Email: info@kokshopoth.com
July 25, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ

Jul 24, 2026

ধারাবাহিক
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ পর্ব# ১৮

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

 

কী করিয়া খাবার বাছিতে হয়?

কী খাব ঠিক করা কিন্তু খুব সহজ ব্যাপার নয়, বিশেষ করে যখন অনেক অপশনের মধ্যে বাছতে হয়। এ ব্যাপারে খুব কম বয়সেই শিক্ষা হয়ে গেছিল। সে সময় বাবা প্রায়ই বাইরে টুরে থাকতেন। একটা সময় তো মুজফরপুরে বদলিই হয়ে গেছিলেন। মা আমাদের দুই ভাই বোনকে নিয়ে থাকতেন। ফলত উনিই হয়ে উঠেছিলেন আমাদের ভারত ও ভাগ্যবিধাতা। উনি যে মোটেই একনায়িকা নন, সেটা দেখাবার জন্যে  রোজ সকালে উঠে কী রান্না করবেন সে বিষয়ে আমাদের মতামত নিয়ে একটা ভোটাভুটি করতেন। কোন কথা হবে না বস। একেবারে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। আমরা প্রথম প্রথম খুব উৎসাহিত হয়ে উঠতাম। এই যে সকালে কী নাস্তা খাব, দুপুরেই বা ভাতের সঙ্গে কী খাব, রাতে রুটির সঙ্গে কী থাকবে- এইসবে যে আমাদের মহত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ  থাকবে- এ কি কম কথা? ততদিনে তো জেনে গেছি প্রতিযোগিতায় জয় নয়, অংশগ্রহণই বড় কথা! ভোটাভুটিতে কোনভাবে আমাদের অংশগ্রহণ করাতে পারলেই যে ভদ্রমহিলার অর্ধেক কাজ সারা হয়ে গেল তা তো তখন বুঝিনি। বুঝলে কোন শালা…।

 

সকালের প্রথম অধিবেশন সাধারণত শুরু হত ডাল বিষয়ক প্রশ্ন মালা দিয়ে। চা পান করতে করতে উনি স্মিত্মুখে জিজ্ঞেস করতেন’আজ কী ডাল খাবি?’

এই প্রশ্নে আমি বিশেষ সম্মানিত বোধ করি। সোৎসাহে বলি ‘ মা আজ মুসুর ডাল খাব’

‘মুসুর ডাল! এত চয়েস কীসের? যা পাবি তাই খাবি। নাকে গন্ধ আসছে না বুঝি? মুগ ডাল শুখনো খোলায় ভাজছি তখন থেকে!’

আমি বাক্যিহারা। যাচ্চলে! মুগ ডাল করবে যদি ঠিক করেই রেখেছ, তবে ঘটা করে জিগ্যেস করাই বা কেন? কেন এই গণতন্ত্রের ভান? ক্রমে বুঝি যখন খাবার বাছাইয়ের সুযোগ থাকে, তা প্রকৃত প্রস্তাবে ফাঁদ ছাড়া কিছু নয়। এ হচ্ছে এমন একটা টস, যেখানে মুদ্রার দু দিকেই হার লেখা থাকে। অর্থাৎ যাই পড়ুক তুমি হারছই। পুরো হেড ইউ উইন টেল আই লুজ-কেস।

এক বালকের কথা জানি, সে একদিন বিকেলে স্কুল থেকে এসেছে, তার মাও তাঁর স্কুল থেকে পড়িয়ে ফিরেছেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে ম্যাগি খাবে না পরোটা? সে ধাঁ করে বলেছে ম্যাগি। পাশে বসে যখন তার মা পরোটা খাচ্ছে সাদা আলুর তরকারি আর অমলেট দিয়ে (বোধ করি একটা নলেন গুড়ের সন্দেশও ছিল সঙ্গে), তখন তার মনস্তাপ দেখার মতো। ম্যাগি তার এত প্রিয় কিন্তু সেদিন  সেই ম্যাগিই তার কাছে বিষবত। সে ভাবছে মার মতো পরোটা বললে কী ভালোই না হত! ম্যাগি খেয়ে কী ঠকানই না সে ঠকে গেছে!

এরকম ঠকা তো আমরা নিত্যি ঠকছি। বাইরে গেলে হটেলে সকালে যে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দ্যায়, তাতে সাধারণত তিনটে অপশন থাকে। পুরি সবজি, ব্রেড অমলেট কিংবা ব্রেড বাটার বা জ্যাম, ও কলা।  যদি দুজন থাকে তবে দুজন দুটো আলাদা জিনিস নিয়ে ভাগাভাগি করে দুটো জিনিসেরই স্বাদ নিতে পারে। কিন্তু একা বোকার বড় বিপদ। সে বেচারা চায় একটু পুরি একটু ব্রেড অমলেট আর একটু বাটার টোস্ট মিশিয়ে খেতে। কিন্তু তা হবার জো নেই যদি না বুফে থাকে। বুফে হলে তো আবার কাঙ্গালের শাকের ক্ষেত দেখার মতো অবস্থা। চায়ের সঙ্গে ফ্রুট জুস, কফির সঙ্গে ইডলি,  সঙ্গে পাস্তা আর পুরী সবজি, সসেজের সঙ্গে উপমা আর দুধ চকোস মিশিয়ে যে জিনিসটা বাঙালি খেয়ে নেয়, তাতে মেরে ভারত এমনকি মহাবিশ্ব মহান হয় ঠিকই, তবে তা পেটে গিয়ে মোটেই মিলে সুর মেরা তুমহারা গেয়ে ওঠে না, বরং গেয়ে ওঠে অন্ধকারে বন্ধ ঘরে থাকব না!

 

বড় হয়ে দেখলাম, শুধু মায়ের রাজত্বে নয়, নামী দামী রেস্তোরাঁয় খাবার বাছা কম কঠিন নয়।  সেখানে  আমাদের মতো ক্যাংলাস পার্টি গিয়ে মেনুকার্ডের ডানদিকই দেখে যায় একমনে, বাঁদিকে খাবারের নাম দেখার প্রয়োজনই মনে করে না। ডানদিক দেখে দেখে খুঁজে যায় সবচেয়ে শস্তা কী  আছে। হয়তো সে পদটি শুখনো হাতরুটি, কিংবা এক টুকরো রঙ্গিন পাঁপড় , যাকে নাচোস বলে চালানো হচ্ছে। আমি কিছুতেই বুঝিনা কবে থেকে বাংলা ক্রিয়ার সঙ্গে এস যোগ হতে লেগেছে! এর মানে কি সবাই মিলে নাচ?

একবার একজন নতুন বই নিয়ে কথা বলবেন বলে একটা কাফেতে ডেকে কফি অর্ডার দিয়েছেন, সঙ্গে অনেক খুঁজে পেতে সবচে শস্তা পদ ঐ নাচোস। পাঁপড়ভাজা টুকরো টুকরো করে কেটে রং মাখানো হলে যে কেস দাঁড়ায়, অবিকল তাই। তার ওপর একটা গুমো গন্ধ, যেন অনেকমাস পর কৌটো থেকে প্রাণে ধরে বার করা হয়েছে। জানিনা হাই ফাই খাবারের হয়তো এমনই গন্ধ হয়, তবে দেখলাম যিনি এটি অর্ডার দিয়েছেন তিনিও চার টুকরোর বেশি খেতে পারলেন না। আমি উঠে আসার সময় প্লেট ভর্তি অস্পৃষ্ট নাচোসের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম আঁচলে বেঁধে আনলে হত, তাহলে অন্তত আর কাউকে ওগুলো রিসাইকেল করে দিতে পারত না।

  মেনু নির্বাচনে ভাষাও একটা বাধা হতে পারে। সেই যে গল্প আছে চাইনিজ রেস্তোরাঁয় খেতে ঢুকে চাইনিজ ভাষায় লেখা মেনুকার্ডে অনেক খুঁজেপেতে একজন যে আইটেমটি সিলেক্ট করেছে, দেখা গেল সেটি হচ্ছে ‘থ্যাংক ইউ’। বিদেশি রেস্তোরাঁয় এটি এক বড় সমস্যা বটে।   একবার তারাপদ রায়  এক এমন জায়গায় খেতে গিয়ে দেখছেন পাশের টেবিলে দুই মেমসাহেব খাচ্ছেন ভাত ডাল  আলুভাজা আর বেগুন সেদ্ধ। আর তিনি মনের দুঃখে খাচ্ছেন আধসেদ্ধ শামুক, গুড়মাখা পেঁয়াজ কলি (ফ্রেশ অনিয়ন লিভস ইন মেপল সিরাপ!)  এইসব, কারণ ডাল  আলুভাজা আর বেগুন সেদ্ধর ইংরেজি নাম তিনি জানেন না। ছোটবেলায় ইস্কুলে যা শিখেছিলেন, দেখা গেল সবই ভুল। ডাল খেতে চাইলে পালস অর্ডার দিলে চলবে না, বলতে হবে লেন্টিল সুপ, আলু ভাজা চাইলে পটাটো চিপস নয়, বলতে হবে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। বেগুনের ইংরেজি আমরা যা জানি বিঞ্জাল নয়, এগপ্ল্যান্ট। বেগুন সেদ্ধ চাইলে বলতে হবে বয়েল্ড এগপ্ল্যান্ট !

সেখানে তারাপদ রায় চেয়েছিলেন ‘গিভ মি বয়েল্ড বিঞ্জাল, পালস অ্যান্ড পটাটো চিপস’ এই শুনে মেমসাহেব মুখের দিকে খানিকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে যা এনে দিল তা হচ্ছে ঝিঙ্গের মতো তরকারি ছেটানো একটা আমিষ পদ, সেই আমিষটা শুয়োরের মেটে হতে পারে, আবার হাঙরের লেজও হতে পারে!

 

শিব্রামের দারুণ সব গল্প আছে খাওয়াদাওয়া নিয়ে। পয়সা না থাকায় দেয়ালে লেখা আর সেটা ঢাকা দিতে শার্ট কেড়ে তার ওপর টাঙ্গিয়ে রেখে দেওয়া এসব তো আমরা শিব্রামের লেখাতেই পেয়েছি। একবার স্কুলের বন্ধুরা মিলে নিকো পার্কে গেছি। তখন মফস্বলের গণ্ডি ছাড়িয়ে সবাই কলকাতার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, তাই সেই আদি যুগের নিকো পার্কে গিয়ে আমাদের সাবালকত্ব প্রমাণের চেষ্টা। হাতে পয়সা কারওরই তেমন নেই। দু চারটে রাইড চড়ে বেজায় খিদে পেয়েছে। ফুড কোর্টে গিয়ে আট জন অনেক মাথা ঘামিয়ে অর্ডার দেওয়া হল রুটি আর তন্দুরি চিকেন।  দুটোই খটখটে শুখনো, সেটা আমরা আন্দাজই করিনি। রুটি আর চিকেন এত শক্ত যে টানা প্র্যাক্টিস করলে টাগ অব ওয়ারে প্রাইজ বাঁধা।

‘জল দিয়ে ভিজিয়ে খাব?’ এমন প্রস্তাব দিতে বন্ধুরা কটমট করে তাকাল। এমনিতেই প্রত্যেকে প্রত্যেকের ওপর এই মেনু বাছাইয়ের দায় চাপানোর চেষ্টা করে মাথা গরম করেই ছিল। শেষ অব্দি একটা মিক্সড ভেজ কিনতে হল, যা দিয়ে রুটি গেলা হল কোনরকমে। সে মিক্সড ভেজের বাটির সাইজ দেখলে বাগবাজার সার্বজনীনের কাঙ্গালিভোজনের খিচুড়ির শালপাতার বাটিও লজ্জা পাবে। তাই দিয়ে আটটি আঠের বছরের খাইয়ে মেয়ে কী ভাবে রুটি খেয়েছিল- সেটা বুঝতে পারলে   অংকে কেউ ফেল করবে না গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়।

সেই তন্দুরিকাণ্ডের পরে তিন দশক পার করে পৃথিবীতে আরও নতুন নতুন খাবার এসে গেছে, তাই অপশনও অধিক এবং সমস্যা অধিকতর। সেদিন উদুপীতে গিয়ে একইরকম জব্দ হলাম। সবাই মশলা দোসা নিল, আমি খুব কায়দা করে বাছলাম নির দোসা। সে যখন টেবিলে ল্যান্ড করল, দেখলাম সে একটা নরম চালের রুটি বিশেষ।  সবার পাতে ক্রিস্পি দোসা আর আমি মনের দুঃখে খাচ্ছি নেতপেতে চালের রুটি, তার সঙ্গে আবার নারকেল নারু চটকানো, ভাবা যায়! ডান দিক বাঁদিক থেকে  দোসার মুচমুচে আওয়াজ হচ্ছে। তখন আমার প্লেটে সাইলেন্সার লাগানো!

উদুপীর অসাধারণ সৈকত, সেন্ট মেরি দ্বীপের অনাঘ্রাত  সৌন্দর্য- সারাজীবনের মতো কলঙ্কিত হয়ে গেল। যখনি তাদের কথা ভাবি, নির দোসা খাবার শোকই উথলে ওঠে।

আর কপাল খারাপ হলে ভাল খাবার যেচে এসেও জোটে না। একবার রোইং ক্লাবে এক অনুবাদক দিদি ডেকেছেন আমার একটি উপন্যাস অনুবাদ বিষয়ে কথা বলতে। চা এসেছে, সঙ্গে আমার জন্য আমার বিশেষ পছন্দের ওয়ালনাট কেক । এক টুকরো কামড় দেবার পরেই আমাদের সেলফি তোলার বাসনা চাগিয়ে উঠল। লেকের জলে তখন সূর্য ডুববে ডুববে করছে। সেলফি পর্ব শেষ করে ফিরে দেখি আমার প্লেটেও সূর্যাস্ত হয়ে গেছে! একটু দূরে একটা বেড়াল জমিয়ে বসে খাচ্ছে আমার সাধের সেই ওয়ালনাট কেক! এ অন্যায় অবিচার নয়, বলুন?

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *