তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
ধারাবাহিক মায়াগদ্য
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ পর্ব #২১
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
ক্যাংলাসরা কি ভদ্রলোক?
কী করিয়া ক্যাংলাস প্রজাতি চিনিতে হয় পড়ে যে হারে লোকজন অতি উৎসাহী হয়ে ক্লাসে প্রেজেন্ট প্লিজ বলার ভঙ্গিতে ‘আমিও ক্যাংলাস আমিও ক্যাংলাস’ বলে গোলমাল পাকাতে শুরু করেছে, তাতে আমি একটু ভয়ই পাচ্ছি মশাই। এরা একটা বেসিক ব্যাপারেই গোলমাল করে ফেলছে যে সকলেই ক্যাংলাস নয়, কেউ কেউ ক্যাংলাস। আসলে কবিত্বের মতো ক্যাংলাসত্বও অর্জন করা যায় না , ওটা নিয়েই জন্মাতে হয়। যেমন ধরুন লেজ। আপনি লেজ নিয়ে জন্মালেন , ওটা হঠাৎ গজায় না। লেজ গজানোটা আমরা রূপকার্থেই বলে থাকি, প্রথমেই সেটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। মানে আপনি ক্যাংলাস হয়ে না জন্মালে ক্যাংলাস হয়ে মরতে পারবেন না।
ইল্লি! এত্ত সহজ? রসমুণ্ডি খেতে ইচ্ছে হলেই আপনি ক্যাংলাস? তাহলে তো আমার কত কাউকে ঘর থেকে তুলে আনতে ইচ্ছে হয়। তাবলে কি আমি ডোনাল্ডো চ্যাম্প ? চাপ আছে ব্রো। এক আধদিন অমন ইচ্ছে সবার হয়। কিন্তু তারও আগে জানা দরকার ভদ্রলোক কারা। কারণ অনেক সময় ক্যাংলাসরা ভাবে তারা বুঝি ভদ্রলোক। আবার ভদ্রলোকেরা ভাবে তারা নাকি ক্যাংলাস! কিন্তু তা বললে তো আর চলবে না।
কীরকম এলোমেলো ভাবে মনে পড়ে যায় সেই শ্যাওলায় পিছল উঠোনটা। ‘গল্প হলেও সত্যি’ সিনেমায় যে উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরে যেতে গিয়ে বউদের পিছলিয়ে পড়া ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। তা সত্ত্বেও কেউ সেটা পরিষ্কার করার কথা একবারও ভাবেনি, না বউয়েরা, না তাদের স্বামীরা। যাদের মধ্যে কেউ সদাগরি আপিসের বড়বাবু, কেউ শিক্ষক , কেউ বিজ্ঞাপনের আপিসের কপি রাইটার। তারা প্রতিদিন খেতে বসে রাজ্য রাজনীতি, সংস্কৃতি, মার্ক্স লেনিন, রবীন্দ্রনাথ, বেটোভেন নিয়ে গলা ফাটায়, কিন্তু উঠোনের নোংরা পরিষ্কার করার কথা কেউ ভাবে না। কারণ এই সমস্ত নন-ইন্টেলেকচুয়াল ব্যাপার নিয়ে বাঙালি ভেবে সময় নষ্ট করে না। এগুলো একেবারেই নন –ইস্যু।
সেই সব নন-ইন্টেলেকচুয়াল, কিন্তু ‘না করলে নয়’ কাজ করার জন্যে একদিন আবির্ভাব হল ধনঞ্জয়ের। সে হয়তো সত্যি কোথাও নেই, ছিল না, সবার মনের ইচ্ছের কুসুম সে। পিছল উঠোন দেখে বলল উঠোনটা এরকম কেন মা? পরিষ্কার করার অসুবিধে আছে বোধহয়?
এই হচ্ছে চিরন্তন বাঙালি। যারা কথায় কথায় কামু কাফকা ফাটায়, কিন্তু নিজের দরজার ময়লা সাফাই করে না। হয়তো সাহেব ভজনার ঐতিহ্য এতটাই শক্তপোক্ত যে বাঙালি সব ইস্যুতেই অনেক বেশি আন্তর্জাতিক, অনেক কম দেশীয়, আরও কম আঞ্চলিক।সেই যে বাঙালি সম্পর্কে গোখলের বিখ্যাত উক্তি ‘হোয়াট বেংগল থিংকস টুডে ইন্ডিয়া থিংকস টুমরো’ কথাটা কতটা প্রশংসাসূচক আজকাল তা নিয়ে রীতিমতো সন্দেহ হয়। বাঙ্গালির এই অগ্রসর ভাবনা কি স্বদেশ ও স্বভূমিকে বাদ দিয়ে? তাই কি আগে গিয়ে বাঙ্গালিকে শিকড়হীনতার বাঘে খেল?
এই লেখাটি তৈরির সময় পড়শি বাড়িতে অন্নপ্রাশনের তোড়জোড়। সে তো এখনো দিন সাতেক দেরি। কিন্তু নানান রসম বা তিওহার (বাপের জন্মে না জানা) মানানোর জন্যে গুচ্ছ গুচ্ছ লোকজন সেজেগুজে গাড়ি ভর্তি করে আসছেন সারাদিন, আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুইগি, জোমাটো থেকে খাবার আসতেই থাকছে। অমুকদের তমুকদের বিয়েতেও বিয়ে, গায়ে হলুদ ইত্যাদির বেশ কিছুদিন আগে থেকে সঙ্গীত মেহেন্দি, সাগাই, শুরু হয়ে যায়। সাবেকি পশ্চিমাস্য বাঙালি ইন্টেলেকচুয়ালরা এসব দেখে নাক সিঁটকে বলেন গোবলয় ঢুকে পড়েছে বাঙ্গালির অন্দরমহলে। অনেকদিন আগে সাহিত্য অকাদেমির একটি অনুষ্ঠানের মধ্যাহ্নভোজে এক বিখ্যাত বাঙালি বুদ্ধিজীবী স্যান্ডুইচ কফির প্রস্তাব দিলে তা ভাত মাছের কাছে শুধু হেরে ভূত হয়ে যায়নি, অন্য অবাঙালি লেখকদের কাছেও সেই মানুষটি বিদ্রূপের কারণ হয়েছিলেন।
এখন অবশ্য বাঙ্গালিকে আর পশ্চিমাস্য বলা যাবে না শুধু। সে অন্য প্রদেশের পড়শিদের অনেক রীতি রেওয়াজ, পুজো আপন করে নিয়েছে যেমন সঙ্গীত, যেমন মেহেন্দি, যেমন গ্ণেশ পুজো। নিজের রিচুয়াল গুলোর নামেও মেক ওভার এনেছে। কোন বিয়ের কার্ডে ‘কার্ড ইন মার্স’ দেখলে চমকে উঠবেন না, ওটা আসলে দধিমঙ্গল!
আর খাবার জায়গায় আক্ষরিক অর্থেই বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান। ইটালির পাশে নলেন গুড়ের পাটালি, পাস্তার পাশে ওড়িশার পাখাল।
‘যখন যা মনে পড়ে’ স্মৃতিকথায় প্রফুল্ল রায় লিখেছেন
‘আমার সেই অল্প বয়সে বিয়ের ভোজ বলতে ছিল উৎকৃষ্ট রূপশাল কি সুগন্ধি গোবিন্দভোগ চালের ভাত, খাঁটি গাওয়া ঘি, বেগুন আলু এবং দুরকম মাছভাজা, মাছের মাথা দিয়ে ঘন সোনামুগের ডাল, তিন চার পদের মাছ, গরমকালে আম, নইলে আনারস বা আমসত্বের চাটনি, দই, ক্ষীর এবং চার পাঁচ রকম মিষ্টি।
তখনো বিয়েবাড়িতে লাচ্ছা পরোটা, কোর্মা কাবাব বিরিয়ানি আইসক্রিম ইত্যাদির কথা কেউ ভাবতেই পারত না। বাঙ্গালির মতো অনুকরণ প্রিয়, নকলনবিশ জাত ভূ ভারতে দ্বিতীয়টি আর নেই। অনেক বছর বাদে কলকাতায় লক্ষ্য করেছি বাঙ্গালিদের বিয়ের ভোজে মোগলাই কন্টিনেন্টাল… সেই সঙ্গে ফুচকা জিলিপি টিলিপি। নিজেদের ট্র্যাডিশনাল স্ব সুখাদ্য তাদের কাছে ব্রাত্য…’
এই বাঙ্গালির কাছে চিন্তাভাবনার আশা কেউ করে না। আর চিন্তাভাবনার দরকারটাই বা কি? গুগল খুললেই সব জানা যায়। তারপর এ আই এসে গেছে। চিন্তার দিন গিয়াছে। ফেসবুক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্ত জ্ঞান থরে থরে সাজানো। সেখানে লাইক দাও, কমেন্ট ছোঁড়ো। অভিষেকের আঙ্গুলে বিয়ের আংটি দেখা গেল কি না, কে কার প্রাক্তনকে বর্তমান করে নিল- এইসব গুরুতর বিষয় নিয়ে হল্লা মাচিয়ে দিব্যি দিন কেটে যায়। খাবারে যেমন, মুখের ভাষাতেও বাঙালি এখন পশ্চিমি বুলির পাশে দেশি বুলি স্থান দিয়েছে এতদিনে। সে এখন জন্মদিন মানায়। গালাগালিতে যদিও ইংরেজির ওপর তার আস্থা বেশি। বাঙ্গালির মহা পরিচালকদের ছায়াছবি ফা* দিয়ে সব ফাঁক ভরাতে চায়। সেদিন হঠাৎ একটা ষাটের দশকের ছবি দেখতে বসে কানে ভারি আরাম হল। সেখানে প্রতি তিন সেকেন্ডে ফা* নেই যে।
ধনঞ্জয় থাকলে হয়তো বলত ‘ ভাষাটা এত নোংরা কেন? পরিষ্কার করার অসুবিধে আছে বোধহয়?’
ধনঞ্জয়ের পথ চেয়ে বসেছিলাম, হাজির হলেন বুনো রামনাথ। বললেন ‘গিন্নি তেঁতুলপাতার ঝোল রেঁধেছেন আজ। আসবে নাকি?’
আমি একটা রিল দেখছিলাম। কার্লি টেলসের। তারকাদের সঙ্গে সানডে ব্রাঞ্চ। না খেয়েও কত কী যে খেয়ে থাকেন তারকারা!
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম ‘আপনার কোন কিচ্ছু চাই না? দিল মাঙ্গে মোর না হলেও কিছুমিচু? আপনার স্ত্রীর ওই লাল সুতোতেই চলে যাচ্ছে এখনো?’
বুনো রামনাথ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর বলেন ‘চিন্তার একটা জায়গায় আটকে গেছি। কাল মনে হয় করে ফেলব’
রামনাথ কীসব বিড়বিড় করতে করতে চলে যাচ্ছেন দেখছেন তো? ক্যাংলাস রা কিন্তু বুনো রামনাথও নয়, আবার ওই ফা* বলা বাঙ্গালিরাও নয়। জিনের অনেক কেরামতির ফলে এ জন্মে আমি ক্যাংলাস হয়ে জন্মেছি, আর আপনারা শুধু রসমুণ্ডি খেয়েই তা হয়ে যাবেন? ইল্লি! লক্ষণ মিলিয়ে দেখুন। আপনারা নেহাতই ভদ্রলোক!
5 Comments
গভীর। ভাবার বিষয়।
রসেবশে ভালোই
আরে ভাই, কতদিন যে পোস্তর বড়া খাওয়া হয়নি, হবে কি করে, সেই আগের মোতো পোস্তো কি আর আছে? সেখানেও গুজরাতের জে,কে, এসে গেছে। ছোটবেলায় হাঁদুদা কাগজে মুড়ে পাঁচ টাকায় এত্তো পোস্তো দিলে, শিলে বাটা গরম, লাল লাল বড়া কী ক্যাংলাসেরা খেয়েছে?
ও বড়দিমনির খোকা বলি খেয়েচো, না খাওনি?
অনবদ্য লিখছেন 🙏
অসাধারণ লেখা। কমিক লেখার মধ্যে ও গভীর ব্যঞ্জনা রয়েছে। পুরোনো দিনের গল্পে মধুর নস্টালজিয়া। রসে বলে চমৎকার
অসাধারণ লেখা। কমিক লেখার মধ্যে ও গভীর ব্যঞ্জনা রয়েছে। পুরোনো দিনের গল্পে মধুর নস্টালজিয়া। রসে বশে চমৎকার