Email: info@kokshopoth.com
April 28, 2026
Kokshopoth

দেবদত্ত চক্রবর্তী

Apr 24, 2026

 গদ্য

দেবদত্ত চক্রবর্তী

যুদ্ধ, মৃত্যু এবং মানুষ: একটি আন্তঃবিষয়ক বিশ্লেষণ


মানব সভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ একটি পুনরাবৃত্ত বাস্তবতা, কিন্তু এর প্রকৃতি ও উৎস নিয়ে বিতর্ক আজও অব্যাহত। মানুষ কি স্বভাবগতভাবে সহিংস, নাকি সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ যুদ্ধের সৃষ্টি? এই প্রশ্নটি কেবল নৈতিক বা দার্শনিক নয়, বরং জীববিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি কেন্দ্রীয় অনুসন্ধান।

এই প্রবন্ধে আধুনিক ইথলজি, সামরিক ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে এই যুক্তিটি প্রতিষ্ঠা করতে চাইব যে, মানুষ স্বভাবগতভাবে অন্তঃপ্রজাতির  হত্যার প্রতি প্রবণ নয়; বরং যুদ্ধ একটি সামাজিকভাবে নির্মিত প্রক্রিয়া, যা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিকশিত।

ইথোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ: আগ্রাসন ও প্রজাতিগত সীমাবদ্ধতা

আধুনিক প্রাণী আচরণবিদ্যা বা ইথোলজির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী কনরাড লরেঞ্জ (Konrad Lorenz, ১৯০৩-১৯৮৯) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ On Aggression (১৯৬৬)-এ দেখিয়েছেন যে, প্রাণীজগতে আন্তঃপ্রজাতি (interspecies) হত্যাকাণ্ড সাধারণ ঘটনা, কিন্তু অন্তঃপ্রজাতি (intraspecies) হত্যা তুলনামূলকভাবে বিরল। লরেঞ্জ, যিনি ১৯৭৩ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, জোর দিয়ে বলেছিলেন যে প্রাণিজগতে আগ্রাসন একটি প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি হলেও তা নিয়ন্ত্রিত এবং কাঠামোবদ্ধ। তার মতে, অধিকাংশ প্রাণীর মধ্যে অন্তঃপ্রজাতি সহিংসতা (Raitualized Aggression) আনুষ্ঠানিক আগ্রাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে গুরুতর আঘাত বা মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছায় না।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় শিংওয়ালা হরিণ বা বাইসন যখন একই প্রজাতির সদস্যের সঙ্গে লড়াই করে তখন তারা প্রায়শই শুধু মাথা দিয়ে গুঁতো দেয় বা শিং আটকে রেখে চাপ দেয়– কিন্তু কখনোই প্রাণঘাতী হামলায় জড়ায় না বা প্রাণঘাতী আঘাত করে না। কিন্তু অন্য প্রজাতির সঙ্গে লড়াইয়ে তারা পেট চিরে বা শিং দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করে এবং বিলুপ্তি এড়ায়। এই পর্যবেক্ষণ থেকে লরেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতিষ্ঠা করেন, মানুষও যেহেতু একটি সামাজিক প্রজাতি তাই তার মধ্যেও অন্তঃপ্রজাতি হত্যার বিরুদ্ধে একটি অন্তর্নিহিত প্রতিবন্ধকতা কাজ করে।

যুদ্ধক্ষেত্রের আচরণ


এই সম্বন্ধে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমাকে ফিরে যেতে হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে। ১৯৪৭ এ প্রকাশিত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এল এ মার্শাল (S. L.A. Marshall) যিনি যুদ্ধক্ষেত্রের ইতিহাসবিদ হিসেবে হাজারো সৈনিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ “ম্যান এগেইনস্ট ফায়ার” (“Men Against Fire”) ১৯৪৭’এ দাবি করেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে মাত্র ১৫ থেকে 25 শতাংশ সৈনিক সরাসরি শত্রুর দিকে গুলি চালায়। অধিকাংশ সৈনিক, জীবন সংকট থাকা সত্ত্বেও, হত্যা করতে অনিচ্ছুক থাকে।

যদিও মার্শালের পদ্ধতি পরবর্তীকালে সমালোচিত
হয়েছে, তবু তার গবেষণা একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেঃ  কেন প্রশিক্ষিত সৈনিকও হত্যার মুহূর্তে দ্বিধাগ্রস্ত হয়?
এই দ্বিধা ইঙ্গিত দেয় যে মানুষের মধ্যে সহানুভূতি সামাজিক বন্ধন এবং নৈতিক সচেতনতা যা বিবর্তনের ফল সহজে দমনযোগ্য নয়।

প্রাক- ঐতিহাসিক প্রমাণ : যুদ্ধের উদ্ভব

যদি যুদ্ধ মানব প্রকৃতির অন্তর্নিহিত অংশ হত, তবে স্পষ্ট প্রমাণ প্রাগৈতিহাসিক যুগে পাওয়া যেত। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। আমরা দেখি যে প্রাচীন গুহাচিত্রে বাইসন, ঘুড়া বা হরিণের শিকারের হাজারো দৃশ্য আছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে যুদ্ধের একটিও স্পষ্ট চিত্র নেই (উচ্চ পেলিওলিথিক যুগে)। আজ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো হাজারো প্রাগৈতিহাসিক কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে। বহু গবেষকের মতে, এগুলোতে সংঘবদ্ধ যুদ্ধের (organised warfare) স্পষ্ট প্রমাণ খুবই কম।
ব্যক্তিগত সহিংসতা বা ছোটখাটো সংঘর্ষ (যেমন সুদানের জেবেল সাহাবা সাইটে ১৩০০০ বছর আগের কিছু আঘাতের চিহ্ন) থাকলেও, সংঘটিত যুদ্ধের বিস্তৃত প্রমাণ মূলত নিওলিথিক যুগ থেকেই শুরু।

ফরাসি দার্শনিক জঁ-জ্যাক রুসো (Jean-Jacques Rousseau) তাঁর Discourse on the Origin of Inequality-এ যুক্তি দেন যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবই সামাজিক বৈষম্য সংঘাতের সূচনা করে।
এবং তার এই বিখ্যাত যুক্তিটি তার ‘সামাজিক বৈষম্যের উৎস হিসেবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ তত্ত্ব থেকে উল্লেখিত। তাঁর মতে বৈষম্য প্রকৃতিগত নয়, বরং সামাজিক ও ঐতিহাসিক এবং এর মূলে আছে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা। যে মুহূর্ত থেকে মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদকে (যেমন জমি) নিজের বলে দাবি করতে শুরু করে সেই মুহূর্ত থেকেই প্রাকৃতিক সাম্যের মৃত্যু ঘটে এবং শুরু হয় মানুষের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, যুদ্ধ এবং অপরাধের। এবং পরবর্তী সময়ে আমরা দেখি, কৃষি বিপ্লবের ফলে জমির মালিকানা, সম্পদের সঞ্চয় এবং সামাজিক স্তরবিন্যাস — যা সম্ভবত সহিংসতার ভিত্তি স্থাপন করে। প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসও এই সময় থেকেই প্রমাণ তোলে ধরে যে, মানুষ সামরিক দুর্গ তৈরি করে, গুহাচিত্রে তীরন্দাজদের মধ্যে সংঘর্ষের দেখা মিলে এবং কঙ্কালে তীর, ক্লাব বা অন্যান্য অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন বৃদ্ধি পায়। এ থেকে একটি যৌক্তিক অবরোহনে পৌঁছা যায় যে, যুদ্ধ আসলেই একটি (Post Agricultural Phenomena) কৃষি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ যা অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

মনোবিজ্ঞান এবং সামরিক প্রশিক্ষণ: প্রতিবন্ধকতা ভাঙ্গা

মানুষের অন্তর্নিহিত নৈতিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার জন্য আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করা হয়।
Dave Grossman তাঁর “On Killing” (১৯৯৫)-এ দেখান যে কিভাবে সৈনিকদের ধাপে ধাপে হত্যা করতে অভ্যস্ত করা হয়
অপারেন্ট কন্ডিশনিং (Operant Conditioning): মানবাকৃতির টার্গেট ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়াশীল শুটিং প্রশিক্ষণ।
ডিহিউমেনাইজেশন (Dehumanization):  শত্রুকে অমানবিক রূপে উপস্থিত করা যেমন রুয়ান্ডা গণহত্যায় (১৯৯৪) হত্যাকারীদের বলা হয়েছিল যে টুটসি সম্প্রদায় ‘তেলাপোকা’ যাদের পিষে ফেলতে হবে।
মানসিক দূরত্ব: প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি সংযোগ কমানো।
এই পদ্ধতিগুলি ব্যবহারের ফলে কোরিয়ান ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে গুলি চালানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় কোরিয়ান যুদ্ধে গুলি চালানোর হার বেড়ে ৫৫ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের ৯০ থেকে ৯৫% হয়। কিন্তু এর ফলাফল ছিল মর্মান্তিক ভিয়েতনাম ফেরত সৈনিকদের মধ্যে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার PTSD এর হার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছিল।
এখানে এসে আমরা একটি মৌলিক দ্বন্দ্বের সামনে দাঁড়াই : মানুষকে হত্যা করতে শেখানো যায়, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা মানসিকভাবে গ্রহণ করা কত কঠিন, আমরা কি তার চিন্তা করি?

যুদ্ধের রাজনৈতিক অর্থনীতি

যুদ্ধের স্থায়িত্ব বুঝার জন্য এর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ অপরিহার্য একটি যুদ্ধের পরিণতি ভোগ করে মূলত সৈনিক তাদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষরা তবে যুদ্ধ কেন হয় এতে লাভবান কারাই বা হয়:

এক) রাষ্ট্র ও ক্ষমতা: রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই বহির্শত্রুর ধারণা ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ ঐক্য তৈরি করেন। অনেক নেতাই যুদ্ধ বা সংঘাতকে ব্যবহার করে নিজের অথবা পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়াতে, অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি থেকে মানুষের দৃষ্টি ফেরাতে বা নির্বাচনী সুবিধা নিতে চান। এটাকে বলা হয়- “Rally ’round the flag’ effect” । যুদ্ধ বা বহির্শত্রুর হুমকির মুখে মানুষ নেতার পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়। সমালোচনা কমে। এবং জনপ্রিয়তা বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জর্জ ডব্লিউ বুশ-এর কথা। ২০০১’এর ৯/১১ হামলার পর তার অনুমোদন রেটিং ৫১ শতাংশ থেকে এক লাফে পৌঁছে যায় ৯০ শতাংশে।এবং একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের আগে আমরা দেখেছি পুতিনের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছিল।  কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর সঙ্গে সঙ্গে, জাতীয়তাবাদী প্রচারের মাত্রা বাড়িয়ে, তিনি তার হারানো জনপ্রিয়তা অনেকটাই ফিরে পান।

দুই) অস্ত্র শিল্প: যুদ্ধ একটি লাভজনক শিল্প; অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রির বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় Lockheed, Martin, Raytheon (RTX), Boeing, General Dynamics এর মত কোম্পানিগুলি যুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। এবং এরা সারা বিশ্বজুড়ে সর্ব সময়ের জন্য একটি যুদ্ধযুদ্ধ খেলা লাগিয়ে রাখতে চায়।
ইরাক আফগানিস্তান যুদ্ধের ফলে গত 20 বছরে এই কোম্পানিগুলো  ট্রিলিয়ন ডলারের কন্ট্রাক্ট পেয়েছে। ২০২২ এর ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজা সংঘাতের পর তাদের স্টক ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

তিন) মিডিয়া বা জনমনস্তত্ব: “Schadenfreude” বা অন্যের দুঃখে আনন্দ পাওয়া- যুদ্ধকে একপ্রকার ভোগ্যপণ্যে রূপান্তরিত করে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় ইউক্রেন যুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাশিয়ান সেনাদের ধ্বংসের ভিডিও ভাইরাল হয় এবং বহু লোক ইউক্রেনিয়ানদের কষ্ট দেখে আনন্দ উপভোগ করে। এই কাঠামো যুদ্ধকে একটি ” Self- perpetuating system”-এ পরিণত করে, যা মানব প্রকৃতির বাইরে গিয়ে নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটঃ ভূমি, পরিচয় ও সংঘাত

বর্তমান বিশ্বে সংবাদগুলোর একটি বড় অংশ- ভূমি, জাতিগত পরিচয় এবং রাজনৈতিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশেষত গাজা অঞ্চল- এই বাস্তবতার একটি জটিল উদাহরণ, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, রাষ্ট্রনীতি এবং ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িত। এই প্রেক্ষাপট রুশোর তত্ত্বকে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলে : সম্পত্তি মালিকানা এবং ক্ষমতার প্রশ্নই সংঘাতের কেন্দ্রে অবস্থান করে।

উপসংহার

এই প্রবন্ধের শেষ চমক টি এই যে এখন আমাদের আর অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে মানুষ জন্মগতভাবে হত্যা প্রবণ নয় বরং বিবর্তনীয় মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক উপাদান গুলো একত্রে মানুষের মধ্যে সহিংসতা বিরুদ্ধে একটি অন্তর্নিহিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
তবে রাষ্ট্র অর্থনীতি ও মতাদর্শ এই প্রতিরোধকে অতিক্রম করে যুদ্ধকে সম্ভব করে তোলে। ফলে যুদ্ধকে মানব প্রকৃতির অনিবার্য ফল হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক নির্মাণ হিসেবে বোঝা যুক্তিসঙ্গত। এবং স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে সেই সামাজিক কাঠামোগুলোর পুনর্বিন্যাসে, যা সংঘাতকে জন্ম দেয়– বিশেষতঃ সম্পত্তি, বৈষম্য এবং ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ।

এই উপলব্ধি মানবতার জন্য আসার উৎস : যদি যুদ্ধ মানুষের তৈরি হয়, তবে তা একমাত্র মানুষের দ্বারাই রূপান্তরিত বা বিলুপ্ত করা সম্ভব।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *