জেমস জয়েস-এর গল্প
জেমস জয়েস-এর গল্প
ভাষান্তরঃ অনিন্দ্য ঘোষ
ইংরেজি তথা আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে জেমস জয়েসের নাম এতোটাই প্রকট যে কক্ষপথের পাঠকের কাছে তাঁর পরিচয় দেওয়াটা হাস্যকর। আধুনিক গদ্যশৈলীর অবিস্মরণীয় কারিগর। ওঁর লেখার ভাষান্তর, অতি দুরূহ। এই গল্পটি প্রকাশের ১১২ বছর পরেও সমান আলোচিত। সেই সময়ের ডাবলিনের ধুসরতার পরিপ্রেক্ষিতে এক নামহীন কিশোরের স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী । এ’ বাহ্য। এ গল্প শেষ পর্যন্ত চরিত্রটিকে এক নির্মম সত্যের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, যা জয়েসিয় ভাষায় যা Epiphany ।
জন্ম ১৯৭৪। দক্ষিণ ২৪ পরগণা। পশ্চিম বঙ্গ।
লেখকের নিজের কথায়,
“লেখালিখির অভিজ্ঞতা খুবই বন্ধুর — নির্দিষ্ট কিছু লিটল ম্যাগাজিন ছাড়া বিশেষ কেউ পাত্তা দেয়নি যদিও তাতে কিছু আসেও না, যায়ও না। বাংলা সাহিত্যের বিগ হাউজে যাঁরা সাম্প্রতিক গদ্য-সাহিত্য লিখছেন, তাঁদের লেখালিখির মান নিয়ে মোটের ওপর হতাশ। এখনো আশাবাদী যে, যেসব লেখকের (অনর্থক লিঙ্গায়ন অপচ্ছন্দের) উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশী নয়, তাঁদের হাত দিয়েই বাংলা গদ্য-সাহিত্যের শাপমুক্তি হবে।
নেশা — বহুবিধ এবং অবশ্যই, বান্ধব-আড্ডা আর হিমালয়।
বিপন্নতা — বাংলা ভাষার ক্রিয়াপদের ব্যবহার এবং বানানবিধি (শেষোক্ত ক্ষেত্রে বৈয়াকরণিকরা বিবেচনাধীন নন আদপেই)।“
অ্যারাবি (Araby)
চোখের পাতা বন্ধ করে রাখলে যে সময়টায় খ্রিস্টান ব্রাদারস’ স্কুল তাদের ছেলেপিলেদের ছুটি দেয়, সেসময়টুকু বাদ দিলে নর্থ রিচমন্ড স্ট্রীটটাকে শান্তই লাগে। কানাগলির শেষে চৌকো জমিতে পড়শীদের থেকে একদম আলাদা, একটেরে একটা দোতলা বাড়ী — এখন সেখানে কেউ থাকে না। রাস্তার অন্যান্য বাড়ীগুলোর সবকটা নিজেদের বনেদিয়ানা নিয়ে বেশ হুঁশিয়ার। তারা একে অন্যের দিকে বাদামী, ভাবলেশহীন মুখে চেয়ে থাকে।
আমাদের বাড়ির আগের ভাড়াটে পেছনের ড্রইংরুমে মারা গিয়েছিলেন। পুরোহিত ছিলেন তিনি। অনেকদিন ধরে বন্ধ থাকার দরুণ ওদিকের সবকটা ঘরে গেলেই ভ্যাপসা বাতাসের একটা ঝাপ্টা লাগত। ড্রইংরুমটাতেও সেই একইরকম ভ্যাপসা গন্ধ। তার ওপর, এটা রান্নাঘরের ঠিক পিছনে হওয়ায় ফালতু কাগজপত্তরের আস্তাকুঁড় হয়ে গিয়েছিল। এগুলোর ভেতর থেকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম কয়েকটা কাগজে মোড়া বই, যার পাতার ধারগুলো কোঁচকানো, নোনাধরা — ওয়াল্টার স্কটের লেখা দ্য অ্যাবট,[i] দ্য ডিভাউট কমিউনিক্যান্ট,[ii] আর ভিদোকের স্মৃতিচারণ[iii]। আমার শেষেরটা সবচেয়ে ভালো লেগেছিল কেননা, এর পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বাড়ীর পেছনদিকে ছিল একটা বুনো বাগান — মাঝমধ্যিখানে ছিল একটা আপেলগাছ আর এদিক-ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু ঝোপ-ঝাড়, যার একটার নীচ থেকে আমি মৃত ভাড়াটের সাইকেল-পাম্পারটা পেয়েছিলাম। মরচে পড়ে গিয়েছিল সেটাতে। পুরোহিতমশাইয়ের দান-ধ্যান ছিল বিস্তর — তাঁর উইলে দেখা গিয়েছিল, তিনি তাঁর সব টাকাকড়ি দিয়ে গেছেন গীর্জাগুলোর জন্য, আর তাঁর বাড়ীর সব আসবাব অর্শিয়েছিল তাঁর বোনের ওপর।
শীতকাল এলে আমাদের দিনগুলো ছোট হয়ে যায়। আর তখন, সূর্য পশ্চিমে ঢলে যাওয়ার বেশ আগেই আমরা রাতের খাবার সেরে নিতাম। যখন আমাদের রাস্তায় দেখা হত, বাড়ীগুলো ততক্ষণে বিষণ্ণ হয়ে গেছে। আমাদের মাথার ওপরে আকাশের যে জায়গাটার রঙ সবসময়-পাল্টাতে-থাকা বেগুনী, সেদিকেই রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো তাদের নিস্তেজ লন্ঠনের আলোগুলোকে বাড়িয়ে ধরত। ঠান্ডা হাওয়া আমাদের পেড়ে ফেলত। তাই আমরা, আমাদের গা গরম না হওয়া পর্যন্ত খেলে যেতাম। ঠা ঠা রাস্তায় আমাদের চিল্লানির প্রতিধ্বনি হত। আমাদের খেলাধুলোর পথ গিয়ে ঠেলে উঠত বাড়ীগুলোর পিছনের অন্ধকার কাদামাখা গলিগুলোতে। সেখানে কুটির থেকে বেরিয়ে এলাকার বখাটে ছেলেরা ভিড় জমাত। আমরা সেই ভিড়ের মাঝখান দিয়ে আমরা টেনে দৌড় মারতাম; পৌঁছে যেতাম ছায়া চুঁইয়ে পড়া ভেজা ভেজা বাগানগুলোর পিছনের দরজাগুলোর কাছে, যেখানে ছাইগাদা থেকে আবর্জনার গন্ধ উঠত। সামনেই দুর্গন্ধে ভরা ঘোড়ার আস্তাবল — আলো গিয়ে প্রায় পৌঁছতই না সেখানে। কানে আসত, কোচম্যান ঘোড়াকে আঁচড়ে দিচ্ছে, বা ঘোড়াকে পরানো জিন থেকে আওয়াজ তুলছে। আমরা যতক্ষণে বড়ো রাস্তায় ফিরে আসতাম, ততক্ষণে গোটা তল্লাটকে ভরিয়ে দিয়েছে রান্নাঘরগুলোর জানলা থেকে আসা আলো। রাস্তার মোড়ে কাকাকে যেদিন দেখতে পেতাম, আমরা সেদিন ছায়া খুঁজে নিয়ে কাকাকে দেখে যেতাম যতক্ষণ না কাকা বাড়ীর ভিতর পুরোপুরি ঢুকে যায়। কিংবা, যদি মর্গ্যানের বোন সদর দরজার চৌকাঠে এসে মর্গ্যানকে চা খেতে ডাকত, তাহলে, ছায়া-ছায়া রাস্তা থেকে মেপে নিতাম তাকে। আমরা এটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতাম যে, সে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে কিনা, নাকি, ডাক দিয়েই ভেতরে চলে যায়। তারপর, আবছায়া ঘেরা জায়গা ছেড়ে, আমরা, খুবই কাঁচুমাঁচু মুখ করে মর্গ্যানদের সদরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতাম। সে আমাদের জন্য অপেক্ষা করত — আধা খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে আসা আলোয় তার চেহারার আদল দেখা যেত। মর্গ্যান, মানে, তার ভাই তার কথা শোনার আগে, সবসময় তাকে কিছু না কিছু বাঁকা-ট্যারা কথা শোনাতই, আর আমি রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতাম। তার জামাটা দুলে উঠত যখনই সে তার শরীর ঘোরাত, আর তাতে করে, তার চুল বাঁধার নরম দড়ি দুই দিকেই দোল খেত।
প্রত্যেক দিন সকালে আমি ওর দরজার দিকে তাকিয়ে সামনের হলঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়তাম। জানলার পর্দা এক ইঞ্চি মতো জায়গা ফাঁকা রেখে নামানো থাকত, যাতে, কেউ আমাকে দেখতে না পায়। ও দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়ালেই আমার মনে হত, বুকটা ধক করে উঠল। আমি এক দৌড়ে ভেতর-বারান্দায় গিয়ে বইগুলো নিয়ে ওর পেছন পেছন বেরিয়ে পড়তাম। রাস্তার একটা জায়গাটা অবধি এসে আমাদের পথ আলাদা হয়ে যেত — ঠিক এতদূর আসার আগে অবধি, ওর বাদামী চেহারাটা আমার চোখে লেগে থাকত। আমি আমার হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিতাম এবং ওকে টপকে যেতাম। প্রত্যেক সকালেই এটাই ঘটত। আমি কোনোদিনই ওর সঙ্গে কথা বলিনি, ওই দু-একটা মামুলি শব্দ ছাড়া, তবুও ওর নাম শুনলেই মনে হত, ঝিমোতে থাকা রক্ত অবধি পৌঁছে কেউ আমাকে হ্যাঁচকা মারছে।
তার আদল আমাকে সাথ দিত এমনকি সেইসব জায়গাতেও যেখানে আর যাই হোক, প্রেম-পীরিতি এক্কেবারেই জমে না। ফি-শনিবার সন্ধ্যায় আমার কাকীমা যখন বাজারে যেত, আমাকে কিছু ব্যাগ-পত্তর বইতে হত। আমরা হাঁটতাম ব্যস্ত রাস্তায়। আলো ঝলমল করছে চারদিকে। সেখানে মাতালরা ধাক্কা মারছে, মহিলারা দরদাম করছে। শ্রমিকদের গালাগাল কানে আসত। আর শুনতে পেতাম, কসাইয়ের দোকানের ড্রামগুলোর ওপর যেখানে শুয়োরের মাথাগুলোকে সার দিয়ে রাখা থাকত, সেই ড্রামগুলোর পাশে পাহারা দিতে থাকা দোকানী ছেলেদের তীক্ষ্ণ চিৎকার। এদিকে রাস্তার গাইয়েরা নাক টেনে গান ধরত — কখনও ও’ডোনোভান রসার গল্পের গান,[iv] কখনও বা আমাদের দেশের সমস্যা নিয়ে বাঁধা ব্যালাড। এই সব চেল্লামিল্লি আমার জীবন চেতনার একটা জায়গায় জমে যেত — ভাবতাম, আমি যেন শত্রুদের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে আমার নৈবেদ্যর থালা নিরাপদে নিয়ে যাচ্ছি। আজব আজব প্রার্থনা আর প্রশংসার মূহুর্তগুলোতে ওর নাম হঠাৎ আমার ঠোঁটে চলে আসত, যেগুলো আমি নিজেই বুঝতাম না। আমার চোখে প্রায়ই জল এসে যেত (কেন যে আসছে সেটা বুঝতাম না), আর কখনও মনে হত, বুকের ভেতর থেকে একটা স্রোত বেরিয়ে এসে হৃদয় ভর্তি করে দিয়ে আবার বুকের খাঁচার ভেতর ফিরে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা তখন আমার ছিল না। আমি জানতাম না, আর কোনোদিন ওর সঙ্গে কথা হবে কি না, আর যদি হয়ও বা, কীভাবে আমি আমার দিশেহারা ভক্তি-শ্রদ্ধার কথা বলে উঠতে পারব। কিন্তু আমার শরীরটা যেন একটা তানপুরা, আর ওর কথা আর চলনবলন যেন সেই তানপুরার তারে বাজানো আঙুল।
এক সন্ধ্যায় পেছনের ড্রইংরুমে গিয়েছিলাম যেখানে সেই পুরোহিতমশাইয়ের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল অন্ধকার সেই সন্ধ্যেতে, আর সেটা ছাড়া বাড়ীতে কণামাত্র শব্দ ছিল না। জানলার একটা ভাঙা শার্সি দিয়ে আমি শুনতে পেয়েছিলাম মাটির বুকে বৃষ্টির আছড়ে পড়ার শব্দ, ভিজে শপশপে হয়ে ওঠা পৃথিবীতে জলের মিহি ছুঁচের একটানা পড়ে যাওয়ার শব্দ। দূরের খানকতক ল্যাম্পপোস্ট বা কয়েকটা জানলার আলো আমার সামনে মিটমিট করছিল। ভাগ্য ভালো যে, বেশী দূর পর্যন্ত নজর যাচ্ছিল না। আমার সব চেতনা যেন ঘোমটার আড়ালে লুকিয়ে পড়তে চাইছিল, আর আমার মনে হচ্ছিল, আমি ওদের থেকে খসে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। আমি আমার দু হাতের তালু জোরে চেপে ধরেছিলাম, যতক্ষণ না হাতদুটো কেঁপে উঠেছিল। কতবার যে বিড়বিড়িয়ে বলেছিলাম ‘হে প্রেম, হে প্রেম!’
শেষমেশ সে আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। যখন সে আমাকে উদ্দেশ্য করে প্রথম শব্দটা বলেছিল, আমি এতটাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম যে বুঝতে পারছিলাম না কী উত্তর দেব। সে জানতে চেয়েছিল, আমি অ্যারাবিতে যাচ্ছি কি না। আমার মনে নেই, উত্তরে আমি হ্যাঁ বলেছিলাম, নাকি, না। দারুণ বাজার ওটা, সে বলেছিল, ওর নাকি যেতে পারলে খুব ভালো লাগত।
আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম ‘তাহলে যাওনি কেন?’
কথা বলার সময় সে তার রূপোর বালাটা সমেত কব্জিটাকে বারবার ঘোরাচ্ছিল। সে যেতে পারবে না, সে বলেছিল, কারণ ওই সপ্তাহেই তার কনভেন্টে একটা ধর্মচর্চা চলার কথা। তার ভাই আর দুটো ছেলে মিলে টুপি নিয়ে মারামারি করছিল, আর আমি ছিলাম রেলিংয়ের কাছে। একা। আমাদের দরজার উল্টোদিকের পোস্টের আলো ওর ঘাড়ের শাদা বাঁকটা ছুঁয়ে গেল, সেখানে যেটুকু চুল ছিল, তাতে একটা আলোর ঝলক খেলে গেল, আর তারপর সেই আলো এসে পড়ল রেলিংয়ের ওপর রাখা হাতের ওপর। তার জামার একদিকে আলো পড়েছিল, আর তাতে করে ওর শায়ার শাদা ফ্রিলটাকেও বোঝা যাচ্ছিল — ও খুব স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জন্যই চোখে পড়েছিল আমার।
– তোমার জন্য এটা ভালোই, সে বলেছিল।
– যদি আমি অ্যারাবিতে যাই, আমি বলেছিলাম, তোমার জন্য কিছু কিনে আনবো।
সেই সন্ধ্যের পর থেকে কত অগণন বোকামি যে আমার ঘুম আর জাগরণের সব ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়ে গেল! আমি ওই মাঝের ক্লান্তিকর দিনগুলোকে খতম করে দিতে চেয়েছিলাম। স্কুলের কাজগুলো আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছিল। রাতের বেলায় আমার শোওয়ার ঘরে, আর দিনের বেলায়, ক্লাস ঘরে — আমি আর আমার সামনে খুলে রাখা বইয়ের পাতা, যেটা আমি আপ্রাণ চেষ্টা করতাম পড়ার, এসবের ঠিক মাঝখানে তার চেহারা এসে হাজির হত। অ্যারাবি — এই শব্দটার অক্ষরগুলো নৈঃশব্দ্যের ভেতর দিয়ে আমায় ডাকত, যার মধ্যে আমার মন ডুবে যেত বারবার, ডুবে গিয়ে আমাকে পূব দেশের জাদু দিয়ে মুড়ে দিত। আমি শনিবার সন্ধ্যায় বাজার যাওয়ার হাত থেকে রেহাই চেয়েছিলাম। আমার কাকীমা চমকে গিয়েছিল, ভেবেছিল, আর যাই হোক, ফ্রীম্যাসন[v]-এর মতো কোনও গোপন সমাজ এবং ধর্মবিরোধী ব্যাপার নয় এটা। আমি ক্লাসে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম। দেখতাম, মাস্টারমশাইয়ের হাসিখুশী মুখটা আস্তে আস্তে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে, ভেবেছিলেন আর যাই হই না কেন, আমি নির্ঘাত আলসে হতে শুরু করি নি। আমি কিছুতেই আমার বাউন্ডুলে চিন্তাগুলোকে এক জায়গায় আনতে পারতাম না। জীবনের কোনও সিরিয়াস কাজেই আমার একেবারেই ধৈর্য ছিল না, কারণ ওগুলো আমি, আর আমার কামনা — এই দুইয়ের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াত, আমার মনে হত, ওগুলো নিতান্তই বাচ্চাদের খেলা — বিরক্তিকর, একঘেয়ে ছেলেমানুষি।
শনিবার সকালে কাকা, টুপি পরিষ্কার করার ব্রাশ খুঁজে পাচ্ছে না বলে ভেতর-বারান্দার কোট খুলে রাখার স্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে চেল্লাচিল্লি করছিল। আমি সেসময় তাকে সন্ধ্যেবেলায় বাজার যাওয়ার ইচ্ছের কথা জানালে খুব রুক্ষ জবাব পেয়েছিলাম ‘ঠিক আছে, বাপু। জানি, জানি।’
কাকা ভেতর-বারান্দার মাঝমধ্যিখানে থাকায় আমি কিছুতেই সামনের হলঘরে গিয়ে জানলার ধারে আড় খেয়ে শুতে পারছিলাম না। মাঝখান থেকে খিঁচড়ে যাওয়া একটা মেজাজ নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লাম, আর আস্তে আস্তে ইস্কুলের দিকে এগোতে থাকলাম। এত খরখরে বাতাস বইছিল যে আমার মনটা ওখানেই অনেকটা দমে গেল।
রাতের খাবারের সময় বাড়ী ফিরে দেখি, কাকা তখনও ফেরে নি। এমনকিছু দেরীও হয় নি অবশ্য। আমি বসে বসে কখনও ঘড়ির দিকে চেয়ে থাকলাম, তো কখনও ওটার টিকটিক শব্দ আমার হাড় জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। আমি ঘর থেকে বেরিয়েই গেলাম। সিঁড়ি ভেঙে উঠলে বাড়ীর ওপরের দিক — উঁচু উঁচু, ঠান্ডা, ফাঁকা, মনমরা ঘরগুলো আমায় এতটাই মুক্তি দিল যে আমি এ ঘর-ও ঘর গান গেয়ে গেয়ে ঘুরতে লাগলাম। সামনের জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম আমার সঙ্গী-সাথীরা নীচে, রাস্তায় খেলছে। তাদের চেঁচামেচি আমার কানে খুব ফিকে আসছিল। আর আমি ঠান্ডা শার্সিতে কপাল ঠেকিয়ে সেই ঝাপসা জট পাকানো হইচইয়ের বদলে সেই অন্ধকার বাড়ীটার দিকে তাকালাম যেখানে সে থাকে। ঘন্টাখানেক নির্ঘাত দাঁড়িয়েছিলাম৷ কিন্তু কিছুই দেখি নি, শুধু মনে মনে আঁকা বাদামী পোশাকের একটা অবয়ব, ল্যাম্পপোস্টের আলো যার বাঁকানো ঘাড়ে, রেলিংয়ে রাখা হাতে, পোশাকের নীচের ফ্রীলে আলতো ছুঁয়ে গেছে।
নীচে নেমে দেখি, মিসেস মার্সার ফায়ারপ্লেসের ধারে বসে আগুন পোহাচ্ছেন। মিসেস মার্সার মহাজনের বিধবা বউ, অত্যন্ত বাচাল এক বুড়ী, যিনি কিনা পুণ্য সঞ্চয়ের কারণে পুরোনো ডাকটিকিট জমাতেন।[vi] আমাকে চায়ের টেবলের এক দফা গুজগুজ-ফিশফিশ সয়ে যেতে হল। রাতের খাবার খেতে খেতে ঘন্টাখানেকেরও কিছু বেশী কাবার হয়ে গেল, তখনও কাকা বাড়ী ফেরে নি। মিসেস মার্সার টেবল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আর বেশীক্ষণ থাকতে পারবেন না বলে তাঁর খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু আটটা বেজে গেছে, ফলে তিনি আর বেশী বাড়ীর বাইরে থাকতে পারবেনও না, কেননা, রাতের বাতাস তাঁর পক্ষে ক্ষতিকর ছিল। তিনি বেরিয়ে গেলে আমি হাত মুঠো করে ঘরময় পায়চারি করতে লাগলাম। একটা সময় কাকীমা বলে উঠল ‘আমার মনে হয়, আজকের এই পুজো-আচ্চার রাতে তোমার বাজার যাওয়ার কথা আর না ভাবাই ভালো।’
রাত ন’টার সময় শুনতে পেলাম কাকা বাড়ীর সদর দরজায় ল্যাচ কী ঘোরাচ্ছে। কাকা নিজের মনে গজগজ করতে শুনলাম, আর তারপর, কোটস্ট্যান্ডটার ওপর কাকার ওভারকোটটা পড়লে, স্ট্যান্ডটার ককিয়ে ওঠার শব্দ। আমি এসবের মানে জানতাম। রাতে খেতে বসে, খাওয়ার মাঝখানে আমি বাজারে যাওয়ার জন্য টাকা দেওয়ার কথাটা বললাম। কাকা এটা একদম ভুলে মেরে দিয়েছিল। কাকা বলল ‘সবাই-ই তো ঘুমিয়ে পড়েছে, এতক্ষণে একঘুম করে দেওয়াও বোধহয় হয়ে গেছে সকলের।’
আমি হাসলাম না। কাকীমা তখন বেশ জোর গলায় বলল ‘তুমি ওকে টাকাটাই বা দিচ্ছ না কেন? আর যেতেই বা দিচ্ছ না কেন? বেচারিকে তুমি এর মধ্যেই অনেক দেরী করিয়ে দিয়েছ।’
কাকা জানাল যে সে খুবই দুঃখিত যে সে পুরো ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিল। সে আরও জানাল যে, সে সেই পুরোনো কাঁহাবাতে বিশ্বাস করে যে খেলাধুলো ছাড়া সারাক্ষণ কাজ করে গেলে একজনের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল যে আমি কোথায় যাচ্ছি, আর যখন আমি দ্বিতীয়বারের জন্য বললাম, তখন সে জিজ্ঞাসা করল আরবের ঘোড়াকে দেওয়া বিদায়[vii] আমি জানি কিনা। আমি খাবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, কাকা কবিতাটার শুরুর লাইনগুলো কাকীমাকে আবৃত্তি করে শোনানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
মুঠোর মধ্যে একটা ফ্লোরিন[viii] শক্ত করে চেপে ধরে আমি বাকিংহাম স্ট্রীট ধরে হাঁটা লাগিয়েছিলাম ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে। রাস্তার ভিড় আর ল্যাম্পপোস্টের গ্যাসের ঝলকানি আমায় মনে করিয়ে দিয়েছিল, কেন বেরিয়েছি। জন-মনিষ্যিহীন ফাঁকা একটা ট্রেনের একটা থার্ড ক্লাস কামরা দেখে উঠে পড়লাম। অসহ্য দেরীর পর ট্রেনটা আস্তে আস্তে ষ্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে থাকল। ভাঙাচোরা বাড়ীগুলোর ফাঁক দিয়ে, আর ঝলমলে নদীর ওপর দিয়ে ট্রেনটা হামাগুড়ি দিতে এগোচ্ছিল। ওয়েস্টল্যান্ড রো ষ্টেশন এলে, এবং সেখানে কিছু লোক দরজার সামনে ভিড় করলে কুলিরা তাদের হাটিয়ে দিল, বলল, এটা বাজারের জন্য স্পেশ্যাল ট্রেন। খালি কামরায় আমি সেই একাই রয়ে গেলাম। মিনিট কয়েকের মধ্যেই ট্রেনটা গিয়ে থামল কাঠ দিয়ে বানানো একটা অস্থায়ী প্ল্যাটফর্মে। আমি রাস্তায় বেরিয়ে এলে একটা ঘড়ির আলো দেওয়া ডায়ালে দেখলাম, দশটা বাজতে আর মাত্র দশ মিনিট বাকী। আমার সামনে ধকধক করছে একটা মস্ত ইমারত, যার গায়ে দেখা যাচ্ছে সেই জাদুকরী নাম।
কোনও ছয়-পেনীর পথ আমি খুঁজে পেলাম না। বাজার বন্ধ হয়ে যাবে এই ভয়ে তাড়াহুড়ো করে একটা রিভলভিং দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লাম, একটা শিলিং দিলাম একটা লোককে। তাকে বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তারপর দেখলাম আমি এক বিরাট হলঘরে দাঁড়িয়ে আছি, গ্যালারি সেই হলঘরের আদ্ধেক উচ্চতা অবধি পেঁচিয়ে আছে। প্রায় সব স্টলেই ঝাঁপ পড়ে গেছে। হলঘরের বেশীরভাগটাই আঁধারে ডুবে গেছে। আমার মনে হল, চার্চে, প্রেয়ারের পর এইরকম নিস্তব্ধতাই নেমে আসে। আমি লাজুক পায়ে বাজারের মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালাম। যেসব স্টল তখনও খোলা ছিল, তাদের ধারেকাছে কিছু লোক জটলা করছে। একটা পর্দার সামনে, যার ওপরে রঙীন আলো দিয়ে লেখা ছিল ‘কাফে শ্যান্ট্যান্ট’, দুজন লোক তখনও টাকা গুণছিল। আমি কয়েন পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম।
খুব কষ্ট করে আমায় মনে করতে হল, আমি কেন এসেছি। একটা স্টলের দিকে এগিয়ে গেলাম, আর চীনেমাটির ফুলদানি আর ফুল-ফুল ছাপ দেওয়া চায়ের সেট দেখতে থাকলাম। স্টলের দরজায় এক তরুণী দুজন তরুণ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। আমার খেয়ালে এসেছিল তাদের ইংরেজি অ্যাকসেন্ট, আর আমি তাদের কথোপকথনটা আবছা আবছা শুনছিলাম।
– ওহ্, আমি তো এমন কিছু বলি নি!
– ওহ্, অবশ্যই বলেছো!
– এহ্, কিন্তু সত্যিই বলিনি!
– ও (মেয়েটি) বলে নি?
– আলবাত। আমি নিজের কানে শুনেছি।
– ওহ্, এটা ডাহা গুলপট্টি।
আমার দিকে চোখ পড়ায় তরুণী এদিকে এল, জানতে চাইল আমি কিছু কিনবো কিনা? তার গলায় কোনও আন্তরিকতা ছিল না। তার দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলাম, আর তাই জিজ্ঞাসা করতে হয় বলেই জিজ্ঞাসাটা করা। আমিও আর উৎসাহ না পেয়ে নরম চোখে চেয়ে রইলাম বিরাট বিরাট চেহারার জারগুলোর দিকে — স্টলে ঢোকার মুখের দু’ পাশের আলো-আঁধারিতেই পূব-বাহিনীর প্রহরীদের মতো খাড়া হয়ে আছে।
মৃদু গলায় বললাম ‘না, ধন্যবাদ।’
তরুণী একটা ফুলদানি একটু এদিক-ওদিক করে দিয়ে আবারও ওই দুই তরুণের কাছে ফিরে গেল। তারা আগের বিষয়েই কথা বলতে লাগল। মেয়েটা কথা বলা আর শোনার ফাঁকে ফাঁকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছিল আমার দিকে।
আমি তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই রইলাম, যদিও জানতাম এ দাঁড়িয়ে থাকা বেকার যাচ্ছে। তবুও দাঁড়িয়েছিলাম যাতে তার পশরার দিকে আমার আগ্রহটা বেশী করে সত্যি বলে মনে হয়। তারপর একটা সময় আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ালাম, বাজারের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। পকেটে থাকা পেনি দুটো ছয় পেন্সের সঙ্গে ঠকঠক করে বাজছিল, আমি তাদের ঠোকাঠুকিতে কোনও বাধা দিচ্ছিলাম না। গ্যালারির এক ধার থেকে একটা স্বর ভেসে এসে জানান দিয়ে গেল যে, আলো নিভে গেছে। গ্যালারির ওপর দিকটা এখন পুরোই অন্ধকার।
সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নিজের দিকে চোখ ফেরালাম — একটা প্রাণী, যাকে অহংকার তাড়িয়ে নিয়ে গেছে, আর তারপর, ভ্যাঙাতে থেকেছে। রাগে, দুঃখে আমার চোখ জ্বলে উঠল।
[i] স্যার ওয়াল্টার স্কট (Sir Walter Scott)-এর লেখা (The Abbot) দ্য অ্যাবট, (বাংলা মানে করলে, ‘অধ্যক্ষ’ জাতীয় কিছু একটা হবে) — ১৮২০ সালে প্রকাশিত একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। এটি স্যার স্কটের বিখ্যাত দ্য টেলস অফ মাই ল্যান্ডলর্ড সিরিজের একটি লেখা। সেই সময়ের স্কটল্যান্ডের ‘কুইন অফ স্কট’, মেরি-এর অশান্ত শাসনকালকে কেন্দ্র করে লেখা। উপন্যাসটিতে স্কটল্যান্ডের ধর্মীয়-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিধৃত আছে।
[ii] ১৭শ শতকের ইংরেজ ধর্মতাত্ত্বিক আবেন্ডেগো সেলার (Abednego Seller)-এর লেখা বই দ্য ডিভাউট কমিউনিক্যান্ট (বাংলা মানে করলে, আধ্যাত্মিক ভোজগ্রহণকারীর কাছাকাছি) — খ্রিস্টানদের হোলি কম্যিউন, অর্থাৎ, পবিত্র প্রভুভোজ-এর আগে (আত্মপরীক্ষা, প্রার্থনা, এবং পাপস্বীকারের প্রস্তুতি ইত্যাদি), ভোজগ্রহণ চলার সময় (ভক্তি, বিনয়, এবং খ্রিস্টের আত্মত্যাগের স্মরণ ইত্যাদি), এবং ভোজগ্রহণের পরে (কৃতজ্ঞতা, নৈতিক জীবনযাপন, এবং আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা বজায় রাখা ইত্যাদি) যেরকম আচরণ ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি থাকা উচিত, সেটা ওই বইতে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
[iii] ইউজিন-ফ্রাঁসোয়া ভিদোক (Eugène-François Vidocq) (১৭৭৫ – ১৮৫৭) — একজন ফরাসী অপরাধী। পরবর্তীকালে, তিনি পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে উঠে জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে যান। তাঁকে আধুনিক গোয়েন্দা ও অপরাধতত্ত্বের জনক বলা হয়। তিনি ফ্রান্সের প্রথম অপরাধ-তদন্ত সংস্থা সুয়েরতে ন্যাশানালে (Sûreté Nationale, জাতীয় নিরাপত্তা বলা যেতে পারে)-এর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বিশ্বের প্রথম বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন। তাঁর জীবন পরে বহু সাহিত্যিককে অনুপ্রাণিত করেছিলো, যেমন ভিক্টর হুগো, বালজাক, এডগার অ্যালান পো, চার্লস ডিকেন্স প্রমুখ। তাঁরই লেখা আত্মজীবনীমূলক বই হলো মেমোইরস অফ ভিদোক বা ভিদোকের স্মৃতিচারণ।
[iv] Jeremiah O’Donovan Rossa ছিলেন Irish Republican Brotherhood-এর অন্যতম নেতা। তিনি Fenian Rising (1867) বিদ্রোহে সক্রিয় ছিলেন। তিনি Phoenix National and Literary Society প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজীবন স্বাধীন আইরিশ প্রজাতন্ত্রের জন্য কাজ করেন। ব্রিটিশরা তাঁকে গ্রেফতার করে আজীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলো। ১৮৭০ সালে “Cuba Five” অ্যামনেস্টির অংশ হিসেবে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত করা হয়েছিলো। তার নাম এতটাই প্রতীকী হয়ে উঠেছিলো যে সাধারণ মানুষ তার নামে গান রচনা করেছিলো। “O’Donovan Rossa’s Song” সেই ধারার অংশ, একটি বিখ্যাত আইরিশ জাতীয়তাবাদী গান যেখানে তাকে আইরিশ স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
[v] ১৭২৫ সালে Dublin-তে Grand Lodge of Ireland গঠিত হয়, যা বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম Grand Lodge হিসেবে পরিচিত। এটি একটি ভ্রাতৃত্বমূলক সংগঠন, যেখানে গোপনীয় রীতি, প্রতীক, এবং নৈতিক শিক্ষা প্রচলিত। অ্যান্টি-ক্যাথলিক এবং চোরা সংগঠনের জন্য ১৭ শতক থেকেই ফ্রিম্যাসনদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, সন্দেহ, এবং রাজনৈতিক বিতর্ক চলেছে। অনেকেই তাদেরকে গোপন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখতেন।
[vi] যে সময়ের গল্প এটি, সেসময় যাঁরা পুরোনো ডাকটিকিট জমাতেন, তাঁরা সেগুলোকে চার্চকে বিলি করে দিতেন। আর চার্চগুলো সেগুলোকে বিক্রি করে কিছু টাকা পেত, যেগুলো জনকল্যাণে ব্যবহার করা হতো।
[vii] The Arab’s Farewell to his Steed কবিতাটি Caroline E S Norton-এর লেখা একটি কবিতা। ভিক্টোরিয়ান ইংরেজিতে লেখা এই কবিতা সেসময় খুবই সমাদৃত হয়েছিলো।
[viii] ফ্লোরিন হলো একটি ঐতিহাসিক মুদ্রা। ১২৫৩ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে সোনার ফ্লোরিন চালু হয়েছিলো। এটি দ্রুত ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। ১৩৪৪ সালে তৃতীয় এডওয়ার্ড (Edward III) নিজের সোনার ফ্লোরিন চালু করেছিলেন, যার মূল্য ছিল ছয় শিলিং। পরে, ১৮৪৯ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার শাসনকালে দুই শিলিং মূল্যের ফ্লোরিন চালু হয়েছিলো। এটি ছিল এক পাউন্ডের দশভাগের একভাগ। ফ্লোরিন ১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল, এবং ১৯৯৩ সালে ঘোষিতভাবে বাতিল হয়ে যায়।