Email: info@kokshopoth.com
April 18, 2026
Kokshopoth

তিতীর্ষা জোয়ারদার

Apr 17, 2026

 গদ্য

তিতীর্ষা জোয়ারদার

যুদ্ধঃ ভিতরে বাহিরে

 

যুদ্ধ কী? যুদ্ধের নৈতিক বা রাজনৈতিক ন্যায্যতা কী? যুদ্ধের কি কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎস রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কারণে তাকে মান্যতা দিয়ে থাকে? দর্শনের গবেষক হিসেবে এই সমস্ত প্রশ্ন মাথার ভিতর ঘোরাফেরা করে। সংজ্ঞা এবং যাথার্থ্য বিচারে না গিয়েই খুব সহজ ভাষায় বলা যায়, যুদ্ধের সঙ্গে ক্ষমতা এবং বৈষম্যের জটিল সমীকরণ রয়েছে । তবে প্রাচীন কাল থেকে যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ।  শত শত ক্রন্দনরত শিশুর আর্তনাদ খুব সন্তর্পণে মাটির তলায় চাপা পড়ে গিয়েছে। আমাদের সভ্যতা এবং যুদ্ধের ইতিহাস প্রায় সমসাময়িক, তবে পদ্ধতি এবং ধরণ বদলে যাচ্ছে ক্রমশ । যুদ্ধের নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্নও উঠছে ।   

 বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা, মধ্য-প্রাচ্য সংকট বা ইউক্রেন- রাশিয়ার প্রবল অস্থিরতা এবং তাতে আমেরিকার ভূমিকা দেখে এই মুহূর্তে আমাদের মাথায় একটাই কথা আসছে ,“যুদ্ধ চাইনা আর!”  অনেকেই যদিও পাল্টা উত্তর দেবেন, “শান্তি আনতে যুদ্ধ চাই”। যেমন নীরদ সি চৌধুরী লিখেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভায়াবহ ধ্বংসলীলা যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে শান্তি আনতে সক্ষম হয়েছিল। এই দুইপক্ষের দ্বন্দ্ব দীর্ঘকালীন । তবে এই দু-পক্ষের বাইরেও একটি নতুন শ্রেণী আমাদের সমাজে বিরাজমান, যারা অরাজনৈতিক, নিশ্চুপ । অর্থাৎ এক কথায় বলা চলে কিছু সংখ্যক মানুষ উদাসীন অথবা অজ্ঞানতার অহংকারে নিমজ্জিত ।  

“অন্যায়ের পরিস্থিতিতে যদি আপনি নিরপেক্ষ থাকেন, তবে আপনি অত্যাচারীর পক্ষ বেছে নিয়েছেন”— এ কথা আমাদের অজানা নয়।  মানুষের নীরবতা হত্যাকারীর সাহসকে খানিকটা বাড়িয়ে দেয়, শান্তির পরিবেশকে করে ফেলে বিঘ্নিত। এই উদাসীনতার অন্যতম কারণ, মানুষের নিজের ভিতরেই সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব। দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, কোনো বিশেষ শুদ্ধ মতে উত্তীর্ণ হতে গেলে, আমাদের বিপরীতধর্মী যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন ও উত্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে । ফলে, মানুষের মনে দ্বন্দ্বমূলক ভাবনা, বা বিভিন্ন মতের ভাবনার অস্তিত্ব, নেতিবাচক দিক নয়। তা মানুষকে যেমন প্রশ্ন করতে শেখায়, তেমনই উত্তরেরও সন্ধান দেয়। তাই ভৌত জগতে যুদ্ধ থামাতে গেলে, মাথার মধ্যে আমাদের প্রশ্নের যুদ্ধকে জাগিয়ে রাখতে হবে। তাকে সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালিতও করতে হবে। বাইরের যুদ্ধ মানুষের তথা সমগ্র প্রাণের অস্তিত্বের সংকট ডেকে আনে, কিন্তু মানুষের অভ্যন্তরে যুদ্ধকে জাগিয়ে রাখলে বাহিরের শান্তি বজায় রাখা সুবিধে হবে। ইসলামে জিহাদ কথাটির অর্থ এক শ্রেণির মানুষ ব্যাখ্যা করেন এইভাবে যে, তা ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু অপর একটি ব্যাখ্যায়, তা আসলে নিজেরই ভিতরের কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। প্রকৃতই যদি জিহাদের এই অর্থকে গ্রহণ করে কেউ, তা শান্তি স্থাপনেরই সহায়ক হবে। একইভাবে হিন্দুধর্মের অচৌর্য, অস্তেয়, শৌচ ইত্যাদি দশটি পন্থা, অথবা বুদ্ধের অহিংসা নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই অর্জন করতে হয়। বিশ্বের প্রতিটি দার্শনিক ঐতিহ্যেই যে ‘ডায়ালগ’ পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা করা হয়েছে, তা কিন্তু অনেকাংশেই নিজের সঙ্গে নিজেরই কথা বলা।   

 

 “যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী? না কি কোনো ভাবে যুদ্ধকে পরিহার করা যায়?” এই প্রশ্নগুলো বিভিন্ন কনটেক্সট অনুসারে গড়ে ওঠা জরুরি। প্রতিটি ধারণার ফলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সত্য এবং মত যতক্ষণ আমাদের মাথায় ঘোরাফেরা করবে, যুক্তিশীল প্রাণী হিসেবে মানুষ, নিজেকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংজ্ঞার মান রাখতে পারবে। আমাদের মাথার ভিতর যুক্তির যুদ্ধ  বন্ধ হওয়া কাম্য নয় । সমাজে ক্ষমতাপ্রিয় এক শ্রেণির মানুষ জনসাধারণের অবিবেকের সুবিধে নিয়ে পৃথিবীর বুকে যুদ্ধ তখনই ঘোষণা করবে যখন বিকল্প শক্তি হিসেবে পড়ে থাকবে অজ্ঞতা । বহুমাত্রিক বাস্তবতার সাথে মানিয়ে চলার জন্য, বুদ্ধির নমনীয়তা বৃদ্ধি করার জন্য, আবেগিক প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রশমিত করার জন্য , বিভিন্ন চিন্তার মধ্যে সমন্বয় এবং সক্রিয়তা প্রয়োজন । প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে আমাদের যুক্তি এবং আবেগকে ব্যবহার করতে হবে। যে-কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্বিতীয় ধাপ সমাধান দেওয়া, প্রথম ধাপ অবশ্যই সেই পরিস্থিতির নিরিখে সঠিক প্রশ্নগুলো করতে শেখা। বৈরিতা, নীরব শান্তির চেয়েও ভয় পায়, সুদৃঢ় প্রশ্নকে। আমাদের আরও ভাবতে হবে, ভাবা প্র্যাকটিস করতে হবে।   

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *