Email: info@kokshopoth.com
May 18, 2026
Kokshopoth

প্রবন্ধঃ দেওয়ান বাদল

May 15, 2026

প্রবন্ধঃ দেওয়ান বাদল

জন্ম: ১৯৬৬, চর আশুতোষপুর, পাবনা, বাংলাদেশ। পেশা : শিক্ষকতা, নেশা: শিশু সাহিত্য, চলচ্চিত্র পরিচালনা ও  গবেষণা, গান রচনা। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর তালিকাভুক্ত গীতিকার।

 

কবিতায় ইমেজারি

 

ইমেজ—এর বাংলা প্রতিশব্দ চিত্রকল্প। তবে কেউ কেউ চিত্রকল্পের পরিবর্তে বাকপ্রতিমা, ভাবরূপচিত্র, মানস প্রতিবিম্ব প্রভৃতি শব্দও ব্যবহার করতে চান। কবিতার প্রাচীন অলংকারশাস্ত্রে চিত্রকল্প কোনো অলংকার হিসেবে স্থান পায়নি, যদিও কবিতায় চিত্রকল্প সৃষ্টির ব্যাপারটি বহু প্রাচীন। অথচ চিত্রকল্পের ধারণাটি  জন্মেছে আধুনিক কালে। কবিতায় চিত্রকল্পের প্রাধান্যকে কেন্দ্র করে প্রথম  ইমেজিস্ট মুভমেন্ট বা চিত্রকল্পবাদী আন্দোলন’—এর সূত্রপাত হয় পাশ্চাত্যে ১৯১০ সালে, কবি ও তাত্ত্বিক এজরা পাউন্ডের নেতৃত্বে। এই আন্দোলনে (১৯১০— ১৯১৭) আরও যুক্ত ছিলেন এমি লাওয়েল, টি ই হিউম, উইন্ডহাম লুইস, এফ এম ফ্লিম, ডি এইচ লরেন্স, জেমস জয়েস, টিএস এলিয়ট প্রমুখ। পাশ্চাত্যের চিত্রকল্পবাদী আন্দোলনের হাত ধরেই বাংলা কবিতায় আসে তিরিশি আন্দোলন। তিরিশি আন্দোলনকারিগণও চিত্রকল্পকে কবিতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গণ্য করতেন।  এর প্রভাব এখন আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কবিদের মধ্যেও বেশি প্রবল হয়ে উঠেছে।

অনেকেরই ধারণা কবিতায় শব্দ দিয়ে সৃষ্ট সব চিত্রই চিত্রকল্প। কিন্তু এধারণা ঠিক নয়। আসলে চিত্র ও  চিত্রকল্পের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কী পার্থক্য রয়েছে? তা এখন একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক।

কবিতায় ব্যবহৃত চিত্র যদি পাঠককে কেবল সেই চিত্রের দৃশ্যই উপহার দেয়, পাঠকের চেতনাকে যদি আলোড়িত না করে অর্থাৎ তা যদি পাঠককে বাড়তি কিছু ভাবতে উদ্বুদ্ধ না করে, তাহলে সেই চিত্রকে শুধুই ‘চিত্র’ বলা যায়, চিত্রকল্প নয়। কিন্তু কবিতায় অঙ্কিত চিত্রের দৃশ্যের সঙ্গে কোনো ভাবনা অর্থাৎ কোনো প্রতিতুলনাজাত অলংকার যুক্ত হয়ে যদি দৃশ্যকে ছাড়িয়ে অতিরিক্ত কিছু দান করে, পাঠককে তা যদি দৃশ্যের বাইরেও ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে, পাঠকের চেতনাকে যদি প্রসারিত করে, তখন তাকে ‘চিত্রকল্প’ বলা হয়। কয়েকটা কবিতা থেকে উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা আরও পরিষ্কার করা যাক-

 ক.  আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর

থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর

পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই

একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই।

(বন্দে আলী মিয়া: আমাদের গ্রাম”)

খ.  শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরে কচুর পাতায়, আমগাছে,

     কাঁঠাল গাছের নিচে, সবুজ ধঞ্চের পাতাগুলো

     ভিজে উঠে, সারা মাঠে, সংসারের আনাচে—কানাচে

     অঝোর বৃষ্টির ধারা ঝরে যায়, কাদা হয় ধূলো।

         (ওমর আলী: শ্রাবণের বৃষ্টি’)

 

     গ. এক কোণে নিস্তেজ কুপিটা কোনো বিলুপ্ত প্রেমের মতো

         জ¦লছে এক বিষণ্ণ আচ্ছন্নতায়।

       (শামসুর রাহমান:‘সেই ঘোড়াটা’)

      ঘ. দুরন্ত এক বাতাস নাড়ে বুনো—চালতা ফল—হৃদয় যেন।

         (সৈয়দ শামসুল হক: বুনো বৃষ্টির গান’)

ক—সংখ্যক চিত্রটি একটি ছোট গ্রামের নিত্যদিনের জীবনকে ধারণ করেছে এবং খ—সংখ্যক চিত্রে আছে  শ্রাবণের বৃষ্টি ভেজা গ্রামবাংলার দৃশ্য। এ চিত্রগুলো পাঠককে কেবল দৃশ্যই উপহার দেয়, বাড়তি কিছু ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে না। এগুলো ক্যামেরা চিত্রের মতো পরিবেশের বিশ্বস্ত চিত্র। এধরণের চিত্রকে শুধুই চিত্র বলা যায়, চিত্রকল্প নয়। গ ও ঘ—সংখ্যক চিত্র দুটি চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে । কারণ এগুলো দৃশ্যকে ছাড়িয়েও  একটি ভাবনা পাঠকের চেতনাকে প্রসারিত করে। গ—সংখ্যক চিত্রকল্পটিতে বিলুপ্ত প্রেমের সঙ্গে নিস্তেজ কুপির  প্রতিতুলনায় উপমা ব্যবহৃত হয়েছে এবং  ঘ—সংখ্যক চিত্রকল্পটিতে চালতা ফলের সঙ্গে হৃদয়ের প্রতিতুলনায় উৎপ্রেক্ষা ব্যবহৃত হয়েছে, আর দুরন্ত বাতাস প্রেমের প্রতিতুলনা। এখন আমরা সহজেই বুঝতে পারি চিত্রকল্প সাধারণ চিত্র বা ছবি নয়, কবিতার চিত্রকে তার অন্তর্গত শক্তির জোরে চিত্রকল্পে রূপান্তরিত করেন কবি।

 

চিত্রকল্প একজন কবির জন্য খুবই প্রয়োজনীয়, কারণ কবিকে চেনা যায় তার চিত্রকল্পে। এখানে কবি ও গবেষক সরকার আমিন এর উক্তি প্রণিধানযোগ্য- চিত্রকল্প হচ্ছে কবিতার হৃদয়। মানব দেহের রক্তপ্রবাহে হৃদপিন্ড যেমন বিশেষ অবদান রাখে, তেমনি কবির বিশেষ ভাবকে কবিতায় সম্পৃক্তায়ন ও সঞ্চালন করার কাজে চিত্রকল্প পালন করে অতুলনীয় দায়িত্ব। চিত্রকল্পকে কবির অনন্য বোধ ও কল্পনার অভিব্যক্তি বা ভাবমূর্তি বলেও অবিহিত করা যায়।(সরকার আমিন, ২০০৬: ১)। হুমায়ুন আজাদের ভাষায় পাউন্ডের অতিশয়োক্তি “বিপুল পরিমাণ রচনাবলীর চেয়ে সারাজীবনে একটি মাত্র চিত্রকল্প উপহার দেওয়া শ্রেয়।” টি ই হিউম থেকে উদাহরণ দিয়ে তিনি আরও জানান-টিহিউমের বিখ্যাত চিত্রকল্প চাঁদ। হেমন্তি চাঁদকে তিনি দেখেছিলেন খেলাশেষে শিশুদের ফেলে—যাওয়া বেলুনরূপে।(হুমায়ুন আজাদ, ২০১৪: ২২৭)। কুন্তল চট্টোপাধ্যায়ের অভিমত- সার্থক চিত্রকল্প এমন এক মেটাফরধর্মী চিত্ররূপ,যা প্রথাগত সাদৃশ্যকে অতিক্রম করে পাঠককে চালিত করে ব্যঞ্জনার্থের দিকে দুঃসাহসিক গভীরতায়। যথার্থ চিত্রকল্প নিছক  সজ্জাসর্বস্ব কিংবা ‘decorative নয়, তা ক্রিয়ামূলক বা functional দৃশ্য—শ্রুতি—ঘ্রাণ—স্পর্শ— স্বাদের ইন্দ্রিয়- সংবেদনকে আশ্রয় করে কবি শব্দের এই জটিল যৌগ নির্মাণের কাজটি সম্পন্ন করেন, শব্দের অন্তর্নিহিত সংকেত—ধর্মিতাকে অভাবিত সৃজনী মাত্রায় চিহ্নিত করেন। (কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ২০০১: ১৫০)।

চিত্রকল্প আলাদা কোনো অলংকার নয়, কোনো প্রতিতুলনাজাত অলংকার অর্থাৎ উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, সমাসোক্তি, অন্যাসক্ত  এগুলোর কোনো একটি বা দুটি বা তারও অধিক—সংখ্যককে আশ্রয় করে চিত্রকল্প গড়ে উঠতে পারে। তবে যে—প্রতিতুলনাজাত অলংকারকে অবলম্বন করে চিত্রকল্প গড়ে উঠে, তা সেই—অলংকারবাহী চিত্রকল্প বলে গন্য হয়। যেমন: উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, সমাসোক্তি, অন্যাসক্ত প্রভৃতিকে আশ্রয় করে গড়ে উঠা চিত্রকল্প যথাক্রমে  উপমাবাহী চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষাবাহী চিত্রকল্প, রূপকবাহী চিত্রকল্প, প্রতীকবাহী চিত্রকল্প, সমাসোক্তিবাহী চিত্রকল্প, অন্যাসক্তবাহী চিত্রকল্প। কবিতা থেকে উদাহরণ দিয়ে দেখানো যাক:

ক. অন্ধকার হই আর প্রায়অন্ধ দুটি চোখ তুলে

    নির্বোধ পশুর মতো চেয়ে থাকি;

   ( আহসান হাবীব :স্বরূপে মহিমা তার’)

খ. হীরের প্রদীপ জে¦লে শেফালিকা বোস যেন হাসে

    হিজল ডালের পিছে অগনন বনের আকাশে ।

    (জীবনানন্দ দাশ: ‘হরিণেরা’)

গ. তার সে বুকের নাক্ষত্রিক অলিন্দে আর

    চোখের বাগানে হাতের মহলে অবক্ষয়ের

    দারুণ বেলায় কার অধিকার?

    (শামসুর রাহমান : কতোবার ভাবি)

ঘ. খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে

   (কাজী নজরুল ইসলামের একটি গানে ব্যবহৃত)

ঙ. অবাক রাতের তারারা আকাশে মিটমিট করে চায়

    যেমন করে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায়।

    (সুকান্ত ভট্টাচার্য: ‘রানার‘)

চ. আমি দাঁতে ছিঁড়ে চলি সারারাত

    শব্দের—শুধু শব্দের অনুপম ঘাস।

    (সৈয়দ শামসুল হক: চিত্রকর কিবরিয়ার পটে ঘোড়াটিকে দেখে’ )

ছ. এবং হঠাৎ

    সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে

   বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম।

   (শহীদ কাদরী:বৃষ্টি, বৃষ্টি’)

জ. রাতের পাহাড় থেকে

    খ‘সে যাওয়া পাথরের মতো

    অন্ধকার ধ্বসে ধ্বসে পড়ছে।

    দু‘ হাতে সরিয়ে তাকে নির্বিকার নিরুত্তাপ মন এগুলো

    দু‘পাশের পায়ে—চলা পথে

    এখনো ঘুমের স্রোত মরেনি,

    পড়ে আছে কুন্ডলী পাকিয়ে

     এখানে— ওখানে।

     তারা ভরা আকাশকে কাঁপিয়ে

     শাদা কাফনের সঙ্কেত।

    (আহসান হাবীব: রেড রোডে রাত্রি শেষ)

 

ক— সংখ্যক উদ্ধৃতিটি উপমাবাহী চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে,কারণ এতে নিবোর্ধ পশুর অসহায় দৃষ্টির সঙ্গে কবির সহায়হীন দৃষ্টির প্রতিতুলনায় উপমা ব্যবহৃত হয়েছে।খ— সংখ্যক উদ্ধৃতিটিতে শেফালিকা বোস — এর সঙ্গে সুন্দর আকাশ এর প্রতিতুলনায় উৎপ্রেক্ষা ব্যবহৃত হওয়ায় এটি উৎপ্রেক্ষাবাহী চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে।গ— সংখ্যক দৃষ্টান্তটি রূপকবাহী চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে। কারণ এতে ‘বুকের নাক্ষত্রিক অলিন্দ এসব রূপক ব্যবহারে প্রেমিকের বুক পেয়েছে প্রসারিত অলিন্দরূপ, ছোখ হয়ে উঠেছে বাগান, হাত রূপন্তরিত হয়েছে মহলে অর্থাৎ এক বস্তু গ্রহণে করেছে অন্য বস্তুর রূপক শোভা। ঘ—সংখ্যক উদ্ধৃতিটিতে উপমেয় ‘ঈশ্বর’ অনুপস্থিত থাকায় এটি প্রতীকবাহী চিত্রকল্প হয়েছে। ঙ— সংখ্যক উদ্ধৃতিটিতে তারার অবাক হওয়া, মিটমিট করে চাওয়া এর কোনোটাই তারার ক্রিয়া নয়। মানুষের ক্রিয়াকে তারার উপর আরোপ করা হয়েছে অর্থহারা সমাসোক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। এ কারণে এটি সমাসোক্তিবাহী চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে। চ— সংখ্যক উদ্ধৃতিটিতে ‘অনুপম ঘাস’ এই সাধারণ অন্যাসক্ত নিয়ে কবির সঙ্গে ঘোড়ার প্রতিতুলনায় এটি অন্যাসক্তবাহী চিত্রকল্প হয়েছে।

ছ— সংখ্যক দৃষ্টান্তে উপমা ও উৎপ্রেক্ষা ব্যবহৃত হওয়ায় এটি উপমা ও উৎপ্রেক্ষাবাহী চিত্রকল্প হয়েছে। জ— সংখ্যক উদ্ধৃতিটিতে উপমা, রূপক ও সমাসোক্তি ব্যবহারে এটি উপমা, রূপক ও সমাসোক্তিবাহী চিত্রকল্প  হয়ে উঠেছে।

চিত্রকল্প দৃষ্টি, শ্রবণ, স্পর্শ, গন্ধ, স্বাদ এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের কাছে আবেদন করে। এসব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যকে নির্ভর করে চিত্রকল্পকে যে কয় ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলো হলো: দৃষ্টি নির্ভর চিত্রকল্প, ধ্বনিরূপময় চিত্রকল্প, স্পর্শরূপময় চিত্রকল্প, ঘ্রাণেন্দ্রিয়ময় চিত্রকল্প, স্বাদ—ইন্দ্রিয় চিত্রকল্প। দৃষ্টিনির্ভর চিত্রকল্প: এধরণের চিত্রকল্পের আবেদন দৃষ্টির কাছে, তবে সব ধরণের চিত্রকল্পেই দৃশ্য থাকে। ধ্বনিরূপময় চিত্রকল্প: যে চিত্রকল্পের আবেদন শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের নিকট, তা হলো ধ্বনিরূপময় চিত্রকল্প। এধরণের চিত্রকল্পে পাঠক দৃশ্যের সঙ্গে একটি ধ্বনিত্ত শুনতে পান। স্পর্শরূময় চিত্রকল্প: এ জাতীয় চিত্রকল্প পাঠককে দৃশ্যের সঙ্গে একটি স্পর্শের অনুভূতি দান করে।ঘ্রাণেন্দ্রিয়ময় চিত্রকল্প: যে চিত্রকল্পে ব্যবহৃত বস্তুর ঘ্রাণ পাঠকের ইন্দ্রিয়ে অনুভূত হয় তা হলো ঘ্রাণেন্দ্রিয়ময় চিত্রকল্প।স্বাদ—ইন্দ্রিয়ময় চিত্রকল্প: এধরণের চিত্রকল্পে বর্ণির্ত বস্তুর স্বাদ পাঠকের ইন্দ্রিয়ে অনুভূত হয়।

কেউ কেউ চিত্রকল্পকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে থাকেন: দৃশ্যমান চিত্রকল্প, অদৃশ্যমান চিত্রকল্প ও বিমূর্ত চিত্রকল্প। কল্পবাদী আন্দোলন পূর্ববতীর্ কবিতায় শুধুমাত্র দৃশ্যমান চিত্রকল্প সৃষ্টির প্রবণতা ছিলো। চিত্রকল্পবাদী আন্দোলন পরের কবিতায় দৃশ্যমান চিত্রকল্পের পাশাপাশি অদৃশ্যমান চিত্রকল্প ও বিমূর্ত চিত্রকল্প দেখা যায়। কারও কারও মতে চিত্রকল্প দু’ধরণের হয়ে থাকে: প্রত্যক্ষ চিত্রকল্প  ও পরোক্ষ চিত্রকল্প। প্রত্যক্ষ চিত্রকল্প কবিতার শরীরে পরিস্ফুট থাকে, আর পরোক্ষ চিত্রকল্প থাকে গুপ্ত।

চিত্রকল্প কবিতার অনিবার্য উপাদান, কারণ এর কাব্যিক লক্ষ, সৌন্দর্যময়তা ও শৈল্পিক উত্তরণের দিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে চিত্রকল্পের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কবিতায় কোনো প্রতিতুলনাজাত অলংকারের চেয়ে চিত্রকল্প বেশি শক্তিশালী, যদিও কোনো প্রতিতুলনাজাত অলংকার ছাড়া চিত্রকল্প গড়ে উঠতে পারে না। অথচ কোনো প্রতিতুলনাজাত অলংকার ব্যবহারে কবিতার কেবল বহিরাঙ্গের  সৌন্দর্য প্রকাশ পায়, কিন্তু  চিত্রকল্প ব্যবহারে ভিতর ও বাহির উভয় অঙ্গের সৌন্দর্যই ধরা দেয় পাঠকের রোধে অথার্ৎ চিত্রকল্প চোখ ও হৃদয় দুটোকেই আবিষ্ট করতে পারে। পাশ্চাত্যে চিত্রকল্পবাদী আন্দোলোনের পর ‘চিত্রকল্পই কবিত্ব’ এই বিশ্বাস এখন সারা বিশ্বেই সমাদৃত।  এর প্রেক্ষিতে তিরিশি আন্দোলনের পর বাংলা কবিতার অগ্রযাত্রায় বর্তমান কালেও সবার আরাধ্য হয়ে উঠেছে চিত্রকল্প। তবে আমাদের কবিতায় চিত্রকল্প ব্যবহারের আধিক্য থাকলেও কিন্তু প্রকৃত চিত্রকল্পবাদী কবিতা খুবই বিরল। কারণ চিত্রকল্পবাদী কবিতা বলতে যা বুঝায় তা হলো কবিতায় ব্যবহৃত সকল চিত্রকল্প  মিলে একটি মালার মতো গেথে পুরো কবিতাই হয়ে উঠবে একটি চিত্রকল্প, আমাদের কবিতায় যার উপস্থিতি খুবই কম। বাংলা কবিতায় চিত্রকল্পবাদী কবিতায় উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’।  চিত্রকল্পবাদী কবিতাই হোক, আর কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহারই হোক; চিত্রকল্প ছাড়া ঋদ্ধ হয় না কবিতা।

 

তথ্যসূত্র:

১.       আনোয়ার, আবিদ (২০০৫)। চিত্রকল্প ও বিচিত্র গদ্য। আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

২.       সরকার আমিন (২০০৬)। বাংলাদেশের কবিতায় চিত্রকল্প। বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৩.       হুমায়ুন আজাদ (২০১৪)। শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা। আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৪.       আবিদ আনোয়ার(২০১৫)।আমাদের আধুনিক কবিতার দুই দশক বরেণ্য কবিদের নিমার্ণকলা। আগামী প্রকাশনী, ঢাকা ।

৫.       আনোয়ার, আবিদ (২০০৪)। বাংলা কবিতার আধুনিকায়ন আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৬.       নরেন বিশ্বাস (২০০২)অলংকার অন্বেষা। অনন্যা, ৩৮/২ বাংলা বাজার, ঢাকা।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *