অর্জুনের ডায়েরি পর্ব #৬ – তিস্তা
ধারাবাহিক
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব #৬ - তিস্তা
তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।
ভুল
টাকি থেকে ফেরার ট্রেনটা ভিড় ছিল না।
বিকেল গুটিয়ে আসছিল ধীরে ধীরে। জানলার বাইরে স্টেশনগুলো এসে পড়ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। নাম না জানা ছোট ছোট প্ল্যাটফর্ম, ধানখেত, জলে ভরা মাঠ, বাঁশঝাড়, দূরে কোনো মন্দিরের চূড়া—সবকিছু যেন চলন্ত জানলার ফ্রেমে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
আলো বদলাতে শুরু করেছে। দিনের সঙ্গে রাতের যে অদৃশ্য হাতবদল— তার ঠিক মাঝখানের সময়। কোনো কিছুই আর পুরোপুরি উজ্জ্বল নয়, আবার অন্ধকারও নয়। এই সময়টাকে আমার সবসময় অদ্ভুত লাগে। মনে হয়— পৃথিবী দিনের সমস্ত কথা শেষ করে এবার চুপ করে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আমি জানলার ধারে বসেছিলাম।
টাকি থেকে ফেরার সময় একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়! অন্য কোথাও বেড়াতে গেলে ফেরার পথে সাধারণত কিছু না কিছু সঙ্গে আসে— কোনো দৃশ্য, কোনো কথোপকথনের টুকরো, কোনো মুখ, কিংবা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ার মতো কোনো মুহূর্ত। টাকি থেকে ফেরার সময় ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। মনে হয় কী যেন একটা রেখে এসেছি।
কী রেখে এসেছি, তা অবশ্য ঠাওর করতে পারিনা। শুধু ট্রেন ছাড়ার পর থেকে মনে হতে থাকে, একটা ছোট্ট অনুপস্থিতি পাশে এসে বসেছে। তাকে দেখা যায় না, নাম দেওয়া যায় না, অথচ তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। তখন আর বই পড়তে ইচ্ছে করে না, ফোন দেখতেও নয়। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। পিছিয়ে যেতে থাকা গাছপালা, মাঠ, স্টেশনগুলোর দিকে…। যেন তাদের ভেতরেই কোথাও পড়ে আছে সেই হারিয়ে যাওয়া জিনিসটা।
বসিরহাট থেকে একজন ভদ্রলোক উঠে আমার পাশে বসলেন। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। সাদা-ধূসর চুল। পরিপাটি পাঞ্জাবি। কাঁধে শান্তিনিকেতনি ব্যাগ। বসার সময় ব্যাগটা সাবধানে কোলের ওপর রাখলেন। তারপর জানলার বাইরে একবার তাকিয়ে আবার সোজা হয়ে বসলেন। প্রথমে তাঁকে বিশেষ খেয়াল করিনি। ট্রেন তখন একটা ছোট স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে। কামরার ভেতরেও সেই পরিচিত দিনশেষের আলস্য। কেউ মোবাইল দেখছে, কেউ আধঘুমে জানলার গায়ে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে।
হঠাৎ খেয়াল করলাম, ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এমন নয় যে কৌতূহল নিয়ে দেখছেন। বরং মনে হল, কোথায় যেন মিলিয়ে নিচ্ছেন। চোখাচোখি হতেই তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“তোর এখনও চশমা লাগেনি?”
কথাটা এমন ভঙ্গিতে বললেন, যেন মাঝখানের বছরগুলো কোনো বা নদীর জলে বয়ে গেছে বটে, কিন্তু ওপারের মানুষটাকে মুছে দিতে পারেনি। আমি লোকটার দিকে তাকালাম। চিনতে পারলাম না। অথচ তাঁর মুখে এমন একটা নিশ্চিন্ত ভাব, যেন চিনতে না পারার কোনো প্রশ্নই আসে না।
সম্ভবত উত্তর না পেয়ে ভদ্রলোক খানিক মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে বললেন,
“একই রয়ে গেলি।”
কথাটা বলে আবার জানলার দিকে মুখ ফেরালেন। আমার তখন বলা উচিত ছিল,
“আপনি ভুল করছেন।”
কিন্তু কথাটা মুখ পর্যন্ত এসেও বেরোল না। কারণ ভদ্রলোকের আচরণে কোনো সংশয় ছিল না। যেন বহুদিন পর দেখা হওয়া একজন পুরোনো পরিচিতর সঙ্গে কথাশুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমাকে কার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন, সেটা জানার ইচ্ছে অদ্ভুতভাবে চেপে বসল।
মানুষটা নিজেই এবার কথা বলতে শুরু করলেন। প্রথমে ধীরে ধীরে। যেন অনেকদিন বন্ধ থাকা কোনো আলমারি খুলে একে একে জিনিসপত্র বের করছেন। তিনি কিছু নাম বললেন। কিছু জায়গার কথাও। কোনো স্কুলের মাঠ, কোনো পাড়ার মোড়, কারও বাড়ির ছাদ। কথাগুলোর বেশিরভাগই আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। কিন্তু সেগুলো বলার সময় ভদ্রলোকের মুখে যে আলো ফুটে উঠছিল, সেটা অপরিচিত নয়।
মাঝে মাঝে তিনি থেমে যাচ্ছিলেন। কারও নাম মনে করার চেষ্টা করছিলেন। তারপর হঠাৎ পেয়ে গেলে এমনভাবে হেসে উঠছিলেন, যেন হারিয়ে যাওয়া কিছু ফিরে পেয়েছেন। কখনো আবার বলছেন,
“মনে আছে?”
কখনো মাথা নেড়ে,
“কী দিনই না ছিল! এখন কেউই বিশ্বাস করবে না।”
প্রত্যুত্তরে আমি কখনো মাথা নাড়ছিলাম, কখনো শুধুই হাসছিলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার, মানুষটার কথা এগিয়ে নিয়ে যেতে আমার কোনো উত্তর দেওয়া বা বলার প্রয়োজন পড়ছিল না। একটা নাম থেকে আরেকটা নাম, একটা ঘটনা থেকে আরেকটা ঘটনা— ভদ্রলোক যেন নিজের স্মৃতির ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন। মাঝখানে কোনো সেতু নেই, কোনো ক্রম নেই। যেন বহুদিন বন্ধ থাকা ঘরের জানলাগুলো একে একে খুলে যাচ্ছে।
পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলা, কোনও বিয়েবাড়ি অথবা একদল বন্ধুর আড্ডা— যার অধিকাংশই আমার কাছে অর্থহীন। তবু অদ্ভুত একটা টান! শুনে যেতে ইচ্ছে করছিল। কারণ ততক্ষণে আমার কৌতূহল ঘটনাগুলো থেকে সরে মানুষটার দিকে গিয়ে পড়েছে। কথা বলতে বলতে তাঁর মুখের ভাঁজ বদলে যাচ্ছিল। কখনো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল! কখনো আবার থমকে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, মানুষটা ট্রেনের কামরায় বসে নেই। অনেক অনেক দূর অতীতে ফিরে গেছেন।
একসময় তিনি নিজেই হেসে উঠলেন।
“কী না পাগল ছিলাম আমরা!”
হাসিটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই আবার মাথা নড়ল।
“ভাবা যায়?”
এই প্রশ্নটা সম্ভবত তাঁর নিজের কাছে নিজের।
আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। কী ভাবা যায়, বুঝলাম না। তবে এটুকু বুঝলাম, প্রশ্নটা আমার উদ্দেশে নয়। সেই মানুষটার উদ্দেশে, যে এই কামরায় নেই, তবু অদ্ভুতভাবে আমাদের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটুকু দখল করে বসে আছে। আমি তাকে চিনি না। সে কেমন মানুষ ছিল, তা আমি জানি না। অথচ ধীরে ধীরে মনে হচ্ছিল, তার অনুপস্থিতিই এই কামরার সবচেয়ে স্পষ্ট উপস্থিতি—
বহু বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যার জন্য একটি আলাদা জায়গা রয়ে গেছে এই ভদ্রলোকের স্মৃতিতে। মানুষের জীবনে এমন জায়গা সবাই পায় না।
ট্রেন আরও কয়েকটা স্টেশন পেরিয়ে গেল। জানলার কাচে বাইরের আবছায়া আলোর সঙ্গে ভেতরের মুখগুলোও ভেসে উঠছে মাঝে মাঝে। হঠাৎ ভদ্রলোক বললেন,
“তোর বাবার মতো মানুষ আর হয় না রে রঞ্জন।”
রঞ্জন! নামটা প্রথমবার উচ্চারণ করলেন ভদ্রলোক। এতক্ষণ পর্যন্ত মানুষটা ছিল শুধু কিছু ছড়িয়ে থাকা স্মৃতি, কিছু অসমাপ্ত ঘটনার ভেতর। নামটা শুনে মনে হল, কুয়াশার আড়াল থেকে হঠাৎ একটি অবয়ব বেরিয়ে এল। সম্পূর্ণ নয়, স্পষ্টও নয়। তবু এখন তাকে ডাকা যায়। রঞ্জন।
তারপর কিছুক্ষণ ধরে ভদ্রলোক রঞ্জনের বাবার কথা বলতে লাগলেন। বুঝতে পারছিলাম, তিনি এমন একজন, যার কাছে প্রয়োজনের সময় মানুষ নির্দ্বিধায় চলে যেত। যিনি খুব বেশি কথা বলতেন না, কিন্তু পাশে দাঁড়াতেন। যাঁর উপস্থিতিকে আলাদা করে টের পাওয়া যেত না, অথচ তিনি না থাকলে একটা শূন্যতা তৈরি হত।
একসময় ভদ্রলোক একটু থামলেন। জানলার বাইরে তাকিয়েই মৃদু স্বরে স্বগতোক্তির মতো বললেন,
“কী অপরিসীম ধৈর্য ছিল মানুষটার!”
কথাটা বলার সময় মনে হল, তিনি যেন আমাকে শোনাচ্ছেন না। নিজেরই বহুদিনের একটা বিশ্বাস আরেকবার উচ্চারণ করছেন।
আমি এবারও কিছু বললাম না। যে বাবার কথা তিনি বলছেন, তিনি আমার বাবা নন। তবু কোথাও যেন আমার বাবার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। বাবারা বোধহয় শেষ পর্যন্ত একই রকম হন। আলো আরও কমে এল। ট্রেনের ভেতরের বাতিগুলো জ্বলে উঠল। জানলার কাচে বাইরের অন্ধকারের সঙ্গে নিজের মুখও দেখা যাচ্ছে এখন।
মানুষটা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর বললেন,
“তুই তো আগে এত চুপচাপ ছিলি না।”
আমি হেসে ফেললাম। তিনিও হাসলেন। তারপর যেন নিজের মনেই কিছু একটা মেলানোর চেষ্টা করলেন। মানুষের মুখ বদলায়, গলার স্বর বদলায়, অভ্যাস বদলায়— সম্ভবত সেই হিসেবটাই কষছিলেন। শেষ পর্যন্ত আর কিছু বললেন না। শুধু মৃদু মাথা নেড়ে জানলার বাইরে তাকালেন। খানিক পরেই হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় আবার বলে উঠলেন,
“শুনলাম তোর মেয়ে এবার কলেজে উঠেছে?”
আমি থমকে গেলাম। প্রশ্নটার উত্তর আমার জানা ছিল না। অন্তত নিজের জীবনের হিসেব অনুযায়ী নয়। আমাদের মাঝখানে অদৃশ্য আরেকজনের উপস্থিতি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কথাগুলো তার জন্যই বলা— যে মানুষটার একটা অতীত আছে, একটা পরিবার আছে, হয়তো একটা মেয়েও আছে। আমি তাকে চিনি না। তবু অদ্ভুতভাবে মনে হল, এই মুহূর্তে তাকে অস্বীকার করার অধিকারও আমার নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর শুধু হাসলাম। ভদ্রলোকও হাসলেন। যেন আমার উত্তর তিনি
পেয়ে গেছেন।
এতক্ষণে মানুষটার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল!
“দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল, না?”
আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়লাম। কথাটা শুনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল! এতক্ষণ পর্যন্ত ভদ্রলোকের স্মৃতিগুলোকে দূর থেকে দেখছিলাম। এবার যেন তাদের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। এতক্ষণ শুধু একজন মানুষের কথা শুনছিলাম। এখন তার চারপাশে আরও মানুষ জড়ো হতে শুরু করেছে। সম্পর্ক, সংসার, সময়… সব মিলিয়ে একটা জীবন ধীরে ধীরে আকার পাচ্ছে।
এমন এক জীবন, যার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তবু তার আনন্দ, তার সময় পেরিয়ে যাওয়া, তার বয়স বেড়ে ওঠা— এসব যেন কোথাও গিয়ে পরিচিত লাগছিল। কথা বলতে বলতে একসময় দুজনেই চুপ করে গিয়েছিলাম। ট্রেন তখন দমদমের দিকে এগোচ্ছে। জানলার বাইরে আলো বেড়ে উঠছে। ভেতরে ভেতরে মনে হচ্ছিল, একটা দীর্ঘ আলাপ শেষের দিকে পৌঁছচ্ছে। ট্রেনের গতি কমে এল। দমদমে ট্রেনটা ঢোকার আগেই ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলেন। তারপর আমার কাঁধে হাত রাখলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। যেন মুখটা আর একবার মনে রেখে দিতে চাইছেন।
“তোকে দেখে ভালো লাগল।”
কথাটা বলেই একটু চুপ করে গেলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,
“ভালো থাকিস, রঞ্জন।”
আমিও মৃদু হেসে মাথা নাড়লাম। কিন্তু এবারও শুধরে দিলাম না। ভদ্রলোক নেমে গেলেন। কিছুক্ষণ দেখা গেল তাঁকে। তারপর একসময় চোখের আড়াল হয়ে গেলেন।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
আমি জানলার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, কিছুক্ষণ আগে যে কথোপকথনের মধ্যে ছিলাম, সেটা সত্যিই ঘটেছিল কি না। রঞ্জন নামে একজন মানুষ। আমি তাকে চিনি না। কোনোদিন দেখিনি। তবু তার জন্য একধরনের কৌতূহল জন্মেছিল। সে এখন কোথায় আছে, আদৌ আছে কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই। হয়তো জানার প্রয়োজনও নেই।
কারণ হঠাৎ মনে হল, ভদ্রলোক যাকে মনে রেখেছেন, তিনি হয়তো আর শুধু একজন মানুষ নন। বহু বছরের স্মৃতি, অনুপস্থিতি, স্নেহ আর সময় মিলে তাকে ধীরে ধীরে অন্য কিছুতে বদলে দিয়েছে। আমরা মানুষকে যেমন ছিল তেমন করে মনে রাখি না। আমরা তাকে মনে রাখি যেমনভাবে মনে রাখতে চাই। হয়তো মানুষ নয়, শেষ পর্যন্ত আমরা তার স্মৃতিকেই ভালোবাসি। কিংবা ঘৃণা করি। কিংবা সারা জীবন বয়ে বেড়াই। তারপর একসময় সেই স্মরণটুকু মানুষটার চাইতেও বেশি সত্যি হয়ে ওঠে।
ট্রেন অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছিল। জানলার কাচে নিজের মুখের পাশে আরেকটা মুখ যেন ভেসে উঠছিল বারবার। স্পষ্ট নয়। শুধু মনে হওয়ার মতো। আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলাম…