বাল্মীকি রায়
গদ্য
বাল্মীকি রায়
একটা যুদ্ধই আমাদের ঝান্ডাবাজ এবং ফান্ডাবাজ বানিয়ে দিল
একটা বিনা যুদ্ধে নাহি দেব… ধর্মযুদ্ধই আমাদের ঝান্ডাবাজ এবং ফান্ডাবাজ বানিয়ে দিল! কেউ ঝান্ডা ধরলাম পাঁচ ভাই মানে, পাণ্ডব ফ্রণ্টের পক্ষে, কেউ উঁচা গলায়, ( চোরের মা-র গলায় ) হমারা ঝান্ডা উচ্চা রহেগা বলে, মলেস্টেসন, দং-জং, গুম খুনের পক্ষে পতাকা নাড়ালাম! কারণ গীতার অন্ধিসন্ধি, সবকিছু তত্ত্বতালাশ করে ভুবনের কানকাটা মাসি-পিসি এবং গোয়েবলসকাকুরা বোঝাল, যুধিষ্ঠির মোটেই ধোয়া তুলসিপাতা ছিল না! সেও অশ্বত্থামা হত…বলে নরক দর্শন করেছে! অর্থাৎ মুড়িঘণ্টও যা চপ মুড়িও তাই!
দ্রৌপদীসহ চার-পাণ্ডব স্বর্গের উদ্দেশে বেরিয়ে শেষমেশ রাস্তাতেই এক-এক করে পাহাড় থেকে পড়ে দুর্ঘটনায় মারা গেলেন! অবশ্য মহর্ষি ব্যাসের পোস্টমর্টেমে, এইসব মৃত্যুর কারণ হিসেবে জানা গেল, সস্ত্রীক চার পাণ্ডবের চারিত্রিক কিছু সূক্ষ্ম ত্রুটি বা আসক্তির কথা! যদিও যুধিষ্ঠির স্বর্গে পৌঁছে দেখলেন, দুর্যোধন তাঁর আগেভাগেই সেখানে পৌঁছে ইন্দ্রের সঙ্গে বসে বহালতবিয়তে ধর্মযুদ্ধের বানান লিখছেন, ম আর দ! চোখের সামনে এমনতরো ওএমআর শিট-কেলেঙ্কারি যুধিষ্ঠির আর কাঁহাতক সহ্য করতে পারেন! তিনি ক্রমশ ভিসুভিয়াসস্কোয়ার হয়ে একটা লাভাস্রোতের ওয়াক তুলতেই, ফান্ডাবাজ ইন্দ্র জানালেন, দেবী গঙ্গা… এবং ধর্মরাজের আশীর্বাদধন্য কুরুবংশে জন্মানোর পুণ্যফলেই নাকি, দুর্যোধনের স্বর্গপ্রাপ্তি!
যাইহোক ফা ন্ডা বা জ, এই শব্দটা সার্চ করতে গিয়ে দেখলাম, এর মানে ( জ্ঞানদা-গুগলের ইনফর্মেশন অনুযায়ী ) অশ্লীলধরনের কিছু-একটা হবে বা হতে পারে। তাহলে কি, সংকরায়ন হওয়া বাংলাভাষার ফন্দিবাজ বিশেষণ থেকেই তৈরি হয়েছে এই অশ্লীল শব্দটা! আর এই অশ্লীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে আমাদের ব্রজের কানাই মানে, একসময় কদম্বের ডালে বসে থাকা কানু…! অবশ্য তখন তিনি আর ব্রজের রাখালবালকটি নেই,ততদিনে তিনি দ্বারকার রাজা বা শাসক হয়ে বসেছেন। যদিও আরেক মাতুলঘাতী যুদ্ধে কংসকে মারার পর টিটুলার হেড করে উগ্রসেনকে দ্বারকার রাজসিংহাসনে বসানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর দাদা বলরামের বদলে কৃষ্ণ-ই দ্বারকার মুকুটহীন রাজা হয়ে রাজ্যপাট চালাতে শুরু করেন। এবং সেই কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথমদিবসেই, উৎসবে ব্যসনে চৈব দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবে রাজদ্বারে শ্মশানে চ যঃ তিষ্ঠতি স বান্ধব-আত্মীয়তায় অর্জুনকে তাঁর চিত্র-বিচিত্র একখানা বহুরূপী চেহারা দেখিয়ে বোঝালেন, কেউ কারও নয়! আর এইসব কথায় ব্রেনওয়াশ করে অর্জুনকে মা ফলেষু কদাচন…ইত্যাদি বক্তব্যে তাতিয়ে বললেন, ওহে দোস্ত, তুমি ঝাঁকা থেকে তির তোলো এবং ওইসমস্ত দাগি-পচা শরীর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আত্মাগুলোকে বের করে এসো মুক্ত করো, মুক্ত করো অন্ধকারের এই দ্বার…!
এই মুহূর্তে অবশ্য গান নয়, একসময় লেখা একটা পদ্যের কথা মনে পড়ল এবং বর্তমান লেখাটির উদ্দ্যেশ্য, বিধেয় বোঝানোর জন্য সেটা সাপলি হিসেবে এখানে সেঁটে দিলাম!
হা কৃষ্ণ! হা কৃষ্ণ! বলে
রাধে সারাদিন কাঁদে,
স্পন্ডেলাইটিসের ব্যথাটা
ফের চাগিয়েছে কাঁধে!
ভেজালের যুগে, সে যন্ত্রণা
ঘাড়ের মশাটাও বোঝে
কিন্তু, কৃষ্ণ কেন,
কেষ্টাটাও আসেনাকো
দুটো কম্বিফ্লাম হাতে!
( তখন, গোমতীর তীরে)
কৃষ্ণ বলে, শোনো সখা,
তুমি তো নিমিত্ত, এঁরা সব মৃত
তোমার স্কন্ধটি শক্ত বলেই,
রেখেছি ভাই রাইফেলের কুঁদো!
( রাধা-কৃষ্ণউবাচ, দেবব্রত রায় )
আজকাল আমরা দরকার মতো গীতার উপদেশ নিজের নিজের কাজে লাগাই। মানে কাজের বেলায় কাজি, কাজ ফুরোলেই কিষাণজি! বিষয়টা অনেকটাই এরকম। দুনিয়ায় কেউ নিজের নয় তাই, শ্মশান-যাত্রী হওয়ার আগেও লাভ-লোকসান কষি। কেউ রাস্তায় ঘাটে মুখথুবড়ে পড়ে থাকলেও, যেচে তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিই-না, অযথা ৩৬ ঘায়ের ঝামেলায়।
বাজারে এরকম বিষয় নিয়ে আরেকটা গল্পও চালু আছে। ঈশ্বরচন্দ্র নাকি, কোথাও বলেছিলেন কিংবা, লিখেছিলেন, যেচে কাহারো উপকার করিও না! অর্থাৎ এই কে-কার-মায়ার সংসারে অযাচিত এবং বোঝা-বোঝা মায়া না-বাড়ানোই ভালো!
অবশ্য এসব কড়াপাকের উপদেশগুচ্ছ পড়া বা, শোনার আগেই দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমারঝুলি পড়ে ফেলেছি আমরা। আসলে বিদ্যাসাগরমাশাই এবং মহাভারতেরও আগে ওটাই আমাদের কাছে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ এবং অন্যতম সম্পত্তি ছিল কিনা! যাইহোক গল্পটা ছিল এরকম, দুখু নামে এক তাঁতীর মেয়ে কুঁড়ের উঠোনে বসে তুলো শুকোচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ-ই, বাতাস এসে তার সব তুলো উড়িয়ে নিয়ে গেল! তখন দুখু সেই তুলো ফিরিয়ে আনার জন্য কাঁদতে-কাঁদতে বাতাসের পিছনে দৌড়োতে লাগল। পথের মধ্যে একটা গাই-গোরু তার গোয়ালখানা কেড়ে দিয়ে যাওয়ার জন্য, এক কলাগাছ তার শরীর ঘিরে গজিয়ে ওঠা লতাপাতাগুলো টেনে দিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতেই, দুখু চোখের জল মুছে, গাইয়ের গোয়াল কেড়ে, খড় জল দিয়ে, কলাগাছ পরিষ্কার করে আবারও বাতাসের পিছনে ছুটতে শুরু করল। কিন্তু সাহায্যের জন্য দুখুর কাছে গাই-গোরু, কলাগাছ_এদেরকেই বা অনুরোধ করতে হল কেন? এদের দুরবস্থা কি টু-গুড মেয়ে দুখুর চোখে পড়েনি!
সেদিন দুখুর প্রতিটা মুহূর্ত কাটাছেঁড়া করলেই, ২০২৬এর আরেকটা ছবির শুরুয়াতও নজরে পড়ে যায়! আজকাল ছত্রিশ ঘা-এর ভয়ে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একজন সঙ্গাহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বদলে, আমাকে তো ডাকছে না, বলে কেউ-কেউ পাশ কাটাই! অথচ আজও জালিয়ানওয়ালাবাগের যে গণহত্যা বহু মানুষের চোখ জলে ভরিয়ে দেয়। ঘেন্নায় চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে সেই গণহত্যাকারী হ্যারি ডায়ারকে নাকি, জালিয়ানওয়ালাবাগ বিষয়ে তৈরি হওয়া কমিশনের প্রধান জিজ্ঞেস করেছিলেন, আহত কাউকে ডায়ার সাহায্য করেছিলেন কিনা! এর উত্তরে ডায়ার বলেছিলেন, আমার কাছে সাহায্য চাইলে নিশ্চয়ই তা করতাম! কিন্তু প্রশ্ন হল, একটি আহত শিশু কীভাবে ডায়ারের কাছে সাহায্য চাইবে!
তাহলে কি কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের পরপরই দুনিয়ার সমস্ত দুখুরাই বুঝে গেছিল যে এই গাই-গোরু, কলাগাছ…প্রত্যেককেই মানুষের ভাষায় কথা বলা জানতে হবে এবং না-চাইলে কাউকেই সাহায্য করা চলবে না! যদিও গীতা-স্বাক্ষাতে বেড়ে ওঠা এবং বেঁচেবর্তে থাকা এই দেশের মানুষ দু-হাজার ছাব্বিশের আজ পর্যন্ত জিরাফেও আছে, ধর্মেও আছে!
অ্যামেরিকান ব্যবস্থাপনায় যুদ্ধ অপহরণ দারিদ্র্য পেট্রল ডিজেল ডাল ভাত কেউ আয়তনে, কেউ দরদামে এক-একটা দানব হয়ে উঠেছে!