Email: editors.kokshopoth@gmail.com
August 23, 2026
Kokshopoth

অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১২-তিস্তা

Aug 21, 2026

ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১২-তিস্তা

তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।

জন্মদিন

রাত এগারোটা।

হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলাম। একজনের ফোন নাম্বার খুঁজছিলাম। কন্ট্যাক্ট লিস্টে নামটা স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ আঙুলটা মাঝপথে থমকে গেল। ​সৌম্য।

একসময় নম্বরটা মুখস্থ ছিল। দশটা সংখ্যা ডায়াল প্যাডে চোখ বন্ধ করে এঁকে দিতে পারতাম। আঙুলগুলো নিজেদের মতো পথ চিনে নিত। এখন আর চেনে না। এখন নাম টাইপ করতে হয়। স্ক্রল করতে হয়। নম্বরের নিচে ছোট করে তারিখটা লেখা। আজ আগস্টের ২০ তারিখ। আজ সৌম্যর জন্মদিন।

ফোন করলাম। ফোনটা কানে ধরলাম। ওপাশে রিং হওয়া শুরু হল। একটা… দুটো… তিনটে… ​ধরল। ওপাশের কোলাহলহীন নীরবতায় ওর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

 “মনে রেখেছিস তাহলে।”

সৌম্যর গলায় হালকা হাসি। কিন্তু হাসিতে আগের সেই চেনা উষ্ণতা নেই। একসময় যে গলায় অবাধ অধিকারের সুর থাকত, আজ সেখানে কেবল মেপে নেওয়া ভদ্রতা। 

“অবশ্যই। শুভ জন্মদিন রে।” 

মিথ্যে বললাম। মনে ছিল না। অন্য একজনকে ফোন করতে গিয়ে কন্ট্যাক্ট লিস্টে ওর নামটা ভেসে উঠেছিল। তারিখটা দেখে বুকের ভেতরে কেমন একটা খালি হয়ে গেল। তারপর মনে পড়ল। তারিখটা মাথায় ছিল না। থাকলে সকালে ফোন করতাম। সকালে ফোন করার মধ্যে একটা আলাদা তাগিদ থাকে, উদ্‌যাপন থাকে। থাকে আন্তরিকতা।

আর রাত এগারোটায় ফোন করলে বুঝিয়ে দেয়—দিনটা শেষ হওয়ার মুখে, প্রথাগত সৌজন্যটুকু খালি বাকি থেকে গেছে। তাই সারাদিন পর কড়ায়-গণ্ডায় সেই হিসেব মিটিয়ে দেওয়া।

সৌম্য কি সেটা বুঝল? হয়তো, হয়তো বা নয়। অথবা বুঝেও কিছু বলল না। কথা হল মিনিট পাঁচেক।

 “কেমন আছিস?” 

“ভালো। তুই?”

“চলছে রে। কাজ কেমন?”

“চলছে। ডেডলাইন।”

“বাড়ির সবাই ভালো আছে?”

“হ্যাঁ, তোর? মাসিমা ভালো আছেন?”

“চলছে। বয়স হচ্ছে তো, টুকটাক সমস্যা লেগেই আছে।”  

এই কথোপকথনে অদৃশ্য অথচ একটা মাপা ছন্দ আছে। দুজনেই জানি কোথায় গিয়ে থামতে হবে। ​কোন প্রশ্নের পর কতটা নীরবতা স্বাভাবিক। ঠিক কোন জায়গায় একটা বানানো হাসি দিয়ে শূন্যতা ঢেকে দিতে হবে। একসময় এই ছন্দের প্রয়োজন হতো না। কথা আসত সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, একটার পর একটা। এখন মনে হয়, নাটকের সংলাপের মতো মুখস্থ বলছি।   

সৌম্যর সঙ্গে পরিচয় কলেজের প্রথম বছরে। হোস্টেলের ডাইনিং হলে। ​সেদিন বাইরে বেশ বৃষ্টি পড়ছিল। মেসের বারান্দা ঘেঁষে জলের ছাট আসছে। আমি একা বসে খাচ্ছিলাম। মেলামাইনের একটা থালায় বিচ্ছিরি রান্নার ডাল-ভাত, সয়াবিনের সবজি। ও খাবারের থালা নিয়ে এসে সামনে দাঁড়িয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল,

“বসতে পারি?”

বলেছিলাম, “হ্যাঁ, নিশ্চই।” 

সেদিন দুঘণ্টা কথা হয়েছিল। দুঘণ্টা! এখন পাঁচ মিনিটেই কথা ফুরিয়ে আসে, দম আটকে আসে। কী নিয়ে কথা হয়েছিল সেদিন? আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। হয়তো সিনেমা, হয়তো মেসে দেওয়া বিশ্রী খাবার, কিংবা কলকাতা শহরের আবহাওয়া। সে বয়সে কথার বলার জন্য কোনো বিষয়ের প্রয়োজন পড়ে না। কথার আবার বিষয় কী! কথা বলাটাই ছিল বিষয়।

​এখন বিষয় ছাড়া কথা হয় না।

কলেজের চারটে বছর সৌম্যর জন্মদিন ছিল আমার কাছে একটা উৎসব। তখন সৌম্যর জন্মদিন আপনিই মনে থাকত। শুধু মনে থাকত না, অপেক্ষা করতাম। ক্যালেন্ডারের তারিখটার দিকে কতদিন আগে থেকে যে তাকিয়ে থাকতাম! আগের রাতে ঘড়ি ধরে বসে থাকতাম, ঘড়ির কাঁটাদুটো বারোটার ঘরে এক জায়গায় হলেই প্রথম ফোনটা যেন আমার হয়। ওপাশে ফোন তুলেই ও বলত,

“এখনো ঘুমাসনি?”

“তোর জন্য জেগে ছিলাম রে, গাধা।” 

এই কথা শুনেই ও হাসত। একটা খোলা হাওয়ার মতো তাজা হাসি। ফোনের স্পিকার পেরিয়ে সেই হাসির শব্দ আমার ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেত। আজ এই নির্জন রাতে সেই হাসির শব্দটা অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না। স্মৃতির পুরু ধুলোয় শব্দটা পুরোপুরি ফিকে হয়ে গেছে।  

চাকরি হওয়ার পর দূরত্বটা বাড়তে শুরু করল। সৌম্য গেল পুণেতে, একটা আইটি সংস্থায়। আমি রইলাম এই পুরোনো শহরে। ​তবে ভৌগোলিক দূরত্বটা একটা বাহানা মাত্র। সত্যিটা হলো, একই শহরে থাকলেও হয়তো আজ এই দূরত্বটাই আসত। স্থান পরিবর্তন শুধু প্রক্রিয়াটাকে একটু তরান্বিত করেছে।  

প্রথম বছর পুণে যাওয়ার পর নিয়ম করে ফোন হতো। সপ্তাহে অন্তত একদিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই সময় সেটা গিয়ে ঠেকল মাসে একবার। তারপর শুধু জন্মদিনে, বিয়ের বার্ষিকীতে, নতুবা বড় কোনো ভালো-মন্দ খবর থাকলে। ​এই কমে আসার প্রক্রিয়াটা কেউ ইচ্ছে করে করেনি। কোনো ঝগড়া হয়নি। কোনো অপমান বা মান-অভিমানও হয়নি। শুধু জীবনের তাগিদে একজন অন্যজনের কক্ষপথ থেকে দূরে ছিটকে গেছি নিঃশব্দে।

এমনি করে হারিয়ে যাওয়াটাই কি সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়ম? জানি না।

ফোনে ওপাশের দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে সৌম্য বলল,

“দেখা হবে একদিন।”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। জলদি মিট করছি।” 

‘দেখা হবে একদিন।’ এই বাক্যটার ভেতরের সত্যিটা আমরা দুজনেই জানি। কিন্তু দুজনেই প্রথা মেনে মিথ্যেটা বললাম। সত্যিটা বলা যায় না, কারণ সত্যিটা বড্ড নির্মম। সত্যিটা হলো, দেখা করার মতো কোনো যৌথ কারণ আর আমাদের অবশিষ্ট নেই।​ আলাদা হয়ে যাওয়া দুটো জীবন, দুটো আলাদা জগত যখন মুখোমুখি এসে বসে, তখন স্মৃতির দু-চারটে শুকনো পাতা ছাড়া নতুন কোনো কথাই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। 

পাঁচ মিনিটও গড়াল না, কথা শেষ হয়ে গেল। ​স্ক্রিনটা কালো হয়ে যেতেই ঘরটা আবার নিঝুম হয়ে এলো। কিছুক্ষণ চুপচাপ খাটের ওপর বসে রইলাম। ঘরের নীরবতা যেন হঠাৎ বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল! হিসেব করে দেখলাম, শেষ দেখা হয়েছিল আজ থেকে তিন বছর আগে। এক বন্ধুর বিয়েতে, মারাত্মক ভিড়ের মধ্যে। মাত্র দশ মিনিটের জন্য।

​            তিন বছর। তিন বছরে পৃথিবী অনেকটাই বদলায়। মানুষও বদলায়। সৌম্য বদলেছে নিশ্চয়ই। ওর হাবভাব, ওর কথা বলার টান বদলেছে। আমিও কি আর আগের মতো আছি? কিন্তু ফোনে কথা বলার সময় আমরা সেই পুরোনো অতীতে আটকে থাকার নাটক করি। পুরোনো ছাঁচে কথা বলি। সেই পুরোনো ছাঁচটা কিন্তু প্রতিদিন একটু একটু করে ছোট হয়ে আসছে। একটা সময় আসবে যখন ছাঁচটাও আর থাকবে না।

বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ কী মনে হলো। খাট থেকে উঠলাম। টেবিলের নিচের ড্রয়ারটা টেনে একদম পেছনের দিকে হাতড়ালাম। একরাশ পুরোনো খাতা আর রসিদের নিচ থেকে একটা নীল রঙের ডায়েরি বের করলাম। অন্তত আট-দশ বছর আগের। প্রচ্ছদে ধুলোর একটা পুরু আস্তরণ। ফুঁ দিয়ে ধুলোটা ওড়ালাম। কাগজের গন্ধটা কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে।

পাতা ওল্টাতে শুরু করলাম। একে একে পুরোনো দিনগুলো ভেসে উঠতে লাগল। থামলাম এক জায়গায়। ​লাল কালিতে গোল করে চড়া দাগে লেখা—সৌম্যর জন্মদিন! 

পাশে একটা ছোট কেকের ছবি আঁকা। ওপরের দিকে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি। আমিই এঁকেছিলাম। কোনো এক অলস অফ-ক্লাসে বসে।

কখন এঁকেছিলাম? সালটা মনে নেই। সম্ভবত বহু পেছনে ফেলে আসা কোনো এক শীতের দুপুর। যে মানুষটা একদিন যত্ন করে খাতার কোণে রঙিন কালিতে বন্ধুর জন্য কেকের ছবি এঁকে রাখত, সে মানুষটা আজ কোথায় হারিয়ে গেল? 

সেই ছেলেটা, আর আজকের এই ছেলেটা কি এক? উত্তর নেই। অন্তত আমার কাছে নেই। ​স্মার্টফোন আসার পর ডায়েরিতে চোখ রাখা বন্ধ হয়েছিল। ক্যালেন্ডার অ্যাপে রিমাইন্ডার সেট করার সুবিধে এলো। কিন্তু রিমাইন্ডার সেট করতে হলেও তো মানুষকে আগে থেকে মনে রাখতে হয়। তার নামটা তালিকার ভেতর ঢোকাতে হয়। ঢোকাইনি। কেন ঢোকাইনি?

হয়তো সময়ের অজুহাতে ভুলে গিয়েছিলাম। হয়তো ভেবেছিলাম প্রতিদিনের এই ডিজিটাল ভিড়ে আর দরকার হবে না। হয়তো ওই মুহূর্তে অন্য কোনো কাজ জরুরি ছিল। 

‘হয়তো’ শব্দটা খুব অদ্ভুত! জীবনের অজস্র ব্যর্থতা আর অলসতাকে এই একটা শব্দ দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়। ​সম্পর্কগুলো কি এভাবেই মরে যায়? কোনো বড় বিস্ফোরণ ছাড়া? কোনো তীব্র ঘৃণা বা রক্তক্ষরণ ছাড়া? ​শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে নাম মুছে গিয়ে… রিমাইন্ডারের নোটিফিকেশন বন্ধ হয়ে গিয়ে… ফোন করতে করতে পাঁচ মিনিটের জং ধরা সৌজন্যে নেমে এসে… অথবা দেখা হবে বলে আর কোনোদিন না হয়ে!

ডায়েরিটা বন্ধ করলাম। আবার ড্রয়ারের অন্ধকারে চালান করে দিলাম। আলোটা নিভিয়ে বিছানায় এসে শুলাম।

সৌম্যকে শুভ জন্মদিন বলা হয়ে গেছে। বাৎসরিক খাতাটায় একটা টিক মার্ক পড়ল। এটুকু হয়েছে। এটুকুই যথেষ্ট? ​মন উত্তর দেয় না। তবে যথেষ্ট না হলেও আজ রাতে আর কিছু করার সামর্থ্য বা অধিকার আমার নেই। 

সিলিং ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দের ভেতর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। অন্ধকার ধীরে ধীরে আরও ঘন হয়ে এলো। 

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *