Email: info@kokshopoth.com
June 18, 2026
Kokshopoth

পার্থজিৎ চন্দ

Apr 17, 2026

 গদ্য

পার্থজিৎ চন্দ

যুদ্ধ, শিশু, ক্ষমতা

বিরাশি বছরের দীর্ঘ আয়ু পেয়েছিলেন, তার মধ্যে অনিবার্য হয়ে প্রবল প্রভাব নিয়ে রয়ে গেছিলেন প্রায় ষাট বছর।  ষোলো-শো চোদ্দ থেকে ষোলো-শো কুড়ির মধ্যে জিয়ান লরেঞ্জ বেনিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘বয় উইথ অ্য ড্রাগন’। এক সময় বলা হত এই বেনিনি রোম শহরের সৌন্দর্যকেই ‘পরিবর্তিত’ করে দিয়েছিলেন। এতটাই প্রভাব ও জনপ্রিয়তা ছিল তাঁর যে বেশিরভাগ ‘কমিশনড’ কাজ তাঁর হাতেই অর্পিত হত।

রেনেসাঁর ধারার থেকে ছিটকে বেশ কিছুটা বেরিয়ে এসেছিলেন বেনিনি। কিশোর বয়সেই বিখ্যাত হয়ে ওঠা বেনিনি সারাজীবন ব্যারোক ধারার কাছাকাছি নিজেকে থিতু রেখেছিলেন, তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছিল সাইকোলজিক্যাল রিয়ালিজমের শিল্প-দানব।  দর্শকের সঙ্গে সরাসরি এবং তীব্র সংযোগের ধারা বেয়ে নির্মিত এই শিল্পকর্ম শুধু হারকিউলিসকেই নয়, সারা পৃথিবীর মিথিক্যাল শিশু বীর ও অবতারদের কথা মনে করাবে।

বেনিনির ভাস্কর্যের শিশুটির শরীরে পেলবতা; শিশুর শরীরে ছেয়ে থাকা স্নেহপদার্থের প্রকাশ। সে একই সঙ্গে ড্রাগনের সঙ্গে ‘খে্লায় রত’, উদাসীন এবং আপাত-শৈশবস্থার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে দুষ্টুমির হাসি।

বেনিনি দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ পছন্দ করতেন, তাই শিশুর দৃষ্টি দর্শকের দিকে নিবদ্ধ। যে ভয়ংকর ড্রাগনের চোয়াল ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার দিকে শিশুটির নজর নেই। যেন সে তার সারল্য দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে ড্রাগনের চোয়াল ও মাথা।

শৈশবের ‘শক্তি’ এখানেই, বেনিনির শিশুর দেহভঙ্গিমার ভেতর স্পষ্ট হয়ে আছে তার প্রকাশ।

কিন্তু, আজ যুদ্ধ নিয়ে কয়েকটি কথা লিখতে গিয়ে কেন বারবার ফিরে আসছে বেনিনির এই ভাস্কর্যটি?

তার প্রধান কারণ কি এই যে কয়েকদিন আগে সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় জ্বলজ্বল করছিল স্কুলে ও হাসপাতালে মিশাইল আছড়ে পড়ার সংবাদ ও সমাজ মাধ্যমে বারবার ফুটে উঠছিল এক অতিকায় বর্গক্ষেত্রের চারটি বাহু জুড়ে খোঁড়া রয়েছে সার-সার কবর; চারশোটির বেশিই হবে হয়তো। অনেক উঁচু থেকে ড্রোনের মাধ্যমে নেওয়া চিত্র। ঠিক কতজন মারা গেছে মিশাইল হামলায় তা তো আর নির্ভুল গুনে বলা সম্ভবপর নয়; মানুষ প্রথমে সংখ্যা এবং তারপর হারিয়ে যাওয়া সংখ্যা। যুদ্ধের সময় এসব হবেই। ফলে কিছু কবর বেশি খুলে রাখাই ‘বাস্তবসম্মত’।

যে কোনও যুদ্ধে যে সবার আগে আক্রান্ত হয় নারী ও শিশু তা কোনও নতুন তথ্য নয়। হাজার হাজার বছর ধরে যুদ্ধ আমাদের অনন্ত এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে নারী ও শিশুরা এটিও সবার জানা। এক একটি যুদ্ধ এক একটি মহা-এপস্টেইন ফাইলের বাস্তবতা। পৃথিবীতে এমন কোনও যুদ্ধ হয়নি বা হবে না যেখানে এই সত্যের অন্যথা হয়েছে। মাত্র কয়েক দশক আগে হিরোশিমা ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই সব গায়ে কাঁটা দেওয়া চিত্র দেখলে সহজে ধরা দেবে বিষয়টা।

কিন্তু বিষয়টির আরেকটি ‘মুখ’ আছে, আছে আরেকটি চিন্তাপ্রস্থান।

যুদ্ধের এই মহাবিভৎষ্যতাই কি ধীরে ধীরে মহাকাব্য থেকে শুরু করে মিথের ‘শিশু’দের অমিত শক্তিশালী করে তুলেছে? জীবন ও ক্ষমতার দ্বারা নামিয়ে আনা হিংসার ধারাপাত কি মিথের কাছে গিয়ে নিজের মাথাটিকে নিচু করে প্রায়শ্চিত্ত করেছে? না কি মহাকাব্য থেকে শুরু করে ‘ক্ষমতা’ জানে যে যুদ্ধের ফলে একদিন প্রায় শূন্য হয়ে যেতে পারে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা, রাষ্ট্রের প্রজা বা ক্ষমতাকে সুরক্ষিত করে রাখা মানুষ। তখন যুদ্ধের ময়দানে শিশুরাই ‘সৈন্য’, শিশুরাই শক্তি। ক্ষমতাকে সুরক্ষিত করে রাখার কারিগর।

বেশ কয়েক বছর আগে আধুনা নিশ্চিহ্ন, কিন্তু একদা প্রবল ক্ষমতাশালী সংগঠন এলটিটিই-র এক নাবালক সৈনিকের সাক্ষাৎকার দেখার সুযোগ হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার তামিল জাতিসত্তার এই লড়াই, যুদ্ধ সারা পৃথিবীর কাছে এক উদাহরণ। কীভাবে আত্মঘাতী বাহিনির যোদ্ধারা হাসিমুখে গলায় ঝোলানো সায়ানাইড ক্যাপসুল খেয়ে নিমেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে তা প্রথমবারের জন্য প্রত্যক্ষ্য করেছিল পৃথিবী। জাফনার এই যুদ্ধেও ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের সব থেকে মারাত্মক ‘অস্ত্র’ ছিল নাবালক সৈনিকরা।

প্রথমে জাতিসত্তার আবেগকে সামনে এনে তীব্র তামিল-অস্মিতা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা তো ‘ক্ষমতা’ই, সংখ্যাগুরু হওয়ার কারণে দিনের পর দিনে তামিল জনগণের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছিল ‘বৌদ্ধ’ সরকার। প্রভাকরণের সংগঠন নির্দেশ দিয়েছিল প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে ছেলে কিংবা মেয়েকে এলটিটিই-তে যোগ দিতে।

ওই সাক্ষাৎকার দেখতে দেখতে বারবার মনে হচ্ছিল জাতিসত্তার প্রতি ‘প্রেম’ এবং  যুদ্ধের বিভৎসতার সামনে শিশুদের এগিয়ে দেওয়ার ‘অমানবিকতা’ আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ। যুদ্ধের ময়দানে নাবালকদের এগিয়ে দেওয়ার সব থেকে বড় কারণগুলির মধ্যে রয়েছে নিশর্ত আনুগত্য থেকে শুরু করে যুদ্ধের খরচ কমানোর মতো বিষয়। তার থেকেও বড় কথা, নাবালকরা কোনও লড়াইয়ে জয়ী হলে সে-জয়ের কৃতিত্ব দাবি করে না। ফলে, যুদ্ধজয়ের ফলে প্রাপ্ত ‘booty’ শেয়ারিং করার যে বিষয়টি যে কোনও যুদ্ধের অনিবার্য ‘বিষয়’ সেটিকেও এড়িয়ে যাওয়া যায়। যুদ্ধে নাবালক সৈনিকের অর্থই হল দাবিহীন, নিঃশর্ত এক ‘ফোর্স’।

সেই ফোর্সকে শৈশব থেকেই মস্তিষ্কপ্রক্ষালন করা যে কোনও শক্তি ও ক্ষমতার লক্ষ্য। পৃথিবীতে প্রতিটি ‘উন্নত’ দেশের হাতে শয়ে-শয়ে পরমাণু বোমার ভাণ্ডার। বলা হয়ে থাকে আমাদের জানা যে অস্ত্র তার থেকে অন্তত হাজারগুণ বেশি শক্তিশালী অস্ত্র নিজের পকেটে রেখেই রাষ্ট্রগুলি নিজেদের ভাণ্ডারের অফিশিয়াল হদিশ দেয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি দেশই তাদের বিদ্যালয়-স্তরে Cadet-Training-এর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এ কি শুধুই ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের দিকে কোনও আক্রমণ ধেয়ে এলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করে রাখা? না কি যুদ্ধের প্রয়োজনে সাপ্লাই-চেন তৈরি রাখা?

সারা পৃথিবীর মিথ থেকে শুরু করে লোককথা ইত্যাদিতে ছড়িয়ে থাকা এই যে শিশুর আত্মত্যাগ থেকে ও সাহসিকতার ধারাপাত তা কি শুধুই ‘কাহিনি’? এর মধ্যে গূঢ় রাজনীতির বিষয়টি, যা অনেকাংশেই ক্ষমতাকে সুরক্ষিত করার খেলা, তা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়।

‘মহাভারত’-এ নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্যের বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া যাক। দ্রোণ একই সঙ্গে পাণ্ডব ও কৌরবদের অস্ত্রগুরু, ‘ক্ষমতা’কে শান দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করাই তাঁর ‘কাজ’। যুগের ধর্ম বিচার করলে বিষয়টির মধ্যে অস্বাভাবিকত্ব নেই। নিষাদ পরিবারের পুত্রের প্রবেশাধিকার নেই দ্রোণের অস্ত্র-শিক্ষালয়ে প্রবেশ করার। একলব্য দ্রোণের মূর্তি তৈরি করে অস্ত্রশিক্ষা করতেন। এরপর কুকুরের দ্বারা মনোসংযোগ নষ্ট হবার কারণে বিরক্ত হয়ে দ্রোণের অস্ত্রবর্ষণ থেকে শুরু করে বনের মধ্যে তাকে খুঁজে বের করার ইতিবৃত্ত সবাই জানেন। সব থেকে গূঢ় বিষয় হল, সেই অল্পবয়সী একলব্যের আঙুল গুরুদক্ষিণা হিসাবে চেয়ে নিয়ে অর্জুনের ‘শ্রেষ্ঠ’ হয়ে ওঠার পথটিকে প্রশস্ত করেছিলেন দ্রোণ।

আমরা যদি ক্ষমতার চোখে শিশু ও নাবালকদের অবস্থান একমাত্রিক হিসাবে গণ্য করি তা হলে ভুল করব।

শিশুর ‘ইনোসেন্স’কে সামনে রেখে শাসকের অত্যাচারকে পরিস্ফূট করা থেকে ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাতের বিষয়টিকে ধীরে ধীরে বাস্তব করে তোলার বিষয়টিও কি রণ-নীতিই?

কংসের কারাগার থেকে শুরু করে রাজা হেরডের শিশুমেধ-যজ্ঞ- দুটোরই ধরন এক। শিশুর জন্মকেই রুখে দিতে চাইছে ক্ষমতা। হত্যার লক্ষ্য নির্দিষ্টভাবে শিশুনিধন। আবার এই দুই শিশুর শৈশবকে ঘিরে এমনভাবে মিথের নির্মাণ হচ্ছে যে তারাই এক সময় ক্ষমতা হয়ে উঠতে পারেন। একবার শৈশবে কৃষ্ণের কালিয়দমন, পুতনারাক্ষসী নিধন ইত্যাদি মিথ তৈরি হয়ে গেলে ভবিষ্যতে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে বিশ্বরূপদর্শন থেকে শুরু করে যুদ্ধের পক্ষে, ‘আত্ম’কে বিযুদ্ধ করে নিয়ে যুদ্ধকে অনিবার্য ঘটনা হিসাবে দেখার বাণীও স্বাভাবিক বলে প্রতিভাত হতে শুরু করে। মনে রাখা জরুরি, ক্ষমতা যেমন যুদ্ধে সব থেকে সহজ টার্গেট হিসাবে শিশু ও নারীদের বেছে নেয়, তেমনই যুদ্ধ ও নিজের কারণেই তাদের নিয়ে মিথও তৈরি করে। কিন্তু চক্রব্যুহে অভিমন্যুকে হত্যা করতে তাদের হাত কাঁপে না। এখানে ‘অভিমন্যু’ এক প্রবণতামাত্র, আসলে বিষয়টি হল- হত্যা।

শিশুহত্যার লাইসেন্স সংগ্রহ করার আগে শিশুদের যুদ্ধের ময়দানে টেনে আনা বাধ্যতামূলক। এ কারণেই সারা পৃথিবীর রূপকথাগুলিতেও হিংসা থেকে শুরু করে শিশুদের মনোজগতে ধীরে ধীরে হত্যার বিষয়টিকে প্রবেশ করিয়ে দেওয়ার উদাহরণ দেখা যায়।

যে ‘রাজপুত্র’ হ্রদের নীচে লুকিয়ে থাকা ডাইনিকে মারার লাইসেন্স পেয়ে যায় তার কাছে হত্যা ও রক্তপাত স্বাভাবিকতা পায়। আবার ব্যাকড্রপ তৈরি হয়ে থাকে, তাকে হত্যা করাও আমাদের কাছে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে।

বেশ আকর্ষক একটি বিষয়ের দিকে একবার চোখ ফেরানো যাক, মাত্র কয়েক বছর আগে ঘটনা। অনেকটা রূপকথার শর্ত মেনেই যেন চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল। আমাদের দেশের আদিবাসি জনগোষ্ঠির একটি অংশের নাবালকদের হাতে মাওবাদিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য রীতিমতো রাষ্ট্রব্যবস্থার দ্বারা অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল।

ছত্তিশগড়ে চালু হওয়া এই পদ্ধতি অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারা নিষিদ্ধ হয়েহিল। কিন্তু বিষয়টির সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। রাষ্ট্রও যখন কোনও শক্তির সঙ্গে সম্মুখ সমরে পেরে ঊঠছে না তখন মাঠে নামানো হয়েছিল আদিবাসি নাবালকদের। নিশ্চয় কৌমের পবিত্রতা ও জাতিসত্তার বিষয়টিকেও সামনে আনা হয়েছিল। ‘সাওয়া জুডুম’-এর বেশ কিছু নাবালক যোদ্ধার কৃতিত্ব ও আত্মত্যাগ এখনও ছত্তিশগড়ের হাওয়ায় হাওয়ায় ঘোরে।

এখানে একটি সঙ্গত প্রশ্ন উঠতে পারে, তা হলে কি সংকটের সময়, যখন ‘যুদ্ধ’ই একমাত্র পথ তখন কি নাবালকরা ‘যুদ্ধে’ সামিল হবে না?

উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা কি ‘অশুদ্ধ’ পথ?

বিষয়টি এত সহজও নয়। নাবালকদের কত শতাংশ ‘নিজের ইচ্ছা’য় হাতে যুদ্ধে সামিল হচ্ছে আর কত শতাংশকে নানা পদ্ধতিতে ‘শক্তি’ যুদ্ধের ময়দানে সামিল করছে তার দিকেও নজর দেওয়া দরকার। এমনকি নাবালকের ‘নিজের ইচ্ছা’ বলে আমাদের কাছে যা ধরা দিচ্ছে তাও কতটা ‘বিশুদ্ধ ইচ্ছা’ সেটিও গণ্য করা দরকার।

কীভাবে এই ইচ্ছা ‘ম্যানুফ্যাকচার’ করা হয় তার দিকে একবার তাকানো যাক। চমৎকার একটি গল্প আছে কাফকার, ‘চিনের মহাপ্রাচীর’। আসলে গল্পটি একটি মহা-ডিসকোর্স।

এখানে কাফকা দেখিয়েছিলেন কীভাবে এক কল্পিত শক্তির বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে রাজতন্ত্র, রাষ্ট্র বা ক্ষমতা। তিনি দেখান যে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জাতির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার কারণে চিনের প্রাচীর নির্মাণের ‘গল্প’ তা আসলে অলীক।

আসল বিষয় ছিল রাজতন্ত্রের ধ্বজা উড়িয়ে রাখা এবং জনগণকে থিতু হতে না দেওয়া। তাদের জীবনকে নরক করে রাখা এবং সেই নরকের নাম দেওয়া রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা। এমন এক সাইকি তৈরি করা যাতে জনগণের মনে হতে থাকে তাঁরা এক মহান দায়িত্ব পালন করছে তাদের জীবনযৌবন উৎসর্গ করে।

কাফকা দেখিয়েছিলেন কীভাবে ধীরে ধীরে চিনের প্রাচীর নির্মাণ শুরু হওয়ার অন্তত পঞ্চাশ বছর আগে থেকে স্কুলের সিলেবাস থেকে শুরু করে সমাজ জীবনের নানা বিষয়কে প্রাচীর নির্মাণের যুক্তির স্বপক্ষে ম্যানুফ্যাকচার করা হচ্ছিল।

ফলে আজ যাকে ‘আত্মোৎসর্গ’ বলে মনে হচ্ছে তার ভিত যে কয়েক দশক আগে থেকে নির্মাণ করা হয়েছে তা নস্যাৎ করে দেওয়ার আগে ভাবা দরকার। ভাবা দরকার কেন, কোন পথে যুদ্ধ-উন্মাদরা অসহায় শিশুদের হত্যা করার লাইসেন্স পায়; আর কেনই বা আমাদের চারপাশে শিশুদের কেন্দ্র করে এত-এত বীরগাথা!

অবশ্য ‘যুদ্ধ’ ব্যতীত হয়তো মানুষ ‘বাঁচবেও’ না। কারণ যুদ্ধের অমর এক শক্তি তার ভেতর খেলা করছে। সেই কবে অরুণ মিত্র গায়ে কাঁটা দেওয়া একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ঈষৎ বঙ্কিম উচ্চারণেই বলেছিলেন,

‘এই সব শান্তিবাণী একদিন আমার ভিটেয় ঘুঘু চরিয়ে দেবে। এটা জানা কথা হওয়া সত্ত্বেও স্বপ্নরা নাছোড়বান্দা। তারা ঘুমের মধ্যে দেখা দেবেই, দেখাবে ইন্দ্রসভা, দেখাবে ধনধান্যে পুষ্পে ভরা। এক নম্বর শান্তিবাণী যখন এই ছবিঘরে স্বপ্নদের নিয়ে যাচ্ছে তখন দুনম্বর শান্তিবাণী এক নম্বরকে কচুকাটা করে রাজত্ব করার জন্য মহাব্যস্ত। শস্যশ্যামলকে মরুকান্তার না বানালে দুনম্বর কল্কে পাবে না।’

থমকে যাই, বারবার থমকে যাই। এই তো যুদ্ধের অনিবার্য যুক্তি! ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করার জন্যই পৃথিবীতে সব যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে।  কিন্তু একনম্বর শান্তির সঙ্গে দুনম্বর শান্তির লড়াই তো বেশ প্রথাসম্মত। এই যুদ্ধ না-হলে ‘সুপ্রিম্যাসি’ অর্জন করা যাবে কীভাবে?

এই ‘সুপারলেটিভ’ বিশেষণের জন্য যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত, প্রস্তুত যূপকাঠ। শিশুরাই সব থেকে প্রথম ও সহজ বলিদানের উপযুক্ত।  

3 Comments

  • যুদ্ধ হলো একটি ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া এবং কখনোই তা কাম্য নয়। অনেক সময় নিজেকে শক্তিশালী প্রমাণ করার জন্য পরিস্থিতি এত চরমে উঠে যায় যে যুদ্ধকে এড়ানো যায় না। যুদ্ধেসবচেয়ে বেশি নিরীহ শিশু ও নারীদের প্রাণ অকারণে চলে যায় একথা সত্য ।
    খুব ভালো লাগলো বেশ গুছিয়ে,যথাযথ যুক্তিপূর্ণ এবং সময়োচিত এই লেখাটি। বেনিনির ভাস্কর্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে লেখাটির শুরু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ঋদ্ধ হলাম লেখাটি পড়ে।

  • বেশ সমৃদ্ধ হলাম।

  • যুদ্ধে শিশুদের এগিয়ে নিয়ে চলা হয় বীরবিক্রম এর গাথা শুনিয়ে শুনিয়ে। তোমার এই লেখা পড়তে পড়তে “ব্ল্যাক ডায়মন্ড ” সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল যেখানে ইস্কুলে যাওয়ার বদলে বন্দুক হাতে ক্ষমতর শিখরে থাকা মালিকদের হুকুম তামিল করতে হবে। ছোট ছোট বাচ্চারা এ.কে ৪৭ হাতে আগুনের উল্লাসে মেতেছে। যুদ্ধ বলো ক্ষমতার পুতুল বলো একটা সমাজকে আয়ত্তে রাখতে গেলে প্রভূত্ব ফলাতে হয় একদম শিশুদের নির্মম হত্যা অথবা হত্যাকারী বানিয়ে।
    চমৎকার একটা লেখা পড়লাম মনে থেকে যাবে। যা তোমার সব লেখাই সমৃদ্ধ করে।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *