পিউলি মুখোপাধ্যায়-এর কবিতা
পিউলি মুখোপাধ্যায়-এর কবিতা
পিউলি মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি নদিয়ার শান্তিপুর। কবিতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘সামনে জীবন যেমন’– অনুরাগ প্রকাশনী এবং ‘অস্তিত্বে স্থিতিস্থাপকতা’, কবিতাপাক্ষিক থেকে প্রকাশিত ২০২৫-এর জুনে।
১)
ফোঁটা
ভালো না লাগা এবং সময় নষ্টের রোগে চোখের সামনে রীলস– আনন্দ এবং দুঃখে, সুস্থতা এবং অসুস্থতায়, জন্ম ও মৃত্যুতে… জলচক্রের মতো মস্তিষ্ক বন্দি থাকছে অনিচ্ছায়। জীবনযাপন অন্যরকম, কথাবার্তাও। মানসিকতা, সৌজন্য, আচার-আচরণ পুরোনো প্রকাশভঙ্গি ছিঁড়ে দেখছে নতুন স্বপ্ন, পুজোতে মগ্ন। আমাদের ভাষা যতটা বদলেছে, কবিতা তার থেকেও বেশি। ধরাছোঁয়ার বাইরে গিয়ে জনপ্রিয়তায় পিছিয়েছে অনেক। জানো তরুণ কবি, নীল আকাশে ধূসর মেঘ আজগুবি শব্দে বৃষ্টি আনবে না। সাহিত্যের মৌসুমি ঋতু হয়ে ভাবনার স্বাধীন আর্দ্রতা থেকে ছিনিয়ে নিয়ো জীবনের বিন্দু…
রাগ
বিশ্রামের পালঙ্ক বেয়ে গ্রীষ্ম শেষের সুর
তীব্র তাপপ্রবাহে গৌড় মল্লার
গরমের ছুটির চিরকুট ঠোঁটে রঙ্গন গাছে দোয়েল পাখি
এসেছে ভোরের সাদাকালো স্বপ্নের গায়ে রঙিন রাংতায়
বুকের মাঝে কিশোরী ঝরনা
সম্পর্কের অকালমৃত্যুতে মায়ার মরূদ্যান
রাস্তায় ফ্রুট-জুস বিক্রির প্রথম সপ্তাহে
কেউ ক্রেতার ডাকে লুকোনো মেঘ মালহারে
পরাজয়ের জঙ্গল পুড়িয়ে স্বপ্ন শিখছে
সরকারি ফ্রেমের সানগ্লাস চোখে যাচ্ছ পাশ দিয়ে
বর্ষার প্রথম দিন কম্পিটিটিভ এক্সামের বই বুকে
ঘুমিয়েছিলে চন্দ্রকৌঁসের সুরে, মনে আছে?
২)
প্রাপ্তবয়স্কতা
মনের ক্যানভাসে নিম্বোস্ট্রাটাস ভর্তি অভিমান
প্রবল বৃষ্টিতে মাথার ওপর এক টুকরো ছাদের আশায়
কালিদাসের মেঘদূতম চোখের পাতায়
ঠোঁটে ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’…
দুই হাত অভ্যাসবশত ড্রয়ারে খুঁজছে চিরুনি
ভেজা চুলের কান্না থামাতে অর্ডার দিলে উচ্চচাপ!
বর্ষা ছুঁয়ে যাবে শরীর, ঘটনাবহুল বাস্তবে
ভারসাম্যরক্ষায় বেছে নেবে কি নিরাপদ আশ্রয়?
নাকি থাকবে সংলাপের কালো মেঘের পাহারায়…
উত্তাপ, উত্তেজনা ভুলিয়ে জলের ফোঁটা
লুকিয়ে রাখছে ঝলমলে সূর্য আস্তিনের তলায়
সময় এলে ভোর হবে আবেগের প্রাপ্তবয়স্কতায়
অতিক্রম
বাউন্ডারি পেরিয়ে লোকালয়ে ঢোকার আগে
নিয়মকানুনে থাবা বসিয়ে ঘুমিয়েছে বাঘ!
৩)
বর্ষা
আমাদের চোখ হঠাৎ বসছে মাথার পেছনে
সমালোচনার হাওয়ায় রুমালের প্রিন্টে সহজপাঠ
বাসের কন্ডাক্টর সামনে এলে অভ্যস্ত হাতের মুঠো এখন ফাঁকা
স্টপেজের সংগ্রহে বন্ধ এবং অপেক্ষার ইতিহাস
ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্তে স্তব্ধ বাঘ
মানুষের ডিপ্রেশন বুঝে অবাক ভঙ্গিমায় তাকিয়ে
এই বুঝি মন ছেয়ে গেল মেঘে
অজানা থাকুক অপ্রিয়, শিকল দেখলেই মেলো ডানা
জিভের আগ্নেয়গিরি বিচ্ছিন্নতার শান্ত পাহাড়
উত্তপ্ত কথোপকথন ভুলে আকাশে সান্নিধ্যের মেঘ
চোখ খুললেই তীব্র বৃষ্টি, মনের ব্যালকনি সবুজ বন
ময়ূর পেখম তুলে আসবে কি ঘরে?
অন্তর
মুখোশ, যেন ব্যস্ততায় ভারী মৌলের স্বর
খসে পড়লে একাকী আলিঙ্গনে সত্যের কলরব
৪)
চাতক
ব্যস্ততা ঢাকছে কাদামাখা রাস্তা
জুতোর তলা থেকে মনের মধ্যে টুপটাপ
কিউমুলোনিম্বাসের আভাসে গাছের ডাল বেয়ে কদম ফুল
আকাশ জানে না কতটা কাঁদলে বন্যা হয়
চোখের বৃষ্টি দূরবর্তী প্রান্তর কতটুকুই বা সিক্ত করে!
মরূদ্যান হয়ে বিদ্যুৎ-হাসি বেঁচে থাকুক এই বুকে
নিম্নচাপের পূর্বাভাস যেন
স্টুডেন্ট-লাইফ শেষে পরীক্ষার আবহাওয়া, জিতলে
ধূসর পর্দা সরিয়ে ঝলমলে আকাশ দেখব একদিন
গোধূলি মেঘের নীচে মাটির সোঁদা গন্ধে
তোমার পায়ের ছন্দে গাইব স্বরচিত গান
এমন বিশ্বাসে প্রতিবছর হয়ে উঠি চাতক…
জান্তব
মৃত সন্তানকে রেখে এইমাত্র চোখ ফেরাল যে মা
তার প্রবৃত্তির রূপরেখায় একমুঠো সময় রেখো
৫)
অপেক্ষা
ভীষণ রোদে কোন দুপুরে উঠেছিলে ট্রেনে
সূর্যের পা থামল মেঘে, হঠাৎ বজ্রপাত!
জানলা দিয়ে জলের ফোঁটা পড়ল এসে মনে
গন্তব্য স্টেশন যেন সাহসী জলপ্রপাত
সঙ্গী শুধু নিজের ছায়া, ক্লান্ত অবাক আকাশ
শ্রাবণ হয়ে ভোলাবে নাকি জ্যৈষ্ঠ বাতাস?
বাইরে কারও পা জুড়ে অপেক্ষার পায়চারি
প্রখর জুনে প্রকৃতিতে অস্থির বাড়াবাড়ি
বিরামহীন ডাকছে তাকে, যার সঙ্গে আড়ি
বলছে যেন–
যতই রাগো, হোক ছাড়াছাড়ি
সামনে দাঁড়ালে আজও পুড়িয়ে দিতে পারি
অশান্তি আগুন নেভাতে আষাঢ়, এসো তাড়াতাড়ি…
কৃত্রিম
দরজায় অপেক্ষার পারদ চড়ছে মিথ্যে উৎকণ্ঠায়
কৃত্রিম বুদ্ধি জানে না ঘুমপাড়ানি মন্ত্র
৬)
কলতান
গভীর নিম্নচাপে অভিমান উড়িয়ে দিল যে পায়রা
বাসায় অবৈধ বাণিজ্য দেখে তার ঠোঁটের বুলডোজার
খাবারে পেয়েছে দুঃখের দানা
আনন্দে ফিরতে সঙ্গীর মুখে শান্তি, প্রশ্রয়
এখন কোন মাস জেনে কী লাভ!
শুধু ঘন ঘন সংঘর্ষে উত্তাপ বাড়লে
ব্রহ্মার তালু থেকে আসা জলীয় বাষ্পই মেঘ
পায়ে জল নূপুর, কানে গীতবিতান
চোখে প্রাক-বর্ষা, ইলেকট্রনীয় যুদ্ধের তড়িৎ
ভাসমান শরীর দেখে সামান্য জলকণা
জমছে পরিবর্তনের খেলায়, হঠাৎ শিলাবৃষ্টি…
পাখির জলজ কলতানে তুমি কি হবে আকাশনীল?
চিরাচরিত
অনিয়মের বুদ্বুদ ভেঙে ভিজে যাচ্ছে রোজনামচা
মরশুমি ফল কিনতে গিয়ে আকাশ দেখছে কে?