Email: editors.kokshopoth@gmail.com
September 25, 2026
Kokshopoth

অনুবাদে আধুনিক  তুর্কি কবিতাঃ ওকতায় রিফাত

Sep 25, 2026

অনুবাদে আধুনিক তুর্কি কবিতাঃ ওকতায় রিফাত(১৯১৪-১৯৮৮)
অনুবাদে সব্যসাচী রায়

আধুনিক তুর্কি সাহিত্যের গতিপথ বদলে দেওয়া অন্যতম এক কারিগর ওকতায় রিফাত (১৯১৪-১৯৮৮)। ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে ওরহান ভেলি কানিক এবং মেলীহ জেভদেত আনদাইয়ের সাথে যৌথভাবে তিনি সূচনা করেন এক বৈপ্লবিক সাহিত্য আন্দোলন—‘গারিপ’(Garip) আন্দোলন। প্রথাগত অটোমান সাহিত্যের গুরুগম্ভীর ও অলংকারবহুল কাঠামোর দেয়াল ভেঙে এই ত্রয়ী কবিতায় নিয়ে আসেন এক্কেবারে আটপৌরে, কথ্য ভাষা; যা সরাসরি কথা বলত সাধারণ মানুষের ভাষায়, সাধারণ মানুষের জন্য। তবে রিফাতের শিল্পভাবনা কেবল এক জায়গায় আটকে থাকেনি; পরবর্তীতে তিনি নাম লেখান ‘দ্বিতীয় নতুন’(II. Yeni) আন্দোলনে, যেখানে তাঁর কবিতায় ভর করে পরাবাস্তববাদ, রূপকের ঘন বুনন আর গভীর দার্শনিক আবহ।

কবির এই বহুমাত্রিক বিবর্তন তাঁর কবিতাগুলোয় খুব স্পষ্ট। যেমন ‘ডেস্টিনি’ (Destiny) কবিতায় গারিপ যুগের সেই চেনা কৌতুক আর উইট চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। অঙ্কে কাঁচা এক হিসাবরক্ষক, একতরফা প্রেম কিংবা প্রিয় বেগুনের পদে পেট খারাপের মতো রোজকার জীবনের খ্যাপাটে অসঙ্গতিগুলোকে যখন তিনি ‘ভাগ্য’-এর মতো এক ভারী শব্দের মুখোমুখি দাঁড় করান, তখন সাধারণ মানুষের জীবনের ছোটখাটো ট্র্যাজেডিগুলো এক অদ্ভুত রসিকতায় রূপ নেয়।

উল্টোদিকে, তাঁর পরবর্তী সময়ের কবিতাগুলোয় প্রকাশ পায় এক প্রখর সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং রূপকের দুর্দান্ত শাসন। ‘ফ্রিডম হ্যাজ হ্যান্ডস’(Freedom Has Hands) কবিতায় রিফাত শ্রমজীবী মানুষের জন্য এক শক্তিশালী, ছন্দোময় ইশতেহার তৈরি করেন। এখানে স্বাধীনতা কোনো বায়বীয় ধারণা নয়, বরং তা রক্ত-মাংসের মানুষের মতোই সচল ও স্পর্শযোগ্য—যার হাত আছে রক্তাক্ত ঘাম মোছার আর পা আছে সাম্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। এই রাজনৈতিক তীব্রতার সমান্তরালে আবার দেখা যায় ‘দ্য সেমেট্রি ফর টার্কিশ সোলজার্স’(The Cemetery for Turkish Soldiers)-এর মতো কবিতা, যেখানে ওপার থেকে কথা বলে ওঠা মৃত সৈনিকেরা বীরত্বের কোনো আতিশয্য খোঁজে না, বরং শৈশবের সেই চেনা টালির ছাদ কিংবা স্রেফ একটা খেলনা চাকা ঘোরানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষায় হাহাকার করে ওঠে।

‘এমিনে’ (Emine) কবিতার গ্রীষ্মের ছায়ায় ঘেরা নস্টালজিয়া হোক কিংবা ‘আন্ডারডেভেলপড’(Underdeveloped) কবিতায় একটা জাতির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থবিরতাকে চাবুক মারা—ওকতায় রিফাতের কবিতা চিরকালই ভীষণভাবে মানবিক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং চিরআধুনিক।

এখানে কবির ১৩টি কবিতা রইলো।

সব্যসাচী রায় একজন একাডেমিক লেখক, কবি, শিল্পী এবং আলোকচিত্রী। তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে বাংলা ও ইংরেজি—দু’ভাষাতেই। উল্লেখযোগ্য পত্রিকা ও সাময়িকী যেখানে তাঁর কবিতা ছাপা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে কবিতাপাক্ষিক, টারমিনাস, ঋতবাক, Stand, Poetry Salzburg Review, The Potomac প্রভৃতি। গদ্যচর্চার ক্ষেত্রে: তাঁর ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে After the Storm, Inglenook Lit ইত্যাদি আন্তর্জাতিক পত্রিকায়।
সব্যসাচী নিয়মিতভাবে রচনা-শিল্পবিষয়ক প্রবন্ধ লেখেন Authors Publish–এ এবং পরিচালনা করেন একটি সক্রিয় সাবস্ট্যাক, যেখানে ১৩০-র বেশি সদস্য যুক্ত আছেন। তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে আরও নানা পত্রিকায়—Tint Journal, The Suburban Review, Defenestration ইত্যাদিতে।

১. কর্তব্য (Duty)

ঘন কালো আঙুরের চেয়েও,

কোমর: সূঁচের চেয়েও সূক্ষ্ম,

ভার বয় পিঁপড়েরা কেমন করে

ওই খাড়া ঢালে আরোহণ করে?

 

একবার দেখো এই পৃথিবীর দশা,

চেয়ে দেখো ওই ভাঙাচোরা নিয়মের দিকে,

যে ডিম ফুটে বেরোলো এই গতকালই,

আজ সে-ই তীব্র অনুরাগে কপোত।

 

পলক ফেলার আগেই যেন

চিল এসে ছোঁ মারে আবাবিলকে- চোরা থাবায়।

যখনই ওৎ পাতে হিংস্রতা, জলপ্রান্তে,

রক্তে ভেসে যায় হরিণ, নিষ্পাপ।

 

বইছি এই চরাচরের সমস্ত ভার।

ভাবতে হচ্ছে ওদের কথা, প্রত্যেকের, একে একে,

যেসব নবজাতক পা রাখল এই ভুবনে—এই মাত্র

যাদের পৃথিবীর জটিলতা অসম্পূর্ণ, অজানা।

 

সূর্য পূর্ব দিকেই উঠবে—সে ধ্রুব সত্য—

কোনো বিস্ময় নেই।

তবু, আমার কপালেই জোটে যাবতীয় দুশ্চিন্তা,

যখন মৌমাছি হুল ফোটায়  কোনো অবোধ শিশুকে।

 

খেঁকশেয়ালের থাবা রক্তরঞ্জিত—

মেষশাবকের কিছু একটা ঘটেছে।

তাহলে আর কী অর্থ রইল, ওকতায়,

নেকড়ে আর পাখির গায়ে এই বৃথা রঙের প্রলেপ দিয়ে?

 

২. আকুলতা দিন ও রাতের (Longing For Day And Night)

চলবে না, এভাবে চলে না! এক দিন

এই সব জঞ্জাল থেমে যাবে, সূর্যেই হবে আবাহন তোমার।

পুরোনো ছবির মতো আবারও ফিরে পাবে চোখের আলোয়

জানলার ওই আকাশ, টেবিলের ওপর রাখা বই,

ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাওয়া যত শোক, দুশ্চিন্তা,

তোমার তোয়ালে, চাদর আর জামাকাপড় সারি সারি

উড়ে যাবে বাতাসের দোলায় ঝাপটা মেরে।

কই তুমি, শ্রমে হাসা দিনের আলো প্রখর,

কই তুমি, সুন্দর সুবাসে ভরা রাতের প্রহর!

 

৩. উড়িয়েছি সব কটি পতাকা (I Hoisted all my flags)

উড়িয়েছি সব কটি পতাকা পতাকাদণ্ডে,

শহরকে রাঙিয়েছি রক্তের তপ্ত রঙে।

ক্রোধের দিকে যাওয়া পথে বিছিয়েছি পাথরের ঢাল।

হাতের উল্টো পিঠে গুঁড়িয়েছি মিনার-কংকাল।

প্রেমকে চার ভাগে কেটে

ছড়িয়েছি পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর আর দক্ষিণে,

যাতে এক কোণ থেকে অন্য কোণে ঝাঁপ দেওয়া যায় অনায়াসে।

 

আমার প্রথম ফড়িং, আমার তালার একমাত্র চাবি।

 

বসন্তের রোদের মতো তাজা, অঙ্কুরিত আশা

আমার আনন্দকে বইয়ে নিয়ে চলে ডালে ডালে।

আলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্য এক আলো,

ফলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্য এক বীজ

খালি করে দাও আমার সব কল, ঝরিয়ে দাও আমার বৃষ্টি

অন্ধকার, ভয় আর যত জীর্ণ-পুরনোর ওপর।

 

স্বাগতম সেই পাহাড়ি ঢলকে, পাহাড় বেয়ে নেমে প্লাবিত করে সমতল!

 

দাঁড়িয়ে আছি ঠিক মাঝে; দিন আর রাত,

রাস্তা, বাড়িঘর, বয়ে চলে দুপাশ দিয়ে।

মরিচাহীন নোঙরের চেয়ে, কিংবা ওই আকাশের চেয়েও আমি তীব্র ধারালো।

লাটিমের মতো লাটাইয়ে ঘোরাই সব কটি ঋতু।

এক তুড়িতেই একাকীত্বকে উল্টে দিয়েছি, মুছে ফেলেছি চিরতরে।

নিজের বুকের দুধে পুষ্ট হয়ে আমি এগিয়ে চলি অমরত্বের দিকে।

 

মাটির বুকে ঘাস, আর গাছপালা, আর ভেজা আগামীর ডাক।

 

৪. এমিনে (Emine)

পাখিরা আঁচড়ে দিত এমিনের চুল।

ভাগ্যগণনার ডেইজি ফুলের মতো সূর্যটা ফুটত

আবার এই বুজে যেত।

জানলার পাশে ঠান্ডা হয়ে আসত জলের কুঁজো।

ওপর দিয়ে একটা পালতোলা জাহাজ এগিয়ে আসত

তিঁত গাছের ওপর দিয়ে,

গিয়ে বসত মস্ত বড় সিডার গাছের পাশে।

এমিনে তরমুজটা কেটে ফেলত,

যেন প্রেমের পাট চুকিয়ে দেওয়া, তারপর আচমকা ঝুঁকে পড়ত

বারান্দা থেকে এক অসহ্য আকুলতায়।

অবশেষে ফালি করত লাল শাঁস আর ধুয়ে ফেলত

হাত থেকে লেগে থাকা লাল রসটুকু ওই নীলিমায়।

রেলিং থেকে চড়ুইগুলো লাফিয়ে পড়ত বাগানে,

মাথার ওপর ভেসে বেড়াত সাদা মেঘ, একটা।

একটা ভাঙা মই, ঘরগুলোর মাঝে এক চিলতে বাগান,

এটাই তো ছিল তোমার দেশ, এমিনে, গ্রীষ্ম আর ছায়া।

তারপর থেকে কত না গ্রীষ্ম আমরা পার করে এলাম,

কত না দীর্ঘ দিন! কিন্তু তোমার সেইসব প্রেম

কখনোই জায়গা নিতে পারেনি তোমার

টব আর জেরানিয়াম ফুলের।

 

আমরা কি অল্পই বেঁচেছি, আমরা কি বুড়িয়ে গেছি সামান্যই?

বড় শহরের ট্রেনগুলো আসে আর যায়

আমাদের দিগন্তে, শৈশবের সেই টালিগুলো,

একটা নিচু ছাদের ওপর একা একাকী,

তৈরি হয়েছিল তিন দিন আর তিন রাতে,

তারপর মরে যাওয়া, আকাশ থেকে খসে পড়া তারা।

এমিনে হুট করে দরজায় এসে দাঁড়াল!

সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, আয়নার মুখোমুখি, হাসছে খিলখিল।

আমাকে খেতে দিল পিচ আর তরমুজের আইসক্রিম।

এমিনে বলত: ‘তুমি তো এক দীর্ঘ যাত্রায়,

সুখের শিকারি আমরা, স্রেফ একটা চুমুতেই হারিয়ে যাই।

বোঝা ভার কে যে কে, আর কোনটা যে কী।’

 

প্রতিটি কাঠের দোরগোড়া, প্রতিটি দিক আর

সব চোখ থেকে

ঢুকে পড়তে পারতে এমিনের বাগানে।

বন্দরের ভিড়টাকে বাইরে অপেক্ষায় রেখে দিত—

ছোট ছোট বেতের ঘোড়ার গাড়িগুলো সেখানে লাইন দিয়ে

যেন বাতাসে জড়িয়ে থাকা কচি চারাগাছ।

সে সিনেমার দিকে ছুটে যেত

একটা মেঘের মতো, বৃষ্টি এনে দেওয়া গ্রীষ্মের মেঘ।

এমিনে ছিল পাড়ার সবার প্রিয়।

আমাদের বিচ্ছেদ আর মিলনগুলো তাদের ফুল ফোটাত,

আর বুড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই

সেগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হতো

আমাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর গজানো ম্যালোর মতো।

তারুণ্য প্রতি মুঠোয় একটা করে আকাশ ধরে ফেলা!

সাঁঝহীন একটা দিন জন্ম দিত রাতের

আর হলদে ও সাদা রঙের কুত্তিগুলো

বাইরে গিয়ে তাড়া করত বুনো বেড়ালদের।

 

এমিনে বলত:

‘ভোরের আলোর সাথে আমি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি

তোমার জন্য, ঠোঁটে ঠোঁট রেখে। আমি বেঁচেছিলাম

রাতগুলো তোমারই জন্য আর এই লবঙ্গ ফুলটার

এমন সুবাস স্রেফ তোমার একাকীত্বের জন্য।’

‘চাঁদ যখন মেঘের আড়ালে চলে যায়,’ এমিনে বলত,

‘আমার কাঁধের ওপর ফোটে লাইলাক ফুল—

আমার জন্য বাঁশি বাজাও আর

আমার স্তনদের জাগিয়ে তোলো।’

 

এভাবেই তো একটা ফল পচে যায়! বুড়ো হয়ে যাওয়া

গাছগুলো ভেঙে পড়ে চওড়া চত্বরে।

কেউ ভাবে, কোথায় গেল আমার সেই সূর্য,

সারা দিন বয়ে চলা আমার সেই জল? কোথায় তুমি,

আর কোথায় আমি? বাগানের সেই জলাশয়টাই বা কোথায়?

আর কোথায় বাতাসে উড়ে যাওয়া সেই এমিনে?

 

এইসব কিছু সত্যিই আমাদের ছিল।

এই ছেলেটা, যেখান থেকেই সে আসুক না কেন, হাজির হলো

আর রক্তে মিশে গেল গান-বাজনা চলা এক ক্যাফেতে।

প্রথম গোলাপটা ছিল এমিনে, যার পাপড়িগুলো আমার হাতেই ঝরে পড়েছিল,

তপ্ত গ্রীষ্মগুলো ফুঁসে উঠেছিল ভেতরে।

 

৫. ফাতিহ: বিজেতার ছবি (Fatih: The Conqueror’s Picture)

আয়া সোফিয়ার গম্বুজের ওপর এক খণ্ড সাদা মেঘ,

দেখলাম তা বিলীন হতে। আমার মধু-রঙা তসবির দানা,

সেই অ্যাম্বার দিনগুলো, পাতা আর আশারা সব ঝরে গেল।

জানলা বেয়ে নেমে চলল শরতের বৃষ্টির জটলা।

 

এই কাফন-সদৃশ কাফতানগুলো তো আমারই ছিল,

আমারই ছিল ঘোড়াদের ঘাড়, বাতাস বইত ঠিক মনের মতো।

শহরের প্রাচীরের পাথরগুলোয় হাত বুলিয়েছি,

ইস্তাম্বুল ছিল আমার, ওর দুর্গপ্রাকার ছিল ঠিক আমারই মতো।

 

খেয়েছি সোনার থালায়, জল পান করেছি

সোনার পেয়ালায়, পার হয়েছি উত্তাল দানিউব নদী।

আমি সুলতান মেহমেত, ‘আভনি’, বীরত্বের গর্বিত শিখা বুকে।

 

ছবিতে বন্দি হয়ে আমি বামন, কিন্তু সে আমি নই,

আমার গন্ধহীন গোলাপ, আমার পাগড়ি, আমার হিমশীতল পশম,

কেবলই খুঁজে চলেছি, বন্যের মতো খুঁজে চলেছি সর্বত্র।

 

৬. হোমারের প্রতি (To Homer)

হোমার বলেন সেই আদিমতম বুনো সমুদ্রের কথা,

আজ শান্ত, মাংসের পঙ্কিলতামুক্ত শুচি!

বৈশ্বিক কোণে আসীন তিনি, অনন্য ও একা।

তখনও অজানা সব মাউজার রাইফেলের প্রতি উদাসীন,

তাঁর পবিত্র দাঁতে খুঁটে চলেছেন কোনো বীজ;

প্রতিটি শব্দকে খোসা ছাড়িয়ে আলাদা করেন এক এক করে,

এবং রাতের উদ্দেশে জাগিয়ে তোলেন তাঁর সেই অমর বৃক্ষ।

 

৭. স্বাধীনতার হাত (Freedom Has Hands)

১. আমাদের ঘোড়াগুলো ফেনিল মুখে ছুটে গেল

ওই শান্ত সমুদ্রের পানে।

 

২. কিসের এই উড়ান? এ কি ঘুঘুর বুক চিরে উঠে আসা

মুক্তির আনন্দ?

 

৩. চুম্বন ছিল নিষিদ্ধ, তুমি কি জানতে?

নিষিদ্ধ ছিল চিন্তা,

নিষিদ্ধ ছিল শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলা।

 

৪. ওরা গাছ থেকে ফল পেড়ে নিয়ে গেছে

বিক্রি করছে বাজারে

যত বেশি দামে,

আর মাটিতে পড়ে আছে শ্রমের ভেঙে ফেলা ডালপালা।

 

৫. ওরা বলে, অতিরিক্ত আলো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়,

আর স্বাধীনতা হলো বিস্ফোরক।

তাই ঘরপোড়ানিরা ভেঙে ফেলে আমাদের বাতিগুলো

আর তেলচিটে ন্যাকড়া দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় স্বাধীনতায়।

 

আমরা হাত বাড়ালেই ওরা বিস্ফোরণ দেখতে চায়,

আর চায় আমরা জ্বলে উঠি যখনই কোনো মশাল জ্বালাই।

চারপাশে বিছানো মাইনফিল্ড,

অন্ধকারের ভেতর অপেক্ষা করে আছে রুটি আর জল।

 

৬. স্বাধীনতার হাত আছে,

আছে চোখ আর পা;

রক্তাক্ত ঘাম মুছে ফেলার,

আগামীর দিকে চেয়ে দেখার,

সোজা এগিয়ে চলেছে সাম্যের দিকে।

 

৭. আমি যদি খাঁচা হই, তুমি তবে লতা;

জড়াও, যত পারো আমায় জড়িয়ে পেঁচিয়ে ধরো!

 

৮. স্বাধীনতার প্রেম এমনই:

একবার মজেছ আর নিস্তার নেই,

এমন অভ্যাস যা কখনো পুরোনো হয় না,

এমন এক স্বপ্ন যা বাস্তবের চেয়েও বেশি সত্যি।

 

৯. সেই সাহসী রাখালদের ঐতিহাসিক অভিযাত্রা,

সেই শ্রমিকেরা—যারা এই বিশ্ব-মৌচাকের মৌমাছি;

তারা ভিড় করে ঘুরছে ওই কালো রুটির চারপাশে,

সেই ভাইয়েরা যারা আমাদের পৃথিবীতে স্বাধীনতা এনে দেয়।

সেই রুটি ছুঁয়েই মানুষের মন ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে,

আমাদের অন্তহীন রাত কেটে ভোর হয় সেই রুটি পেলেই;

সেই সূর্যের আলোতেই মানুষ ছিনিয়ে আনে স্বাধিকার।

 

১০. এই আশাই হলো স্বাধীনতার দুয়ার,

যা আধো-খোলা আছে সুখী দিন চেয়ে।

এই আনন্দই হলো সেই সুখী আলো,

নরম করে, লাজুক হেসে, আমাদের গায়ে রশ্মি এসে পড়ে।

 

এসো আমার দেশের মানুষ, মেলে ধরো

স্বাধীনতার দুয়ারে নতুন ডালের মতো,

ঠিক পেছনেই আকাশজুড়ে রয়েছে এক ভ্রাতৃত্বের নীল।

 

৮. শিশু (CHILD)

মারা গেছে—

নিজেও জানে না যে সে মৃত,

হাত দুটি পড়ে আছে নিথর, অবিন্যস্ত।

ওরা নিয়ে যাবে দূরে,

বলতেও পারবে না,

‘আমি যাব না!’

এমনকি ধন্যবাদটুকুও দিতে পারল না

কফিন বয়ে নিয়ে যাওয়া বন্ধুদের।

 

আহা, ওর মৃত্যুটা আর কারও মতো নয়।

 

৯. ভাগ্য (DESTINY)

চরম যন্ত্রণা আমার:

পেশায় আমি হিসাবরক্ষক

অথচ অঙ্কেই কাঁচা!

আমার প্রিয় খাবার ইমাম বায়ালদি—সেই বেগুনের বাহার,

কিন্তু ওটা আমার সহ্যই হয় না।

আমি একটা মেচেতা-পড়া মেয়েকে চিনি,

তাকে বড্ড ভালোবাসি,

কিন্তু সে আমায় ভালোবাসে না।

 

১০. একদা (ONCE UPON A TIME)

প্রতিটি গাছের পেছন থেকে তুমি দেখা দিলে

এত বিপুল সংখ্যায় যে নিজেকে বড্ড একা মনে হলো,

আর তোমার উন্মাতাল চঞ্চলতার দমকা হাওয়ায়

দূর্গের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া আমার হাসিটা ঘূর্ণিপাকে উধাও হয়ে গেল।

 

প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে তোমার সাথে দেখা হলো,

অথচ তুমি এতটাই অনুপস্থিত যে কেঁদে ফেললাম, হারালাম নিজেকে।

প্রাচীন সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেওয়া মেঘেদের মাঝে

ভেসে বেড়াল তোমার রক্তে ক্ষয়ে যাওয়া সব পাথর।

 

কী আফসোস! তুমি হারিয়ে গেলে বিপুল সংখ্যায়,

এমন সময়ের সহাবস্থানে যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না কখনো।

নিচু হয়ে মাটি থেকে তুলে নিলাম আকাশটাকে,

যে আকাশ তুমি অসাবধানতায় ফেলে দিয়েছিলে, হাত থেকে ফেলে দিয়েছিলে।

 

১১. তারা (STARS)

বইয়ের পাশে খাতা

খাতার পাশে গ্লাস

গ্লাসের পাশে শিশু

শিশুর হাতে বিড়াল।

আর অনেক দূরে তারা, শুধু তারা।

 

 

 

১২. তুর্কি সৈনিকদের সমাধিক্ষেত্র (THE CEMETERY FOR TURKISH SOLDIERS)

    ১. আমি নৌবাহিনীর নাবিক,

মাছেরা খেয়ে নিয়েছে চোখ।

দেখা আর কাঁদার দিন শেষ।

বেঁচে থাকতে বেশ লম্বা ছিলাম,

বিশ্বাস না হলে

আমার জামাকাপড়গুলো চেয়ে দেখো।

 

কেউ একজন বলে—আমিও তো সৈনিক,

অন্যান্য মৃতদের চেয়ে আলাদা কিছু নই।

একসময় বাস করতাম আমরাও বাড়িঘরে।

এখন দরজার ওপাশে পড়ে থাকি,

দেয়াল ভেদ করে চলে যাই।

 

আর অন্য একজন বলে—

ওদের কথা বিশ্বাস কোরো না,

ওরা সবাই মিথ্যাবাদী,

আমাদের কোনো অস্তিত্বই নেই।

 

    ২. আমার ঘরে আরও সহজে ঢুকবে বলে

ওরা আসে মৃত আত্মীয়দের রূপ ধরে।

তাকাই—সে তো চাচা কিংবা ভাই।

তাকাই—সে তো পোলিশ সার্জেন্ট

এবং সাথে সাথেই কথা বলে ওঠে।

 

আমার পাঁচ বছরের মেয়ে ছিল।

মারা গেছে, এখন আমরা একসাথেই আছি।

এখানে এসে তার ভালো লাগে না,

সে আর চাকা ঘোরাতে পারে না খেলায়,

তার হাত দুটো সে ওয়ারশ’তেই ফেলে এসেছে।

 

একটা কণ্ঠস্বর বলে ওঠে—

এখানে কোদাল দিয়ে আলু তোলার তাড়া নেই,

ভাঙতে হয় না কোনো পাথর,

বাজারে বয়ে নিয়ে যেতে হয় না কোনো বোঝা,

এখানে বেশ শান্তিতে আছি।

 

একজন তার বউকে নিয়ে বড্ড চিন্তিত।

সে আমার কাছে বাড়ির খবর জানতে চায়।

 

যখন মারা গেলাম

ওরা ওভারকোটটা কেড়ে নিল।

বড্ড শীত করছে,

সামনেই তো পড়ে আছে পুরো শীতকাল।

 

তারপর ওরা সবাই সমস্বরে বলে ওঠে—

 

    ৩. “আমরা একই গ্লাস থেকে জল খাই।

সন্ধ্যায় আমরা একসাথেই খাই,

কেউ একজন ভালোবাসা উজার করে আমাদের প্রিয়তমাকে,

কেউ আমাদের মায়ের কোলে সন্তান হতে চায়।”

 

ফেরিগুলোতে ওরা যখন-তখন আসে আর যায়।

ট্রামগুলোতে ওরা আমাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ে।

মনে হয় ওরা আমাদের ছেড়ে কখনো যায় না।

ওরা আরও একবার, দীর্ঘ সময়ের জন্য বাঁচতে চায়।

 

১৩. অনগ্রসর (UNDERDEVELOPED)

অনগ্রসর; বিজ্ঞানে, শিল্পে, বসন্তের বুকে

পত্রহীন আর পুষ্পহীন; কপালে এঁকে নেওয়া

যন্ত্রণাকাতর তারা।

 

অনগ্রসর; কাঠের লাঙলে বন্দি হওয়া

যখন তুমি ফালি করতে পারতে ইস্পাতকে কাগজের মতো,

সময়ের কাছে হেরে যাওয়া।

 

অনগ্রসর; ধর্মের অন্ধকার গুহায় সমাহিত হওয়া

দুপাশে হাত ঝুলিয়ে ক্ষুধার্ত থাকা, প্রচণ্ড স্রোতের বিরুদ্ধে

আর অন্যদের বিরুদ্ধে।

 

অনগ্রসর; মানুষকে ভয় করা যেমন মানুষ ভয় পায় শিয়ালকে

যেখানে বাঁচা যেত ভ্রাতৃত্বে, সেখানে বাঁচার তাগিদে

সাপের ফণাকেই জাপটে ধরা।

 

অনগ্রসর; মূর্খতায় ডুবে আর উকুনে জীর্ণ হয়ে

অন্ধকার গিরিখাদে টানটান ধনুকের মতো আটকে;

সেই তীব্র গতিতেই আবার সমস্ত বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা!

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *