Email: editors.kokshopoth@gmail.com
September 16, 2026
Kokshopoth

মুক্ত গদ্যঃ অনিন্দিতা মণ্ডল

Jul 24, 2026

মুক্ত গদ্যঃ অনিন্দিতা মণ্ডল

জন্ম ও বেড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাঞ্চনপুর গ্রামের প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে। তাঁর মনন ও সংবেদনশীলতা পরবর্তীকালে সাহিত্যচর্চার উর্বর ভূমি হয়ে উঠেছে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৪ সালে ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। লেখালেখি তাঁর আত্মপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। পাশাপাশি বইপাঠ ও আলোকচিত্রচর্চা তাঁর সৃজনশীল মননের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। পাখির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং বাগানপ্রেম তাঁর প্রকৃতিনির্ভর জীবনবোধকে আরও সমৃদ্ধ করেছে

বীথিকা ধরে হেঁটে চলেছে দীন

 

 

প্রখর রোদে একা একা পড়ে থাকে উঠোন কখনও দুটো কুকুরের আনাগোনা কিংবা কাঠবেড়ালির নাচন। অবশ্য বেজী এসে টহল দিয়ে যায় বার কয়েক। বাসি কাপড়ের জল টুপ টুপ করে পড়ে শুকনো উড়ে আসা ফুল পাতার উপর। বাগানবাড়ি পেরিয়ে ঠিক সিঁড়ি ঘরের কাঁধ বরাবর কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে পুঁই শাকের বীজ। লতিয়ে যেতে যেতে তাদের মেরুদন্ড শক্ত হয়েছে খুঁজে পেয়েছে বিদ্যুৎ খুঁটি কিংবা উই ধরা বাঁশের বাতা। তাদের বেগুনী রঙ ছড়িয়ে ফেটে পড়েছে অন্য কোথাও। মোজাইক করা দেওয়ালের গায়ে অসংখ্য পোকামাকড়ের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়েছে খোলা আকাশের নিচে শীতকাতুরে ছাদে। ভুলবশত দুর্ভাগ্য এসে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে, আসন পেতে বসতে চেয়েছে দুপুরের ক্ষিদের পাশে। মায়ার শরীরে তাকে এনে বসিয়েছি অস্ফুটে, তুলে দিয়েছি বৈকালিক মদ মাংস আড্ডা। থুথু জমতে জমতে জিভের এক পাশে জমা হয়েছে করুণা ও কবিতা। ঘুরে ফিরে আরশির উপর এসে পড়ছে আলোর প্রবাহ। নিজের সাথে প্রতিবিম্বের দূরত্ব অতি সামান্য যতটা সামান্য হয়ে পড়েছে বেঁচে থাকা। এই আলো ও অভিশাপ থেকে গজিয়ে উঠছে বৃথা আরোগ্য। এইবেলা পেরিয়ে ওইবেলা এলে মনে হয়— কত সহজে পেরিয়ে গেল বিপদসীমা!

           শব্দের ঘনত্ব কমে গেলে অসহায়ত্ব জাঁকিয়ে বসে বুকের উপর। অযথা পাখির ডানা ঝাপটানো মনে করিয়ে দেয় জীবন উপস্থিতি। করাত দিয়ে কেউ পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মন থেকে শরীর আলাদা করেছে। সেই দাগ নিয়ে একা বসে থাকি কালবৈশাখী বিধ্বস্ত ছাদে। মাছের ডিমের মতো থিক থিক করে জোনাকি পোকা। চতুর্ভুজাকার ছাদ- এর পরিসীমা মাপতে গিয়ে ধরা পড়েছে অসংখ্য ফাটল আর তাদের ভিতরে অসংখ্য হাই ওঠা মুখ। অনন্তকাল ধরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তাদের চোখের তলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ধ্রুপদী রহস্য। সেই রহস্য খুঁজতে খুঁজতে মাছরাঙা পাখির পালক খসে পড়েছে জামরুল গাছের ডালে। শান্ত শীতল হাওয়ায় ফুরফুর করে সেই পালক কোথায় যেন যেতে চাইছে কোন গৃহিণীর আহ্লাদে। ঘর ফিরতি রাজহাঁসের ভেজা ডানায় সেই রঙিন মুকুট জুড়ে যায়। আহ্লাদে আটখানা হয়ে তারা ছুটে যায় চই চই চই চই শব্দে, আছড়ে পড়ে ঝিকিমিকি চাঁদের আলোয়। রাতের আঘাত ক্রমশ শোকস্রোতে বয়ে যায় কানের পাশ দিয়ে। কৃপণ হতে হতে বৃহৎ মন থেকে পাঁজরগুলো থর থর করে কাঁপুনি দিয়ে ঝরে পড়ে। তাদের কি উদ্দেশ্য কে জানে তবু হাপুর নয়নে দুই হাতে জড়িয়ে রেখেছি তাদের কতবার, কতবার শুনিয়েছি বেগনি ফুলের মধু লোকানোর মন্ত্র।

           জীবন কত কিছু শিখিয়ে নেয় আমাদের থেকে। নিজের প্রতি নিজেরই যখন ঘেন্না জন্মায় তখন আয়নার দিকে চেয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ। তারপর উগরে দিতে হয় সমস্ত হজম না হওয়া খাবার ও দোটানা শব্দদের। দলা পাকিয়ে থাকা অবস্থায় যারা গলার ভিতরে অযথা ভিড় জমায় তাদের আঙুল দিয়ে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনতে হয়। বাথরুমের এক কোণে উগরে দিয়ে জল ঢেলে দিতে হয় আনন্দে। তাদের একসাথে একে অপরের পিছনে ভেসে যাওয়া দেখে মনে পড়ে আমি উন্মাদ— ক্ষিদে পেলে খাবো, ঘেন্না হলে থু করে ফেলে দেবো। এইসব অনঘ দৃশ্যের উপর চ্যাটা মেলে বসি। মৃত্যু এগিয়ে আসে। মৃত্যু যত এগিয়ে আসে তত তাকে বড় আশ্চর্য মনে হয়। কটাক্ষ দৃষ্টিতে যারা মেপে নেয় শরীরের ওজন তারা এসে বিনা ব্যথায় ব্যথিত হবে আমার মৃত্যুতে! এত অন্ধকার, ভিড়ভাট্টা চাইনি, চেয়েছি মাছরাঙার গায়ের মতো রঙিন বেদনা কিংবা একঝাঁক বকেদের ফর্সা রঙ। একবার শরীরের উপত্যকা বরাবর আছড়ে পড়ুক, আমার পাশে শুয়ে থাকা চিন্তাগ্রস্ত ভালোবাসা অবধি গড়িয়ে যাক এইটুকু রঙ। অথচ খুবানির মিষ্টি গন্ধ মাখা রাত্রি বুকে নিয়ে হাই তুলতে তুলতে হেঁটে গেছি অরাজনৈতিক মানুষের মিছিলে, খুঁজে পাইনি কোথায় আসার কথা ছিল। এত ছল করে আমি কী বেঁচে যাব নির্ধান্দায়!

1 Comment

  • এটি পড়ে আমার প্রথম অনুভূতি—এটি আসলে প্রচলিত অর্থে কবিতা নয়, আবার গদ্যও নয়; এটি এক ধরনের দীর্ঘ, ঘন, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা গদ্যকবিতা। এবং এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—লেখাটি কী বলতে চাইছে তার চেয়ে কীভাবে অনুভব করাচ্ছে সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

    ১. শুরুটাই খুব শক্তিশালী

    “প্রখর রোদে একা একা পড়ে থাকে উঠোন”—এই একটি বাক্যেই একটা নিঃসঙ্গ পৃথিবী তৈরি হয়ে যায়।

    তারপর কুকুর, কাঠবেড়ালি, বেজী, বাসি কাপড়ের জল, শুকনো ফুলপাতা, পুঁইশাকের বীজ—খুব সাধারণ, প্রায় তুচ্ছ জিনিস। কিন্তু লেখক এগুলোকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যে পরিত্যক্ত একটি বাড়ি ধীরে ধীরে একজন মানুষের মানসিক ভূগোলে পরিণত হয়েছে।

    পুঁইশাকের লতা বিদ্যুৎ খুঁটি কিংবা উইধরা বাঁশের বাতা আঁকড়ে উঠছে—এই ছবিটা বিশেষ সুন্দর। এখানে বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি এবং আশ্রয়ের অনিবার্যতা দুটোই আছে।

    ২. লেখাটির সবচেয়ে বড় গুণ—চিত্রকল্পের অস্বাভাবিকতা

    “থুথু জমতে জমতে জিভের এক পাশে জমা হয়েছে করুণা ও কবিতা।”

    এটি দুর্দান্ত একটি লাইন।

    কারণ করুণা এবং কবিতা—দুটো বিমূর্ত বিষয়কে আপনি শরীরের অত্যন্ত দৈহিক একটি অনুভূতির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। ফলে একটা অস্বস্তিকর অথচ স্মরণীয় ছবি তৈরি হয়েছে।

    আবার—

    “নিজের সাথে প্রতিবিম্বের দূরত্ব অতি সামান্য যতটা সামান্য হয়ে পড়েছে বেঁচে থাকা।”

    এখানে আয়না → প্রতিবিম্ব → নিজের সঙ্গে দূরত্ব → বেঁচে থাকা—এই পরপর সরে যাওয়া অত্যন্ত কবিতাময়।

    আমার মতে, পুরো লেখাটির কেন্দ্রীয় দর্শন সম্ভবত এখানেই লুকিয়ে আছে।

    ৩. দ্বিতীয় অংশটি আরও অন্ধকার

    “করাত দিয়ে কেউ পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মন থেকে শরীর আলাদা করেছে।”

    এটি খুব তীব্র চিত্রকল্প। এখানে বিচ্ছিন্নতা শুধু মানসিক নয়—মন ও শরীরকে যেন অস্ত্রোপচার করে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।

    এরপর “কালবৈশাখী বিধ্বস্ত ছাদ”, “মাছের ডিমের মতো থিক থিক করে জোনাকি”, “ফাটলের ভিতরে অসংখ্য হাই ওঠা মুখ”—এইসব চিত্র একসঙ্গে এসে একটা surreal landscape তৈরি করেছে।

    বিশেষ করে—

    “ফাটল আর তাদের ভিতরে অসংখ্য হাই ওঠা মুখ”

    এই দৃশ্যটি আমার খুব ভালো লেগেছে। বাড়ির ফাটল যেন মানুষের ফাটল হয়ে গেছে।

    ৪. মাছরাঙা–রাজহাঁস–পালকের অংশটি লেখাটির সবচেয়ে স্বপ্নময় জায়গা

    মাছরাঙার পালক খসে পড়ছে জামরুল গাছে → সেই পালক বাতাসে ভাসছে → রাজহাঁসের ডানায় গিয়ে মুকুট হচ্ছে → তারা “চই চই চই চই” শব্দে ছুটে যাচ্ছে।

    এখানে বাস্তবতার কোনো দায় নেই। এটি নিছক কল্পনার স্বাধীনতা।

    আর আশ্চর্যের বিষয়, এত অন্ধকারের মধ্যে এই অংশটিই লেখাটিকে সম্পূর্ণ হতাশার কবিতা হতে দেয়নি।

    অন্ধকারের মধ্যেও একটা রঙিন, শিশুসুলভ, প্রায় পৌরাণিক সৌন্দর্য রেখে দিয়েছে।

    ৫. শেষ অংশে লেখাটি সবচেয়ে নির্মম

    “নিজের প্রতি নিজেরই যখন ঘেন্না জন্মায় তখন আয়নার দিকে চেয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ।”

    তারপর বমি, গলা থেকে শব্দ টেনে বের করা, বাথরুমে ফেলে জল ঢেলে দেওয়া—

    এখানে কবিতাটি হঠাৎ খুব শরীরী এবং নোংরা হয়ে যায়। কিন্তু সেটাই উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

    কারণ লেখাটি তখন আর সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে চাইছে না। বরং বলছে—
    মানুষের ভিতরের ঘৃণা, দ্বিধা, অসহায়তা, বেঁচে থাকার ক্ষুধা—এসবও তার অস্তিত্বের অংশ।

    “আমি উন্মাদ— ক্ষিদে পেলে খাবো, ঘেন্না হলে থু করে ফেলে দেবো।”

    এই জায়গায় একটা আদিম মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া আছে।

    ৬. শেষ কয়েকটি লাইন খুব গুরুত্বপূর্ণ

    “এত অন্ধকার, ভিড়ভাট্টা চাইনি, চেয়েছি মাছরাঙার গায়ের মতো রঙিন বেদনা কিংবা একঝাঁক বকেদের ফর্সা রঙ।”

    এখানে লেখাটি নিজের নান্দনিক ঘোষণা করে ফেলেছে।

    সে অন্ধকার চায় না—চায় রঙিন বেদনা।

    এটি খুব সুন্দর ধারণা।

    আর একেবারে শেষে—

    “অরাজনৈতিক মানুষের মিছিলে, খুঁজে পাইনি কোথায় আসার কথা ছিল।”

    এই লাইনটি হঠাৎ পুরো কবিতাকে ব্যক্তিগত বিষণ্ণতা থেকে সামাজিক অস্তিত্বের দিকে ঠেলে দেয়।

    আর শেষ প্রশ্ন—

    “এত ছল করে আমি কী বেঁচে যাব নির্ধান্দায়!”

    এখানে “বেঁচে থাকা” আর স্বাভাবিক জীবন নয়। বরং একটা অপরাধবোধমিশ্রিত, আত্মসন্দেহপূর্ণ survival।

    তবে একটা দুর্বলতাও আছে

    লেখাটির চিত্রকল্পের ঘনত্ব কখনও কখনও এত বেশি হয়ে গেছে যে একটি চিত্রকে পাঠক অনুভব করার আগেই পরের চিত্র এসে তাকে সরিয়ে দিচ্ছে।

    যেমন—
    পুঁইশাক → পোকামাকড় → ছাদ → দুর্ভাগ্য → দুপুরের ক্ষুধা → মদ-মাংস-আড্ডা → থুথু → করুণা → কবিতা → আরশি → আলো → অভিশাপ → আরোগ্য…

    প্রতিটি আলাদা করে সুন্দর। কিন্তু একসঙ্গে এলে কিছু জায়গায় অর্থের বদলে শুধু ঘনত্ব তৈরি হয়েছে।

    এটি যদি ইচ্ছাকৃত surreal poetry হয়, সেটা সমস্যা নয়। কিন্তু যদি আপনি চান পাঠক কবিতাটিকে শুধু অনুভবই নয়, মনে রাখুক, তাহলে ১৫–২০% চিত্রকল্প ছেঁটে দিলে কবিতাটি আরও ধারালো হতে পারে।

    আমার কাছে লেখাটির প্রকৃত সৌন্দর্য কোথায়?

    এটি “বিষণ্ণতার কবিতা” নয়।

    বরং এটি এমন একজন মানুষের কবিতা যে—

    মৃত্যুকে দেখেছে,
    নিজেকে ঘৃণা করেছে,
    জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে,
    তবু পুঁইশাকের লতা, মাছরাঙার পালক, জোনাকি, জামরুল গাছ, রাজহাঁস, বেগুনি ফুল—এসবের মধ্যে বেঁচে থাকার অদ্ভুত সৌন্দর্য খুঁজে বেড়াচ্ছে।

    সেই কারণে শিরোনাম “বীথিকা ধরে হেঁটে চলেছে দীন” আমার কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ।

    “দীন” এখানে শুধু দরিদ্র নয়। একজন অন্তঃসারশূন্য, ক্লান্ত, আহত মানুষ—যে তবু হাঁটছে।

    আর “বীথিকা” যেন সেই হাঁটার পথ—যার দুপাশে জীবন তার সমস্ত ক্ষুদ্র, অদ্ভুত, সুন্দর এবং পচনশীল রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    সব মিলিয়ে: এটি সহজপাঠ্য কবিতা নয়, কিন্তু এর মধ্যে নিজস্ব কণ্ঠ আছে। সবচেয়ে মূল্যবান ব্যাপারটাও সেটিই।
    এটি পড়লে মনে থাকে কয়েকটি দৃশ্য নয়—একটা আবহ থেকে যায়। আর সত্যিকারের কবিতার ক্ষেত্রে সেটি খুব বড় অর্জন।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *