Email: info@kokshopoth.com
June 25, 2026
Kokshopoth

সাহিত‍্য পুরস্কারের সেকাল-একাল : বিতর্ক ও বিস্ময়ে

Jun 19, 2026

খসরু পারভেজ-এর প্রবন্ধ
সাহিত‍্য পুরস্কারের সেকাল-একাল : বিতর্ক ও বিস্ময়ে

জন্ম, ১৯৬২। যশোর। বাংলাদেশ। পড়াশোনা সাহিত্য নিয়ে।

প্রতিষ্ঠা করেছেন মধুসূদন স্মারক সংস্থা ‘মধুসূদন একাডেমী’ ও কবি সংগঠন ‘ পোয়েট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ‘।

কবিতা চর্চার পাশাপাশি গান লেখেন। গদ‍্য চর্চা ও গবেষণাধর্মী কাজে নিবেদিত। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে গবেষণাকর্মে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: কবিতা, সম্পাদনা, অনুবাদ মিলিয়ে ৪১ টি

সম্পাদনা করেছেন দুই ডজনের বেশি মধুসূদন বিষয়ক সাময়িকী ও স্মরণিকা এবং ছোটকাগজ ‘অববাহিকা’ ও ‘ভাঁটফুল’ । ‘সুবর্ণ লিরিক’-এর উপদেষ্টা সম্পাদক।

কবে থেকে সাহিত‍্য পুরস্কারের প্রচল চালু হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে পুরস্কার প্রথা যে খুব প্রাচীন এটা বলা যায়। ধারণা করি কোনও কাজের মূল‍্যায়নে একে অন‍্যকে খুশি করা, সন্তুষ্টির জন‍্য উপহার প্রদানের সদিচ্ছার মধ‍্য দিয়ে আদিম কালেই জন্ম হয়েছে পুরস্কার প্রদান রীতির। ধর্মগ্রন্থ থেকেও এই প্রথা মানুষের মধ‍্যে সংক্রমিত হতে পারে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে সৎকর্মের জন‍্য, প্রার্থনার মাধ‍্যমে সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ পালনে মানবজাতিকে পরকালে পুরস্কৃত করার কথা বর্ণিত হয়েছে। সেসব পুরস্কারের মধ‍্যে রয়েছে বিভিন্ন দামি সুস্বাদু খাবার, স্বর্গ সুধা পান, অনন্ত যৌবন ধারণ। পুরুষদের জন‍্য  অনন্ত সঙ্গম সুখের উদ্ভিন্না যৌবনা অপ্সরী, তিলোত্তমা, উর্বশী, হুর, সমকামের জন‍্য সুদর্শন বালক, গেলেমান। সতী, সাধ্বী রমণীদের জন‍্য পুণ‍্যবান স্বামী। এসব পুরস্কার অবশ‍্য স্বর্গ বা বেহেশতে বিশ্বাসী মানুষের জন‍্য।

পুরস্কার প্রদানের জন‍্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি। আর বিশ্বে প্রচলন আছে বহু পুরস্কারের। খেলা, সাহিত‍্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, সাংবাদিকতা বিভিন্ন বিষয়ে পুরস্কার প্রদান করা হয়ে থাকে। আমার আলোচনা শুধুমাত্র সাহিত‍্য পুরস্কারের মধ‍্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও প্রসঙ্গক্রমে অন‍্যান‍্য পুরস্কারের কথা উল্লেখ হতে পারে।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সমৃদ্ধ একটি শহর, যার নাম উর। আধুনিক দক্ষিণ ইরাকের পারস‍্য উপসাগরে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদী দুটির আদি মোহনায় উর শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রথম লিখিত ভাষার উদ্ভাবক সুমেরীয়দের সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এই নগরের একটি জিগুরাত অর্থাৎ উপসনালয়ের পুরোহিত ছিলেন বিশ্ব-সাম্রাজ‍্যের সবচেয়ে শক্তিমান নারী এনহেদুয়ানা। তিনি ধর্মীয় স্তোত্র বা স্তবগান রচনা করতেন। কিউনিফর্ম পদ্ধতিতে লেখা তাঁর বিয়াল্লিশটি স্তবগান সাইত্রিশটি প্রস্তরখণ্ড থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ব‍্যাবিলনীয়দের মাধ‍্যমে এর প্রভাব হিব্রু বাইবেল, প্রাচীন গ্রিকের প্রার্থনাসংগীত ও বিভিন্ন মহাকাব‍্যে বিস্তৃত হয়েছে। রাজা ও আমর্ত‍্যবর্গের উদ‍্যোগে এনহেদুয়ানাকে কবি হিসেবে মুকুট পরানো হয়। বলতে পারি, এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত এটিই পৃথিবীর প্রথম সাহিত‍্য পুরস্কার ও সম্মাননা।

যীশু খ্রিস্টর জন্মের হাজার বছর আগে জন্ম হয়েছিল মহাকবি হোমারের। গ্রিসের এই বিশ্ববিশ্রুত কবির মহাকাব‍্য ‘ইলিয়ড’-এ একিলিসের পক্ষ থেকে যুদ্ধ পরবর্তী লুটের মালামাল, বিজিত শত্রুর বর্ম বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে তুলে দেয়ার বর্ণনা আছে। সেকালে নুতন সম্পর্ক নবায়নের ক্ষেত্রে মৃত ব‍্যক্তির সম্পত্তি পুরস্কার হিসেবে গণ‍্য হত। প্রাচীন উপহার বা পুরস্কার প্রদানের প্রথা অনুযায়ী খেলাধূলায় বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদানের কথা হোমারের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি।

জিউসের সম্মানার্থে প্রাচীন গ্রিসে অলিম্পিক খেলার প্রবর্তন হয়। ৪৩৫ খ্রিস্টপূর্ব অব্দে অলিম্পিয়ায় নির্মিত হয় হাতির সিংহাসনে বসানো হাতির দাঁত এবং বসে থাকা সোনার তৈরি দেবরাজ জিউসের মূর্তি। ভাস্কর ও কবিরা এখানে সম্মানিত হয়ে নিজ নিজ কৃতিত্ব প্রদর্শন করতেন। অতঃপর বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হত। রোমান আমলে জুলিয়াস সিজারসহ বিজয়ীদের বরণ করা হত লরেল পাতার মুকুট দিয়ে । এখনও অলিম্পিকে বিখ‍্যাত কোনো ব‍্যক্তিকে লরেল সম্মাননা প্রদানের রেওয়াজ আছে। এখানে যে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়, তাতে এই পাতার প্রতীক ব‍্যবহৃত হয়। কিন্তু লরেল পাতা কেন? লরেল এক ধরনের উদ্ভিদ। যার অন‍্য নাম ড‍্যাফনে। এটা বিরল প্রজাতির। গ্রিসের মানুষ এই গাছকে দেবীর নামে নামকরণ করে। গ্রিক পুরাণে লরেল একটি দেবীর নাম। লরেল পাতার মুকুট খুব মূল‍্যবান বলে বিবেচনা করা হত। লরেল দেবীর স্মরণে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের কাছে এই লরেল পাতার মুকুট ছিল খুবই প্রত‍্যাশিত। গ্রিক ঐতিহাসিক পসানিয়াসের লেখায় উল্লেখ আছে, ডাক্টারইল হেরাক্লিস ( জিউসের পুত্র নয় ) তাঁর দুই ভাইয়ের সাথে অলিম্পিকের এক দৌড় প্রতিযোগিতায় অংগ্রহণ করেন। তারপর তিনি বিজয়ীকে লরেল পাতার মুকুট পরিয়ে দেন। সেই থেকে অলিম্পিকে লরেল মুকুট প্রদানের প্রবর্তন হয়। সমগ্র ইউরোপে লরেল ছিল সেরা পুরস্কার। শুধু ক্রীড়ায় নয়, সাহিত‍্যেও এই লরেল মুকুট পরানোর দৃষ্টান্ত মেলে।  ইতালির কবি ফ্রাঞ্চেসকো পেত্রারকা( ১৩০৪ – ১৩৭৪ )-সহ অনেককেই আমরা এই পাতার মুকুট পরিহিত অবস্থায় ছবিতে দেখতে পাই। বাংলার কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে অবস্থানকালে তাঁর সাহিত‍্যসাধনার কথা উল্লেখ করে বন্ধুকে লেখা চিঠিতে বলেছিলেন  -“আমি চাই লরেল পাতার মুকুট”। তখন ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় কোনো পুরস্কারের প্রবর্তন ঘটেনি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ‍্যমে পুরস্কার প্রদানের রীতি বোধ করি ব্রিটিশ শাসনামলে চালু করা হয়। ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজে স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে শ্রী মধুসূদন দত্ত স্বর্ণপদক অর্জন করেছিলেন প্রথম পুরস্কার হিসেবে। কবি-লেখকদের সম্বর্ধনা প্রদানও এক ধরনের পুরস্কার। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব‍্য’ প্রকাশিত হয়। এ কাব‍্য প্রকাশের পর সুধিমহলে কবির খ‍্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। মহাকবি স্বীকৃতি দিয়ে কলকাতার বিদ‍্যোৎসাহিনী সমাজের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। কবিকে উপহার প্রদান করা হয় রৌপ্যের পানপাত্র। ভারতের ইতিহাসে এটাই প্রথম কবি-সম্বর্ধনা বা গুণীজন-সম্বর্ধনা।

প্রাচীনকালে রাজা-বাদশাহরা রাজসভায় সভাকবি রাখতেন। সভাকবিগণ রাজার ফরমায়েশে কাব‍্যরচনা করতেন। এর জন‍্য কবিদের বিভিন্ন উপঢৌকন বা পুরস্কার প্রাদান করা হত। ব্রিটেন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে এখনও রাজকবি বা সভাকবি পদায়নের দৃষ্টান্ত আছে। কাব‍্যরচনা করে প্রকৃত মূল‍্যায়ন না করার ঘটনাও আমরা জানি। আজ থেকে বহু শতাব্দী আগে গজনীর সুলতান মাহমুদের পৃষ্ঠপোষকতায় কবি আবুল কাসেম ফেরদৌসী ( ৯৪১-১০২০ ) রচনা করেন ‘শাহনামা’। এটি ইরানের জাতীয় মহাকাব‍্য হলেও বিশ্ববিখ‍্যাত সাহিত‍্যসৃষ্টি। এতে রয়েছে বাষট্টিটি আখ্যান, নয়শত নব্বইটি অধ্যায় ও ষাট হাজার শ্লোক । শাহনামায় তুলে ধরা হয় ইরানের সমকালীন ও প্রাচীন ইতিহাস এবং পারস্যের সংস্কৃতি।

সুলতান মাহমুদ কবিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মহাকাব‍্যের প্রতিটি শ্লোকের জন‍্য একটি করে স্বর্ণমুদ্রা

প্রদান করবেন। রাজদরবারের কবির শ্রেষ্ঠ সম্মান দেখে রাজসভার অন্যান্য কবিরা ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। শুরু হয় কবির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র। সুদীর্ঘ ৩০ বছর পরিশ্রম করে ফেরদৌসী শাহনামা রচনা শেষ করেন। রাজদরবারের কতিপয় ঈর্ষাপরায়ণ ও ষড়যন্ত্রকারীর কুমন্ত্রণা শুনে সুলতান তাঁর প্রতিশ্রুত ৬০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা কবিকে না দিয়ে সম পরিমাণ রৌপ‍্য মুদ্রা প্রদান করেন। কবি ক্রোধ, ক্ষোভ ও দুঃখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। ক্ষুব্ধ কবি সুলতানের দেওয়া রৌপ‍্যমুদ্রা ভৃত্য,স্নানাগারের রক্ষক,নিকটস্থ গরীব লোকদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দেন। রাজকীয় পুরস্কারকে অপমান করার স্পর্ধার কথা শুনে সুলতান ক্ষুদ্ধ হয়ে কবিকে হাতির পদতলে পিষ্ট করে হত্যার নির্দেশ দেন। কিন্তু তার আগে সুলতানের উদ্দেশ্যে একটি কবিতা লিখে শাহী মসজিদের দেয়ালে টাঙিয়ে রেখে গভীর রাতে গজনী ত‍্যাগ করেন কবি। কবিতাটি ছিল এরকম-

   সুলতান যদি স্বভাবে তাঁর দরিদ্র না হতেন,

   তাহলে কবিকে নিয়ে তিনি সিংহাসনে বসাতেন

   সুযোগ‍্য যে নরপতি তার দীনতা থাকে না বটে

   পৌরুষের সঙ্গে দারিদ্র্যের সখ‍্য কখনো কি ঘটে!

   প্রজ্ঞার উপর সুলতানের নেই যে অধিকার,

   তাই তো জোটেনি কবির কপালে যোগ‍্য পুরস্কার।

   রাজার আসনে রাজা যদি অভিজাতই না হয়

   বুঝবেন তিনি কী করে তা অভিজাত কারে কয়!

   সুলতান যদি হতেন সুলতানেরই সন্তান;

   তাহলে কবির শিরে পরাতেন স্বর্ণ-শিরস্ত্রাণ!

   সুলতানের মা যদি কোনো রাজার কন্যা হতেন,

   তাঁর পুত্র তবে তাঁর ওয়াদা ঠিকই রাখতেন!

   কুলে যদি মাহাত্ম্য না থাকে কি করে সে মহৎ হয়!

   নরপতি মাহমুদ, তোমার প্রাপ‍্য থুথু নিশ্চয়!

 

গজনী ত্যাগ কবার পূর্বে লেখা ফেরদৌসীর এই কবিতা পাঠ করে সুলতান ক্ষুব্ধ হন। কেননা তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন দাশ বংশোদ্ভূত। কিছু ভুল লেখেননি কবি। সুলতান কবিকে গ্রেফতার করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে ব‍্যর্থ হন। গজনী ত্যাগ করে কবি কুহেস্তান রাজ্যের রাজা নসরুদ্দিন ‍মুহতাসেমের নিকট রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। রাজা কবিকে যোগ‍্য সম্মান দিয়ে রক্ষা করেন। কবি সুলতানের প্রতারণা ও হীনমন্যতার কথা ভুলতে পারেন না। কুহেস্তানে বসেও কবি সুলতান মুহমুদকে উপলক্ষ্য করে একটি ব্যাঙ্গকাব্য রচনা করেন। রাজা নসরুদ্দিন মুহতাসেম ছিলেন সুলতান মাহমুদের একান্ত বন্ধু। একারণে কাব্যটি পাঠ করে রাজা খুব ব‍্যথিত হন। কাব্যটি বন্ধুর জন্য খুবই অবমাননাকর মনে করে রাজা কবিকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করে কাব্যটি  বিনষ্ট করে ফেলেন। সুলতান মাহমুদ কবিকে ফেরত নেয়ার জন‍্য বন্ধু রাজাকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। কিন্তু রাজা মুহতাসেম কবির উচ্চ প্রশংসা করে সুলতানকে পত্র প্রেরণ করেন। পত্র পাঠ করে সুলতান মর্মাহত হন। অন‍্যদিকে কবিকে গ্রহণ করার জন্যে দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমন্ত্রণ আসতে থাকে কিন্তু কবি কোনো আমন্ত্রণ গ্রহণ না করে চলে যান বাগদাদে। বাগদাদ অবস্থানকালে কবি ইউসুফ জুলেখার কাহিনি নিয়ে ১৮০০০ শ্লোকের একটি প্রেমের কাব্য রচনা করেন। এ সময় কবিকে ফেরত পাঠানোর জন‍্য বাগদাদের বাদশার প্রতিও সুলতান পত্র লিখে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। কিন্তু বাগাদাদ থেকে কবিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। বাগদাদের শাসনকর্তা সুলতানের প্রেরিত পত্রের উত্তরে লেখা তাঁর পত্রের এক কোণে আলিফ,লাম ও মীম এ তিনটি অক্ষর লিখে পাঠিয়ে দেন। সুলতান মাহমুদ পত্রে এই তিনটি আরবি অক্ষর দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন। রাজ দরবারের কেউই তার মর্মোদ্ধার করতে না পারলে সুলতান ফেরদৌসীর অভাব তীব্রভাবে অনুভব করেন। ইতোমধ্যে ন্যায় বিচারক সুলতান মাহমুদ নিজের ভুল বুঝতে পারেন। ফেরদৌসী রাজসভার অন্যান্য কবি এবং মন্ত্রীদের ষড়যন্ত্রের স্বীকার এ কথা সুলতানের নিকট স্পষ্ট হয়ে যায়। ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রী খাজা ময়মন্দীকে রাজপদ থেকে অপসারণ করেন এবং কবিকে অনতিবিলম্বে ফিরিয়ে আনার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। ততদিনে কবি ফিরে গেছেন তাঁর জন্মভূমি ইরানের তুস নগরে। অনুতপ্ত সুলতান কবির প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন স্বরূপ কবির প্রাপ্য ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রাসহ কবির জন্মভূমিতে দূত প্রেরণ করেন। কিন্তু দূত যখন স্বর্ণমুদ্রা বোঝাই উট নিয়ে কবির গৃহ আঙিনায় পৌঁছান, তখন অন‍্য পাশ দিয়ে কবির লাশ বহন করে গোরস্থানের পথে চলেছে তাঁর স্বজনেরা। দূতের পক্ষ থেকে কবির একমাত্র কন‍্যার কাছে সমুদয় স্বর্ণমুদ্রা সমর্পণের ইচ্ছা ব‍্যক্ত করলেও কবিকন‍্যা তা প্রত‍্যাখ‍্যান করেন।

প্রাচীনকালে রাজা-বাদশাহরা প্রজাদের কাজে খুশি হয়ে পুরস্কার স্বরূপ খাস জমি, নিষ্কর জমি দান করতেন। এটাও এক ধরনের পুরস্কার।

বিশ্বাসঘাতকতার জন‍্যও ইতিহাসে পুরস্কারের দৃষ্টান্ত  আছে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। বেনিয়াদের হাতে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দিয়েছিল বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রেই বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কারস্বরূপ মীরজাফরকে নতুন নবাব হিসেবে অভিনন্দন ও কুর্নিশ জানিয়েছিল রবার্ট ক্লাইভ। বাংলা-বিহার-উড়িষ‍্যার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনে বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার হিসেবে ইংরেজরা মীর জাফরকে বাংলার মসনদে আরোহণের সুযোগ করে দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশেও এ ধরনের দৃষ্টান্ত আছে। পচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত‍্যা করে মীরজাফর রূপী খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপতি করা হয়।  পরবর্তী সময়ে ঘাতকদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক ও সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘নোবেল প্রাইজ’। প্রখ‍্যাত সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল তাঁর উপার্জিত অর্থ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে এই পুরস্কারের জন‍্য উইল করে রেখে যান। সেই অর্থ থেকেই ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের পাশাপাশি সাহিত‍্যের জন‍্যও সুইডিশ একাডেমি কর্তৃক প্রদান করা হয় নোবেল প্রাইজ। প্রথমবার সাহিত‍্যে এই পুরস্কার অর্জন করেন ফ্রান্সের কবি ও প্রাবন্ধিক সুঘলি প্রম্নদোম ( ১৮৩৯ – ১৯০৭ )। বিশ্বের সবচেয়ে দামি এই পুরস্কার প্রাপ্তির পর প্রম্নদোম একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান। পুরস্কার প্রাপ্তির সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। মৃত‍্যুর আগে পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি তাঁর দেশের তরুণ লেখকদের প্রতিভা বিকাশের জন‍্য একটি তহবিলে দান করে যান। সেই তহবিল থেকে তরুণ লেখকদের পুরস্কার প্রদানের মধ‍্য দিয়ে মূল‍্যায়নের ধারা আজও অব‍্যাহত আছে। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সাহিত‍্যে অবদানের জন‍্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পুরস্কারে ভূষিত হন।

বিশ্বখ‍্যাত অন‍্যান‍্য পুরস্কারের মধ‍্যে রয়েছে বুকার পুরস্কার। যুক্তরাজ‍্যের ম‍্যান বুকার বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের একটি। একবছরে প্রকাশিত ইংরেজি ভাষায় রচিত সেরা উপন‍্যাসের ক্ষেত্রে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই পুরস্কার প্রদানের রীতি চলে আসছে। আর একটি বিশ্বসেরা পুরস্কার ‘পুলিৎজার পুরস্কার’। সাংবাদিকতা, সংগীতচর্চার পাশাপাশি সাহিত‍্যে অবদানের জন‍্য ১৯১৭ খ্রিব্দ থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। খ‍্যাতিমান মার্কিন সাংবাদিক জোসেফ পুলিৎজার ( ১৮৪৭-১৯১১) এর প্রদত্ত অর্থের তহবিল থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ভৌতিক বা হরর সাহিত‍্যের জন‍্য প্রচলন হয়েছে ‘ব্রাম স্টোকার অ‍্যাওয়ার্ড’। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘ড্রাকুলা’ উপন‍্যাসের স্রষ্টা প্রখ‍্যাত আইরিশ লেখক ব্রাম স্টোকার এই পুরস্কার প্রবর্তন করেন।

এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সাহিত‍্য পুরস্কারের প্রচলন রয়েছে। আমাদের আলোচনা শুধু সাহিত‍্য পুরস্কার নিয়ে। তবু সাহিত‍্যের বাইরে অন‍্যান‍্য বিখ‍্যাত পুরস্কারগুলো সম্পর্কে পাঠককে অবহিত করার জন‍্য এখানে উল্লেখ করা হল। অন‍্যান‍্য পুরস্কারের মধ‍্যে অন‍্যতম– সিনেমাজগতের সেরা পুরস্কার ‘অস্কার’ ; ভিডিও মিউজিক ‘এমটিভি অ‍্যাওয়ার্ড ‘ ; ভারতীয় ‘দাদাসাহেব ফালকে’ চলচ্চিত্র পুরস্কার; কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘গোল্ডেন পাম’ ; হলিউডের ‘গোল্ডেন গ্লোব অ‍্যাওয়ার্ড’ ; সংগীত শিল্পে অবদানের জন‍্য আমেরিকার ‘গ্রামি’ ; কম্পিউটার বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন‍্য ‘টুরিং’ ; চলচ্চিত্রে বৃটিশ একাডেমির ‘বাফটা’ ; মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির জন‍্য ব্রিটেনের ‘ব্রিটস’ ; শান্তি-সাম‍্য-সামাজিক ন‍্যায় বিচারের জন‍্য ‘মাদার তেরেসা’ ; গণিতের উন্নয়ন ও সাফল‍্যের জন‍্য ‘ ফিন্ডম’ ; ‘আবেল’ ; কার্ল ফ্রিডরিশ গাউস প্রাইজ ; কলা ও বিজ্ঞানে জাপানের ‘কিয়োটা’ ; বিজ্ঞানের ‘টেম্পলটন’ ; ক্রীড়ার ‘আইসিসি’ প্রভৃতি।

ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন সাহিত‍্য পুরস্কার ‘কুন্তলীন পুরস্কার ‘। ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার প্রখ‍্যাত ব‍্যবসায়ী হেমেন্দ্রমোহন বসু এই পুরস্কার প্রবর্তন করেন। ‘কুন্তলীন’ নামে তাঁর বিখ‍্যাত সুগন্ধি তৈলের প্রসার ছিল। অন‍্যান‍্য ব‍্যবসার পাশাপাশি এই নামে তাঁর ছাপাখানা ছিল। ‘কুন্তলীন’ নামে তিনি একটি সাহিত‍্য পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। তৎকালীন খুব মর্যাদাপূর্ণ ছিল এই পুরস্কার।  অন‍্যান‍্য পুরস্কারের মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রবর্তিত ‘জগত্তারাণী পদক’। বাংলা ভাষা ও সাহিত‍্যে অবদানের জন‍্য  দুই বছর অন্তর এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রথম এই পুরস্কার প্রদানের মধ‍্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর একটি পুরস্কারের প্রবর্তন হয় শুধুমাত্র মহিলা লেখকদের সাহিত‍্যপ্রতিভা মূল‍্যায়নের জন‍্য ; এটি ‘ভুবনমোহিনী দাসী পদক’। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে এটি চালু হয়। আর একটি মর্যাদাবান পুরস্কার ‘ভারতরত্ন’। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এই পুরস্কারের প্রচলন শুরু হয়। একই সাল থেকে তিন ধরনের পদ্ম পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। এই তিনটি হল– পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী। শুধু সাহিত‍্য নয়, বিভিন্ন বিষয়ের উপর এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত‍্য সম্মাননা ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার ‘। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে থেকে এটি চালু হয়েছে। অন‍্য যেসব পুরস্কার রয়েছে সেগুলোর মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য,- সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, টেগোর অ‍্যাওয়ার্ড, বাচস্পতি সম্মান, ব‍্যাস সম্মান, বিদ্যাসাগর পুরস্কার, সোমেন চন্দ পুরস্কার, সরোজিনী বসু পদক, লীলা পুরস্কার, ভারতেন্দু পুরস্কার, কমলকুমারী পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, নরসিংহদাস পুরস্কার, সোপান পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, ভূয়ালকা পুরস্কার, তারাশঙ্কর পুরস্কার, সমরেশ বসু পুরস্কার, ভরতব্যাস পুরস্কার, কাঞ্চিদেশ পুরস্কার, ভূমি পুরস্কার,পঞ্চানন পুরস্কার। পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত‍্য পুরস্কার ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’। এটি চালু হয়েছে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘মাইকেল মধুসূদন স্মৃতি পুরস্কার’ ; ‘ অন্নদাশঙ্কর রায় সাহিত‍্য পুরস্কার ‘। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম প্রবর্তন করা হয় ‘বাংলা আকাদেমি পুরস্কার’।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার সমূহের মধ‍্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার, শিশু একাডেমি পুরস্কার। আর অন‍্যান‍্য সংস্থা ও পরিচালিত পুরস্কার সমূহের মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য আইএফআইসি ব‍্যাংক সাহিত‍্য পুরস্কার, জেমকন সাহিত‍্য পুরস্কার, ব্রাক ব‍্যাংক-সমকাল সাহিত‍্য পুরস্কার, অগ্রণী ব‍্যাংক শিশু সাহিত‍্য পুরস্কার, সিটি ব‍্যাংক আনন্দ আলো সাহিত‍্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার,

সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার, মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার, কবীর চৌধুরী শিশু সাহিত্য পুরস্কার, মেহের কবীর বিজ্ঞানসাহিত্য পুরস্কার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্যিক মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ প্রবন্ধ পুরস্কার, কবি জসিমউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার, কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার, এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হ‌ুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, ফিলিপ্স সাহিত্য পুরস্কার, মুক্তধারা একুশে সাহিত্য পুরস্কার, লেখিকাসংঘ স্বর্ণপদক, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, মহাকবি মধুসূদন পদক, মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার প্রভৃতি। এর বাইরে খ‍্যাতিমান ব‍্যক্তিদের নামে, নিজের নামে অসংখ্য পুরস্কার দেওয়া হয় বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সংগঠনের পক্ষ থেকে, যার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা কঠিন। একসময় বলা হত কবি ও কবিতার দেশ বাংলাদেশ। আর এখন উপহাস করে কেউ কেউ বলেন পদক ও পুরস্কারের দেশ বাংলাদেশ। প্রকৃত প্রতিভা বিকাশের জন‍্য এসব পুরস্কার দেওয়া হয় কিনা, এ নিয়ে আছে ভিন্নমত।

পুরস্কার শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আনন্দ- অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাস। একটি পুরস্কার কর্মপ্রেরণাকে উদ্দীপিত করে। সেটা অবশ‍্য প্রকৃত মূল‍্যায়নের ক্ষেত্রে। কিন্তু দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক আছে। পুরস্কারকে কখনও ব‍্যবহার করা হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। কখনও কোনো বিশেষ ব‍্যক্তি,গোষ্ঠী,দলকে খুশি করার জন‍্য। কখনও বিশেষ কোনো সুবিধা আদায় বা প্রাপ্তির প্রয়োজনে পুরস্কারকে ব‍্যবহার করা হয় ট্রামকার্ড হিসেবে। সেক্ষেত্রে বঞ্চিত হন প্রকৃতপক্ষে পুরস্কার পাওয়ার জন‍্য যোগ‍্য কোনো লেখক । কখনও কখনও জোর করে, চাপ প্রয়োগ করে পুরস্কার আদায় করে নেওয়া হয়, ছিনিয়েও নেওয়া হয়। এর মধ‍্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে যোগ‍্য কোনো লেখক যে পুরস্কার পান না, এমন নয়। তবে অভিযোগের পাল্লাটা সবসময় ভারিই থাকে।

 

প্রথমে আসা যাক বিশ্বের সেরা নোবেল প্রাইজ প্রসঙ্গে।

লেখক হিসেবে পৃথিবীজোড়া খ‍্যাতি পেয়েছেন, অথচ নোবেল পাননি, এমন দৃষ্টান্ত অনেক। হেনরিক ইবসেন (১৮২৬ – ১৯০৬ ), লিও টলস্টয় ( ১৮২৮-১৯১০) নোবেল প্রাইজ প্রবর্তনের আগেই তাঁরা বিশ্বখ‍্যাত লেখক। কিন্তু নোবেল পাননি। মার্ক টোয়েন ( ১৮৩৫-১৯১০ ) দশবার মনোনয়ন পেয়েছেন, অথচ তাঁর মতো প্রভাবশালী লেখককে এই পুরস্কার দেওয়া হয়নি। নোবেল পুরস্কার না পাওয়া লেখকদের তালিকা দীর্ঘ। এ তালিকায় রয়েছেন, এমিলি জোলা (১৮৪০ – ১৯০২), টমাস হার্ডি (১৮৪০ – ১৮২৮), হেনরি জেমস ( ১৮৪৩ – ১৯১৬), আগাস্ট স্টিনবার্গ ( ১৮৪৯ – ১৯১২ ), জোসেফ কনরার্ড ( ১৮৫৭ – ১৯২৪), আন্তন চেখভ ( ১৮৬০- ১৯০৪ ), ম‍্যাক্সিম গোর্কি (১৮৬৮ – ১৯৩৬ ), মার্সেল প্রস্ত ( ১৮৭১ – ১৯২২), পল ভ‍্যালেরি ( ১৮৭১ – ১৯৪৫ ), রবার্ট ফ্রস্ট ( ১৮৭৪ – ১৯৬৩ ), জেমস জয়েস ( ১৮৮২-১৯৪১), ভার্জিনিয়া উলফ ( ১৮৮২- ১৯৪১), ফ্রাৎস কাফকা ( ১৮৮৩ – ১৯২৪ ),  এজরা পাউন্ড ( ১৮৮৫- ১৯৭২ ), ডি এইচ লরেন্স ( ১৮৮৫ – ১৯৩০ ), গার্সিয়া লোরকা ( ১৮৯৮ – ১৯৩৬ ), বারটল্ট ব্রেখট (১৮৯৮ – ১৯৫৬ ), ভ্লাদিমির নভোকভ ( ১৮৯৯ – ১৯৭৭ ), হোর্হে লুই বোর্হেস ( ১৮৯৯ – ১৯৮৬ ), জর্জ ওরওয়েল ( ১৯০৩ – ১৯৫০ ), আর্থার মিলার ( ১৯১৫ – ২০০৫ ), চিনুয়া আচেবে (১৯৩০ – ২০১৩), জন আপডাইক ( ১৯৩২ – ২০০৯ ) প্রমুখ। জীবিতদের মধ‍্যে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে মিলান কুন্ডেরা (১৯২৯),হারুরি মুরাকামি ( ১৯৪৯ ) এর নাম।

এসব বিশ্ববিশ্রুত লেখকরা নোবেল প্রাইজ পাননি, অথচ এমন লেখক পুরস্কৃত হয়েছেন, যাদের সাহিত‍্যের সঙ্গে পাঠকের কোনও পরিচয়ই নেই। হয়ত নামটিও পুরস্কার পাওয়ার আগে কেউ শোনেননি। পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁদের নামটি গুগলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

একটা বিষয় স্পষ্ট যে, পুরস্কারই লেখক মূল‍্যায়নের ব‍্যারোমিটার নয়; নোবেল না পেয়েও এসব লেখক বিশ্বের প্রতিটি পাঠকের কাছে পৌঁছে গেছেন। এটাই বড় পুরস্কার। তবে এসব লেখকের মধ‍্যে কেউ কেউ পুলিৎজার, বুকার পেয়ে হয়ত টাইমলাইনে এসেছেন। কিন্তু নোবেল না পেয়েও অনেকে নোবেল বিজয়ীর চাইতে বেশি সম্মানিত হয়েছেন। এদেরকে নোবেল না দিয়ে বরং নোবেল কমিটি শুধু বিতর্কিত নয়, অসম্মানিত হয়েছে।

নোবেল প্রাইজসহ পৃথিবীতে বিভিন্ন পর্যায়ের যেসব পুরস্কার আছে তার কোনটিই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কেননা, এমন কোনও পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি, যার মাধ‍্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে যে, যারা পুরস্কার পেয়েছেন একমাত্র তারাই শ্রেষ্ঠ লেখক। আর শ্রেষ্ঠ শব্দটাই অপেক্ষিক। একজনের কাছে যা শ্রেষ্ঠ, অন‍্যজনের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। কিন্তু নোবেলের মতো আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিভিন্ন মেরুকরণের দৃষ্টিতে বিচার্য। খ‍্যাতিমান লেখকদের পুরস্কার না দেওয়ার পক্ষে কখনও কমিটি বিভিন্ন যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। কিন্ত মূল কারণ হল কমিটির ইউরোপ মনস্কতা, আর বিশ্ব রাজনীতি। তা না হলে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সমর্থনকারী লেখককে পুরস্কৃত করা হয়, অথচ মানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গকারী লেখককে গণ‍্য করা হয় না। সাহিত‍্যের কথা বায়ে রেখে যদি অন‍্যদিকে একটু চোখ ফেরাই, তাহলে দেখব, মহাত্মা গান্ধীর মতো শান্তিবাদী নেতার নাম বহুবার মনোনয়নের তালিকায় এলেও তিনি কখনও নোবেল পেলেন না; অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রীর মতো যুদ্ধবাজ, মানবতার শত্রুদের নাম উচ্চারিত হয় শান্তি পুরস্কারের জন‍্য। যারাই অশান্তিতে অবদান রাখে, অধিকাংশ সময় মূলত তারাই নির্বাচিত হয় শান্তি পুরস্কারের জন‍্য। যেসব লেখক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী বরাবরই তাঁদেরকে এই পুরস্কারের জন‍্য উপেক্ষা করা হয়েছে। আর নোবেল পুরস্কার পাওয়া নারী লেখকদের সংখ‍্যা অদৃশ‍্য কারণে অপ্রতুল।

২০১২ খ্রিষ্টাব্দে বিশিষ্ট লেখক লেখক জোসেফ এপসটেইন ‘স্ট্রিট জার্নাল’ এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলেন, “নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াই কি সাহিত্য জগৎ ভালো থাকত? তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার না থাকলেও সাহিত্য জগতের অবস্থা বর্তমানের চেয়ে খারাপ হত না, কারণ বর্তমানে দেওয়া পুরস্কারগুলি না সত্যিকার সাহিত্যের জন্য মান (standard) তৈরি করে, না সাহিত্যের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।“

জেমস জয়েস একবার বলেছিলেন, ‘সাহিত‍্য কি খেলাধূলা, যে প্রতিযোগিতা হয়, এরপর ট্রফি তুলে দেওয়া হবে বিজয়ীদের হাতে? এই পুরস্কার তুলে দেওয়ার সংস্কৃতিও উচ্চমন‍্য ও হীনমন‍্যকুলের জন্ম দেয়। যাকে বলে এলিটিজম। এ ফ‍্যাসিবাদেরই নামান্তর।’( ট্রিনকোয়ামে লেকচার )।

বারবার নোবেল মনোনয়নে নাম আসা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন মিলান কুন্ডেরা। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ” কেন যে আমার নাম আসে বারবার নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময়! আমি কি নোবেল না পেলে আর মিলান কুন্ডেরা থাকব না?”

নোবেল পুরস্কার পেয়ে প্রত‍্যাখ‍্যান করেছেন এমন দৃষ্টান্তও আছে।  ফরাসি দার্শনিক ও লেখক জঁ পল সার্ত্র এমনই একজন লেখক। কথিত আছে, তাঁর বন্ধু আলব্যের কামুর নোবেল প্রাপ্তিকে তিনি সহজভাবে নিতে পারেননি। একারণে তিনি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মনে করতেন কামুকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর যথেষ্ট ভূমিকা আছে। কামু ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নোবেল পান। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সার্ত্র নোবেল পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই নোবেল কমিটিকে এই পুরস্কার না দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে পত্র দেন। কিন্তু পত্র পৌঁছানোর আগেই তাঁর নাম ঘোষিত হয়। পরে তিনি প্রকাশ্যে প্রত‍্যাখ‍্যানের ঘোষণা দেন। কারণ উল্লেখ করে বলেন, ‘তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে যেমন ব্যক্তিগত কারণ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বস্তুগত কারণও। কোনো লেখকেরই প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার বা সম্মাননা গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ এ জাতীয় সম্মাননা লেখকের জন্য আপসকামিতার জন্ম দেয়। যে প্রতিষ্ঠান তাকে পুরস্কার দিচ্ছে, তার প্রভাব লেখকের সঙ্গে যুক্ত হোক—পাঠকের জন্য তা কাম্য নয়।’

বিখ‍্যাত রুশ লেখক বরিস পাস্তারনায়েক ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের নোবেল প্রাইজে ভূষিত হন। কিন্তু সরকারি চাপে তিনি তা প্রত‍্যাখ‍্যান করতে বাধ‍্য হন।

পুরস্কার দিয়ে তা কেড়ে নেওয়ারও ঘটনা আছে। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে নোবেল প্রাইজে ভূষিত হন ন‍্যুট হামসুন। এর পঁচিশ বছর পর আডলফ হিটরারের মৃত‍্যু হলে তিনি শোকবার্তা পাঠান। বার্তায় তিনি লেখেন, ” হিটলার ছিলেন মানবজাতির যোদ্ধা। সব জাতির জন‍্য ন‍্যায় বিচারের বার্তা প্রচারক।” এই বিবৃতি প্রকাশের পর সুইডিশ একাডেমি তাঁর নোবেল স্বীকৃতি প্রত‍্যাহার করে নেয়। একারণে হয়ত শেষজীবনে ন‍্যুট মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

পুরস্কার পেয়ে তিরস্কৃত হয়েছেন, অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হ‍ান্ডসকম্ব। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সাহিত‍্যে নোবেল বিজয়ী। ফেসিজমের সমর্থক এই লেখক  ১৯৯০ এর দশকে বসনিয়ার মানুষের উপর সার্বদের নির্মম অত্যাচারকে সমর্থন করেন এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধী স্লোবোডান মিলসেভিককে প্রশংসা করেন। তাঁর নোবেল প্রাপ্তিতে বিক্ষুব্ধ হন পৃথিবীর মানবতাবাদী লেখকগণ। এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানরাও। সমকালের বিখ‍্যাত দার্শনিক স্লাভক বলেছেন, “এবারের নোবেল প্রাইজ এটাই প্রমাণ করে যে পিটার হ‍ান্ডসকম্ব অতীতে ঠিকই বলেছিলেন।” কি বলেছিলেন তিনি? জানা যায়, পুরস্কার প্রাপ্তির এক বছর আগে তিনি বলেছিলেন, “নোবেল প্রাইজ শেষপর্যন্ত বিলুপ্ত হওয়া উচিত।… এটা হচ্ছে সাহিত‍্যের মিথ‍্যাসিদ্ধ ঘোষণা।” যে ব‍্যক্তি নোবেল নিয়ে এমন বিষোদগার করতে পারে; আবার তিনিই নির্বাচিত হন পুরস্কারের জন‍্য। এটাই মজার ব‍্যাপার।

নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও কম সমালোচনা হয়নি। ইংরেজরা অভিযোগ করেছিল, টমাস হার্ডি থাকতে পরাধীন ভারতের একজন কবিকে বিশ্বের সেরা এই পুরস্কার দেয়া হল কেন? আনাতোল ফ্রাঁসের মতো সেরা ঔপন্যাসিককে সম্মানিত না করে একজন এশিয়ানকে সাহিত‍্যের সেরা পুরস্কার দেওয়াটাকে মেনে নিতে পারেনি ফ্রান্স। আর ভারতীয়দের তো বিরোধ ছিলই।

এ তো গেল নোবেল পুরস্কারের কথা। আমাদের বাংলা ভাষার সাহিত‍্যের পুরস্কার নিয়েও তো কম কেলেঙ্কারি ঘটেনি। ভারতে যেসব পুরস্কার দেওয়া হয় তা নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। কয়েক বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ‍্যমন্ত্রী মমতা বানার্জীর আগ্রহে বাংলা আকাদেমি থেকে ‘বাংলা আকাদেমি পুরস্কার’ প্রবর্তিত হয়। তিন বছর অন্তর এই পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম বছরই ‘সাহিত‍্যে নিরলস’ অবদানের জন‍্য পুরস্কার পান স্বয়ং মূখ‍্যমন্ত্রীই। রবীন্দ্রজয়ন্তীতে দেওয়া এই সাহিত‍্য পুরস্কার নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে। প্রতিবাদে বাংলা আকাদেমি থেকে পাওয়া ‘অন্নদাশঙ্কর রায় সাহিত্য পুরস্কার’ ফিরিয়ে দেন বিশিষ্ট লেখক-গবেষক রত্না রশিদ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘’রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে কবিতাকেই অসম্মান করা হয়েছে। ছোটবেলা থেকে কবিগুরুকে বুকের মধ্যে আগলে রেখেছি। তাঁর কবিতা আমার কাছে দুর্মূল্য, সেই কবির জন্মদিনে এই পুরস্কার মেনে নেওয়া যায় না। এটা কার্যত কবিতাকেই অপমান করা। তারই প্রতিবাদে আমি আমার পদক ফিরিয়ে দিয়েছি।…এই পুরস্কার প্রদানে পুরস্কারের গরিমা রক্ষিত হয়নি। সাহিত্য তো সাধনার বিষয়।” তিনি মনে করেন মমতার লেখা সাহিত‍্যের পদবাচ‍্যের মধ‍্যেই পড়ে না। এ ঘটনার প্রতিবাদে অন্যদিকে বাংলা আকাদেমির উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত‍্যাগ করেন লেখক অনাদিরঞ্জন বিশ্বাস। এক বিবৃতিতে তিনি জানান,– রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন কবিতাকে যেভাবে অসম্মান করা হয়েছে, তাতে তিনি বিরক্ত। সেই কারণেই তিনি ইস্তফা দিয়েছেন। মমতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের গ্রন্থের সংখ‍্যা শতাধিক। কিন্তু সত‍্যিই তা উৎকৃষ্ট সাহিত‍্যের কাতারে পড়ে কিনা, তা পাঠ করে দেখা যেতে পারে।

আমাদের দেশে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, স্বাধীনতা  পুরস্কার নিয়ে অনেক অঘটন ঘটে থাকে। প্রকৃত প্রতিভাবানরা বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান না, এটা বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ। পুরস্কার প্রদানের আগে যাঁরা জুরিবোর্ডে থাকেন, তাঁরা তাঁদের পছন্দের লেখকদের নাম সুপারিশ করেন। তাছাড়া আছে তদ্বির, চাপ, তৈলমর্দন। জুরিদের নাম গোপন থাকার কথা। কিন্তু গোপন থাকে না। পুরস্কার ঘোষণার আগে শুরু হয়ে যায় ছোটাছুটি, তদ্বির, মুরব্বী পাকড়ানোর কাজ। শোনা যায়, পুরস্কার প্রাপ্তির জন‍্য মোটা অংকের টাকা খরচের কথা। কয়েক বছর আগে এমন একজন আমলা কবি কোটি টাকা খরচ করে এই পুরস্কার নিয়েছেন; যেটা এখন ওপেন সিক্রেট। জুরিরা বিক্রি হয়ে যান টাকায়, উপঢৌকনে। যেসব সিনিয়র লেখক,অধ‍্যাপক, বাংলা একাডেমির ফেলো, বুদ্ধিজীবী, যাঁদেরকে আমরা শ্রদ্ধা করি, ভেতরে ভেতরে যে তাঁরা এত লোভী নোংরা, যা ভাবলে বা জানলে ঘৃণার উদ্রেক হয়। চাপ প্রয়োগ করেও এই পুরস্কার নেয়া হয়েছে। কয়েকবছর আগে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যমে উপর্যুপরি গালি দিয়ে পুরস্কার বাগিয়ে নিয়ে অন্তরালে চলে গেছেন এক ছিদ্রান্বেষণকারী কবি। একাডেমির চেয়ারম্যানকে ধমক দিয়ে, ভয় দেখিয়ে পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছিলেন একজন কথাসাহিত্যিক। যে কথা প্রকাশ‍্যে সহাস‍্যে বলে বেড়াতেন তিনি। তাঁর লেখায় শক্তিময়তা ছিল, যদিও তিনি নিজেকে বলতেন ‘বাজে মাল’। গাঁজার টাকা ফুরিয়ে গেলে তিনি একাডেমি পুরস্কার বাগানোর চিন্তা করেন। অনেক অযোগ‍্য লেখক এই পুরস্কার পেয়েছেন, অথচ বাংলা সাহিত‍্যের অনেক খ‍্যাতিমান লেখক পরিণত বয়সে এসেও বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাননি, এমন দৃষ্টান্ত তুলে ধরা সম্ভব। বিগত দুবছরে পুরস্কার ঘোঘণা করে পরে তা স্থগিত রাখার ঘটনাও ঘটেছে।

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে এ পুরস্কারের জন‍্য নাম বিবেচনার একটা সম্পর্ক সবসময় থেকেই যায়।

যথাসময়ে মূল‍্যায়ন করা হয়নি বা প্রকৃত প্রভিবানদের মূল‍্যায়ন করা হয় না বলেই হয়ত কবি জসীম উদদীন, বদরউদ্দীন উমরের মতো খ‍্যাতিমান লেখকরা প্রত‍্যাখ‍্যান করতে পারেন বিতর্কিত বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী কবি ওমর শামস বাংলা একাডেমি প্রদত্ত সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পুরস্কার প্রত‍্যাখান করেন। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিতে আপারগতা প্রকাশ করেছেন কথাশিল্পী সেলিম মোরশেদ। তার আগে বাংলা একাডেমির বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে বহু বছর আগে পাওয়া পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন কথাশিল্পী জাকির তালুকদার।

একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার নিয়েও ঘটে তেলেসমাতি ঘটনা। পরপর দুবছর সাহিত‍্যে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন‍্য নাম ঘোষিত হয়েছে দুজন ব‍্যক্তির। একজন প্রাক্তন আমলা। আর একজন চাকরিরত আমলার প্রয়াত পিতা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যম, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হলে, প্রতিবাদ হলে এই ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে প্রত‍্যাহার করে নেওয়া হয়। অথচ নির্মলেন্দু গুণের মতো কবিকে স্বাধীনতা পুরস্কার চেয়ে নিতে হয়।

বেসরকারি যেসব শীর্ষ পুরস্কার রয়েছে সেখানেও অনিয়মের কথা শুনি। আইএফআইসি ব‍্যাংক সাহিত‍্য পুরস্কার, জেমকন সাহিত‍্য পুরস্কার, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার, সমকাল-ব্রাক ব‍্যাংক সাহিত‍্য পুরস্কারসহ যেসব পুরস্কার রয়েছে, এগুলোর জন‍্য প্রতিবছর বই আহ্বান করা হয়। সারাদেশ থেকে লেখকরা এসব জায়গায় বই প্রেরণ করেন। কিন্তু দেশের খ‍্যাতিমান প্রতিষ্ঠিত,প্রভাবশালী লেখকরা যখন বই জমা দেন, তখন প্রকৃত ভালো বইয়ের আর মূল‍্য থাকে না। প্রভাবশালী লেখকদের পাত্রে পুরস্কার জমা হয়। এক্ষেত্রে বিচারকদের প্রভাবিত করা হয়। একুশে পদক প্রাপ্ত, বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত, স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া লেখকগণ শুধুমাত্র টাকার লোভে এসব পুরস্কারের জন‍্য বই জমা দেন। আমি মনে করি, জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির পর বই জমা দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে অন‍্য কোনো পুরস্কার নেয়াটা হীনমন্যতার পরিচায়ক। আর এসব পুরস্কার মনোনয়নের জন‍্য অধিকাংশ থাকে লোক দেখানো জুরি বোর্ড। কে পুরস্কার পাবে বা কাকে দেয়া হবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে। তবে আইএফআইসি ব‍্যাংক সাহিত‍্য পুরস্কারের ক্ষেত্রে এসব ঘটে বলে আমার মনে হয়নি। বিচার নিরপেক্ষ বা প্রভাবহীন না হলে, এই প্রবন্ধের এই অখ‍্যাত লেখকের পক্ষে বই জমা দিয়ে, অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকদের বইকে পেছনে ফেলে, বর্ষসেরা বইয়ের জন‍্য এই পুরস্কার প্রাপ্তি সম্ভব হত না।

বহু আগে থেকে পুরস্কার বেচাকেনার কুরীতি চালু হয়েছে আমাদের দেশে। একসময় এ কাজটি করত কিছু সাংস্কৃতিক সুবিধাভোগী। আর এখন এটা পরিণত হয়েছে বাণিজ‍্যে। ব‍্যাপকভাবে প্রসার ঘটেছে পদক বাণিজ্যের। কিছু ব‍্যক্তির পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে এটা। সারাদেশে আছে এদের সিন্ডিকেট। আনাড়ি, অযোগ‍্য লেখকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের হাতে এরা তুলে দিচ্ছে পদক ও পুরস্কার। কোনো কোনো পুরস্কারকে বৈধতা দেওয়ার জন‍্য দুএকজন খ‍্যাতিমান লেখককে পুরস্কার দিয়ে তাদের দলভুক্ত করে নেওয়া হয়। এর সঙ্গে জড়িত অনেক গৌণ লেখক। এখানে পুরস্কার প্রদান থেকে বাণিজ‍্য করা যেমন উদ্দেশ‍্য, তেমনি তাদের অভিপ্রায় থাকে জাতে ওঠার। পুরস্কার প্রদায়ক হয়ে নিজের নামটা চাউর করে খ‍্যাতিমান হয়ে ওঠার লোভ। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত, কলমের শক্তি ছাড়া সাহিত‍্য জগতে অন‍্য কোনোভাবে টিকে থাকার সুযোগ নেই।

কোনও কোনও পুরস্কার আছে, যেটা পাওয়ার জন‍্য আবেদন করতে হয়। আবেদন করে পুরস্কার নেওয়া কতখানি ভদ্রোচিত, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। এটা নাকি আন্তর্জাতিক রীতি! আমাদের দেশে একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকের জন‍্য নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে গুণী ব‍্যক্তিদের সুপারিশসহ পাঠিয়ে উচ্চপদস্থ আমলাদের খুশি করে এই দুটি পদক অর্জন করতে হয়। কোনো ব‍্যক্তিত্ব সম্পন্ন ব‍্যক্তি একাজটি করবেন বলে মনে হয় না। অথচ এই দুটি পুরস্কারের মওসুম এলে রীতিমত তদ্বির, হুড়োহুড়ি লেগে যায়। আগে এই নিয়ম ছিল না। বুদ্ধদেব বসু তাঁর সমকালে আবেদন জমা দিয়ে পুরস্কার নেওয়ার বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, তা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি আবেদন ও তদ্বির করে রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার প্রাপ্তি সম্পর্কে লিখেছিলেন–

‘রবীন্দ্র-স্মৃতি-পুরস্কার বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে-বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন, সাহিত্য এবং সাহিত্যিকের পক্ষে তার চাইতে অপমানজনক কোনো দলিল আমাদের চোখে পড়েনি । লেখকদের এর জন্য ‘প্রার্থী’ হ’তে হবে : পাব্লিক সার্ভিস কমিশনে চাকুরির আবেদনপত্রের মতো জীবনীপঞ্জী লিখে দিতে হবে (জন্মের তারিখ,বিদ্যালয়াদির নাম সুদ্ধ ) – শুধু তা-ই নয়, দু-জন ‘সুপরিচিত বৈজ্ঞানিক বা সাহিত্যিকে’র সুপারিশ-পত্র সঙ্গে না-থাকলে সেই ‘আবেদন বিবেচিত হবে না’। বারো কপি পুস্তকও প্রেরিতব্য। বলা বাহুল্য, ‘পুরস্কার’ আর ‘আবেদন’ পরস্পর-বিরোধী শব্দ : যাকে পুরস্কার বলা হচ্ছে তার মধ্যে কোনো গুণপনা বা সৎকর্মের জন্য সম্মাননার ভাবটাই প্রধান, সেই সম্মান যথাস্থানে অর্পণ করাতেই দাতার গৌরব, এবং তা যদি সম্পূর্ণরূপে অযাচিত না হয়, যদি প্রাপক তার জন্য কখনো একটি কড়ে আঙুলও নাড়েন – তাহ’লেই সমস্ত জিনিশটা এক দিকে হ’য়ে ওঠে ভিক্ষাবৃত্তি, অন্য দিকে ঔদ্ধত্য।

লেখকের জীবনী-তথ্য, এমনকি তিনি জীবিত বা মৃত, এই সব প্রশ্নই অবান্তর : শুধু পূর্ব-বৎসরের মধ্যে প্রকাশিত পুস্তক হওয়া চাই, এই শর্তটিও নিতান্ত অর্থহীন। আর তাছাড়া একটি পুস্তকই বা হ’তে হবে কেন ; কোনো-কোনো ক্ষেত্রে লেখকের সমগ্র রচনাকেই অভিনন্দন জানাবার প্রয়োজন ঘটতে পারে – তা থেকে একটি গ্রন্থকে বিচ্ছিন্ন করতে গেলে মূল্যবোধ বিনষ্ট হয় ।

এই রকম ছিদ্রবহুল বিজ্ঞপ্তি যে প্রকাশিত হ’তে পারলো, আর তা নিয়ে কোনো আন্দোলনও হ’লো না, এতেই বোঝা যায় আমরা এখনো সভ্য জগতের বহুদূরবর্তী কোন মরুভূমিতে বাস করছি। অন্তত, সাহিত্যিকরা এর নিঃশব্দ এবং ফলপ্রসূ প্রতিবাদ জানাতে পারেন অসহযোগ পন্থা অবলম্বন ক’রে ; কিন্তু হয়তো এতদিনে বহু আবেদন-পত্র যথোচিত সুপারিশ এবং বারো কপি ক’রে পুস্তক-সমেত যথাস্থানে পৌঁছে গেছে, আর আগামী বৎসরেও এই লজ্জাকর লিপি পুনরায় রাষ্ট্র করা হবে।

এই বুভুক্ষাময় দেশে সাহিত্যিকের মধ্যেও আত্মসম্মান-বোধ দুষ্প্রাপ্য।” ( উদ্বৃতি : ইসরাইল খান, ফেসবুক ১৩ জুলাই ২০২৪; এই সাময়িক পত্র বিশেষজ্ঞ ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘কবিতা’ পত্রিকার পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বিজ্ঞাপিত ‘রবীন্দ্র-স্মৃতি

 পুরস্কার’-এর নীতিমালা কাগজে পড়ে ‘কবিতা’ পত্রিকার ২০তম বর্ষের এক সংখ্যায় বুদ্ধদেব বসু ‘সাময়িক-প্রসঙ্গ’ নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর এই লেখাটি খুঁজে পান। )

প্রকৃত লেখক কখনও পুরস্কারের জন‍্য লেখেন না। তবে পুরস্কার কাউকে কাউকে নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা যোগায়। দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে মধুসূদন গবেষণার জন‍্য অধ‍্যাপক মোবাশ্বের আলীকে প্রাদান করা হয় ‘মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার’। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মধুসূদন বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন ‘নবজাগৃতি ও মধুসূদন’। মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্তির পর তিনি রচনা করেন পরপর দুটি বই– ‘মধুসূদনের বিশ্ব’ ও ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত : ইংরেজি গদ‍্যরচনা ও স্মৃতিকথা’। তিনি এই দুটি গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি মধুসূদনের একটি বিশ্বরূপ প্রত‍্যক্ষ করেন। এবং মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার না পেলে তাঁর পক্ষে এই দুটি গ্রন্থ প্রকাশ করা সম্ভব হত না। এমন ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত দেয়া সম্ভব।

তবে পুরস্কার কখনও লেখককে হীনমন‍্য, লোভী  করে তোলে। আশির দশকে যশোর সাহিত‍্য পরিষদ থেকে প্রদান করা হত যশোর সাহিত‍্য পুরস্কার। তখনকার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ এই পুরস্কার প্রদানের পেছনে ছিলেন পঞ্চাশ দশকের খ‍্যাতিমান কবি আজীজুল হক। বাংলাদেশের একজন খ‍্যাতিমান কবি ও গবেষক, এক সময়ের বাংলা একাডেমির ডিজিকে দেখেছি এই পুরস্কার প্রাপ্তির জন‍্য নির্লজ্জ আগ্রহ প্রকাশ করতে। এই পুরস্কার প্রাপ্তি একটি সংক্রামক ব‍্যাধি। যাকে আক্রান্ত করে তার থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়।

সেকাল থেকে একালে সাহিত‍্য পুরস্কার জন্ম দিয়েছে অনেক বিতর্কের ও বিস্ময়ের। যা মানবসভ‍্যতার ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেপন করেছে অমোচনীয় কালিমা।

পুরস্কারের নামে পচনশীল লেখকদের লোভী বানানোর এই প্রক্রিয়া বন্ধ হোক। গড়ে উঠুক পুরস্কার মুক্ত লেখকদের পৃথিবী।

 

সহায়ক:

এনহেদুয়ানা – সালেক আল মাহমুদ

অ্যা র‌্যাংকিং অব দ্য মোস্ট ইনফ্লুয়েনশিয়াল পারসনস ইন হিস্টরি – মাইকেল এইচ হার্ট

মধুসূদনের চিঠি – খসরু পারভেজ অনূদিত

দেশরূপান্তর- পুরস্কার যখন হাতিয়ার, জাকির তালুকদারের প্রবন্ধ। ১৯ জানুয়ারি ২০২৩

দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৩ মার্চ ২০২৩

বাংলা লাইব্রেরি ওয়েব পোট্রাল

ইন্টারনেট

1 Comment

  • Saving the link for sure, this one is a keeper, and a look at thisdomainisabdu confirmed I should bookmark the entire site rather than just this page, the consistency across what I have seen so far suggests there is a lot more here worth coming back for soon when I have more time.

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *