় মরো’—আদিতম যুদ্ধের স্লোগান। যারা মারা যায়, তারা আদেশ পালন করে দেশের জন্য—বলা ভালো সাম্রাজ্যবাদী দখলদারদের জন্য। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে (১৮৫৪) ব্রিটিশ সেনাপ্রধানের একটি ভুল নির্দেশে ৬০০ অশ্বারোহী সৈন্য রাশিয়ান কামানের দিকে ছুটে যায়, এবং কামানের গোলায় প্রায় সবাই মারা যায়। সৈন্যরা জানত ঝুঁকি আছে, তবুও আদেশ পালন করেছে। একটি ভুল নির্দেশে সেনাদের প্রাণ গেল। এ নিয়ে লর্ড টেনিসনের একটি কবিতা আছে—

 

‘There’s not to reason why

There’s but to do and die.’

 

১৯৩৯ সালে বার্টোল্ট ব্রেখট Mother Courage and Her Children নামে একটি যুদ্ধবিরোধী নাটক লেখেন। নাটকের পটভূমি ত্রিশ বছরের ইউরোপীয় যুদ্ধ, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয়।

নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মাদার কারেজ’ একজন ব্যবসায়ী নারী, যিনি যুদ্ধক্ষেত্রের পাশেই জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি সৈন্যদের কাছে প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেন। যুদ্ধ তার কাছে শুধু ধ্বংস নয়, বরং একটি সুযোগ—একটি ব্যবসা। এই লাভের নেশা তাকে ধীরে ধীরে নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত করে এবং নানা ধরনের অনৈতিক, স্বার্থপর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

মাদার কারেজ যুদ্ধ থামুক তা চায় না—যুদ্ধ চললেই তার ব্যবসা চলবে। এই মানসিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ব্রেখটের তীব্র সমালোচনা—যুদ্ধ কেবল রাজনীতি নয়, অনেকের কাছে এটি লাভের সরু রাস্তা।

 

নাটকের ট্র্যাজেডি হলো, এই যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত তার নিজের জীবনকে শূন্য করে দেয়। এই নাটকের মাধ্যমে ব্রেখট দেখাতে চেয়েছেন যে, যুদ্ধ থেকে সাময়িক লাভ হলেও তার পরিণতি সর্বনাশা। মানবিক মূল্য এতটাই ভয়াবহ যে কোনো অর্থনৈতিক লাভ তার ক্ষতিপূরণ করতে পারে না। মাদার কারেজ এখানে ট্রাজিক ভিলেন।

 

অনৈতিক যুদ্ধের ব্যবসা এখন পৃথিবী জুড়ে চলছে। অস্ত্র ব্যবসায়ে এত লাভ—আমেরিকা, ইসরায়েল যুদ্ধ থামাবে কেন? আর অনৈতিকতার দিক হলো—শত্রুর বহুমূল্য সম্পদ তছনছ করা, ইতিহাসকে কাঙাল করা, ট্যুরিজমের ব্যবসা শূন্য করা। স্কুল, হাসপাতাল, হেরিটেজ বিল্ডিং—এক একটি বধ্যভূমি।  শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর প্রাচীন সংস্কৃতির কেন্দ্রে সর্বত্র মিসাইল হানা হচ্ছে। 

 

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, উগ্র জাতীয়তাবাদ যুদ্ধের কারণ। আজ পরিবর্তিত পরিবেশে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌলবাদ ও অস্ত্র ব্যবসা। যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা মজবুত করতে লক্ষ কোটি টাকার অস্ত্র কেনা হচ্ছে। উদ্দেশ্য—সারা বছর কারণে-অকারণে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, বড় যুদ্ধের আরতি ।

 

মিডিয়া মাঝে মাঝে উসকে দেয়—কার অস্ত্রবল কত, কে শক্তিধর, কে মহাশক্তিধর। এই মুহূর্তে যুদ্ধ হলে কে জিতবে—এরকম জল্পনা। আড্ডায় বসেন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলরা। সিনেমা তৈরি হয় যুদ্ধকে তোল্লাই দিয়ে। পাবলিক মজা পায়।

 

সভ্যতা যতই এগোয়, মানুষের ভেতরের হিংস্রতাকে যতই শৃঙ্খলায় বাঁধা হয়—সে শোধরায় না। বাঁধন আলগা হলেই তার বীভৎস হা-মুখ বেরিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ শুধু সময়ের অপেক্ষা।

কেউ কি ভেবেছিল আমেরিকা হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলবে? অথচ ফেলা হল। তার ফল কতটা বিকলাঙ্গ—ইতিহাস ঘাঁটলে বা গুগল সার্চ করলেই জানা যায়।

 

ফরাসি পরিচালক আলাঁ রেনে তাঁর Hiroshima Mon Amour ছবিতে হিরোশিমার ধ্বংসের স্মৃতি, মৃত্যু, বিকলাঙ্গতা—দেখিয়েছেন। সরাসরি যুদ্ধ নয়, কিন্তু তার ভয়াবহ পরিণতি। এখানে একটি প্রশ্ন—মানুষ কি ধ্বংসের ভয়াবহতা ভুলে যায়? তাহলে তো একই ভুল আবার হবে! কোনো উন্মাদের মুহূর্তের ভ্রমে এ ঘটনা আবার ঘটবে না—কেউ কি বলতে পারে?

 

জীবনানন্দ লিখেছিলেন—‘সৃষ্টির আদিতে ছিল দ্বেষ’। যুদ্ধের নাগরদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস পড়েই চলেছে। সম্প্রসারণবাদী দেশগুলো যতদূর যেতে হয় যাবে, ধ্বংস করবে সভ্যতার অনন্য কীর্তিগুলোকে।

 

প্রাচীন যুদ্ধের তুলনায় আধুনিক কালের যুদ্ধের খরচের বহর কেমন—একটা হিসাব দিই।

এক একটি মিসাইলের খরচ আনুমানিক ১০ লক্ষ ডলার—যে টাকায় সুদানের মতো গরিব দেশে ১০ লক্ষ মানুষের এক দিনের খাবারের যোগাড় হয়ে যেত। রাতের আকাশ লাল করে শ’য়ে শ’য়ে মিসাইল ছুটছে প্রতিদিন।

 

খবরে প্রকাশ, সাম্প্রতিক যুদ্ধে আমেরিকার  প্রতিদিন গড়ে এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার খরচ হচ্ছে। ৪০ দিনে তা ৪০০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত এফ-৩৫ ও অন্যান্য সমরাস্ত্রের কথা বাদই দিলাম। এই যুদ্ধ—ঘনিয়ে ওঠা শত্রুতা, ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার—চলছে ১৯৮০ সাল থেকে।

ইরান বলেছে, ‘৪০ বছর আমরা অপেক্ষা করেছি, এবার নয় এপার নয় ওপার।’এর মধ্যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্ত্র আধুনিক হয়েছে, কূটনীতি জটিল হয়েছে—কিন্তু মানুষের ভেতরের সেই আদিম হিংস্র যুদ্ধলিপ্সা, ক্ষমতা আর প্রাধান্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা ফেটে পড়ছে।

 

যুদ্ধের ভয়াবহতা সীমাহীন। গাজায় শিশুদের দাফন করার জন্য কবরের মাটি পর্যন্ত নেই। সাদা কাপড়ে ঢাকা সারি সারি শবদেহ—আল জাজিরা টিভি দেখিয়েছে।

 

শান্তির কোনো ললিত বাণী কেউ শুনছে না আজ এই একুশ শতকে।

 

ভারতের মতো শান্তিকামী দেশ ব্রহ্মস বিক্রির ক্রেতা খুঁজছে। অস্ত্র নির্মাণ—মিসাইল, ড্রোন, রকেট, পরমাণু অস্ত্র সম্ভার—এখন বৃহৎ পুঁজির ব্যবসা। আমরা সবাই ভয়ের ফলার উপর দিয়ে অতিক্রম করছি। বিপর্যস্ত হচ্ছে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার মান। যার প্রত্যক্ষ শিকার সাধারণ থেকে উচ্চবিত্ত—কারো রেহাই নেই।

 

আদিম মানুষ যখন প্রথম অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, তখন তার লড়াই ছিল বেঁচে থাকার জন্য—খাদ্য, আশ্রয় কিংবা নিজের গোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য। আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ এসেছে পরে। যুদ্ধ আর শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়; বরং তা হয়ে উঠেছে শক্তির প্রদর্শন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নির্মম মাধ্যম।

সাম্রাজ্যবাদীদের লোভ ইতিহাস জুড়ে যেমন ছিল, আজও তা নিঃশেষ হয়নি। একসময় সরাসরি ভূখণ্ড দখল করা হতো; এখন সেই দখল অনেক সূক্ষ্ম—অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও কৌশলগত জোটের মাধ্যমে।

 

আজকের পৃথিবী এক দ্বৈত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে—একদিকে উন্নয়ন, বিজ্ঞান, মহাকাশযাত্রা, অন্যদিকে যুদ্ধ, ধ্বংস ও ক্ষমতার লড়াই। প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই আদিম প্রবৃত্তিকে অতিক্রম করেছি, নাকি তাকে আরও গুপ্ত বাসনায় সূক্ষ্ম রূপে লুকিয়েছি?

 

উত্তর সহজ নয়। তবে নিশ্চিত—যতদিন মানুষের ভেতরে দ্বেষ, লোভ ও আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা থাকবে, ততদিন যুদ্ধের ছায়া মুছে যাবে না।

 

Russia–Ukraine যুদ্ধ তার উদাহরণ। ছোট দেশও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে—যদি বড় শক্তির সমর্থন পায়। একইভাবে Iran-এর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ—Strait of Hormuz নিয়ন্ত্রণ মানে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব।

 

সোজা কথায়, আজকের বিশ্ব এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে—কোথাও যুদ্ধ মানেই সর্বত্র অর্থনৈতিক কম্পন।

শেষ পর্যন্ত মনে হয়—যুদ্ধের রূপ বদলেছে, কিন্তু সত্য বদলায়নি। এই যুদ্ধ শুধু মাটিতে নয়—মানুষের মন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ওপরও দখলের লড়াই।

 

আশার কথা,  খোদ আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী মনোভাব তীব্রতর হয়ে উঠছে। সর্বশেষ খবরে প্রকাশ 

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ৭০ লাখ মানুষ মিছিল করেছে। ট্রাম্প চেয়েছিল ইরানিরা তাদের নিজের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করুক, কিন্তু সেটা হয়নি। এখন ট্রাম্পকে আমেরিকার লক্ষ লক্ষ মানুষের ‘নো কিংস’ প্রতিবাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

 

শেষ কথা 

 

যুদ্ধের ভেতরে কোনো প্রকৃত বিজয় নেই। প্রতিটি বিস্ফোরণ শুধু জীবনই নয়, ভবিষ্যৎও ধ্বংস করে।

অস্ত্র ব্যবসায়ীরা যুদ্ধ সাজাবে বারবার। সভ্যতার সংকট ঘনীভূত হবে। তারপর?

 

আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন—

“আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোন অস্ত্রে হবে, কিন্তু চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি আর পাথর দিয়ে।”

 

সভ্যতার পতনের আগে বলতে হবে—

“নো পাসারান।”

যুদ্ধবাজ, তোমাকে এগোতে দেব না।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *