মুক্ত গদ্যঃ অনিন্দিতা মণ্ডল
মুক্ত গদ্যঃ অনিন্দিতা মণ্ডল
জন্ম ও বেড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাঞ্চনপুর গ্রামের প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে। তাঁর মনন ও সংবেদনশীলতা পরবর্তীকালে সাহিত্যচর্চার উর্বর ভূমি হয়ে উঠেছে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৪ সালে ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। লেখালেখি তাঁর আত্মপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। পাশাপাশি বইপাঠ ও আলোকচিত্রচর্চা তাঁর সৃজনশীল মননের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। পাখির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং বাগানপ্রেম তাঁর প্রকৃতিনির্ভর জীবনবোধকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বীথিকা ধরে হেঁটে চলেছে দীন
প্রখর রোদে একা একা পড়ে থাকে উঠোন কখনও দুটো কুকুরের আনাগোনা কিংবা কাঠবেড়ালির নাচন। অবশ্য বেজী এসে টহল দিয়ে যায় বার কয়েক। বাসি কাপড়ের জল টুপ টুপ করে পড়ে শুকনো উড়ে আসা ফুল পাতার উপর। বাগানবাড়ি পেরিয়ে ঠিক সিঁড়ি ঘরের কাঁধ বরাবর কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে পুঁই শাকের বীজ। লতিয়ে যেতে যেতে তাদের মেরুদন্ড শক্ত হয়েছে খুঁজে পেয়েছে বিদ্যুৎ খুঁটি কিংবা উই ধরা বাঁশের বাতা। তাদের বেগুনী রঙ ছড়িয়ে ফেটে পড়েছে অন্য কোথাও। মোজাইক করা দেওয়ালের গায়ে অসংখ্য পোকামাকড়ের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়েছে খোলা আকাশের নিচে শীতকাতুরে ছাদে। ভুলবশত দুর্ভাগ্য এসে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে, আসন পেতে বসতে চেয়েছে দুপুরের ক্ষিদের পাশে। মায়ার শরীরে তাকে এনে বসিয়েছি অস্ফুটে, তুলে দিয়েছি বৈকালিক মদ মাংস আড্ডা। থুথু জমতে জমতে জিভের এক পাশে জমা হয়েছে করুণা ও কবিতা। ঘুরে ফিরে আরশির উপর এসে পড়ছে আলোর প্রবাহ। নিজের সাথে প্রতিবিম্বের দূরত্ব অতি সামান্য যতটা সামান্য হয়ে পড়েছে বেঁচে থাকা। এই আলো ও অভিশাপ থেকে গজিয়ে উঠছে বৃথা আরোগ্য। এইবেলা পেরিয়ে ওইবেলা এলে মনে হয়— কত সহজে পেরিয়ে গেল বিপদসীমা!
শব্দের ঘনত্ব কমে গেলে অসহায়ত্ব জাঁকিয়ে বসে বুকের উপর। অযথা পাখির ডানা ঝাপটানো মনে করিয়ে দেয় জীবন উপস্থিতি। করাত দিয়ে কেউ পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মন থেকে শরীর আলাদা করেছে। সেই দাগ নিয়ে একা বসে থাকি কালবৈশাখী বিধ্বস্ত ছাদে। মাছের ডিমের মতো থিক থিক করে জোনাকি পোকা। চতুর্ভুজাকার ছাদ- এর পরিসীমা মাপতে গিয়ে ধরা পড়েছে অসংখ্য ফাটল আর তাদের ভিতরে অসংখ্য হাই ওঠা মুখ। অনন্তকাল ধরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তাদের চোখের তলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ধ্রুপদী রহস্য। সেই রহস্য খুঁজতে খুঁজতে মাছরাঙা পাখির পালক খসে পড়েছে জামরুল গাছের ডালে। শান্ত শীতল হাওয়ায় ফুরফুর করে সেই পালক কোথায় যেন যেতে চাইছে কোন গৃহিণীর আহ্লাদে। ঘর ফিরতি রাজহাঁসের ভেজা ডানায় সেই রঙিন মুকুট জুড়ে যায়। আহ্লাদে আটখানা হয়ে তারা ছুটে যায় চই চই চই চই শব্দে, আছড়ে পড়ে ঝিকিমিকি চাঁদের আলোয়। রাতের আঘাত ক্রমশ শোকস্রোতে বয়ে যায় কানের পাশ দিয়ে। কৃপণ হতে হতে বৃহৎ মন থেকে পাঁজরগুলো থর থর করে কাঁপুনি দিয়ে ঝরে পড়ে। তাদের কি উদ্দেশ্য কে জানে তবু হাপুর নয়নে দুই হাতে জড়িয়ে রেখেছি তাদের কতবার, কতবার শুনিয়েছি বেগনি ফুলের মধু লোকানোর মন্ত্র।
জীবন কত কিছু শিখিয়ে নেয় আমাদের থেকে। নিজের প্রতি নিজেরই যখন ঘেন্না জন্মায় তখন আয়নার দিকে চেয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ। তারপর উগরে দিতে হয় সমস্ত হজম না হওয়া খাবার ও দোটানা শব্দদের। দলা পাকিয়ে থাকা অবস্থায় যারা গলার ভিতরে অযথা ভিড় জমায় তাদের আঙুল দিয়ে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনতে হয়। বাথরুমের এক কোণে উগরে দিয়ে জল ঢেলে দিতে হয় আনন্দে। তাদের একসাথে একে অপরের পিছনে ভেসে যাওয়া দেখে মনে পড়ে আমি উন্মাদ— ক্ষিদে পেলে খাবো, ঘেন্না হলে থু করে ফেলে দেবো। এইসব অনঘ দৃশ্যের উপর চ্যাটা মেলে বসি। মৃত্যু এগিয়ে আসে। মৃত্যু যত এগিয়ে আসে তত তাকে বড় আশ্চর্য মনে হয়। কটাক্ষ দৃষ্টিতে যারা মেপে নেয় শরীরের ওজন তারা এসে বিনা ব্যথায় ব্যথিত হবে আমার মৃত্যুতে! এত অন্ধকার, ভিড়ভাট্টা চাইনি, চেয়েছি মাছরাঙার গায়ের মতো রঙিন বেদনা কিংবা একঝাঁক বকেদের ফর্সা রঙ। একবার শরীরের উপত্যকা বরাবর আছড়ে পড়ুক, আমার পাশে শুয়ে থাকা চিন্তাগ্রস্ত ভালোবাসা অবধি গড়িয়ে যাক এইটুকু রঙ। অথচ খুবানির মিষ্টি গন্ধ মাখা রাত্রি বুকে নিয়ে হাই তুলতে তুলতে হেঁটে গেছি অরাজনৈতিক মানুষের মিছিলে, খুঁজে পাইনি কোথায় আসার কথা ছিল। এত ছল করে আমি কী বেঁচে যাব নির্ধান্দায়!