অর্জুনের ডায়েরি পর্ব #৪ – তিস্তা
ধারাবাহিক
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব #৪ - তিস্তা
তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখবেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। এবারে পর্ব # চার। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।
নিমন্ত্রণ
অফিসের ছুটি শেষ হয়ে এল। সামনের সোমবার জয়েন করতে হবে। আজ শুক্রবার। হাতে এখনও দুটো দিন আছে। ছুটি জিনিসটা অদ্ভুত। শুরুতে মনে হয়, আরও কিছুদিন যদি পাওয়া যেত। তারপর একসময় মনে হয়, এবার শেষ হোক।
গত ক’দিন বাড়িতেই ছিলাম প্রায়। খুব বেশি কোথাও বেরোনো হয়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর এই প্রথম মনে হল, বাড়ি থেকে একটু বেরোনো দরকার। সমস্যা হল, মানুষ চলে যাওয়ার পর বাড়ির জিনিসপত্রগুলো আচমকা খুব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বাবার চশমা। ওষুধের পাতা। আলনায় ঝোলানো পাঞ্জাবি।
জীবিত অবস্থায় এসব চোখে পড়ত না বিশেষ। কারণ তখন মানুষটা নিজেই সামনে। মারা যাওয়ার পর তার ব্যবহার করা জিনিসগুলো যেন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে— যেন কিছু একটা মনে করিয়ে দিতে চায়। রাতে জল খেতে উঠে করিডর পেরোতে গিয়ে হঠাৎ মনে হয়, পাশের ঘরে এখনও কেউ আছে। দরজার ওপারে হয়তো জেগে বসে। হয়তো ডাকলেই উত্তর দেবে। তারপর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে— না, কেউ নেই। একটা কাপ হাতে নিলেই অন্য একটা হাতের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এই ‘মনে পড়া’ ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে।
আসলে বাড়ির জিনিসপত্রের নিজস্ব কোনো স্মৃতি থাকে না। আমরাই তাদের মধ্যে স্মৃতি জমা করে রাখি। তারপর একদিন হঠাৎ দেখি, তারা সবাই মিলে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তখন বাড়ির বাইরের পৃথিবীটার কথা মনে পড়ে।
তাই শুক্রবার সকালে একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোথায় যাব, প্রথমে ঠিক ছিল না। তারপর হঠাৎ টাকির কথা মনে পড়ল। টাকি আমার ভালো লাগা একটা জায়গা। কেন ভালো লাগে, কেনই বা পছন্দ, সেটা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারব না। কিছু কিছু জায়গা থাকে, যাদের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে নয়, আবেগ দিয়ে সম্পর্ক তৈরি হয়। টাকির সঙ্গে আমার সম্পর্কটা সেরকম।
জায়গাটার মধ্যে একধরনের স্থিরতা আছে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। আবার স্থবিরতাও না। বিকেলগুলো একটু বেশি দীর্ঘ মনে হয় এখানে। নদীর ধারে বসে নৌকা চলাচল দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা নেমে আসে। ওপারে অন্য দেশ দেখা যায়। অথচ তার কাছে পৌঁছানো যায় না। এই অসম্পূর্ণ দূরত্বটা আমার ভালো লাগে।
ট্রেনে জানলার পাশে বসেছিলাম। শহর ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছিল। তারপর বাড়ি কমে এল। মাঠ বাড়ল। জলাজমি। মাঝেমধ্যে সাদা বক। ছোট ছোট স্টেশন। প্ল্যাটফর্মে চা। চানাচুর। অনেকদিন পরে মনে হল, পৃথিবী আমার ব্যক্তিগত শোকের বাইরে তার নিজের মতো চলছে।
টাকিতে পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল। স্টেশন থেকে একটা টোটো নিয়ে ছোট্ট একটা লজে উঠলাম। ঘরটা খুব সাধারণ। একটা খাট। একটা টেবিল। জানলা দিয়ে নদীর হাওয়া আসছে। ব্যাগটা রেখে আগে বাথরুমে ঢুকে স্নান সেরে নিলাম। ট্রেনের ধুলো, গরম, ভিড়— সব মিলিয়ে শরীরটা আঠালো লাগছিল। কিছুক্ষণ বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইলাম। কোথাও পৌঁছানোর পর খানিকক্ষণ কিছু না করে শুয়ে থাকার একটা আলাদা আনন্দ আছে।
তারপর নিচের হোটেলে গিয়ে ভাত খেলাম। ডাল। আলুভাজা। পারশে মাছের ঝাল। খুব ভালো কিছু
না। আবার খারাপও না। ভ্রমণের প্রথম দিনের খাবার সাধারণত এমনই হয়। লজে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেল হতে না হতেই দিকে নদীর পাড়ে চলে গেলাম।
ইছামতীর ধারে বসলে সময় যেন একটু ধীরে বয়। নদীর জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, পৃথিবীতে স্থায়ী বলে সত্যিই কিছু নেই। সবকিছুই একসময় সরে যায়। শুধু সরে যাওয়ার ভঙ্গিটা আলাদা। জল বয়ে যাচ্ছে। নৌকা চলে যাচ্ছে এক পার থেকে আর এক পারের দিকে। আলো বদলে যাচ্ছে। বিকেল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে সন্ধ্যার দিকে।
শুধু আমরা মানুষরাই বারবার ভেবে বসি, কিছু কিছু মুহূর্ত, কিছু কিছু সম্পর্ক, কিছু কিছু মানুষ বুঝি চিরকাল একই জায়গায় থাকবে। নদী অবশ্য সে কথা মানে না। সে শুধু বয়ে যাওয়ায় বিশ্বাসী।
অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। একসময় নজরে পড়ল, একটু দূরে একটা ছেলে আর মেয়ে বসে আছে। খুব কাছাকাছি না। আবার দূরেও না। মাঝেমধ্যে কথা বলছে। তারপর চুপ করে যাচ্ছে। ওরা বিবাহিত কিনা বোঝা যাচ্ছিল না। প্রেমিক-প্রেমিকা হতে পারে, স্বামী-স্ত্রীও। একটা বয়সের পর এই দুটোর তফাৎ বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। কারণ ভালোবাসা আর অভ্যেস তখন একই রকম দেখতে হয়।
ওদের দেখে হঠাৎ তিতিরের কথা মনে পড়ল। তিতিরের বিয়েতে গিয়েছিলাম— সেও প্রায় দশ-বারো বছর হয়ে গেল। কলেজে তিতির আর আমার মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিল। খুব নাটকীয় কিছু না। রাত জেগে হাজার ফোনও না। তবু কলেজ ক্যান্টিনে এক সাথে চা খাওয়া। ক্লাস শেষে একসঙ্গে বেরোনো। বইমেলায় যাওয়া। পরীক্ষার আগে নোট ভাগাভাগি। বৃষ্টির দিনে কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা। এইসব ছোট ছোট জিনিস মিলিয়েই একটা সম্পর্ক তৈরি হয় সম্ভবত।
বন্ধুরাও আমাদের আলাদা করে ভাবত না। ‘অর্জুন আসছিস তো?’— না বলে বলত, “তোরা আসছিস তো?” এই ‘তোরা’ শব্দটার মধ্যেই একটা ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে। যেন সবাই ধরে নেয়, এই দুজন মানুষ অনেকদিন পাশাপাশি থাকবে। মজার ব্যাপার হল, তখন আমরাও সেটা বিশ্বাস করতাম।
তারপর কলেজ শেষ হল। বন্ধুরা যে যার মতো ছড়িয়ে গেল। কেউ এমএ পড়তে গেল। কেউ চাকরি পেল। আর আমি তখন চাকরির পরীক্ষার ফর্ম ভরছি একের পর এক। পরীক্ষায় বসছি। ইন্টারভিউ দিচ্ছি। বাড়ি ফিরে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছি, উনি হতাশ কিনা।
এই সময়েই তিতিরের বিয়ের কার্ড এল। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, তিতির আলাদা করে আমাকে ডাকেনি। আমাদের পুরো গ্রুপকে একটাই কার্ডে নিমন্ত্রণ করেছিল। একই মেসেজ। একই ভাষা। যেন আমিও বাকিদের মতো শুধু কলেজের এক বন্ধু। মেয়েরা কখনও কখনও খুব নিষ্ঠুর হয়। অবশ্য এই নিষ্ঠুরতা ইচ্ছে করে কিনা, আমি জানি না। হয়তো ওদের বাঁচার পদ্ধতিটাই আলাদা।
নিমন্ত্রণ পেয়ে প্রথমে ঠিক করেছিলাম যাব না। তারপর শেষ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। কেন গিয়েছিলাম, আজও সঠিক জানিনা। সম্ভবত না-গেলে যে প্রশ্নগুলো থেকে যেত, সেগুলোর সঙ্গেই দেখা করতে গিয়েছিলাম। বা শেষবারের মতো হয়তো দেখতে চেয়েছিলাম, একটা গল্প সত্যিই শেষ হয়ে গেলে তাকে কেমন দেখায়।
তিতিরকে সেদিন খুব সুন্দর লাগছিল। সব কনেকেই সুন্দর লাগে সম্ভবত। আলো, সাজ, ক্লান্তি— সব মিলিয়ে একটু অন্যরকম দেখায়। সবাই তাকে ঘিরে আছে। ছবি তুলছে। ডাকছে। সাজ ঠিক করছে। দৃশ্যটা দেখে হঠাৎ মনে হল, পৃথিবীতে কোনো মানুষই আসলে কারও একার নয়। আমরা শুধু কিছুদিনের জন্য পাশাপাশি হাঁটি।
এখানে আসার আগে একটা কষ্ট অনুভব করছিলাম। ভেবেছিলাম তিতিরকে দেখলে। ওর বিয়ের মণ্ডপ দেখলে। সিঁদুর পরা মুখ দেখলে। কিছু একটা হবে। কিন্তু কিছুই হল না। ওকে সুন্দর লাগছিল। এই পর্যন্তই। এতে খানিকটা অবাকও লেগেছিল। তাহলে কি আমি তিতিরকে সত্যিই ভালোবাসিনি? নাকি ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু সেই ভালোবাসাটা সময়ের সঙ্গে অন্য কিছুর মধ্যে বদলে গেছে? চলে যাওয়া ভালোবাসা কোথায় যায়, আমি জানি না। মানুষ কি একদিন হঠাৎ কাউকে ভালোবাসা বন্ধ করে দেয়? নাকি ভালোবাসা থেকে যায় কোথাও সুপ্ত…কখনও কখনও মনে পড়ে!
একবার তিতিরের সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছিল। ও সামান্য হেসেছিল। সেই হাসির অর্থ আমি আজও বুঝিনি। স্বস্তি হতে পারে। বিদায়ও। অথবা শুধু এইটুকুই— আজ থেকে আমাদের আলাদা পথ।
তারপর খাওয়াদাওয়া শুরু হল। আমরা কলেজের বন্ধুরা একটা টেবিলে বসেছিলাম। অনেকদিন পর সবাই একসঙ্গে। খেতে খেতে কেউ চাকরির গল্প করছে। কেউ তুললো কলেজের পুরনো গল্প। কেউ তিতিরের বরকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। আমি শুনছিলাম। মাঝেমধ্যে হাসছিলামও।
পাতে উপচে পড়ছে পোলাও, মাটন— তবু ওয়েটার এসে আবার মাটন দিয়ে গেল। আমি বারণ করলাম না, কেননা মাটনটা দারুণ হয়েছিল। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমি খাচ্ছি। মনোযোগ দিয়ে, নিবিষ্টভাবে খাচ্ছি। অথচ যে মেয়েটাকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিলাম একদিন, মাত্র পঁচিশ হাত দূরে তার বিয়ে হচ্ছে।
বেঁচে থাকাটা সম্ভবত এরকমই। খুব বড় কোনো উপলব্ধি না। খুব নাটকীয়ও না। শুধু একদিন বুঝতে পারা— তোমার দুঃখ তোমার চেয়ে বড় নয়।
নদীর ওপরে তখন সন্ধ্যা নেমে আসছে। ওপারে বাংলাদেশ নামে দেশটার আলো জ্বলতে শুরু করেছে। ছেলে-মেয়ে দুটো উঠে চলে গেল। আমি আরও কিছুক্ষণ বসে রইলাম। হাওয়া আসছিল নদীর দিক থেকে।
অনেকদিন পরে মনে হল, শোক ছাড়াও মানুষের ভেতরে আরও অনেক ঘর থাকে।