রিটন খান-এর প্রবন্ধ
রিটন খান-এর প্রবন্ধ
বুলডোজার ও ক্ষমতা: ধ্বংসের রাজনীতি
রিটন খান লেখক, প্রকৌশলী। তবে তাঁর পরিচিতির সবচেয়ে মজার দিক হলো, তিনি একাধারে কল্পনাবিলাসী ও প্রযুক্তিপাগল মানুষ। বইয়ের পাতায় হারিয়ে যান, আবার কম্পিউটারের স্ক্রিনে বাস্তবতা খোঁজেন। নিজের মৌলিক লেখালেখির পাশাপাশি বই নিয়ে চর্চা করেন, নিয়মিত বই পর্যালোচনা লেখেন, অনুবাদ করেন, আর নানান রকম ভাবনার গদ্য সাজান।
শুধু প্রযুক্তি নয়, তাঁর আগ্রহের পরিধি আরও বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে “Strategic Planning for Public Libraries”এবং “Scrolls in the Age of the Book” বিষয়েও পড়াশোনা করেছেন। অর্থাৎ, আধুনিক গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপির জটিলতা দুই-ই তাঁর জানা। অতীত আর ভবিষ্যৎ—দুই দিকেই তাঁর সমান আগ্রহ।
প্রকাশিত বইঃ
গ্লোবাল মার্ক্সিজম – সিমিন ফাদে (অনুবাদ);দ্য নাইফ – সালমান রুশদী (অনুবাদ); বইচর্চা (প্রবন্ধ); ফ্যাসিবাদ (প্রবন্ধ); বুলডোজার (প্রবন্ধ); কবিতায় বুনি জীবনের সুর (কবিতা)।
বুলডোজার জিনিসটার সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় সাধারণত দূর থেকে দেখা, হলুদ রঙের এক ভারী যন্ত্র, সামনে লোহার ফলক, পেছনে ধুলো, আর তার চলার ভঙ্গিতে এমন এক নির্বিকার একরোখামি, যেন পৃথিবীকে সে কেবল দু’ভাগে ভাগ করে চিনতে শিখেছে, একদিকে যা দাঁড়িয়ে আছে, আর অন্যদিকে যা শিগগিরই আর দাঁড়িয়ে থাকবে না। ছোটবেলায় এ-রকম যন্ত্র দেখলে আমার কৌতূহলই হত বেশি, ভয় নয়। কারণ আমাদের শেখানো হয়েছিল, বুলডোজার উন্নয়নের জিনিস, রাস্তা করবে, মাটি কাটবে, জঙ্গল সরাবে, নতুন বাড়ি হবে, শহর বাড়বে। পরে বুঝেছি, উন্নয়নের অভিধানে অনেক সময় যে-শব্দগুলো মোলায়েম শোনায়, তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক পুরোনো হিংস্র ব্যাকরণ। বুলডোজার তার মধ্যে একটি।
যন্ত্রটি লোহার, কিন্তু তার ইতিহাস মাংসের। আজ আমরা যে নামটি শুনে এক যান্ত্রিক দানব কল্পনা করি, সেই “বুলডোজার” একসময় ছিল মানুষের নামধাম-ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো সন্ত্রাসের উপাধি। Reconstruction-পর্বের আমেরিকান দক্ষিণে, গৃহযুদ্ধ শেষ, দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে অবসিত, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ ভোটাধিকার পেয়েছে, গণতন্ত্রের নব্য কাঁচা অঙ্কুর মাটির ভিতর থেকে মাথা তুলছে, এমন সময় শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নেমে এল সেই অঙ্কুর পিষে দিতে। তারা এক প্রকারের জীবন্ত clearing machine, ভোটকেন্দ্রের পথে দাঁড়ানো কালো মানুষকে বোঝাতে চাইত, গণতন্ত্র তোমার জন্য নয়, নাগরিকত্ব তোমার জন্য নয়, রাষ্ট্র তোমাকে স্বীকার করলেও সমাজ করবে না। এই লোকগুলোকেই তখন “বুলডোজার” বলা শুরু হয়। শব্দটির আদি সুরে তাই যন্ত্রের গর্জনের চেয়ে মানুষের নিষ্ঠুরতার শব্দ বেশি।
এখানে ইতিহাসের বিদ্রূপটি হলো; পরে যে-যন্ত্রকে আমরা নির্মাণের প্রতীক ভাবলাম, তার নাম এসেছিল ধ্বংসের ক্ষেত্র থেকেই। ছুরি, রশি, চাবুক, আগুন, রাতের হামলা, ঘুমন্ত মানুষকে বিছানা থেকে টেনে বের করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া, গির্জার কাঠের কড়ি থেকে পাদরিকে ফাঁসিতে তোলা, ভোট দিতে গেলেই পিটিয়ে মারার হুমকি, এগুলোই ছিল সেই প্রথম বুলডোজিং। এক লুইজিয়ানা পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান ভোটার ডব্লিউ. ওয়াই. পেইনকে গভীর রাতে তুলে নিয়ে গাছে ঝুলিয়ে মারা হয়েছে; কাছেই এক কৃষ্ণাঙ্গ ধর্মযাজক, রেভারেন্ড মাইনর হোমস, চার্চের বিম থেকে ঝুলছিলেন, যেন ধর্ম আর নাগরিকত্ব দুটোই একসঙ্গে শাস্তি পাচ্ছে। এইসব বিবরণ পড়লে বোঝা যায়, গণতন্ত্রের শত্রুরা প্রায়শই সংবিধানের ভাষায় কথা বলে না, তারা শরীরের ভাষায় কথা বলে। তাদের যুক্তি রক্তাক্ত।
শব্দের উৎপত্তি নিয়েও কৌতূহল কম নয়। “বুলডোজার” নিয়ে নানা ব্যাখ্যা আছে। “বুলহুইপ” আর “ডোজ” মিলে, বা শক্তি ও শাস্তির মাত্রা মিলে, বা উচ্চারণের কোনো ঘর্ষণে “z” এসে পড়েছে, এরকম কয়েকটি ভাষাতাত্ত্বিক কাহিনি চালু আছে। লুইস আলবার্ট ওয়াগনার নামের এক জার্মান অভিবাসীর নামও এ প্রসঙ্গে উঠে আসে। সংবাদপত্রের পাতায় শব্দটি প্রথম দেখা যায় ১৮৭০-এর দশকে, তারপর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে সহিংস ভয়প্রদর্শন, পরে যে-কোনো জবরদস্তি, আর শেষে বিশাল যন্ত্র। ভাষা প্রায়ই এভাবেই কাজ করে, আগে রক্ত, পরে রূপক, শেষে প্রযুক্তি। আমরা শেষে শুধু প্রযুক্তিটাই মনে রাখি, রক্তের কথা ভুলে যাই।
কিন্তু ইতিহাসের দোষ, সে পুরোপুরি ভুলতে দেয় না। যন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পরও শব্দটির পুরোনো স্মৃতি ফিকে আলোয় জ্বলতে থাকে। উনিশ শতকের শেষভাগে কোনো কোনো পিস্তলের নাম “বুলডোজার” বা “বুলডগ” রাখা হল; বরফ ভেঙে পথ করা টাগবোটকে বলা হল বুলডোজার; কোথাও কারখানার এক যন্ত্র, যা শ্রমিকের হাত ছিঁড়ে ফেলল, তাকেও একই নামে ডাকা হল। যেন সমাজ এই শব্দটি যেখানেই লাগিয়েছে, সেখানেই বলপ্রয়োগের একটা অদ্ভুত ছায়া রয়ে গেছে। পরে বিশ শতকের শুরুতে, যখন বিশাল ধাতব ব্লেড-ওয়ালা মাটি সমান করা যন্ত্র তৈরি হল, তখন নামটি সেখানে এসে স্থির হল। প্রথমে ব্লেডের নাম, পরে পুরো যন্ত্রের।
এরপর যে ইতিহাস, তা আর শুধু একটি যন্ত্রের নয়, আধুনিকতার আত্মপ্রতিকৃতির ইতিহাস। ১৯১৭ সালে রাসেল গ্রেডার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি “বুলডোজার” নামে যন্ত্রের বিজ্ঞাপন দিল। খচ্চরে টানা ধাতব ব্লেড, মাটি সরাচ্ছে, জমি সমান করছে। হোল্ট, ক্যাটারপিলার, আর. জি. লেটুরনো, এরা সবাই সেই প্রযুক্তিকে বাড়াল। খচ্চরের জায়গায় ট্রাক্টর এল, চাকার জায়গায় ট্র্যাক, বাষ্পের জায়গায় গ্যাসোলিন, তারপর ডিজেল। ব্লেড একটু একটু করে বৈজ্ঞানিকভাবে বাঁকানো, শক্তিশালী, হাইড্রোলিক নিয়ন্ত্রিত, অতএব দক্ষ। মানুষের পুরোনো প্রবৃত্তিগুলোও এ সময় প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করল। আগে যে-প্রবৃত্তি চাবুক নিয়ে আসত, এখন তা এল ইস্পাতের ফলক নিয়ে।
এই ইতিহাসে রবার্ট জি. লেটুরনো একটি মনোরম অথচ ভয়াবহ চরিত্র। মনোরম, কারণ তিনি নিজের বিশ্বাসে অকৃত্রিম ছিলেন। ভয়াবহ, কারণ সেই বিশ্বাসের সঙ্গে যন্ত্রের আকার ও ক্ষমতা একসঙ্গে বেড়েছিল। ভার্মন্টে জন্ম, এভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান, মাথায় ট্রিলবি হ্যাট, ব্যক্তিগত বিমান, বছরে লক্ষ লক্ষ এয়ার মাইল, মুখে ঈশ্বর, হাতে বুলডোজার। তাঁর প্রিয় ঘোষণা, “ঈশ্বরই আমার বোর্ডের চেয়ারম্যান।” তিনি পৃথিবীকে সমান করার এক ধর্মতত্ত্বও নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর কাছে অসমতল ভূখণ্ড ছিল সমস্যার নাম, আর উন্নয়ন ছিল সমতলতার নৈতিকতা।
এই ধরনের লোকদের মধ্যে প্রায়ই শিশুসুলভ একরোখা বিশ্বাস থাকে; তাই একে ক্ষমা করতে পারি না, কারণ সেই বিশ্বাসের ফল অন্যদের গায়ে গিয়ে পড়ে। লেটুরনো বুলডোজারের ব্লেডকে সাদামাটা ইস্পাতের পাত থেকে টেনে নিয়ে গেলেন এক দানবীয় ক্ষমতার পর্যায়ে। তাঁর কাছে প্রযুক্তি ধর্মপ্রচারের সহকারী। বিলি গ্রাহাম তাঁর যন্ত্রে আশীর্বাদ করলেন, পশ্চিম আফ্রিকায় পাঠানো জাহাজকে বলা হল “আর্ক অব লেটুরনো”, সঙ্গে ভূমি-সমান করার যন্ত্র, এক বছরের খাবার, আর পাঁচশো কপি নিউ টেস্টামেন্ট। যেন উন্নয়ন, ধর্মপ্রচার, পুঁজিবাদ, সব এক কার্গোতে বাঁধা।
এইখানেই বুলডোজার আধুনিকতার সবচেয়ে নগ্ন প্রতীক হয়ে ওঠে। লেটুরনোর চোখে জঙ্গল ছিল অপচয়, ফাঁকা ক্যানভাস, ঈশ্বরের ইচ্ছায় ও পুঁজির প্রয়োজনে সমান করে ফেলা উচিত এমন ভূদৃশ্য। পেরুর জঙ্গলে তিনি টুরনাভিস্তা গড়তে চাইলেন, এক প্রোটেস্ট্যান্ট-প্রযুক্তিবাদী ইউটোপিয়া। জঙ্গল তার কাছে প্রতিপক্ষ, আবার পরীক্ষাগার। বুলডোজার এক ঘণ্টায় এক একর বন ফেলে দিচ্ছে, হাতের কাস্তে-কোদালে যা করতে মাস লাগত। বিশাল শিহুয়াহুয়াকো গাছের সামনে তাঁর যন্ত্র ছোট মনে হলে তিনি আরও বড় যন্ত্র বানালেন, “জঙ্গল ক্রাশার”, ৭৪ ফুট লম্বা, ২৮০,০০০ পাউন্ড ওজনের। পরে আমেরিকান সেনাবাহিনী ভিয়েতনামে একই যন্ত্র নিয়ে গেল। প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ আর মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্যে যে সেতু আছে, তা প্রযুক্তি খুব সহজে পার হয়ে যায়।
অবশ্য এই সব ইউটোপিয়া শেষ পর্যন্ত বহুক্ষেত্রেই করুণ । ফোর্ডল্যান্ডিয়ার পর টুরনাভিস্তাও টিকল না। বৃষ্টি, রাজনীতি, বন্য গাছপালা, স্থানীয় বাস্তবতা, সব মিলিয়ে প্রকৃতি আর সমাজ মিলে সেই প্রকৌশলী-মিশনারি স্বপ্নকে ভেঙে দিল। কিন্তু ব্যর্থ ইউটোপিয়াও ক্ষতি করে। স্বপ্ন ভাঙলেও বন আর আগের মতো ফিরে আসে না, মানুষের জীবনও না। একটা রানওয়ে, একটা পরিত্যক্ত মেডিকেল সেন্টার, ভগ্নপ্রায় গির্জা, আর অনলাইনে খুঁজে না-পাওয়া এক প্রায়-লুপ্ত বসতি, এইসবই পরে থেকে যায়, যেন আধুনিকতার ব্যর্থ আত্মপ্রেমের ধ্বংসাবশেষ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বুলডোজারের নতুন জীবন শুরু হল। যুদ্ধের ইতিহাস সাধারণত ট্যাঙ্ক, বিমান, বোমা, সাবমেরিন, এইসব নাটকীয় জিনিসের দিকে তাকায়। বুলডোজার সেখানে পর্দার পেছনের লোক। অথচ যুদ্ধ মানে শুধু ধ্বংস নয়, ধ্বংস বহন করার অবকাঠামোও। বিমান চাইলে এয়ারফিল্ড চাই, এয়ারফিল্ড চাইলে সমতল জমি চাই; সৈন্য চাইলে রাস্তা চাই; জাহাজ চাইলে ডক চাই; ডক চাইলে কংক্রিট, স্টিল, শ্রম, আর মাটি সরানোর যন্ত্র চাই। সেইখানে বুলডোজার যুদ্ধের নীরব নায়ক। কর্নেল কে. এস. অ্যান্ডারসন প্রায় স্বীকার করেছিলেন, এই যন্ত্র ছাড়া যুদ্ধ জেতা যায় না।
কিন্তু যুদ্ধ মানুষের ভেতরের হিংস্রতাকে প্রযুক্তিগত রূপকল্প দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে Seabees নামের নির্মাণবাহিনী গুলি চলাকালেই ভূমি সমান করেছে। মোনো দ্বীপে ১৯৪৩ সালে অরেলিও ট্যাসোনে নামের এক বুলডোজার অপারেটর জাপানি পিলবক্সের দিকে যন্ত্র নিয়ে গিয়ে ব্লেড নামিয়ে সেটি গুঁড়িয়ে দিলেন; পরে দেখা গেল মাটির সঙ্গে বারোটি দেহ মিশে আছে। হতে পারে এটি প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা, যেখানে বুলডোজারকে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষ মারার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়। সেই সময় তাঁকে নায়ক বলা হয়েছিল। যুদ্ধ নায়ক বানাতে ভালোবাসে, বিশেষত যখন নায়কের হাতে একটি বড় যন্ত্র থাকে।
আবার সেই সময়ই থিওডোর স্টার্জন, নৌবাহিনীতে কর্মরত, বুলডোজার চালাতে চালাতে যন্ত্রটির মধ্যে এক অদ্ভুত দানবীয় আভা দেখতে পেলেন। পরে তিনি লিখলেন Killdozer। বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মধ্যে গিয়ে যন্ত্রটি যেন নিজের সত্য প্রকাশ করল। মানুষ যখন কোনো যন্ত্রকে খুব ভালোবাসে, তখন সে-যন্ত্রকে ভয়ও করতে শেখে। এই দ্বৈত অনুভূতি আধুনিকতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
যুদ্ধশেষে বুলডোজার আমেরিকার শহর ও উপশহরে নতুন নাগরিক জীবন গড়ল, আবার পুরোনো জীবন মুছেও দিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় কমলাগাছ কাটা পড়ল, শহর ভাঙল, রাস্তা হল, উপশহর এল, এক্সপ্রেসওয়ে এল, রবার্ট মোসেস নিউ ইয়র্ককে পুনর্লিখন করলেন। মার্শাল বারম্যানের সেই মর্মন্তুদ দ্বিধা এখানে বড় প্রাসঙ্গিক। তিনি আধুনিকতার মহিমায় মুগ্ধও, আবার নিজের পাড়াকে বুলডোজারের তলায় যেতে দেখে ভেঙেও পড়েন। এ এক জটিল অনুভূতি। ধ্বংসের ক্ষমতা মানুষকে প্রায়শই মুগ্ধ করে, বিশেষত যদি তা “অগ্রগতি”র নামে আসে। নিজের বাড়ি না ভাঙা পর্যন্ত অনেকে বুলডোজারকে ইতিহাসের বাহন মনে করে। দরজায় এসে দাঁড়ালে বোঝে, ইতিহাস অনেক সময় ঠিকাদারের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল নয়।
এই যন্ত্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক জীবন আরও কদর্য। ভারতে বুলডোজার বিচারবহির্ভূত শাস্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ অপরাধীদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ভাষা ব্যবহার করতে করতে একসময় মুসলমানদের বাড়ি, প্রতিবাদকারীদের দোকান, বা “অবৈধ নির্মাণ” নামে চিহ্নিত প্রায় যেকোনো কিছুতে একই যন্ত্র চালালেন। “অবৈধ” শব্দটির মজা এই যে, তা আইনের মতো শোনায়, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ হয় রাজনীতির প্রয়োজনে। দিল্লিতে, আসামে, গুজরাটে, মধ্যপ্রদেশে, বুলডোজার হয়ে উঠল রাষ্ট্রের রাগের দৃশ্যমান রূপ। কেউ বলল প্রতিশোধমূলক ন্যায়বিচার, কেউ বলল শৃঙ্খলা, কেউ বলল দাঙ্গাকারীদের জবাব। কিন্তু বাড়ির ভেতরে যারা বাস করত, তাদের কাছে বিষয়টা ছিল সহজ: আমার বাড়ি, আমার বিছানা, আমার আলমারি, আমার নথি, আমার রান্নার হাঁড়ি, আমার মৃত মায়ের ছবি, আমার বাচ্চার বই, সব একসঙ্গে ধুলো।
হাসিনা বি-র বয়ান এইখানে রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতার অন্তঃসার। চল্লিশ বছর ধরে থাকা বাড়ি, কাগজপত্র হাতে নিয়ে অফিসারের পেছনে ছোটা, লাঠির ঘা, ছেলেকে বলতে শোনা, “আম্মি, এরা তোমাকে মেরেও ফেলতে পারে”, তারপর একটিও জিনিস তুলে নিতে না-পারা। এই অভিজ্ঞতাকে কেবল “ডেমোলিশন” বলা ভাষার অপমান। এটি বসতবাড়ির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক হিংসা।
জাহাঙ্গিরপুরীর ঘটনায় তো সেই হিংসা সরাসরি টেলিভিশনের উৎসবে পরিণত হল। নয়টি বিশাল যন্ত্র, পুলিশ, আধা-সামরিক বাহিনী, মসজিদের সামনে রাস্তা, ধুলো, আতঙ্কিত মানুষ, আর এক সংবাদ উপস্থাপিকা বুলডোজারের কেবিনে উঠে লাইভ সম্প্রচার করছেন, যেন কোনো খেলার ধারাভাষ্য। আধুনিক গণমাধ্যমের একটা গুণ আছে, তা নিষ্ঠুরতাকে spectacle বানাতে জানে। বিচার, প্রক্রিয়া, অধিকার, নোটিশ, এ সব নরম জিনিস পর্দায় খুব ভালো দেখায় না; বালতি-ওয়ালা যন্ত্র, ভাঙা টিন, চিৎকার, ধুলো, এগুলো বেশি উপযোগী।
JCB-র নাম এখানে প্রায় এক সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যদিও মজার কথা, কোম্পানিটি প্রকৃত অর্থে বুলডোজারই বানায় না। তবু মানুষের ভাষায় “জেসিবি” এখন প্রায় সব বড় ভাঙার যন্ত্রের নাম। ব্র্যান্ড বহুদিন ধরেই বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাশক্তির উপর বেশি কর্তৃত্ব চালায়। শিশুদের খেলনা, পপ গান, থিয়েটার শো, গ্রামীণ বিয়ের শোভাযাত্রা, রাজনৈতিক মিছিল, কনডমের ব্র্যান্ড, সবকিছুর মধ্যে JCB পৌরুষ, শাস্তি, শৃঙ্খলা, নির্মাণ, প্রদর্শন, সব কিছুর প্রতীক হয়ে উঠেছে। সমাজ মাঝে মাঝে নিজের দানবকেও খেলনা বানায়। এতে তাকে আর কম দানবীয় লাগে না, বরং কখনও কখনও বেশি।
এইসব কোম্পানির কাছে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থান হলো ভান করা যে তারা কেবল যন্ত্র নির্মাতা, ব্যবহারকারীর কাজের জন্য তারা দায়ী নয়। ক্যাটারপিলার বহু দশক ধরে ইসরায়েলকে D9 বুলডোজার দিয়েছে। ইসরায়েলে পৌঁছে সেই যন্ত্র সাঁজোয়া, সামরিকীকৃত, বর্মযুক্ত, অস্ত্র-সংবলিত দানবে পরিণত হয়েছে। D9 এখন ফিলিস্তিনে শুধু রাস্তা পরিষ্কার করে না; ঘরবাড়ি ভাঙে, বাগান গুঁড়িয়ে দেয়, কবরস্থান চিরে ফেলে, রাস্তাঘাট ধ্বংস করে, হাসপাতাল অবরুদ্ধ করে, কখনো কখনো অভিযোগ আছে, মৃত ও জীবিত মানুষকেও মাটির নিচে পিষে ফেলে। যে-যন্ত্র নির্মাণের ভাষায় বাজারে আসে, যুদ্ধক্ষেত্রে এসে ভূমির স্মৃতি মুছতে শুরু করে।
ফিলিস্তিনে বুলডোজার নিয়ে যে ভাষ্যগুলো এসেছে, সেগুলো বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে, কারণ এখানে যন্ত্রটি সরাসরি ভূগোল-পরিবর্তনের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ট্যাঙ্ক আপনাকে গুলি করে, বোমা এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়, কিন্তু বুলডোজার ধীরে, ঠাণ্ডা মাথায়, ব্লেডের নিচে স্থান, স্মৃতি, গাছ, পাথর, ঘর, দরজা, রাস্তা, সবকিছুকে এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক ধ্বংসে নিয়ে যায়। এই ধ্বংসের গতি ধীর বলে তা কম সহিংস নয়। বরং অনেক সময় বেশি। বোমা বজ্রপাতের মতো, বুলডোজার অনবরত খরার মতো, আস্তে আস্তে জীবনের ভিতর থেকে জল শুষে নেয়।
র্যাচেল কোরির মৃত্যু এই ইতিহাসের এক অমোচনীয় দৃশ্য। উজ্জ্বল কমলা জ্যাকেট পরে, হাতে মেগাফোন, তিনি বুলডোজারের সামনে দাঁড়ালেন। চালক তাঁকে দেখেননি, এই ছিল সরকারি ভাষ্য। বড় যন্ত্রের একটি সুবিধা হলো, সেটি মানুষকে অদৃশ্য বানাতে পারে। পরে আদালতও বলল, ক্যাটারপিলারের ওপর দায় বর্তায় না, কারণ যন্ত্রটি মার্কিন সরকারের সামরিক বিক্রয় কর্মসূচির আওতায় গিয়েছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র, কোম্পানি, আইন, সবাই মিলে এমন একটি পরিসর তৈরি করল, যেখানে যন্ত্রের তলায় মানুষ পিষ্ট হল, কিন্তু দায় কারও না। আধুনিক আইনের এই এক আশ্চর্য সৌন্দর্য, দায়িত্বকে এমনভাবে ভাগ করে দেয় যে শেষ পর্যন্ত তা কারও থাকে না।
এদিকে কোম্পানিগুলো আজ আর নেহাত ইস্পাত কারখানা নয়। এরা তথ্য-সাম্রাজ্যও বটে। JCB-র LiveLink, Caterpillar-এর VisionLink, John Deere-এর রিমোট কিল-সুইচ, VIN-locking, telematics, geofencing, cloud diagnostics, এইসব শব্দ শুনতে বেশ সভ্য । দক্ষ, স্মার্ট, connected, efficient। আসল কথা হলো, যন্ত্রগুলো এখন চলমান কম্পিউটার। কোথায় আছে, কত জ্বালানি খাচ্ছে, কে চালাচ্ছে, কীভাবে চালাচ্ছে, কোন অঞ্চলে ঢুকছে, কোন অঞ্চলের বাইরে যাচ্ছে, সব জানা সম্ভব। চাইলে দূর থেকে বন্ধও করা সম্ভব। ইউক্রেনে রুশ সেনারা John Deere-এর মেশিন লুট করে নিয়ে গেলে সেগুলো দূর থেকে অচল করে দেওয়া হয়েছিল। তখন প্রযুক্তি কাজ করেছে। কিন্তু যখন একই ধরনের প্রযুক্তি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে, তখন কোম্পানিগুলো আকস্মিকভাবে স্মৃতিভ্রংশে ভোগে।
এখানেই প্রশ্নটি বুলডোজারের নয়, আমাদের সময়ের সমস্ত প্রযুক্তির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নজরদারি ব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অস্ত্র, নির্মাণযন্ত্র, সবকিছুর ক্ষেত্রেই নির্মাতাদের একটি প্রিয় বাক্য আছে: আমরা কেবল প্ল্যাটফর্ম, কেবল টুল, কেবল সাপ্লায়ার। ব্যবহারকারীরা যা করে, তার জন্য আমরা কীভাবে দায়ী হব? এই যুক্তি সুবিধাজনক, কারণ তা প্রযুক্তিকে নৈতিক শূন্যতায় বসায়। কিন্তু বাস্তবে নির্মাতা, বিক্রেতা, রক্ষণাবেক্ষণকারী, সার্টিফিকেশনদাতা, সফটওয়্যার আপডেট-প্রদানকারী, ডেটা-গ্রাহক, এরা সবাই একই শৃঙ্খলের অংশ। কেউ কেবল দূরের দর্শক নয়।
রালফ ওয়াল্ডো এমারসন একসময় লিখেছিলেন, ভোজনশেষেও আপনি কসাইখানার সঙ্গে সম্পর্কহীন নন। এ কথাটি আজ আরও বেশি সত্য। আধুনিক মানুষ তার জীবনের সহিংসতা অনেকটাই outsourcing করে ফেলেছে। মাংস আসে সুপারমার্কেটের ট্রেতে, বোমা আসে নির্ভুল সামরিক ভাষায়, বুলডোজার আসে প্রকল্পের tender-এ, উচ্ছেদ আসে municipal notice-এ, surveillance আসে convenience-এর নামে, আর আমরা বলি, আমি তো শুধু আমার অংশটুকু করছি। কিন্তু অংশের যোগফল দিয়েই তো ইতিহাস তৈরি হয়।
এই জায়গায় ফিরে আসতে হয় বসতবাড়ির কথায়। বাড়ি জিনিসটি কেবল ইট, সিমেন্ট, টিন, কাঠ, শাটার, নকশা, mortgage, registry নয়। বাড়ি হলো স্মৃতির স্থাপত্য। এখানে কারও মা শেষবার বসেছিলেন, কারও বিয়ের শাড়ি আলমারিতে তোলা আছে, কারও পরীক্ষার সার্টিফিকেট, কারও সন্তান জন্মানোর পর প্রথম শোওয়ার খাট, কারও বাবার লাঠি, কারও রান্নাঘরের হাঁড়ি, কারও জানালায় ঝোলানো গাছ। কপিল সিব্বল বা মাহমুদ দারবিশের ভাষা এখানে অলংকার নয়, যথার্থতা। বাড়ি ভাঙা মানে কেবল shelter loss নয়, existential assault। যে মানুষ নিজের ঘর হারায়, সে শুধু রাস্তার মানুষ হয় না, নিজের অতীতের সঙ্গেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ধানমন্ডি ৩২ হোক, জাহাঙ্গিরপুরী হোক, রাফাহ হোক, কালকিলিয়া হোক, বা ব্রঙ্কসের কোনো উচ্ছেদ-পাড়া, বুলডোজার যেখানে যায়, সেখানে তার ব্লেডের সামনে শুধু স্থাপত্য দাঁড়ায় না, দাঁড়ায় ইতিহাসের একাংশ। অনেক সময় রাষ্ট্র, দল, সামরিক বাহিনী, প্রশাসন, উন্নয়ন-প্রকল্প, বা প্রতিশোধপরায়ণ জনমত, সবাই মিলে সেই ইতিহাসকে অনধিকার বস্তু বলে ঘোষণা করে। তারপর যন্ত্রটি আসে। যন্ত্রের সুবিধা এই যে, তার কোনো মতামত নেই। সে কেবল আদেশ মানে। কিন্তু যন্ত্রকে যারা আদেশ দেয়, তারা খুব সচেতনভাবেই জানে কী মুছতে চায়।
প্রথম বুলডোজার কি যন্ত্র ছিল? না, মানুষ। আর আজকের বুলডোজার কি কেবল যন্ত্র? তাও নয়। এটি এক মানসিকতা। যে মানসিকতা ভাবে, সমস্যা মানেই অপসারণযোগ্য বস্তু। মানুষ, পাড়া, বন, স্মৃতি, গাছ, ইতিহাস, প্রার্থনালয়, দোকান, কবরস্থান, সবকিছুকে সে obstacle-এর ভাষায় দেখে। তারপর বলে, clear it.
সভ্যতার সংকট বোধহয় এখানেই। আমরা তৈরি করেছি এমন সব যন্ত্র, যা পৃথিবী বদলে দিতে পারে; কিন্তু নিজের নৈতিক কল্পনাশক্তিকে সেই অনুপাতে বড় করতে পারিনি। ফলে যন্ত্রগুলো প্রায়ই আমাদের সবচেয়ে নীচু প্রবৃত্তির চাকরি করছে। নির্মাণের নামে ধ্বংস, শৃঙ্খলার নামে প্রতিশোধ, উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ, নিরাপত্তার নামে অপমান, ন্যায়বিচারের নামে বিচারহীনতা, সব একে অন্যের ভাষা ধার করে ফেলেছে।
তবু শেষ কথা ধ্বংসের নয়। বাড়ি ভাঙা যায়, কিন্তু বাড়ির ধারণা মুছে ফেলা যায় না। গাছ কাটা যায়, কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে ছায়ার প্রয়োজন তোলা যায় না। রাস্তা সমান করা যায়, কিন্তু পদচিহ্নের ইতিহাস পুরোপুরি মুছতে পারে না কোনো ব্লেড। যে হাত লিভার টানে, সে আজ শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু একদিন সেই হাতও ইতিহাসের বিচারের বাইরে থাকবে না। আর যে মানুষ ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ভাঙা ইট চিনে নেয়, তার স্মৃতি, যতই বিপন্ন হোক, শেষ পর্যন্ত যন্ত্রের চেয়ে বেশি মানবিক, আর সে কারণেই বেশি স্থায়ী।
1 Comment
যে মুহুর্তে বাংলাদেশের হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক হামলার আতংকে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে, যে মুহুর্তে চিন্ময় মহাপ্রভু বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দী হয়ে আছে, যে মুহুর্তে বাংলাদেশের হিন্দুরা নিজের পরিচয় দিতে আতংকিত বোধ করছে, সে সময়ে বাংলাদেশী বংশদ্ভূত আমেরিকার নাগরিক ভারতের সমস্যা নিয়ে ভারত থেকে প্রচারিত পত্রিকায় লিখছে। আহা! গণতন্ত্র, মানবতা বোধহয় কাতার সৌদীর টাকার মূল্য দিয়ে বিচার হয়। বামাতী আর বামটুস শব্দগুলো তো আর এমনি তৈরি হয় নি।