অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ৯- তিস্তা
ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ৯- তিস্তা
তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।
ইন্টারভিউ
অফিসে বেরোনোর সময়ই বুঝেছিলাম, আজ দু-এক মিনিট দেরি হয়ে গেছে। ট্রাম ডিপোর কাছে পৌঁছতেই আমার বাসটা বেরিয়ে গেল। দৌড়োইনি। বাসটা তখন অনেকটাই এগিয়ে গেছে। আমি ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম।
কিছু কিছু মুখ দেখলেই বোঝা যায়, আজ তাদের জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন।
টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোতে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করতে করতে আজ হঠাৎ সেই কথাটাই মনে হল। সকালের ভিড় তখন ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে। প্রত্যেকেই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে, কিন্তু সবার যাওয়ার কারণ এক নয়। কেউ খুব তাড়াহুড়ো করছে। কেউ ফোনে শেষ মুহূর্তের নির্দেশ নিচ্ছে। কেউ আবার এমনভাবে ঘড়ি দেখছে, যেন সময়টা তার কথা শুনবে।
আমি প্রতিদিনের মতো সেক্টর ফাইভের বাসে উঠলাম। ভাগ্য ভালো, জানলার ধারে একটা সিট পেয়ে গেলাম। বাস তখনও ছাড়েনি। একে একে যাত্রীরা উঠছে। কন্ডাক্টর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একের পর এক গন্তব্যের নাম ডেকে চলেছে। ঠিক বাস ছাড়ার আগে একটা ছেলে উঠে এসে আমার পাশে বসল। বয়স পঁচিশের বেশি নয়।
সাদা-নীল চেক শার্ট। একেবারে পালিশ করা জুতো। কোলে একটা আকাশি নীল ফাইল। বসেই প্রথমে ফাইলটা খুব সাবধানে হাঁটুর ওপর রাখল। যেন ভেতরে কাগজ নয়, অন্য কিছু আছে। তারপর চেন খুলে একবার ভেতরের কাগজগুলো দেখে নিল। সব ঠিকঠাক আছে বুঝে চেন টেনে বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণ পর আবার খুলল। সার্টিফিকেটগুলো ঠিক আগের জায়গাতেই ছিল। তবু যেন দেখে নেওয়াটা দরকার। আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। বাস তখন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
রাস্তার ধারের দোকানগুলো খুলছে। স্কুলবাসে বাচ্চারা উঠছে। ফুটপাতে চায়ের ভাঁড় থেকে ধোঁয়া উঠছে। শহরের প্রতিটা সকালই যেন একই রকম। অথচ সেই একই সকালের ভেতরেই কারও চাকরির প্রথম দিন, কারও শেষ কর্মদিবস, কারও অস্ত্রোপচার, কারও বিয়ে। একটা সকাল কখন কার কাছে কতটা আলাদা, বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
ছেলেটার ফোন বেজে উঠল। ওপাশে সম্ভবত বাড়ির কেউ। সে শুধু বলল,
“হ্যাঁ…”
“হ্যাঁ, বেরিয়ে গেছি।”
‘না, সব কাগজ নিয়েছি।”
“হ্যাঁ, খেয়ে এসেছি।”
তারপর মুখে একটা হাসি নিয়ে বলল,
“এত চিন্তা কোরো না।”
ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও কয়েক সেকেন্ড মোবাইলটার দিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে করে পকেটে
রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যে হাসিটা একটু আগে গলায় ছিল, সেটা আর মুখে রইল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ
বসে থেকে হঠাৎ আমার গলায় ঝোলানো অফিসের পরিচয়পত্রটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি সেক্টর ফাইভেই কাজ করেন?”
বললাম, “হ্যাঁ।”
আমার গলায় ঝোলানো পরিচয়পত্রটার দিকে সে আর-একবার তাকাল। যেন এতক্ষণে নিশ্চিত হল, ঠিক মানুষকেই প্রশ্নটা করেছে। ছেলেটার চোখদুটো একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“আজ আমার একটা ইন্টারভিউ আছে।”
আমি মাথা নাড়লাম।
“প্রথম?”
“হ্যাঁ।”
কথাটা বলেই একটু হেসে ফেলল। সেই হাসির মধ্যে আনন্দের চেয়ে ভয়ই বেশি ছিল। মনে হল, অনেকক্ষণ ধরেই কাউকে কথাটা বলতে চাইছিল। শুধু একজন শ্রোতা দরকার ছিল। তারপর আবার দুজনেই চুপ।
বাস চলছে। ছেলেটা আবার ফাইল খুলল। একটা একটা করে সার্টিফিকেট দেখল। তারপর বায়োডাটা। তারপর কল-লেটার। আবার সব গুছিয়ে রাখল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, কাগজগুলো ঠিক আছে কিনা সেটা সে দেখছে না। সে আসলে নিজের নার্ভাসনেসটাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। আমার নিজের কথা মনে পড়ল। একসময় আমিও এমনই ছিলাম। ইন্টারভিউয়ের আগে মনে হত, যদি একটা সার্টিফিকেট ভুলে যাই! যদি নিজের নামটাই ভুলে যাই! যদি সবচেয়ে সহজ প্রশ্নটারও উত্তর দিতে না পারি! অদ্ভুত ব্যাপার, চাকরি পাওয়ার পর এসব ভয় ধীরে ধীরে মন থেকেও হারিয়ে যায়।
হঠাৎ ছেলেটা বলল,
“দাদা…”
আমি তাকালাম।
“আপনার প্রথম ইন্টারভিউয়ের দিন খুব টেনশন হয়েছিল?”
আমিও একটু হেসে বললাম,
“খুব।”
“কী হয়েছিল?”
“ঘরে ঢোকার আগে বারবার মনে হচ্ছিল, যা পড়েছি সব ভুলে গেছি।”
ছেলেটা অধীর আগ্রহে চুপ করে শুনছে।
বললাম,
“ইন্টারভিউ শেষ করে বেরিয়ে মনে হয়েছিল, একটাও উত্তর ঠিকমতো দিতে পারিনি।”
“তারপর?”
“ওই চাকরিটা পাইনি। তারপর আবার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।”
সে একটু থমকে গেল। আমি আবার হেসে বললাম,
“সেটাও হয়নি। তারপর আবার। একসময় বুঝেছিলাম, ইন্টারভিউ শুধু একটা দরজা। সব দরজাই যে
খুলবে, এমন নয়। তবে নক করেই যেতে হবে। একদিন না একদিন কোনো একটা দরজা খুলবেই।”
ছেলেটা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে মাথা নাড়ল।
বাস তখন বাইপাসে উঠেছে। গতি একটু বেড়েছে। জানলার বাইরে একের পর এক গাড়ি, উড়ালপুলের থাম, বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। বাসের ভেতরেও কথাবার্তা প্রায় থেমে এসেছে। কেউ মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখেছে, কেউ জানলার বাইরে। ছেলেটা ফাইলটা শক্ত করে দুই হাতের মাঝে চেপে ধরে বসে আছে। মনে হল, আর কাগজগুলো খুলে দেখার দরকার নেই। এখন শুধু অপেক্ষা।
কিছুক্ষণ পরে খুব আস্তে বলল,
“দাদা…”
“হুম?”
সে একবার আমার দিকে তাকাল, আবার চোখ নামিয়ে নিল।
“আপনার কী মনে হয়… হবে?”
আমি উত্তর দিলাম না। জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলাম। বাস তখন বাইপাস পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে। রাস্তার সব দৃশ্যগুলো একের পর এক পিছিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, সময়ও বোধহয় ঠিক এভাবেই পিছিয়ে যেতে জানে। হঠাৎ কত বছর আগের একটা সকাল মনে পড়ে গেল।
আমিও একদিন ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলাম। একজন স্যারকে। একজন বন্ধুকে। বাবাকে। প্রত্যেকেই বলেছিল,
“হবে।”
আজ ভাবি, তারা কি সত্যিই জানত? নাকি শুধু আমার ভয়টা একটু কমাতে চেয়েছিল? আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম। সে উত্তর শোনার জন্য স্থির হয়ে বসে আছে। তার চোখে এমন এক ধরনের অপেক্ষা, যেন আমার একটা কথাতেই আজকের দিনটা বদলে যেতে পারে।
আমি বললাম,
“জানি না।”
সে একটু থমকে গেল।
আমি বললাম,
“সত্যিই জানি না। যারা ইন্টারভিউ নেবে, তারাও হয়তো এখনো জানে না কাকে নেবে। তুমি কেমন করবে, সেটাও আমি জানি না। এই প্রশ্নটার উত্তর এখন পৃথিবীর কারও কাছে নেই।”
ছেলেটা চুপ করে শুনছিল। তার হাত দুটো তখনও ফাইলটার ওপর রাখা। আঙুলগুলো একবার শক্ত হয়ে উঠছে, আবার আলগা হয়ে যাচ্ছে।
আমি একটু থেমে বললাম,
“তবে একটা কথা বলতে পারি।”
সে আমার দিকে তাকাল।
“আজ যা-ই হোক, সেটা তোমার পুরো জীবন নয়। আজ যদি না-ও হয়, তার মানে এই নয় যে তুমি অযোগ্য। আবার আজ হয়ে গেলেও সব সমস্যা শেষ হয়ে যাবে, এমনও নয়।”
আমি আবার বললাম,
“আজ তোমার কাজ শুধু যতটা পারো নিজের মতো করে ইন্টারভিউটা দেওয়া। বাকিটা তোমার হাতে নেই।”
ছেলেটা কিছু বলল না। আস্তে করে মাথা নাড়ল।
সেক্টর ফাইভ এসে গেছে। বাসের গতি কমে এল। একে একে সবাই উঠে দাঁড়াতে শুরু করল। আমরাও উঠে দাঁড়ালাম। এতক্ষণ পাশাপাশি বসে থাকা দুজন মানুষ এবার দুদিকে নামার জন্য তৈরি হলাম। নামার আগে সে একটু ইতস্তত করে বলল,
“ধন্যবাদ, দাদা।”
আমি হেসে বললাম,
“অল দ্য বেস্ট।”
বাস থেকে নেমেই ছেলেটা দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। হাঁটার মধ্যে তাড়া আছে, কিন্তু আগের মতো যেন অস্থিরতা নেই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে ভিড়ের অংশ হয়ে গেল।
আমি অফিসের দিকে পা বাড়ালাম। হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, কিছু প্রশ্নের উত্তর আগে থেকে জানা যায় না। হয়তো সেই জন্যই তাদের নাম— ভবিষ্যৎ।