Email: info@kokshopoth.com
April 26, 2026
Kokshopoth

সিদ্ধার্থ শেখর চক্রবর্তী

Apr 24, 2026

 গদ্য

সিদ্ধার্থ শেখর চক্রবর্তী

অপ্রাসঙ্গিক যুদ্ধের নিস্তব্ধতা

 

‘ভূমিকম্পের মতই যুদ্ধও তুমি কোনোদিন জয় করতে পারবেনা।’ ( জেনেট রঙ্কিন)

যুদ্ধ একমাত্র খেলা, এবং খেলা শব্দটি সচেতন ভাবেই ব্যবহার করা হলো, যেখানে কোনো পক্ষেরই স্পষ্ট জয় হয়না, তবে সন্দেহাতীত ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। রাজা বাদশারা যে খেলার মাধ্যমে সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করতেন, বর্তমান রাষ্ট্রনায়কদের কাছে এখন তা কেবল শক্তি দেখানোর মাধ্যম। অদ্ভুত এক পৌরুষের  লোভ নিরন্তর যুদ্ধ শুরু করার প্ররোচনা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো রাষ্ট্রের পৌরুষত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ইতিহাস পড়ার উদ্দেশ্য ভুল থেকে শিক্ষা নেবার হলেও, আমরা শিখিনা। বদলানোর চেষ্টা করি। বদলা নেবার উদ্যমে নামি। অনেকাংশেই লক্ষণীয়, যে কোনো জাতির ঘুরে দাঁড়াবার একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে যুদ্ধ। অহরহ যুদ্ধের জিগির তুলে, ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, প্রথম মিসাইল ছোঁড়া অবধি যা হাতের নাগালে থাকে, যথাযথ প্রত্যাঘাতের পর সেটাই হয়ে ওঠে দীর্ঘকালীন, একঘেয়ে এবং বিরক্তিকর। একসময় আর জয় নয়, সম্মানীয় বিদায়ের আশায় বসে থাকতে হয় অযাচিত অনুপ্রবেশকারীকে। যা আমরা দেখছি রাশিয়া ইউক্রেন অথবা আমেরিকা ইসরাইলের ইরান আক্রমণের পর।শুরুতে শক্তিশালী রাষ্ট্রের পক্ষে  সহজ জয় সময়মাত্র মনে হলেও, তথাকথিত দুর্বল রাষ্ট্রও হাল ছেড়ে পালিয়ে যায়নি এখনো। যত বেশিদিন এই লড়াই চলতে থাকবে, ভঙ্গুর হতে থাকবে নিরঙ্কুশ বিজয়ের ক্ষমতা।

 

লিও টলস্টয় বলেছিলেন, ‘মানুষের যুক্তিবোধের কি দরকার যদি হিংসার সাহায্যেই প্রভাবিত করা যায়?’ যান্ত্রিক অগ্রগতির পালে হাওয়া লাগিয়েও, নিরাপত্তা খাতে বেশ ভালো রকমের বরাদ্দ থাকে প্রায় সব দেশেরই। নিজস্ব নির্মাণের উদ্যোগ নেবার পরেও, আমদানি করা হয় প্রচুর অস্ত্র। দেশের সার্বিক আয়ের একটা মোটারকমের অংশ খরচ হয় এজন্যে, যে সম্পদ হয়তো ব্যবহার করা যেত সার্বিক শিক্ষা উন্নতিতে, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অথবা কৃষিশিল্পের ক্রমান্বয়ে বর্ধিত সমস্যার নিরসনে। কিন্তু জনগণকে বুঝিয়ে সন্তুষ্ট রাখা হয় এই বলে যে, দেশের সংজ্ঞা বাঁধা চার দেওয়ালের সীমানাতেই। সে বৃত্তের বাইরে রয়ে গেলো যারা, তারা হয় বর্তমানে শত্রু অথবা ভবিষ্যতে শত্রু হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। আগাম  শত্রুপক্ষের এই ভয়টা রাখা খুব দরকার অস্ত্র বেচে ব্যবসা বাড়াতে। যুদ্ধ তাই একটি মিলিয়ন ডলার ব্যবসাও বটে। এই লাভজনক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে নিরাপত্তাজনিত ভীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক নীতিতে অস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তোলার প্রয়োজন পড়ে।বিক্রি বাড়ে অস্ত্রের, বড় অঙ্কের বিনিময়ে নিরন্তর গোপন গবেষণা চলতে থাকে আরো উন্নত অস্ত্র নির্মাণের।শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, দেশে মজুদ অত্যাধুনিক অস্ত্রের পরিমাণই নির্ধারিত করে দেয় দেশটির প্রলম্বিত শান্তির দৈর্ঘ্য।

 

ইদানীং যুদ্ধের সংখ্যা বেড়েছে, এবং পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যুদ্ধ চালানোর খরচ। যে বিরোধগুলো আলোচনার টেবিলে বসে মীমাংসা করে নেওয়া যায়, সেটাই নেমে আসছে রণাঙ্গনে। যে যতটা স্বীকৃত শক্তিতে বলীয়ান, সে ঠিক ততটাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসেন আলোচনায়।আর তাই, সীমানা নির্ধারণের মতো তুচ্ছ সমস্যাগুলোও ছোট খাটো যুদ্ধের চেহারা নিয়ে নিচ্ছে অজান্তেই। আজারবাইজান আর্মেনিয়া যেমন, কম্বোডিয়া থাইল্যান্ড যেমন।

 

বিগত শতকে দু দুটো নিষ্ফলা বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তিরক্ষার্থে, আলোচনার মাধ্যমে বিচার ত্বরান্বিত করতে এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা স্থাপন করা হয়েছিল। চুক্তি সই হয়েছিল প্রচুর। অগুন্তি উদ্যোগ চোখে পড়েছিল বিশ্ববাসীর। দীর্ঘকালীন এক শান্তির প্রয়োজন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল। বর্তমানে এটা এখন স্পষ্ট যে, এই সংস্থাগুলো তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তার প্রচুর কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, উগ্র লালসার সঠিকরূপে বিকল্প তৈরি করতে না পারা, বিভিন্ন জাতি ও দেশকে ভিন্ন ভাবে উপস্থাপিত করা , স্থিতিশীল উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারা এবং বিশেষ কিছু শক্তির ওপর অনেকাংশে নির্ভর হয়ে পড়া। রেফারি হিসেবে যাকে মাঠে আনা হয় তার প্রতি যদি যথাযোগ্য সম্মান পরিলক্ষিত না হয়, তবে অবাধ্য খেলোয়াড়রা নিজেদের মতো করে চটজলদি নিয়ম গঠন করে নিতে চাইবে। তাদের হাতেই থাকবে ম্যাচের রাশ। বাকিরা স্রেফ দর্শক। অনৈতিক লড়াই দেখে যাওয়া, এবং ভুক্তভোগী হওয়া ছাড়া তাদের যেন আর কোনো ভূমিকা নেই।

 

সবচাইতে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে নির্বাক পরিবেশ। আমরা যদি বৃহত্তর যুদ্ধক্ষেত্রে অরণ্যের বেপরোয়া ধ্বংস ছেড়েও দেই, একেকটি যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে এবং সেটার বেহিসেবি প্রয়োগে অত্যধিক পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হচ্ছে, তার ফলে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা অতিরিক্ত পরিমাণে বাড়ছে। কোথাও কোনো শান্তিচুক্তি অথবা যুদ্ধ বিরতিচুক্তিতে লেখা থাকেনা, এই ক্ষতি সামাল দিতে যথোপযুক্ত গাছ রোপণের কথা। শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে গঠিত স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র নিমেষেই নিকেশ করে ফেলা হয়। জীব বৈচিত্রে মারাত্বক প্রভাব ফেলে যুদ্ধকালীন অস্থিরতা। মৃত্তিকা এবং জলীয় দূষণ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে সামগ্রিক অঞ্চল জুড়ে যা দেশীয় অর্থনীতিকে বেশ কয়েক দশক পিছিয়ে দিতে সক্ষম। যুদ্বাস্ত্রে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ধীরে ধীরে ভূমির সঙ্গে মিশে থেকে কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় ঘটায়।

 

বাংলা অভিধানে একটি শব্দ আছে – যুদ্ধবাজ। আমরা শব্দটিকে খুব একটা ভালো অর্থে ব্যবহারও করি না। সাধারণত যুদ্ধবাজ বলতে বোঝায়, যারা অনবরত বিবাদ বা লড়াইয়ে লিপ্ত থাকতে চায় এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করে। কথাটি আমাদের কাছে অবমাননাকর। কিন্তু যারা যুদ্ধের উন্মাদনাতেই পৌরুষত্ব জাহির করতে চায়, তাদের কাছে এ এক নেশার মত। অথচ কিছু রাষ্ট্রনেতার কাছে, দেশের জনগণের কাছে সঠিক নেতা হিসেবে নিজেকে উচ্চতায় তুলে রাখার মত ছোটখাটো যুদ্ধ খুবই ভালো হাতিয়ার। এতে জনগণকে যেমন দেশপ্রেমে ভুলিয়ে রাখা যায়, তেমনিই ভোটারদের কাছে উগ্র দেশপ্রেম বিক্রি করে ভোটের বাক্সে বাড়তি ফায়দা তোলা যায়। মার্গারেট মিডের মতে, ‘যুদ্ধ শুধুমাত্র একটি আবিষ্কার, জৈবিক প্রয়োজনীয়তা নয়’, তবু বর্তমান মানব সভ্যতা যুদ্ধকে ব্যবহার করছি অগ্রগতির এক সিঁড়ি হিসেবেই, অর্থনেতিক এবং পরিবেশতান্ত্রিক বিপর্যয় উপেক্ষা করেই। খনিজ তেলের মূল্য নির্ধারণ করেনি? আক্রমণ করে বসা যাক নির্দিষ্ট দেশকে। শত্রু দেশের থেকে আমদানি হচ্ছে বিপুল? কিছু অস্ত্র নিক্ষেপ করে শায়েস্তা করা যাক। পড়শি দেশ অন্য সংগঠনে যুক্ত হতে চাইছে? যুদ্ধের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

 

শান্তি খুবই মহার্ঘ্য বস্তু। এই জন্যে প্রতিটি দেশেই এবং আন্তর্জাতিক আঙিনায় শান্তি জাতীয় বোধকে বাহবা দেবার জন্যে পুরস্কার ঘোষণা করা হয় প্রতি বছর। এভাবে যুদ্ধের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকাকে আমাদের উৎসাহিত করতে হয়। মানুষের আদিম প্রবৃত্তি লড়াই। লড়াই করেই সে তার খাদ্য ছিনিয়ে আনতে শিখেছে, লড়াই করেই হাজার বিপত্তির মাঝে তাকে টিকে থাকতে হয়েছে সহস্র শতাব্দী জুড়ে। কিন্তু এই লড়াইয়ের অংশীদার যখন হয়ে ওঠে কোটি কোটি মানুষ এবং হাতে রয়ে যায় অত্যাধুনিক অস্ত্র তখনই আমাদের ভয় পাওয়া উচিত। ভয় পাওয়া উচিত একক মানুষের অন্তর্নিহিত বোধগুলোকে। ভয় পাওয়া উচিত নিত্যনতুন আবিষ্কৃত যুদ্ধাস্ত্রকে।

 

যুদ্ধের মূল কারণ সবসময় যুদ্ধই। যুদ্ধকে মানবিকতার কোনো কোণ থেকেই সমর্থন করার জায়গা নেই। তবু কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয় যুদ্ধকে মহিমান্বিত করতে। আগ্রাসী মনোভাবকে উন্নয়নের ভিত হিসেবে মান্যতা দিতে। তাতে আখেরে ক্ষতি হয় উন্নয়নেরই। এই আপাত নিরীহ অঙ্ক যুদ্ধবাজ নায়করা জানে না সেটা নয়। যুদ্ধকে তারা দেখে ব্যবসা হিসেবেই। বাকি সব ব্যবসারই যেমন পার্শ্ব প্রভাব থাকে, যুদ্ধের ভয়াবহ বিপর্যয়কেও স্বাভাবিক আনুষঙ্গিক ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়।

 

একবিংশ শতাব্দীতে মারণক্ষয়ী এই রোগ থেকে বাঁচতে আরো সচেতন হওয়া আমাদের আশু কর্তব্য। যুদ্ধ দিয়ে যুদ্ধ জয় করার যারা চেষ্টা করছে তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছে। প্রয়োজন যুদ্ধবাজদের নায়করূপে গণ্য করা বন্ধ করা। শান্তি অথবা ক্ষমা উচ্চারণকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখা।  ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট সেই কবেই বলে গিয়েছেন, ‘যুদ্ধ বন্ধ করার একমাত্র উপায় শান্তিকে নায়কোচিত খেতাব দেওয়া।’ বিভেদকামী মানসিকতা পরাস্ত করে, সাদা পতাকার স্বপ্ন নিশ্চিত করাই লক্ষ্য হোক আমাদের।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *