হৃদয় পাণ্ডে
কবিতা
হৃদয় পাণ্ডে
#১
বিষণ্ন রাইফেল
রাইফেলের চোখে ঘুম নেই,
ঘুম নেই ট্রিগারে রাখা আঙুলেও।
একটা গোলাপও নেই তার ব্যারেলে,
শুধু পোড়া বারুদের গন্ধ লেগে আছে।
সে জানে না কেন তাকে গুলি ছুঁড়তে হয়,
কে শত্রু, কে মিত্র
সব মুখই তো একরকম অন্ধকারে।
শুধু রাত শেষে গণনায় বদলায় সংখ্যা,
বদলায় শোকের রঙ।
রাইফেল চায় বিশ্রাম,
চায় মানুষের হাত ছেড়ে মাটিতে পড়তে,
চায় ছুঁড়ে ফেলে দিতে সব গোলাবারুদ,
কেবল একটিবার, কেবল একটিবার
কোনো কবির হাতে গিয়ে
কবিতা হয়ে উঠতে।
# ২
মাটিতে ফলছে মৃত্যু
মাটিতে ফলছে বুলেট,
লোহা গজিয়ে উঠছে মাঠ জুড়ে।
গাছে ধরছে বারুদ ফুল,
তার গন্ধে ঘুম পায় না পৃথিবীর।
যতবার মাটি চাষ করি
উপরে ওঠে একটা করে মৃতদেহ,
পুরনো যুদ্ধের হাড়,
রক্তাক্ত মানচিত্র।
জল দিয়ে সেচ দিলে উঠে আসে
গলিত শিরদাঁড়া, পচা জিভ,
কিছু নাম—
যাদের প্রতিবাদ হারিয়ে গেছে
আকাশের ওপারে।
শেষ হোক।
এই বিস্ফোরণ, এই আগুন, এই হিংসা।
পৃথিবীতে নামুক বৃষ্টি
ভিজে যাক মানুষের মন,
গলে যাক লোহার বর্ম।
আবার জন্ম নিক একটি শিশু,
বারুদের নয়, বৃষ্টির গন্ধে।
# ৩
যুদ্ধের ময়দানে ধর্ম
যুদ্ধের ময়দানে,
ধর্ম হাঁটে অভিজাত ভঙ্গিতে।
তার বর্ম সোনালী,
তলোয়ার ছুরি হয়ে ঢুকে পড়ে হৃৎপিণ্ডে।
সে বলে— আমিই আলো,
সে বলে— আমার পক্ষে মরলে স্বর্গে যাবে,
সে বলে— ওরা শত্রু, ওরা অপবিত্র।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে ক্ষুধার্ত শিশুরা,
ধ্বংসস্তূপে খুঁজে ফেরে মা’র মুখ।
তাদের কোনো ধর্ম নেই
তারা শুধু বাঁচতে চায়।
ধর্ম তখন ব্যস্ত
সংখ্যা গোনে, পতাকা তোলে,
মাটি দখল করে, ইতিহাস লিখে।
যুদ্ধের ময়দানে
শান্তি পড়ে থাকে রক্তাক্ত,
আর ধর্ম, সে বিজয় মিছিল করে
একেকটা কফিনের ওপর দিয়ে।
# ৪
অতঃপর কবির মৃত্যু
শহরের অলিগলি তখন নিস্তব্ধ,
দেয়ালে লেখা শব্দগুলো রক্তাক্ত,
কালি মুছে গেছে বুলেটের আঘাতে,
এবং অতঃপর, কবির মৃত্যু ঘটল।
তার কবিতার খাতা খোলা ছিল টেবিলে,
শেষ লাইনটা অসম্পূর্ণ—
“পৃথিবী কি সত্যিই কোনোদিন…”
বাকিটা জানা গেল না।
রাতের বাতাসে তখনও ঘোরাফেরা করছিল তার স্বর,
মানুষেরা ভুলে গেল খুব দ্রুত,
তার নাম ঢেকে গেল নতুন কোনো বিজ্ঞাপনের পোস্টারে,
তার স্বপ্ন চাপা পড়ল রাষ্ট্রের ধুলোর নিচে।
তবে কিছু পাতা উড়ে গেল বাতাসে,
কিছু শব্দ থেকে গেল দেয়ালের ফাঁকে,
কিছু বাক্য ছড়িয়ে পড়ল বিদ্রোহীদের মিছিলে,
এবং কবির মৃত্যু হলো,
কিন্তু তার কবিতারা এখনো বেঁচে রইল।
# ৫
সারসংক্ষেপ: যুদ্ধ, মৃত্যু, পুনরায় যুদ্ধ
যুদ্ধ শেষ হয় না।
শুধু মৃতদেহ বদলায়, পটভূমি পাল্টায়,
অস্ত্রের ধরন আধুনিক হয়।
একটা মৃত্যু থেকে আরেকটা যুদ্ধের জন্ম হয়,
আর প্রতিটি যুদ্ধ আবার নতুন কিছু মৃত্যুর প্রতিশ্রুতি।
শিশুরা বড় হয় যুদ্ধের গল্প শুনে,
তারপর অস্ত্র তুলে নেয়
বেঁচে থাকার জন্য বা মরার জন্য।
মৃত্যুরা জমা হয় রাষ্ট্রের পুরস্কার ঘরে,
আর যুদ্ধ ফিরে আসে, ধীরে, নিঃশব্দে, নতুন নামে।
পুনরাবৃত্তি চলে,
যুদ্ধ–মৃত্যু–যুদ্ধ
এই তিন শব্দই ইতিহাসের আসল ব্যাকরণ।