Email: info@kokshopoth.com
June 4, 2026
Kokshopoth

গল্পঃ পারভীন সুলতানা

May 29, 2026

গল্পঃ পারভীন সুলতানা

লেখালেখির সকাল বেলার নাম পারভীন সুলতানা রুবী। তখন মনপবনের নাওয়ে ছন্দ সুখের দোলা। লিখতেন ছড়া। তারপর জীবন খুঁজে পায় গদ্য লেখার কলম। তাই রুবীহীন গদ্যকারের নাম পারভীন সুলতানা। এখন ছড়ার পাশাপাশি গদ্যে লেখেন জীবন। গল্প লিখেছেন দেড় শতাধিক। প্রকাশিত হয়েছে সব মানসম্মত দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী ও ছোট কাগজেও। এ যাবত প্রকাশিতঃ দশটি গল্পগ্রন্থ, তিনটি উপন্যাস, ছ’টি ছড়া সংকলন এবং দুটি কিশোর গল্পগ্রন্থ।

জন্ম ময়মনসিংহে। শৈশব কেটেছে সেখানেই। এখন ঢাকাবাসী।

জন্মবৃত্তান্ত

  আকাশের নীলাভ রঙ ঝরা জলে শরতের নতজানু কাশফুলও সঙ্গদান করে। সাদা ও নীল রঙ এর যৌথ ছায়া বেশুমার সৌন্দর্য বিলায় ব্রহ্মপুত্রের আটপৌরে জলের শরীরে। ময়মনসিংহ শহরের চিবুক ছুঁয়ে ঢালে নদী। উত্তরে গারো পাহাড়ের আবছা ছায়া হেলান দিয়ে আছে দূরস্থিত আসমানের জমিনে। জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালার অনাড়ম্বর সবুজ, সার্কিট হাউজের ক্লান্তিহীন বিশাল উন্মুক্ত মাঠ আর নদীর ধার ঘেঁসে নাক উঁচিয়ে থাকা গীর্জা; সব মিলিয়ে শহরের সবচেয়ে সেরা আর মনোরম জায়গা এটি। সূর্যের শেষ লাল আভা গীর্জার নাক ছুঁয়ে তেছরা হয়ে ছাদের ঢালে ঝুলতে ঝুলতে মিলিয়ে যায়। তারপরও তার রেখে যাওয়া আলোটুকুর উজ্জ্বলতায় হেসে ওঠে বড় মসজিদের উঁচু মিনারের কয়েকটি কারুকাজময় তারা। কালীবাড়ি মন্দিরের সান্ধ্যকালিন ঘণ্টার ধ্বনি উড়ুক্কু বাতাসে ভর দিয়ে নদীর নীল জলে ছলকে ছলকে পড়ে। 

ঠিক এরকমই ভর সন্ধ্যেবেলা এক নদী জল ডিঙ্গিয়ে নদী তীরের ঢালে গাঁথা পাথর সিঁড়ি টপকে লাসুমন আসে এ পাড়ে। গীর্জার মসৃণ ঘাস বিছানো জমিনে অক্লেশে পাছা বিছিয়ে বসে অপেক্ষা করে ও। প্রার্থনা শেষ করে পিটার এখনো বেরোয়নি। সূর্য ডুবেছে খানিকক্ষণ আগে। আগুনের লাল একটা নদী বইছে সারা আকাশময়। একটু পরেই নিভে যাবে এই ঔজ্জ্বল্য। নদীর দু’ধারে মাথা উঁচু দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর সবুজ ভেলভেটের উপর নিবিড় আঁধার নামবে। সারাদিনের রোদ খাওয়া পরিতৃপ্ত গাছের শাখা ঘুমে নুইয়ে পড়ে । তবু আজ পিটারের দেখা মেলে না। কপালে কুঁচকানো রেখার ভাঁজে বিরক্তির কুচি জমা হতে না হতেই পিটার তার স্বভাব সুলভ হাসির সঞ্চয়টুকু দু’ঠোটে গড়িয়ে দিয়ে লাসুমনের অপেক্ষারত পিঠে হাত রাখে – কিরে ব্যাটা কতক্ষণ? লাসুমন রামবীনের লিকলিকে চেহারায় খুশি ও রাগের ধরন প্রায় এক রকম হলেও আজ কপালে ভাঁজের সংখ্যা বেশিই মনে হয়। পিটারের নাকে মুখে তখনো প্রার্থনা গীতের নরম ও সমাহিত সন্তোষ মাখানো । সেদিকে তাকিয়ে লাসুমন ঘোর বিরক্ত হয়ে ওঠে – মন ভালা নাই। আজ কাইজা কইরা বাড়ি থাইকা বাইর হইছি। আর ফিরুম না ভাবতাছি। ওর কথায় পিটারের স্বস্তি ও তৃপ্তির রেখায় কোন টোকা পড়ে না। ধীর ও শান্ত শোনায় ওর প্রতিক্রিয়া – মেসো আজকেও চাকরির খোটা দিল বুঝি? তোর এই পুরনো প্যাঁচাল শুনতে আর ভাল্লাগে না। বাদ দে। আজ আমাদের খাওয়ার দিন না? কি, চলবে তো? লাসুমন কিছু বলে না। দু’জন অতঃপর পার্কের সিমেন্ট খোয়া বেঞ্চিতে বিমর্ষ চিত্তে বসে থাকে আরও একজনের অপেক্ষায়। বিকেলের ভ্রমণকারীদের ফেলে যাওয়া বাদামের খোসা ওদের পাছার চাপে আরো চ্যাপ্টা হয়। ঠিক তখনই ইজাজ সিকদার ওর একহারা গড়নের লম্বা অবয়বে যথেষ্ট সৌন্দর্য ও আমুদে ভাব নিয়ে ওর উপস্থিতির আলো ছড়ায় । চারপাশে বিছিয়ে থাকা পাতলা অন্ধকারের নিরাপত্তায় বন্ধুদের গা ঘেঁসে বসে প্যান্টের পকেট থেকে একটা বোতল বের করে। পিটার ও লাসুমন রামবীন ওদের বিষাদের শেষ বিন্দুটি ঝেড়ে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে দাঁড়ায় এবার। মুহূর্তে এই তিন যুবক প্রত্যেকেই তাদের যুবক সুলভ আচরণে মৌনতায় খোলস ভেঙ্গে তুমুল গপ্পোবাজ হয়ে ওঠে। বোতল ভর্তি এই তরল এরা খায় প্রতি রবিবার। সন্ধ্যা থেকে রাত-ভোর পর্যন্ত চলে তাদের নিরন্তর আড্ডা ; মধ্যবয়সী রাত অব্দি চলে তরল সুধা পান।

 

লাসুমন অর্থনীতিতে এমএ পাস করার পরও তার কালো ঢেঙ্গা চেহারা আর নিম্নবর্ণের খেসারত হিসেবে আজ পর্যন্ত কোনো চাকরি জোটাতে পারেনি। । তাই সে তার পিতৃ জীবিকা নৌকা চালানো, জালবোন, টুকটাক প্রাইভেট পড়ানো ইত্যাদি করে বেকার উপাধি থেকে মুক্ত থাকার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । হতাশায় জেরবার বেচারা ।

 

 অনাথ পিটার গীর্জার ফাদার ফেলেমোন সরেনের পালিত পুত্র। সপ্তাহ শেষে রোববার সন্ধ্যার শেষ প্রার্থনার পর ফাদারের কাছ থেকে এই সময়টুকু নিজস্ব করে পায়। বাকি সময় কেক তৈরি করে। এ শহরে পিটারের তৈরি কেকের খুব সুনাম। ইন্টার পরীক্ষায় তিন তিন বার অকৃতকার্য হওয়ার পর পিটার কেক তৈরিকেই মূল পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

ইজাজ সিকদারের গল্প ভিন্ন। শহরের নাম করা ধনী ইরফান সিকদারের দৌহিত্র ইজাজ । চরিত্র স্খলনের মতো জটিল ও নিন্দনীয় অপবাদে স্বামী সংসার থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে ওর মাকে। ইজাজেরও জায়গা হয়নি সে বাড়িতে। নানা ইরফান সিকদার পরম আদরে নাতিকে বুকে টেনে নিলেও যুবক ইজাজ সিকদারের যন্ত্রণার উপশম দুঃসাধ্য তার। অপমান আর গ্লানির অন্ধকার ঐশ্বর্যের দ্যূতিতেও ঢাকতে পারে না ইজাজ।

 

লাসুমনের সাথে পিটারের পরিচয় সেই শৈশবে। নদী পাড়ে মিশনারিদের স্থাপিত ওয়ার্ল্ডভিশন স্কুলে দু’জনের হাতেখড়ি। ওদের যৌথ বন্ধুত্বের সুতোয় হঠাৎ করেই ইজাজ সিকদার গেঁথে যায়। সেদিনও ছিল ভরা পূর্ণিমা। মায়ের সঙ্গে ভালো ধরনের এক গন্ডগোল বাঁধিয়ে ইজাজ বাসায় ফেরেনি। পার্কের বেঞ্চে শুয়ে যন্ত্রণার ওমে তড়পাচ্ছিল। রাত ৯টা কি সাড়ে ৯টা হলেও শীতের রাতে এতো সময় পর্যন্ত কেউ সাধারণত পার্কে থাকে না। টিউশনি শেষে বাড়ি ফিরে যাওয়া লাসুমনকে এগিয়ে দিতে গিয়েছিল পিটার। তখনই ইজাজ সিকদারের সুন্দর অবয়ব আর নিঃসঙ্গতা কৌতূহলী করে তোলে ওদের। ত্রিমুখী হতাশা ক্রমশ ওদের বন্ধুত্বের বুননকে নিবিড় তোলে।

 

সারা চরাচরময় জ্যোৎস্নার মায়াবী চাদর বিছিয়ে চাঁদ আজ নিজেও নেমে এসেছে ব্রহ্মপুত্রের জলে। বাতাসের অদৃশ্য আদরে তরল স্রোতের দোলনায় মাঝে মাঝে দোল খাচ্ছে রূপসী । চাঁদের এই পুরনো ও প্রাগৈতিহাসিক আচরণ তিনজনকে ভালোলাগায় আবিল করে। লাসুমনের ভগবান যে চাঁদ বানিয়েছে, পিটারের ঈশ্বর সেই চাঁদে রূপালী রং ঢেলেছে আর ইজাজ সিকদারের আল্লাহ তাতে যোগ করেছেন অপার সৌন্দর্য। 

সমস্ত রাতের বুক জুড়ে বসে থাকা এই তিন যুবকের প্রত্যেকেই স্রষ্টার স্থিতিশীল সৌন্দর্যবোধে আবার নতুন করে মুগ্ধ হয়। তাদের বুকের ভেতর বিছিয়ে থাকা শূন্যতা ও হতাশার ফাটলগুলো চাঁদের মিহিন ও নরম আলোতে একটু একটু করে ভরাট হয় ; সারা চরাচরময় জ্যোৎস্নার মায়াবী চাদর বিছিয়ে চাঁদ আজ নিজেও নেমে এসেছে ব্রহ্মপুত্রের জলে। বাতাসের অদৃশ্য আদরে তরল স্রোতের দোলনায় মাঝে মাঝে দোল খাচ্ছে রূপসী । চাঁদের এই পুরনো ও প্রাগৈতিহাসিক আচরণ তিনজনকে ভালোলাগায় আবিল করে। লাসুমনের ভগবান যে চাঁদ বানিয়েছে, পিটারের ঈশ্বর সেই চাঁদে রূপালী রং ঢেলেছে আর ইজাজ সিকদারের আল্লাহ তাতে যোগ করেছেন অপার সৌন্দর্য। 

 

 পার্কের বেঞ্চ ছেড়ে নদীর ঢালে নামতে থাকে তারা। লাসুমনের দক্ষ হাতে বৈঠা ওঠে। সুদূর প্রসারী গভীরতা মাটির অস্তিত্ব থেকে তিনজনকে টেনে নেয় জলের নিম শীতল আশ্রয়ে। ইজাজ বোতলের মুখ খোলে। খাঁটি বিদেশী জিনিস এনেছে আজ সে। মূল্যবান সেই তরল জলের কিছু ফোটা নদীর আশৈশব পানিতে পরে মহূর্তে ভিখারির মতো নিঃস্ব হয়ে যায়। কিন্তু নৌকার আরোহীরা রাজাধিরাজের খুশিতে মাতাল হয়ে ওঠে ক্রমশ।

 

অনাথ পিটারের বুক থেকে কালো দুঃখের বুদবুদ একটা দুটো করে মিলিয়ে যেতে থাকে। পিটারের দুঃখের ওজন মূলত একটু বেশিই। রোববারের প্রার্থনার সময় বারবারই দুটো না দেখা মুখের শূন্যতায় কাতরায় সে। দুঃখের সেই তাপ কখনো কখনো কেক তৈরির ওভেনের চেয়েও উত্তপ্ত মনে হয় ওর কাছে।

 

লাসুমনের হতাশ ও ক্লান্ত চোখের দৃষ্টি ব্রহ্মপুত্রের তরল স্রোতে মাঝে মাঝেই স্থিত হয়। বাতাসের খেয়াল খুশির উপর ছেড়ে দেয় সে নৌকার গতিকে। বোতলের অমৃত পান করার জন্য জিভের ডগা লোভী হয়ে ওঠে। বাপের ফসলী জমিন অন্যের মালিকানায় চলে গেছে ওর পড়াশোনার খরচ যোগাতে। চাকরি না পাওয়া বেকার যুবকের ভার বুকের উপর এক পাহাড় ওজনের চেয়েও ভারি।

 

বরাবরই ইজাজ পান করে বাকি দু’জনের চেয়ে বেশি এবং সে দাবি করে তার যন্ত্রণার কাছে ওদের দুঃখ, ভেসে বেড়ানো মেঘের মতোই হালকা। এর মধ্যেই সে পৌঁছে গেছে সপ্ত আসমানে। তার নিয়ন্ত্রণহীন বোধ শূন্যতার গভীরে ঘুরপাক খায়। লাসুমনের দক্ষ হাত বরাবর ভাবে নৌকা আজ যতো দূর ইচ্ছা টেনে নিয়ে যাবে। কিন্তু, মাথায় কাজ করে মালোপাড়ার নিশি নীরব ঘাটের মায়া। অতঃপর গভীর রাতে ভ্রমণকারীদের নৌকা লাসুমনদের ঘাটেই ভেড়ে। নেশায় টালমাটাল লাসুমনের সারা শরীরে শুধু হাত দুটোই কখনো মাতাল হয় না। নিঃসঙ্গ জ্যোৎস্নার এই অন্তরঙ্গ সৌন্দর্য দেখার জন্য তিন যুবক ছাড়া চর সিরতার মালোপাড়ায় আর একটা লোকও জেগে নেই। তিনজনের এই দলটা বিস্তৃত চরের সমস্ত নৈঃশব্দকে প্রাণের উষ্ণতায় উপভোগ করে। তাদের নেশালু ঠোঁটের ঘেরে যে গানের সুর ওঠে তার কথা ভিন্ন ভিন্ন হলেও বাণী অভিন্ন। তাদের খসে পরা হতাশার রঙ একই তুলির টানে আঁকা। বুকের ভাঙ্গনেও একই কাতরানির আওয়াজ।

 

 নৌকা থেকে নেমে হেঁটে চলা ওদের তিন জোড়া পা বুড়ি বটগাছের চাতালে এসে লোহার খামের মতো গেঁথে যায়। একটা নারী মূর্তি নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গিনী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় মাতাল লাসুমনের চোখ ঘনশ্যামের বাঁজা বউটাকে ঠিকই শনাক্ত করে নেয়। মেয়ে মানুষটার আকাশচুম্বী সাহসে নেশা প্রায় ছুটে যায় ওদের। নদীর কাছাকাছি শূন্যতায় রাত যাপনে অভ্যস্ত পিটারও মেয়েটার বুকের পাটা দেখে বিস্মিত হয়। কিন্তু লাসুমন রমণীর উপস্থিতিতে চমকিত হয় না বরং জবাবদিহি চাওয়ার ভঙ্গিতে ফাটা বাঁশের মতো গলা চড়ায় – দূর্গা বৌদি, এই মাঝ পহর রাইতে একলা একলা এইখানে করডা কী তুমি? বেটাছেলের লাহান ডাকাইতা সাহস কি তুমার মতো মায়ালোকরে মানায়? লাসুমনের রূঢ় আচরণে দুর্গা দুর্মর সাহসের অবগুণ্ঠন উন্মোচিত করে ক্ষোভে ফেটে পড়ে- একটা বাঁজা মায়া মানুষের কাছে নিশি রাইত তো ভয়ের কিছু না ঠাকুরপো। একটা ছাওয়াল বিয়াইতে না পারার দুষে দিনের পর দিন আমার উপরে যে অমানুষিক অত্যাচারডা চলে তা চোহে দেহ না? জগৎ সংসার কি জানে আসল রহস্য? দুষ কার, কে বাঁজা? শ্বশুর শাশুড়ি মিছা অপবাদে ঘর থাইকা বাইর কইরা দেয় রাইতের পর রাইত। এই ব্রহ্মপুত্র নদ তার সাক্ষী, সাক্ষী এই একশ’ বছরের পুরান বটবৃক্ষ।’ দূর্গার অবগুণ্ঠন খসে পরে, ফর্সা ত্বকে দরদী চাঁদ নরম আলোর আদর ঢালে। একবিন্দু জলের আভাস নেই সে দৃষ্টিতে।রাগে জ্বলে ওঠা চোখ জোড়া ক্রুদ্ধ সাপের ছোবলের মতো হিস হিস করে- ছাওয়াল না হওনের দুষটা যে আমার সোয়ামীর সেইডা কেউ মানে না। পয়দা করার মুরাদ না থাকলেও বউ মারনের তাকত আছে! দুর্গা উন্মত্ত রাগে পিঠে জড়ানো আঁচল সরায় ; ফর্সা চামড়ায় জমাট বাঁধা রক্তের নীল দাগ ডোরা কাটা শাড়ির মতো ফুটে আছে। ইজাজের ঠোঁট সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে- ঘরে যাও দুর্গা, ওদের বুঝিয়ে বলো, ডাক্তার দেখাও তোমার স্বামীকে। বৃষ্টি না পাওয়া মরুভূমি হঠাৎ জলের স্পর্শে যেমন ভাপ ছড়ায় তেমনি উষ্ণতায় বিশ্বচরাচরকে স্তম্ভিত করে শক্ত খুঁটির দুর্গা লাসুমনের মুখোমুখি ঋজু হয়ে দাঁড়ায়- দিবা আমারে একটা ছাওয়াল? একবার খালি আমারে প্রমাণ করনের সুযোগডা কইরা দেও যে, আমি বাঁজা না, মা হওনের ক্ষেমতা আছে…। লাসুমনের ঠেঙ্গা শরীর প্রাগৈতিহাসিক পুরুষ শিহরণে কেঁপে ওঠে। তবু ভিতু মন নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে সে। কোনো কথাই বলে না লাসুমন। এরপর দুর্গা এক ঝটকায় মুখ ফিরিয়ে নেয় লাসুমনের ডরপুক অবয়ব থেকে। এর পর পিটারের স্নিগ্ধ দৃষ্টির সামনে অনুনয়ে নত হয় দুর্গা – ঐ গির্জার দেবতার প্রার্থনা করেন না আপনে? তার কিরে, আমারে একটা ছাওয়াল দেন। পিটারের নরোম চোখের সাদা অংশে স্থাপিত কালো মণি দুটো ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোর মতো ঝক্ ঝক্ করে ওঠে কিছু লোভ ও কিছু কামনার বারুদে। কিন্তু চিরদিনের স্থৈর্যশীল পিটার মুহূর্তেই বশিভূত করে নিজেকে। উত্তাপহীন গলায় সে শুধু জানায়- এক অনাথ কী করে এমন জটিল জন্মের দায়বদ্ধতার ওজন বহন করবে? সে শক্তিতো আমার নাই দুর্গা!

 

হাটু মুড়ে বসে পরে দূর্গা। তারপর সহানুভূতি আদায়ে ব্যর্থ হতাশায় চরের ফসলী জমিনের কাছে নিজেকে বিছিয়ে দেয়। সবে মাত্র জেগে ওঠা আলুর নরোম ডগাগুলো ওর শূন্য বুকের কাছে লুটিয়ে পরে। বালুভরা নিরস ও শুকনা মাটিতে কৃষকের পরিশ্রমী হাত কী নিপুণ দক্ষতায় ফলিয়েছে ফসল! স্থৈর্যের শেষ সঞ্চয়টুকু সম্বল করে আবার উঠে দাঁড়ায় দুর্গা। দু’চোখের তারায় প্রাণের সমস্ত কষ্ট ধারণ করে সে ইজাজ সিকদারের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়; কিন্তু কিছু বলে না। না বলা কষ্টের হাওয়া ইজাজের পৌরষদীপ্ত বুকে আছড়ে পড়ে। দুর্গার ছেঁড়া খোড়া বুক থেকে উঠে আসা সমস্ত আকুলতা গভীরভাবে প্রভাবিত করে ইজাজকে।

 

সূর্য উদিত হওয়ার পর কুসুম কুসুম আলোয় আঁধারের মতো নেশা মিলিয়ে আসলে তিন যুবক আবার পুরনো অবয়ব আর ভাবনার ঠিকঠাক মেজাজে ফেরে। লাসুমনের হাতে খেয়া ঘাটের বৈঠা ওঠে।

 

পিটার তার প্রার্থনা স্তব আওড়ায়- হে পরম পিতা,সমস্ত পাপ হরণকারী ঈশ্বর, তুমি রক্ষা করো আমাদের…। 

 

ইজাজ সিকদারও ফেরে তার বৈভব উপচানো অসুখী পরিচিত গৃহ কোণে । লাসুমন কিংবা পিটার অথবা ইজাজ কারো স্মৃতিতেই দূর্গার কোন হদিশ থাকে না । অমৃত পান করা রাতের আলাদা রঙ ও চমক থাকে, জোছনা ও মদিরা কাতর রজনীর স্বভাবই নানা বানোয়াট কিচ্ছা কাহিনীকে ফেনায়িত করা।

 

মাসখানেক বাদে মালোপাড়ার ঘনশ্যামদের দরিদ্র রসই ঘর থেকে অনেক বছরপর ক্ষীর আর লুচি ভাজার সুবাস উড়ে আসে। নদী ভেজা বাতাসেরা পরম যত্নে এ সুগন্ধকে মালোপাড়ার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দেয় । ঘনশ্যামের মাটি লেপা আটপৌরে ঘরে নতুন শাড়ি পরা দুর্গাকে ঘিরে অনেকগুলো মুখ খলবল করে- ও বউ, এইবার তুই যা বিয়াবি বিয়া,পরেরবার কিন্তু পোলা ছাওয়ালই বিয়াইতে হইবো…! কে জানে রাত তখন কোন নতুন কেচ্ছার আয়োজন সাজায়!

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *