তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা
ধারাবাহিক
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ পর্ব# ১৭
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
আমার রথ যাত্রা
রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধূমধাম- এই কবিতাটার ভিজুয়ালের সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা। বাড়ির ঠিকানাই তো রথতলা, রাসমাঠ। তিনশ বছরের প্রাচীন একটি রথ, রংচটা, একটা চাকা ভাঙ্গা, তাই সারাবছর রথটা ত্রিভংগ মুরারীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। মোটা লোহার শিকল ময়াল সাপের মতো রথের পায়ের কাছে গুটোনো বছরভর। সারাবছর এই রথ ছোটদের জয় রাইড। সেই মফস্বল তো তখনও চিল্ড্রেন্স পার্ক দেখেনি, সি-স, নাগরদোলা- এসব আমাদের স্বপ্নের জিনিস। তাই রথের মধ্যে আমরা কেবল ঢুকি আর বেরোই, লুকোচুরি খেলি। সন্ধের সময় এই রথটাই হয়ে যায় লাভারস ডেন। রথের মধ্যেটা প্রেম করার পক্ষে দারুণ, যদি না সাপ বা বিছের ভয় থাকে। মধুবালা তো কবেই বলে গেছেন ‘পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া’ তাই অকুতোভয় (যারা কুত্তাকেও ভয় পায় না!) প্রেমিক যুগল সন্ধের অন্ধকারে রথের মধ্যে সেঁদিয়ে যায়, আর আমরা পরদিন বিকেলে খেলতে খেলতে সেখানে ঢুকে পড়ে আবিষ্কার করি নিরোধের প্যাকেট। সেটা অবশ্য আমাদের ওপর কোন প্রভাবই ফেলে না, কারণ ক্লাস টেনেও উঠেও আমরা পরস্পরকে বিন্দাস জিগ্যেস করতে পারি ‘পাশাপাশি শুলেই কি বাচ্চা হয়?’
এই রথের উল্টোদিকেই নেড়ানেড়ির বাড়ি। আমরা রথের দোতলায় উঠে রেলিং ধরে ধরে ঘুরি আর বলি ‘চুলটানা বিবিয়ানা/ সাহেবমেমের বৈঠকখানা/আজ বলেছে যেতে/ পান সুপারি খেতে’ সাহেব মেম কীভাবে পান সুপারি খেতে বলতে পারে- সেসব কূট তর্ক মাথায় খেলে না, তবে খেয়াল করি, সাহেবমেমের মতোই ধবধবে ফর্সা নেড়ানেড়ি বিকেলে বারান্দায় দুটো ভাঙ্গা কাঠের চেয়ারে বসে থাকেন গম্ভীর মুখে, তাঁদের ধুতি শাড়িও ধবধবে সাদা। কেনই বা তাঁদের সবাই নেড়ানেড়ি বলে, জানি না। দুজনের চুল পাতলা হয়ে এলেও এখনো যথেষ্ট । বহুদিন জানতাম তাঁরা স্বামী স্ত্রী, তবে মহিলাটি, যাঁকে সবাই নেড়ি বলে, তিনি সিঁদুর পরেন না কেন? হতে পারে, তাঁর সিঁদুরে অ্যালার্জি আছে। আমাদের মফস্বলে কোন বিবাহিত মহিলা সিঁদুর না পরলে তিনটে কথা ভাবা হয়।
তিনি মুসলমান বা খ্রিস্টান
তিনি আল্ট্রা ম্ররডান
অথবা তাঁর সিঁদুরে অ্যালার্জি আছে।
রাসমাঠে যেমন রাসমঞ্চ, যেমন রথ, তেমনি এঁরা। ধ্রুবক। বছরের পর বছর ধরে একইরকম। রথের মেলার ভিড়েও ওঁরা একইরকম বসে থাকেন বিকেলে বারান্দায়, রাসের সময়ও তাই। তবে আমার মনে হয়, রথ এলে ওঁরা একদম খুশি হন না। ওঁদের নিভৃতি নষ্ট হয়ে যায়। বহুবছর পরে জানতে পারি ওঁরা ভাইবোন। ততদিনে সমারসেট মমের ‘আ বুক ব্যাগ’ গল্পটা পড়া হয়ে গেছিল। ভাই বোনের সম্পর্ক কি সর্বনাশের পথে যেতে পারে, তার রক্তাক্ত ছবি সেই গল্পে। আমার বহুদিন মনে হয়েছে, নেড়ানেড়ির সাদা পোশাকেও কি রক্ত লেগে ছিল?
তবে রথ এলে এসব ভাবার অবকাশ থাকে না। বাড়ি ভরে যায় হরেক কিসিমের লোকে। মূলত দখনে লাইন থেকে এবং মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও এরা অবিচলিত ভাবে আসে, প্রতি রথেই। এই প্রকৃত ক্যাংলাসপার্টিরা এসেই আমাদের বিছানা বালিশ দখল করে নেয়, যেখানে সেখানে পানের পিক ফেলে, বাথরুমের সত্যনাশ করে ছাড়ে, একদিনেই আস্ত সাবান গলিয়ে লিকুইড সোপ করে ফেলে (তখনো কিন্তু ঘরে ঘরে লিকুড সোপের প্রচলন হয়নি), মার রান্নার সমালোচনা করে। তবু মাকে কখনো কিছুতেই বিরক্ত হতে দেখি না। অথচ এইসব লোক (যাদের আমরা আড়ালে বলি লাটের মাল), এলে মাকেই সবচেয়ে বেশি খাটতে হয়। মা সারাদিন এদের সেবাযত্ন করে আবার সন্ধেয় গানও শোনাতে বসে। যদিও এরা বেশিরভাগই অ-সুর প্রকৃতির। মা একটা ভজন গাওয়ার পর এদেরই কেউ বলে ওঠে’ বউমা এবার একটা ভক্তিমূলক কিছু গাও!’ মা সে কথা উপেক্ষা করে গেয়ে ওঠে ‘ও মোর ময়না গো!’
এরা কুটোটি না নেড়ে দিব্যি খায় দায়, আর সকাল থেকে রাত রথ দেখে বিস্তর পুণ্য অর্জন করে। বাবা বছরের বেশিরভাগই বাইরে বাইরে ট্যুরে, তাই এদের দুশো মজা। কিন্তু কখনো রথের সময় বাবা বাড়ি থাকলে এই বিপুলজনতরঙ্গ একটু মনক্ষুণ্ণ হয়, কারণ বাবার সামনে এরা এদের ‘প্রকৃত স্বরূপ’ মেলতে পারে না। বাবা না থাকলে তাদের সেই প্রকৃত স্বরূপের ঠেলায় আমাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়।
ফিরে দেখলে এখন বুঝতে পারি রথের ধারে বাড়ি হয়েও আমি যত না রথ দেখেছি তার থেকেও বেশি শুনেছি এই রবাহুত অতিথিদের মুখে। বলা যায় টিভি আসার আগে ওরাই ছিল আমার দূরদর্শন। রথের মেলা বরাবর সভয়ে এড়িয়ে গেছি। তার কারণ রথ হয় আষাঢ়ে। শ্রাবণের মতো বনেদি বৃষ্টি না হোক, আষাঢ়ে বৃষ্টি আসে খেপে খেপে। আর ছোট থেকেই বৃষ্টি আমার জানলা থেকেই ভাল, মাঠে ময়দানে নেমে ভেজার খদ্দের আমি নই। এ ব্যাপারে আমার বেড়ালের সঙ্গে বেশ মিল। ভেজা বেড়াল কি সাধে বলে? তাছাড়া শুধু বৃষ্টি তো না, এই অল্প অল্প বৃষ্টিতেই মাঠে কাদায় কাদা। একবার সেই কাদায় আমার হাওয়াই চটি (অরাজনৈতিক লেখা এটি, সবসময় খারাপ ভাববেন না) আটকে গিয়েছিল, সেই থেকে এই রথের মেলায় যাওয়াকে আমি খুব ভয় পাই। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে কাঁঠাল। যে ভাবে লোকে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ঐ কাদায় বসেই, এমনকি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেও অবিচলিত ভাবে কাঁঠাল খেতে থাকে, আর সে কি খাওয়া! এক একজন লোক একাই একটা কাঁঠাল মেরে দ্যায়- সেই দেখে রথের মেলা এবং কাঁঠাল দুটো জিনিসেই আমার ভয়ানক বিতৃষ্ণা জন্মে যায়। আর তৃতীয় কারণ হচ্ছে রথ টানার জন্যে লোকের পাগলামো, যার কোন ব্যাখ্যা পাই না। সারাবছর রথের পেটের কাছে গুটোনো লোহার মোটা শেকল দুটো বার করা হয়েছে। দুটো শেকল পাশাপাশি শুয়ে চলে গেছে মাঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। ঐ প্রান্ত মানে ওটা মাসির বাড়ি। এই শেকলটাই এখানে রথের দড়ি, সেটা ছোঁয়ার জন্যে সে কি উন্মাদনা। আর সেই উন্মাদনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে রথে দাঁড়ানো তিন পুরোহিত। তারা মুহুর্মুহূ বেল ফুলের মালা ছুঁড়ে দিচ্ছে ভক্তিতে গদগদ জনতার দিতে। যেমন কোন বিখ্যাত রক স্টার ভক্তদের কিছু একটা ছুঁড়ে দিয়ে তাদের অ্যাড্রিনালিন স্রোতকে পাগলাঝোরা করে তোলেন, অবিকল সেইরকম। এই আবেগে থরথর ব্যাপাস্যাপার একবার, দুবার দেখেছিলাম, সম্ভবত দাদু বা মামা জাতীয় কারো কাঁধে চড়ে। বেশ ভয়ংকর মনে হয়েছিল আমার। রথ দেখার ওখানেই ইতি হয়তো, মেলা দেখা আরও কয়েক আষাঢ় চলেছিল। তবে, বেসিকালি ছাদপোষা জীব, মানে যারা ছাদের তলাতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে, বেশি দৌড়ঝাঁপ মোটেই পোষায় না। মেলাবাহিত গল্প আর মেলাবাহিত জিলিপি এলেই আমার চলে যায়। মেলার জিলিপির একটু বিশেষত্ব আছে। সারা বছর আমরা জামাইয়ের দোকানের চিনির জিলিপি খাই, এখানে একটা মৌলিক প্রশ্ন অবশ্যই ওঠে, যে কার জামাই? সেটা অন্তত আমার জানা নেই। হতে পারে আগে এটা ছিল শ্বশুরের দোকান, শ্বশুরের অবর্তমানে মিষ্টির এই দোকানটি জামাইয়ের হাতে এসেছে। আগে থেকেই হয়তো বেশ চালু দোকান, কারণ এর অবস্থানগত সুবিধে জব্বর । রাসমাঠের একেবারে কোনায়, রিক্সার ঠেকের গায়ে। একদিকে শো হাউস সিনেমা হল , অন্যদিকে ফুলতলা, পিয়ালি টাউন, চম্পাহাটির রাস্তা চলে গেছে। দোকানটি , যা একেবারেই একটা চালাঘর বিশেষ, যার অন্ধকারাচ্ছন্ন পেছনদিকে বেঞ্চ পেতে টিফিন খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে, সামনে কাচের শো কেসে মিস্টিও আছে, তবে সেসব খুব কুলীন সন্দেশ কিছু নয়। রসগোল্লা গজা ইত্যাদি প্রধান, মুখ্য শো স্টপার হচ্ছে বিকেলের সিঙ্গাড়া আর সকালের জিলিপি। যাদের পেটের অসুখ আছে, তারা খবর রাখে রাত নটায় জামাইয়ের দোকানে গরম রসগোল্লা নামে। গরম রসগোল্লা নাকি পেটের অসুখে অব্যর্থ দাওয়াই। আর জিলিপি খেতে যেতে হবে সকালে। কিন্তু সে তো চিনির জিলিপি। রথের মেলায় সুযোগ আসে গুড়ের জিলিপি খাওয়ার। অনবদ্য তার স্বাদ।
তবে রথ থেকে গুড়ের জিলিপির থেকেও মধুর ও গাঢ় রসের সন্ধান আমি পেয়েছিলাম। একবার বাবাকে খুব বিরক্ত করছিলাম, নচিকেতার বাবা এমত অবস্থায় যেমন নচিকেতাকে বার করে দিয়েছিল, আমাকেও বাবা বার করে দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে, বছর সাতেক বয়স তখন। বার করে দেবার সময় সঙ্গে আবার একটা জাব্দা খাতা আর পেনসিল দিতে ভোলেননি।
‘যাও রথের ওপর বসে একটা কিছু লিখে আনো।‘ ভেবেছিলেন কিছুক্ষণের জন্যে নিশ্চিন্তি। সদ্য বাক্য গঠন শিখে কী আর লিখবে এই কাল কা যোগিন? কিন্তু নচিকেতা যেমন যমের বাড়ি থেকে খালি হাতে ফেরেনি, ব্রহ্মবিদ্যাটি রপ্ত করে এসেছিল, আমারও রথ যাত্রা বৃথা যায়নি। আমি রথে চড়ে খাতা বাগিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছিলাম ‘সিমেন্ট কিনে এবছর আমাদের খুব লস হয়েছে।‘ আর সেই আমার কালিকলমের কারবারের শুরু, যে কারবারে লেখকের সরস্বতী লাভের বাসনায় ব্যক্তির লক্ষ্মী ছেড়ে গেছে কবেই!
1 Comment
অসম্ভব ভালো লাগলো