Email: info@kokshopoth.com
May 23, 2026
Kokshopoth

ধারাবাহিকঃ অর্জুনের ডায়েরি

May 22, 2026

ধারাবাহিকঃ অর্জুনের ডায়েরি
তিস্তা

তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।

‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।

কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখবেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। এবারে পর্ব # এক। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।

#১

শেষকৃত্য

বাবা মারা যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি কাঁদল মেজোকাকু। মেজোকাকু বাবার সঙ্গে পনেরো বছর কথা বলেনি। জমি নিয়ে মামলা ছিল। মামলা শেষ হয়েছিল সাত বছর আগে। তারপরেও কথা হয়নি। কেন হয়নি, কেউ জানে না। হয়তো কারণটা মামলার চেয়ে গভীরে ছিল। হয়তো অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে শোক চলছে। শোকের একটা নিজস্ব ব্যাকরণ আছে। সেই ব্যাকরণের বাইরে কিছু বললে মনে হয়— তুমি ভুল পরীক্ষায় বসেছ। মেজোকাকু কাঁদছে! আমি দেখছি…

বাবা মারা গেছে বারো দিন আগে। রাত দুটোয়। আমি পাশে ছিলাম। নার্স ছিল। মা ছিল না। মা আগেই চলে গেছে। বাবার শেষ কথা কিছু ছিল না। শেষ নিঃশ্বাসও বুঝতে পারিনি ঠিকমতো। মনিটরে একটা লম্বা সুরেলা শব্দ হল। ঘরে এসি চলছিল। বাইরে বৃষ্টি ছিল কিনা জানিনা। জানালার কাচে একটা আলো ছিল। হাসপাতালের করিডোরের আলো। সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম যখন সুরটা কানে এল।

মনিটরের সুরটা থামল না। নার্স এল দ্রুত পায়ে। আমি সরে দাঁড়ালাম। নার্সের তৎপরতা শুরু হল। আমি দেখতে থাকলাম। শুধু দেখে যাওয়া ছাড়া আমার আর কিছু করারও ছিল না। কিছু করার ছিল না মানে— আমি জানতাম এই মুহূর্তে আমি অপ্রাসঙ্গিক। এই ঘরে এখন শুধু নার্স আর বাবা। আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকা একটা মানুষ। কিছুক্ষণ পরে নার্স সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকালেন। আলতো করে মাথা নাড়লেন দুদিকে। ‘ইটস ওভার’।

এই দুটো শব্দ অনেক কিছু বহন করে। অথবা করে না। নির্ভর করে কে শুনছে। আমি শুনলাম। কয়েকটা নিঃশব্দ মুহূর্ত। বাবার দিকে তাকালাম। চেহারা বদলায়নি। শুধু ছিল, এখন নেই। এই দুটোর মাঝখানে আর কোনো দৃশ্য নেই।

এবার আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। ফোন করলাম কাকুকে। কাকু ধরল। বললাম, ‘বাবা নেই।’

কাকু বলল, ‘আসছি।’

ওই একটা মাত্র শব্দ। তারপরই ফোন কেটে দিল।

পনেরো বছর ধরে তাদের মধ্যে কথা নেই। কিন্তু ফোন ধরল। মৃত্যু কিছু কিছু দরজা খুলে দেয়। কোন দরজা? কতক্ষণের জন্য? সেসব অবশ্য বলা যায় না।

বাবাকে শেষবার বাড়ি নিয়ে এলাম। কী করে যেন ছড়িয়ে পড়ছিল খবর! কেউ আসছে আত্মীয়তার টানে। কেউ আসছে অভ্যেসে। কেউ আসছে কারণ না এলে লোকে কথা বলবে। কেউ আসছে সত্যিই কষ্ট পেয়ে। এই চারটে আলাদা করা যায় না বাইরে থেকে। সবার মুখ একরকম দেখায়। পাড়ার সেনকাকিমা এলেন। কাঁদলেন অনেকক্ষণ। বাবার সঙ্গে সেনকাকিমার কোনো বিশেষ সম্পর্ক ছিল বলে জানি না। পাশের বাড়ি ছিলেন। বাজারে দেখা হলে কথা হত। কিন্তু কাঁদলেন।

সেনকাকিমার সঙ্গে এসেছিল তাঁর নাতি। বছর পাঁচেক বয়স। সে শববাহী গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিচ্ছিল। তারপর আমার কাছে এল। বলল, ‘ফুলদাদু কি মরে গেছে?’

কেউ কোনো উত্তর দিল না। সে আবার বলল, ‘মরে গেলে কি আর খেলতে আসবে না?’

উত্তরের অপেক্ষা করল না। চলে গেল। পাঁচ বছর বয়সে মৃত্যু আর হারানো একই জিনিস।

আমি কাঁদিনি। সেদিন কাঁদিনি, আজও কাঁদিনি। কাঁদব কিনা জানি না। হয়তো পরে। হয়তো না। এটা নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই।

 

        আজ বাবার শ্রদ্ধানুষ্ঠান। শ্রাদ্ধবাড়িতে লোক এসেছে। দুপুরে খাওয়া হল। শ্রাদ্ধবাড়িতে রান্না হয়েছে। লুচি, আলুর দম, পায়েস। মানুষ খাচ্ছে। কথা বলছে। কেউ কেউ হাসছেও। শোকের বাড়িতে মানুষ হাসে। এটা স্বাভাবিক। মানুষ বাঁচে বলেই হাসে। মৃত্যুর পাশে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকাটা টের পায়।

আমি লুচি খেলাম। ভালো হয়েছে। বাবার পছন্দের ছিল লুচি। এই কথাটা মাথায় এল। তারপর চলে গেল। বিকেলে মেজোকাকু আমার পাশে এসে বসল।

বলল, ‘অর্জুন।’

শুধু নামটা।

আমি তাকালাম। মেজোকাকুর চোখ লাল। কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়েছে, নাকি আগে থেকেই ছিল, বলা যাচ্ছে না।

চুপ করে রইল একটু। যেন নামটা ডাকাই ছিল কাজ। তারপর কী বলবে সেটা ঠিক করেনি।

পনেরো বছর আগে শেষবার এই মুখ থেকে নামটা শুনেছিলাম। তখন বয়স কম ছিল। কাকু মানে কাছের মানুষ ছিল। তারপর মামলা হল। দূরত্ব হল—নামটাও হারিয়ে গেল।

আজ ফিরে এল।

মৃত্যু কিছু জিনিস ফেরত দেয়। সেটা উপহার কিনা, বলা মুশকিল।

তারপর বলল, ‘তোর বাবা ভালো মানুষ ছিল।’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’

মেজোকাকু বলল, ‘আমাদের মধ্যে কিছু হয়েছিল। তুই জানিস।’

আমি বললাম, ‘জানি।’

মেজোকাকু বলল, ভুলটা আমার ছিল।’

আমি ভাবলাম, এই কথাটা বাবা শুনতে চেয়েছিল কিনা। হয়তো চেয়েছিল। হয়তো এতদিনে চাওয়াটাও ভুলে গিয়েছিল। মানুষ অপেক্ষা করতে করতে একসময় অপেক্ষা করা বন্ধ করে দেয়। সেটাকে ক্ষমা বলে নাকি অভ্যেস— জানিনা।

বাবা মেজোকাকুকে ক্ষমা করেছিল কিনা জানা হয়নি। জিজ্ঞেস করিনি। এখন আর করার উপায়ও নেই। আমি কিছু বললাম না। কারণ এই কথাটা বাবাকে বলা দরকার ছিল। আমাকে বলে কোনো লাভ নেই। কিন্তু এটাও বললাম না। কারণ মেজোকাকু এখন কাঁদবে। আর কাঁদলে আমাকে সামলাতে হবে।

আমি এখন কাউকে সামলাতে পারব না।

মেজোকাকু উঠে চলে গেল।

রাতে বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। সবাই চলে গেছে। আত্মীয়রা যে যার বাড়ি। পাড়ার লোক পাড়ায়। শোকের একটা শেষ থাকে। তারপর নিজের জীবনে ফিরতে হয়। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম মাঝের ঘরে। বাড়িটা এত চুপ। সারাদিন এত মানুষ ছিল। এত কথা ছিল। এত কান্না ছিল। এখন কিছু নেই। শুধু ঘড়ির শব্দ। সেটাও আগে শুনতাম না। বাবা থাকলে টিভি চলত। নয়তো রান্নাঘর থেকে কিছু একটা শব্দ আসত। এখন আসবে না। এই নৈশব্দটা নতুন। এই নৈশব্দ আমার। এখন থেকে প্রতিদিন। আলো নেভালাম না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর বাবার ঘরের দিকে গেলাম।

বিছানাটা গোছানো। বালিশ পাশবালিশ সব জায়গা মতো পরিপাটি করা। টেবিলে চশমা রাখা। চশমার পাশে একটা বই। পাতা ভাঁজ করা মাঝখানে। বাবা পড়তে পড়তে থামিয়ে রেখেছিল। এটাই তাঁর পড়া শেষ বই। শেষ করার ইচ্ছে ছিল কিনা, জানি না। আমি বইটা তুললাম। পাতাটা খুললাম। বইটার নাম দেখলাম। কোনোদিন নাম শুনিনি। লেখকের নামও অচেনা। ভেতরে একটা পাতায় বাবার হাতের লেখা। পেনসিলে। একটা লাইনের নিচে দাগ দেওয়া, পাশে লেখা— এটা ঠিক। এটা ঠিক!

বাবা কোনোদিন এভাবে কথা বলত না। মানে, আমার সঙ্গে বলত না। হয়তো একা একা বলত। বইয়ের পাতায় বলত। আমি জানতাম না। লাইনটা পড়লাম। সাধারণ একটা কথা। জীবন সম্পর্কে। মনে রাখার মতো, কিন্তু অসাধারণ নয়। বাবার কাছে কেন অসাধারণ লেগেছিল, জানি না। হয়তো কোনো একদিন, কোনো একটা মুহূর্তে, এই কথাটাই ঠিক দরকার ছিল। তখন পড়েছিল। দাগ দিয়েছিল। সেই মুহূর্তটা কোনোদিন জানব না। বইটা রেখে দিলাম। যেখানে ছিল।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে মেজোকাকুর ফোন এল।

বলল, ‘কেমন আছিস।’

বললাম, ‘আছি।’

বলল, ‘একা থাকিস না কটা দিন।’

বললাম, ‘আচ্ছা।’

ওদিকে ফোন রেখে দিল।

মেজোকাকু আমাকে সাইকেল চালানো শিখিয়েছিল। পাড়ার শেষ মাথার রাস্তাটায়, যেখানে বিকেলের রোদ একটু বেশিক্ষণ থাকত। আমি পড়ছি, উঠছি, আবার পড়ছি— হাঁটু ছড়ে যাচ্ছে, হাতের তালু লাল হয়ে যাচ্ছে। কাকু প্রতিবার তুলছে, সিট ধরছে, আবার দৌড়োচ্ছে পাশে পাশে। একটা সময় ছেড়ে দিয়েছিল।  বুঝিনি। ভেবেছিলাম ধরে আছে। কিছুটা গিয়ে পড়ে গেলাম। ফিরে তাকিয়ে দেখি কাকু অনেক পেছনে দাঁড়িয়ে হাসছে।

বলল, ‘একাই চালাচ্ছিলি।’

সেদিন বুঝিনি এটা কতটা বড় কাজ। যে মুহূর্তে ছেড়ে দেয়— সেই মুহূর্তেই আসলে শেখা হয়। তারপর অনেক কিছু হয়েছে। মামলা। দূরত্ব। পনেরো বছর। আজ ফোন করল। বলল, একা থাকিস না। ছেড়ে দেওয়া আর একা থাকিস না— দুটো একই মানুষের কথা। এই দুটোর মাঝখানে পুরো একটা জীবন।

আমি শুয়ে রইলাম। ছাদের দিকে তাকিয়ে।

বাবা নেই। এটা জানি। এটা বোঝা যাচ্ছে কিনা, নিশ্চিত নই। বোঝা আর জানা এক জিনিস নয়। মেজোকাকু পনেরো বছর পরে ফোন করল। বাবা নেই বলে। বাবা থাকলে করত কিনা, এটা এখন আর জানার উপায় নেই।

 

আমি চোখ বুজলাম। বাবার বইটার কথা মনে পড়ল। পাতা ভাঁজ করা, মাঝখানে। বাবা জানত না এটাই তাঁর পড়া শেষ পাতা।

আমরা কেউই জানিনা!

 

 

#২

সহবত

 

মানুষের অনুপস্থিতিরও একটা শব্দ আছে সম্ভবত। সম্ভবত নয়। অবশ্যই আছে। গত কয়েকদিন এত লোকজন ছিল যে সেটা বোঝা যায়নি। আজ সকাল থেকে বাড়িটায় শুধুমাত্র ঘড়ি আর ফ্যানের শব্দ। এবং সে শব্দ অন্যান্য দিনের চাইতে অনেক তীক্ষ্ণ। মর্মভেদী! বাড়িটাও আকারে হঠাৎ করেই যেন অনেকটা বড় হয়ে গেছে।

 

বাবার শ্রাদ্ধের পরদিন আমি মায়ের ঘরে ঢুকলাম।

মায়ের ঘরের দরজাটা আধখোলা ছিল। এই ঘরে শেষ কবে ঢুকেছি, ঠিক মনে নেই। মা মারা যাওয়ার পর দরজাট একরকম বন্ধই থাকত। বাবা-মা বিগত কয়েক বছর আলাদা আলাদা ঘরে থাকতেন।

 এই কথাটা লিখতে গিয়ে আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। কারণ বাবা-মাকে আমরা শুধু বাবা-মা হিসেবেই দেখি এর বাইরে তাদেরও যে আলাদা  জীবন আছে, এটা মেনে নিতে সময় লাগে।  

             স্কুল শেষে আমি তিন বছরের জন্য বেঙ্গালুরুতে ছিলাম পড়াশোনার জন্য। ফিরে এসে দেখলাম দুজনের আলাদা ঘর। অবাক লেগেছিল! কিন্তু প্রশ্ন করিনি। কারণ ছোটবেলা থেকেই একটা জিনিস শিখেছি— অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে অহেতুক ঢোকা অভদ্রতা। এমনকি তারা নিজের বাবা-মা হলেও। একজন সন্তান তার বাবা-মায়ের সম্পর্ক নিয়ে কখনো পুরো সত্যিটা জানতে পারে না। কারণ সে জন্ম থেকেই তাদের সম্পর্কের ফলাফল, সাক্ষী নয়। 

মা মারা গেছে তিন বছর। মাঝখানের এই তিন বছরে আমি বহুবার ভেবেছি, বাবা কি মাকে মিস করত? তারপর সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে, এই প্রশ্নটাই বোকা বোকা। ‘মিস করা’ জিনিসটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। বিশেষ করে আমার বাবার মতো মানুষের ক্ষেত্রে নয়। বাবা খুব কম কথা বলত। রাগ করত বেশি। ছোটবেলায় আমি বাবাকে ভয় পেতাম। বাবার আর আমার মাঝখানে মা ছিল একটা নরম কুশনের মতো। মায়ের আর বাবার মাঝখানে তবে কে ছিল— আজ হঠাৎ এই ঘরে ঢুকে মনে হল।

  মায়ের ঘরে ঢুকে প্রথমে জানলাটা খুললাম।

মায়ের ঘরটা ছোট। একটা খাট। একটা আলমারি। আলমারির পাশে একটা ছোট তাক। মা বই রাখত সেখানে। রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, আশাপূর্ণা দেবী। বেশ কয়েকটা রান্নার বই। বিছানার পাশে একটা টেবিল। টেবিলে ঢাকা দেওয়া একটা জলের গ্লাস— শুকিয়ে গেছে, তলায় সাদা দাগ। আর ফিকে নীল রঙের একটা ডায়েরি। ধুলো জমেছে। মা ডায়েরি লিখত? আমি খাটে বসে অনেকক্ষণ ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম। খুলি খুলি করেও খুললাম না।   

মায়ের একটা জগৎ ছিল— বইয়ের, একাকিত্বের, দুপুরবেলার। যেখানে কেউ ঢুকত না। বাবা না, আমিও না। মা কাজকর্ম করত, আমাকে পড়াতে বসাত, রান্নাবান্না করত— কিন্তু সবসময় মনে হতো কোথাও একটা জায়গা আছে যেটা শুধু মায়ের নিজের জন্য সরিয়ে রাখা। এই ডায়েরিটা কি সেই জায়গা? 

দুটো মানুষ এত বছর একসঙ্গে ছিল, তারপর আলাদা হয়ে গেল একই বাড়ির দুই ঘরে— এই দূরত্বটা কোথা থেকে এল? কখন এল? ধীরে ধীরে, নাকি একদিন হঠাৎ? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই ডায়েরিতে আছে। হয়তো নেই।

মা কবে থেকে ডায়েরি লিখতে শুরু করে? কোন বছরে? বিয়ের আগে; নাকি পরে? মায়ের বিয়ের আগের কথা আমি বিশেষ কিছু জানিনা। বেথুনে পড়ত। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে ছিল। শুনেছি আমার বাবার সাথে সম্বন্ধ ঠিক হওয়ার প্রায় বছর দেড়েক পর বিয়ে হয়েছিল। কেননা দাদু ও দিদা মাত্র তিনমাসের ব্যবধানে পরপর চলে জান। ব্যস, এটুকুই। 

মায়ের একটা পুরনো ছবি আছে, বিয়ের আগের। সেখানে মা একা দাঁড়িয়ে আছে কোনো এক নদীর পারে। পেছনে জল, সামনে ক্যামেরা। মা ক্যামেরার দিকে নয়। তাকিয়ে আছে অন্য কোথাও। দূরে  কোথাও। সেখানে ছবির বাইরে কী আছে জানিনা। কে তুলেছিল ছবিটা? বাবা? নাকি অন্য কেউ?

এই প্রশ্ন করা হয়নি কোনোদিন।

সেই সময় মায়ের বয়স কত ছিল? বাইশ অথবা তেইশ? দাদু-দিদা সবে চলে গেছেন, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে। বাড়িটা খালি হয়ে গেছে। আর মা দাঁড়িয়ে আছে কোনো নদীর পাড়ে, ক্যামেরার দিকে না তাকিয়ে। এই না-তাকানোটা কি শুধু লাজুকতা ছিল? নাকি সেই বয়সে একটা মেয়ে যখন হঠাৎ একা হয়ে যায়, তখন সে এইভাবেই দূরে কোথাও তাকিয়ে থাকে — যেন ঠিক করে নিচ্ছে, এরপর কোথায় যাবে।

মজার ব্যাপার হল, মা বেঁচে থাকতে আমি কোনোদিন তার ব্যক্তিগত কিছু খুঁজে দেখিনি। ফোন না। ব্যাগ না। আলমারি, ড্রয়ার না। অথচ মানুষটা চলে যাওয়ার পর কেন আমার এত কৌতূহল হচ্ছে? কেউ চলে যাওয়ার পর হঠাৎ আমরা ধরে নিই, তার সবকিছু এখন সবার জন্য খোলা। এই ধারণাটা আমার একটু অদ্ভুত লাগে।   

ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বসে থাকতে থাকতে বাবার কথা মনে পড়ছিল। বাবা কি জানত এই ডায়েরির কথা? পড়েছিল কখনো? পড়লে কী ভেবেছিল? আবার এটাও হতে পারে, বাবা কোনোদিন ছুঁয়েও দেখেনি এই ডায়েরি। দুজন মানুষ একই বাড়িতে থেকেও একে অপরের কিছু অঞ্চল এড়িয়ে যায় হয়ত ইচ্ছে করে। হয়তো সেটাই সম্পর্কের শেষ ভদ্রতা। 

দুটো মানুষ পাশাপাশি থাকে। রোজ একই টেবিলে খায়। একই বারান্দায় বসে। একে অপরের অসুখে পাশে থাকে। তারপর একদিন দেখা যায় তারা আসলে অনেকটা অজানা রয়ে গেছে একে অপরের কাছে। বা হয়তো জানত, কিন্তু সেই জানার ভার বহন করেই পাশাপাশি ছিল। এই দুটো জিনিস কি এক? জানিনা। 

সংসার মানে কি একে অপরকে সম্পূর্ণ জানা? নাকি সংসার হল দুটো অচেনা মানুষ পাশাপাশি থেকে পরস্পর চেনা ও  চেনানোর একটা দীর্ঘ, অথচ অসম্পূর্ণ চেষ্টা? বাবা-মায়ের সংসার কোনটা ছিল?

আমি সেটাও জানিনা। আর কোনোদিন জানা হবেও না সম্ভবত।

শেষদিকে বাবা রাতে খুব কম ঘুমোত। আমি অনেকবার দেখেছি, মাঝরাতে জানলার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ঘরে আলো নেই। রাস্তার আলো এসে পড়ছে মেঝেতে। বাবার হাত দুটো কোলের উপর, স্থির।

সেই দৃশ্যগুলোতে আমি কখনো ঘরে ঢুকিনি। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকেছি কিছুক্ষণ, তারপর ফিরে গেছি। কেন ঢুকিনি, সেটা তখন নিজেও জানতাম না। এখন মনে হয়, বাবার সেই একা থাকার মধ্যে একটা সীমানা ছিল। একটা অদৃশ্য দরজা। সেটা ঠেলে ঢোকা ঠিক হবে না — এই বোধটা হয়তো সহজাতভাবেই ছিল।

একদিন তবু সাহস করে ঢুকেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ঘুমাওনি?”

বলল, “ঘুম আসছে না।”

তারপর আবার জানলার দিকে তাকাল। যেন আমি আসার আগে যে কথোপকথন চলছিল — নিজের সাথে, অথবা অন্ধকারের সাথে — সেটায় ফিরে গেল। আমিও আর কথা বাড়াইনি।

                 আমাদের বাড়িতে অনেক কথাই কখনো পুরো বলা হতো না। অর্ধেক বলেই থেমে যাওয়ার একটা অভ্যাস ছিল সবার। বিশেষ করে মা। মা কি সুখী ছিল? এই প্রশ্নটা আমার মাথায় আগে কোনোদিন আসেনি। 

কারণ সন্তানরা সাধারণত নিজেদের কেন্দ্র থেকে বাবা-মাকে দেখে। কে স্কুলে দিয়ে এল, কে ওষুধ খাইয়ে দিল, কে বকলো, কে আদর করল। কিন্তু তাদের নিজেদের ভিতরকার জীবন নিয়ে আমরা খুব কম ভাবি। হয়তো ভাবতে চাই না। কারণ তাহল মেনে নিতে হয় বাবা-মাও অসম্পূর্ণ মানুষ।

এখন ভাবছি, মা কি সুখী ছিল?

আমার ছোটবেলায় একটা দৃশ্য খুব কমন ছিল। বাবা রেগে যাচ্ছে। মা চুপ করে কাজ করছে। তখন মনে হতো মা খুব শান্ত মানুষ। আজ এত বছর পর বুঝি, সব চুপ করে থাকা শান্ততার লক্ষণ নয়।

              একবার মনে আছে— বারান্দায় মা কাপড় তুলছিল। বাবা ভেতর থেকে কী একটা কথা বলছিল বিরক্ত গলায়। মা কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু কাপড়ের ক্লিপ খুলছিল। তখন হঠাৎ আমার মনে হয়েছিল, মায়ের চুপ করে থাকার মধ্যেও একটা শব্দ আছে।

আজ সেই শব্দটা আরও একবার, আরও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। 

ডায়েরিটা খুললে হয়তো আমি অনেক উত্তর পেয়ে যাব। বুঝতে পারব কেন? তারা আলাদা ঘরে থাকত। হয়তো এও জানব যে, মা বাবাকে ঘৃণা করত কি না। অথবা কিছুই তেমন নেই ভেতরে। নেহাত মামুলি দৈনন্দিন বাজারের হিসেব, প্রেসারের ওষুধের নাম, কারও কারও ফোন নম্বর।

তবে যাই থাক, শেষ পর্যন্ত আমি ডায়েরিটা খুললাম না।

 কারণ সত্যি কথা বলতে—আমি ভয় পাচ্ছিলাম! আমার সারা জীবনের পরিবারটাকে নতুন করে দেখতে হবে; এই ভয়। মানুষ একটা বয়সের পর বুঝতে পারে তার বাবা-মা শুধু ‘বাবা‘ আর ‘মা‘ নয়, তারা এক একজন আলাদা আলাদা মানুষও ছিল।

তাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ছিল। অপূর্ণতা ছিল। হয়তো অন্য কারও প্রতি আকর্ষণও ছিল। হয়তো গভীর একাকিত্বও ছিল। এবং সেই জায়গাগুলোয় সন্তানের প্রবেশাধিকার নেই সবসময়। 

আমি ডায়েরিটা রেখে দিলাম, ঠিক আগের জায়গায়।

তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে একবার চারদিকে তাকালাম। খুব অদ্ভুতভাবে মনে হলো, আজ আমি মাকে প্রথমবার যথাযথ একটা সম্মান জানালাম।

সব জানার নাম ভালোবাসা নয়। কিছু কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো।

করিডরে বেরিয়ে এলাম।

দুটো ঘরের মাঝখানের এই সরু জায়গাটায় আমি আগে কখনো এভাবে দাঁড়াইনি। আজ হঠাৎ মনে হলো এই করিডরটা একটা জায়গা — বাবার ঘর আর মায়ের ঘরের মাঝখানে, যেখানে দুজনের কেউই কখনো বেশিক্ষণ থাকেনি। পেরিয়ে গেছে শুধু।

বাবার ঘরের দরজাটাও আধখোলা। ভেতরে শুধু একটা খালি খাট। ওষুধের গন্ধ নেই। কাশিরও শব্দ নেই আর।

আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। বাইরে আলো পড়ে আসছিল। করিডরের মেঝেতে একটা লম্বা ছায়া পড়েছে — আমার নিজের।

দুটো আলাদা ঘর। দুজন মৃত মানুষ।

আর আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি— তাদের সন্তান হয়ে নয়, প্রথমবার দুজন মানুষকে বোঝার চেষ্টা করতে থাকা আরেকজন মানুষ হয়ে।

বাইরে বিকেল নামছে…

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *