Email: info@kokshopoth.com
April 28, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক

Apr 24, 2026

 গদ্য

তৃষ্ণা বসাক

যুদ্ধ ও মেয়েরা

 

‘হুঁ, যুদ্ধের বছরগুলি। ভাবলেই মনে হয় সবসময় যেন বৃষ্টি  পড়ত। আসলে তা নিশ্চয় নয়, তখনো নিশ্চয় রোদ – টোদ উঠত। আমার কিন্তু খালি বৃষ্টি পড়ার কথাটাই  সর্বাগ্রে মনে পড়ে। ওয়েলিংটন বুট পরে বেরোতাম। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকতাম। ঢুকেই ভিজে জুতোজোড়া ছেড়ে ফেলতে হত। তারপর পা গরম করতাম। কখনো কখনো আমার প্র্যামটাতে উঠে বসতাম, কম্বলে ভালো করে পা মুড়ে বসে থাকতাম। সেটা নিঃসন্দেহে আমার মাতৃজঠরে ফিরে যাবার ইচ্ছেটাকেই প্রকাশ করত পরোক্ষে। বিছানাতেও  ওপর কম্বল টেনে একটা নরম গরম অন্ধকার নিরাপদ জায়গা সৃষ্টি করে নিতাম। এখনো তো আমি জ্যাকের সঙ্গে অন্ধকার কোনাকাঞ্চিতে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে উত্তাপ পোহাতে আর আদর বিনিময় করতে ভালবাসি-‘

 

(নোটন নোটন পায়রাগুলি/ কেতকী কুশারী ডাইসন)

 

হ্যাঁ নরম গরম অন্ধকার নিরাপদ জায়গা, মাতৃজঠরের মতো। সেখানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে একটা গণহিস্টিরিয়ায় পরিণত হয়েছিল যুদ্ধোত্তর দিনগুলিতে। তারই ফলশ্রুতি বেবি বুম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী শিশু জন্মের হারকে ছাপিয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এর পেছনে কি আপাতত শান্তিকল্যাণ? অর্থনীতির বাড়বাড়ন্ত? ঐতিহাসিক  এলেন টাইলার মে ‘হোমওয়ার্ড বাউন্ডঃ আমেরিকান ফ্যামিলিজ ইন দা কোল্ড ওয়ার এরা’ – বইতে কিন্তু অন্য কারণ দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন এর পেছনে আছে ধবংস, হতাশা, নিউক্লিয়ার  ওয়ার থেকে পালানোর মনোবৃত্তি। আর পালিয়ে মানুষ ফিরতে চেয়েছে মাতৃজঠরের মতো উষ্ণ পারিবারিক আশ্রয়ে, প্রেয়সীর বাহুবন্ধনে।

‘Americans turned to the families a bastion of safety in an insecure world… cold war ideology and the domestic revival  were two sides of the same coin’

আর এর অব্যবহিত ফল এসে পড়ল মেয়েদের জীবনে। যারা যুদ্ধের দৌলতে ক্ষণিকের জন্যে ঘরের বাইরে পা রেখেছিল, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ পেয়েছিল, ভাবতে শুরু করেছিল তাদের স্বাধীনতার স্বর্ণযুগ সমাগত বুঝি, তাদের স্বপ্নভঙ্গ হল। তারা বুঝতে পারল আসলে যুদ্ধে চলে যাওয়া পুরুষদের ফাঁকা জায়গাটা সাময়িক ভরাট করতেই তাদের ডাকা হয়েছিল, যুদ্ধ থেকে ছেলেরা ফিরে আসতেই শুধু পুনর্মূষিক ভব হল না, গৃহলক্ষ্মীর ভূমিকাটা যেন আরও গৌরবমণ্ডিত করা হল খুব সুচতুরভাবে। গৃহকর্ত্রী ছাড়া গৃহের সুরক্ষা বলয় কেই বা নির্মাণ করবে? বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, টেলিভিশন শো, শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র , ‘ডিক অ্যান্ড ডেন’ সিরিজের বই- সব জায়গায় গরিমা পেল রমণীয়, ঘরেলু মা এবং সকাল থেকে রাত  বাড়ির বাইরে থাকা পুরুষেরা।

‘মোর ওয়ার্ক ফর মাদারস’ গ্রন্থে রুথ শোয়ার্জ কাওয়ার দেখিয়েছেন সেইসময় কেরিয়ার করতে চাওয়া মেয়েদের কীভাবে ব্যঙ্গ করা হত, তাদের ডাকা হত ‘আনলাভ্লি ওম্যান’ ‘লস্ট’, ‘সাফারিং ফ্রম পেনিস এনভি’, ‘রিডন উইথ গিল্ট কমপ্লেক্সেস’, ‘ম্যান-হেটিং’ এইসব বিশেষণ জুড়ে।

যুদ্ধোত্তর এই গৃহকেন্দ্রিকতার অবশ্য কারণ ছিল, গ্রাহ্য কারণ। যে অবর্ণ্নীয় ক্ষতি, মৃত্যু, বেদনা, অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে মানুষ গিয়েছিল, তাতে গৃহমুখী হয়ে পড়াই তো স্বাভাবিক। যুদ্ধ, পরিবারের আশ্রয় যে ঘর, তার স্বাভাবিক চেহারাটাই বদলে দিয়েছিল।

‘প্রত্যেক রাতে… জানলার ওপর করাগেটেড ধাতুর পর্দা দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হত। গেটের কাছে একটা গাছে কতকগুলো চাক্তি ঝুলিয়ে রাখা হত রাতে। যাতে বোমা পড়লে এয়ার রেড ওয়ার্ডেনরা জানতে পারে কটা লাশ খুঁজে বার করতে হবে। ভোরে দুধের বোতলের সঙ্গে সঙ্গে চাক্তিগুলোকেও ঘরের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হত। রাতে তো সর্বদাই ব্ল্যাক আউট থাকত, রাস্তাগুলো নিষ্প্রদীপ, সব জানলা ভালো করে ঢাকা, গাড়ির আলো ম্লান করে দেওয়া। তাছাড়া সেকালে তত গাড়িও ছিল না। বাসের জানলায় পুরু হলদে কাগজ সাঁটা থাকত, যাতে কাঁচ ভেঙ্গে যাত্রীদের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে না পড়ে। রাতে সাইরেন শুনলেই আমাদের  নিচে নেমে আসতে হত। কত রাতে আমি দাদার হাত ধরে নিচে নেমে এসেছি।  এখনো তাই যেকোন সাইরেন শুনলেই আমার গা দিয়ে ঠান্ডা ঘাম ছোটে। আমি একজন মহিলাকে চিনি, যুদ্ধ শুরু হবার সময়ে যাঁর বয়স ছিল বারো। তিনি বলেন যুদ্ধ তাঁর প্রজন্মকে একদম নষ্ট করে দিয়েছে, তার কারণ যুদ্ধের সময়ে তাঁদের দিনগুলো কাটত অতিরিক্ত উত্তেজনার মধ্যে, যেন জীবনটা একটা রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার। একটা দিন থেকে আরেকটা দিনে পৌঁছতেই কত টেনশনের মধ্যে দিয়ে যেতে হত, আগামী কালের মুখটা আদৌ দেখা যাবে কিনা তারই স্থিরতা থাকত না। এত কাণ্ডের পর বাকি জীবনে যা ঘটল তা সবই বিস্বাদ, সবই আশাভঙ্গ, অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স যেন।‘

 

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পরও তো তার মাশুল গুণে চলতে হল সারা পৃথিবীকে। হারিয়ে গেল পুরনো ঠিকানা।

‘যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর আমরা একটা বিরাট বাড়িতে উঠে গেলাম মনে পড়ছে। সেই বাড়িটার চারদিকে অনেক বাড়িই বোমায় নষ্ট হয়ে গেছিল । শুধু ওই বাড়িটা রেহাই পেয়েছিল, কিন্তু পুরোপুরি নয়, ক্ষতির চিহ্ন অনেক ছিল, ছিল অনেক ফাটল। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি বলে ভাড়া কম ছিল’

 

কিংবা ‘আমরা যখন গাঁয়ে তখন বেলফাস্টে আমাদের দোকান আর বাড়িতে বোমা পড়ে।  ভাগ্যিস আমরা পালিয়ে গেছিলাম, নয়তো সবাই স্বর্গে যেতাম, যুদ্ধের শেষে ফিরে এসে দেখি আমাদের সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে’

এই ছাইয়ের ওপর নতুন করে সংসার পাততে গিয়ে বাড়ির মেয়েদের অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হল। তাছাড়া বোমার ভয়ে গাঁয়ে পালানো পরিবারের মেয়েদের মানিয়ে নিতে হল গ্রামের পরিবেশে। সব কিছু আক্রা, তাই শুরু হল রেশনিং।

‘… খাবারের, পোশাকের, কয়লার তাছাড়া বিদ্যুতের ঘাটতিও ছিল, ফলে সর্বদা ঠান্ডায় জমে হিম হয়ে থাকতাম। ঠান্ডার স্মৃতিটা বড় প্রখর’

আর এই পোশাকের রেশনিং এক ধাক্কায় মেয়েদের স্কার্টের ঝুল কমিয়ে ফেলল অনেকখানি। ফ্যাশনের তাড়না নয়, নেহাত কাপড়ের অভাবের জন্যেই চালু হল মিনি স্কার্ট। যুদ্ধ শুরু না হলে তাকে হয়তো অপেক্ষা করতে হত আরও দু এক দশক।

পৃথিবীর উল্টোপিঠে বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব পরোক্ষভাবে পড়েছিল। সেই সময়ের বাংলা সাহিত্যে জাপানি বোমার ভয়ে গ্রামে পালানোর ভুরি ভুরি উদাহরণ মিলবে। যেমন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বেচারি’ গল্পটি-

‘কলিকাতায় বোমার হাঙ্গামা উপলক্ষে বহুদিনের কলিকাতা-বাস ত্যাগ করিয়া সপরিবারে গিয়া ভগ্নীপতির বাড়িতে আশ্রয় লইয়াছি। একেবারে অজ পাড়া গাঁ। রেলস্টেশন হইতে সাত ক্রোশ রাস্তা হাঁটিয়া অথবা গরুর গাড়িতে গেলে গ্রামে পৌঁছনো যায়। ভগ্নীপতিদের মেটে বাড়ি, তাহাদেরই স্থান সংকুলান হয় না। তবে বিপদের দিনে, আপাতত বোমায় মরিতে বসিয়াছি দেখিয়া তাহারা নিজেদের অসুবিধা করিয়াও বাহিরের ঘরখানি আমাদের জন্য ছাড়িয়া দিল’

পরিবারের কর্তা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন বহুদিন কলকাতায় থেকেও বাড়ি করার সঙ্গতি হয়নি বলে। কারণ ‘জাপানি বোমার ঘায়ে সে বাড়ি কতদিন টিকিত? আমার যেসব বন্ধুবান্ধবকে কলিকাতায় বাড়ী করিবার জন্য এতদিন হিংসা করিতাম, আজ তাহাদের প্রতি সে হিংসার ভাব করুণা ও  সহানুভূতিতে পরিণত হইল। বেচারীদের পয়সাগুলো অনর্থক নষ্ট হইল’

প্রথম প্রথম তাঁর স্ত্রী গ্রামের প্রকৃতি দেখে পুলকিত, বনের মধ্যে প্রচুর চালতা এমনি পড়ে আছে দেখে তাঁর উচ্ছ্বাস বাঁধ মানে না।

‘আমার স্ত্রী শহরের মেয়ে, পাড়াগাঁয়ের বনে বাগানে পাকা চালতা শীতকালে পড়িয়া থাকা বিশেষ আশ্চর্যের কথা নয়, তাহা না বলিয়া তাঁহার আনন্দটাকে আরও ঘনীভূত হইবার অবকাশ দিবার জন্য দুজনে বনের দিকে ছুটিয়া গেলাম’

অবশ্য শীতকালের পরে গ্রীষ্ম, অবশেষে যখন ভয়াবহ বর্ষা এল তাঁর মোহভঙ্গ হতে দেরি হল না।

‘গ্রীষ্মকাল কাটিয়া আষাঢ় মাসের প্রথম সেই যে ভীষণ বর্ষা পড়িল, শ্রাবণ মাস পড়িল, শ্রাবণ মাস যায় সে বর্ষার বিরাম নাই, চারিধার জলে ডুবুডুবু, রাস্তাঘট কাদায় হাবড়, বন জঙ্গলে উঠান ঢাকিয়া গেল। আমার স্ত্রী বলিলেন – ওগো কলকাতায় সবাই ফিরছে, চল আমরাও যাই- এখানে থাকা যায় না। মরি সেখানে বোমা খেয়ে মরব। ভিজে কাঠে উনুন ধরিয়ে আর ফুঁ পেড়ে চোখ কানা হয়ে যাবার যোগাড় হয়েছে, এ আর সহ্য হয় না। ‘

তবু যুদ্ধ মানে শুধু ভিজে কাঠে উনুন জ্বালাবার চেষ্টাই নয়, প্রেমের আগুনও জ্বলে উঠেছিল কোথাও কোথাও। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্পে দেখি আমেরিকান সৈনিকের নীল চোখের যাদুতে জড়িয়ে যাচ্ছে বাঙালি কিশোরী, আর আরও অনেকের লেখায় দেখা যায় এইসব দীর্ঘদিন বাড়িছাড়া সৈনিকদের যৌন ক্ষুধা মিটিয়ে রোজগারের চিরাচরিত রাস্তাও সুগম করেছিল যুদ্ধ। রমাপদ চৌধুরীর ‘ভারতবর্ষ’ গল্পে দেখি সৈনিকদের ছোঁড়া খাবারের জন্যে গোটা গ্রাম কীভাবে ভিখিরি হয়ে গেছিল। ‘সপ্তপদী’ চলচ্চিত্রে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে মিলিটারিতে যোগ দিয়ে মদ্যপান ও পুরুষ সঙ্গ সম্পর্কে পুরনো ধ্যান ধারণা ছেড়ে ফেলতে দেখা যায় রিনা ব্রাউনকে। সমাজ তাকে দেখে খারাপ মেয়ে হিসেবে। অনেক মেয়েই যুদ্ধে মিলিটারি নার্সের কাজ নিয়েছিল। যেমন ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’র পিক্সি মিলিটারি নার্স হিসেবে দিল্লিতে পোস্টেড ছিলেন। বহুদিন পর্যন্ত যুদ্ধে মেয়েদের এটাই জায়গা ভাবা হত- অসুস্থ সৈনিকের সেবা আর তাদের যৌন ক্ষুধা মেটানো। আমাদের মনে পড়তে পারে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে রণাঙ্গনের পেছনে প্রচুর বেশ্যাশিবির ছিল। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ কিন্তু এই ধারণাটাকে অনেকাংশে তছনছ করে দিল।

 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মেয়েদের অবস্থান, অংশগ্রহণ বা তার ফল ভোগ- এসব উঠে এসেছে সেদেশের লেখকদের রচিত সাহিত্যে।

সেলিনা হোসেন তার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাস- এ তুলে ধরেছেন একাত্তরের গ্রামীণ জীবনের চিত্র। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বুড়ি তার একমাত্র সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধে উৎসর্গ করে। শহর থেকে দূরের এক গ্রাম হলদী গাঁয়ের মেয়ে বুড়ি এই উপন্যাসে হয়ে উঠেছে একাত্তরে সন্তানহারা হাজার মায়ের প্রতীক। 

‘বরেন চক্রবর্তীর ‘তামস’ বাংলাদেশের বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতার আলোকে ফিরে দেখা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস। এই উপন্যাসের নায়িকার মধ্যে আমরা দেবী চৌধুরানীর মতো চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখতে পাই। এখানে রোমান্টিকতার পাশাপাশি সামজিক দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম ও চেতনা ও মূল্যবোধের বিষয়টি উঠে এসেছে।

সাগর তীরে পথের ধারে
ঝুপড়ি দালান হাট বাজারে
থানায় থানায় জেলায় জেলায়
নদীর জলে- বনের কাছে
মুক্তি সেনার রক্ত রেখা
সাক্ষী আছে সাক্ষী আছে।
গর্ত ছেড়ে সাপের ছানা
কোন সুযোগ দিচ্ছে হানা
মীরজাফরের প্রেতাত্মারা
কিসের জোরে কোথায় নাচে?
সাক্ষী আছে সাক্ষী আছে।
ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দিতে
রক্ত দলিল পুড়িয়ে দিতে
ফন্দি করে আবার কারা
নকশা বানায় নতুন ধাঁচে?
তন্দ্রাহারা বীর বাঙালীর
বুদ্ধি বিবেক সাক্ষী আছে।
(সাক্ষী আছে : সুকুমার বড়ুয়া)

 

তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতকাল ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতকাল দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?
. . . রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে-
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায়
তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।
(তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা : শামসুর রাহমান)

 

হঠাৎ চব্বিশটি রক্তাক্ত দেহ-রমণী, শিশু, যুবক, প্রৌঢ়-
আমরা দেখতে পাই এক মুহূর্তের জন্যে,
রক্তাক্ত এবং লুণ্ঠিত,
দ্বিতীয়বার আর নয়,
রক্তাক্ত, লুণ্ঠিত এবং প্রাণহীন-
দেয়ালের পায়ের কাছে চত্বরে তারা শুয়ে আছে।
(অন্তর্গত : সৈয়দ শামসুল হক)

 

(বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ, মামুম রশীদ, জুলাই, ২০১৬, চিন্তাসূত্র)

 

 

যে হাত শিশুর দোলনায় দোল দেয়, সে হাত দেশ সামলায়। আর প্রয়োজনে যুদ্ধ কি করে না? ইতিহাস শুধু হেলেন আর দ্রৌপদীদের নিয়েই লেখা হয় না, যাদের জন্যে যুদ্ধ বাধে যুগে যুগে, আছেন চিত্রাঙ্গদা, লক্ষ্মীবাই, দুর্গাবতী, লক্ষ্মী স্বামীনাথনরাও, আছেন আধুনিক যুদ্ধের গ্রেস হপাররা, যারা সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন যুদ্ধে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের ভূমিকায় নয়, বীরাঙ্গনার বেশে। শুধু রক্ত মোছানো নয়, যারা প্রয়োজনে রক্ত ঝরাতেও পারে। তারা রণক্ষেত্র ছেড়ে পালায়নি শত বিপদেও, পিঠে অস্ত্রলেখার অপবাদ কেউ দিতে পারবে না তাদের।

আসলে যুদ্ধে বাহুবলের জায়গায় যত মেধা, প্রযুক্তি ও রণ কৌশলের গুরুত্ব বেড়েছে, ততই সহজ হয়েছে মেয়েদের অংশগ্রহণ। যদিও এখনো শুধু মেয়ে হবার জন্যেই প্রচুর অসুবিধেয় পড়তে হয়। শৌচাগারের অল্ভ্যতা, পুরুষ সহকর্মীর যৌন নির্যাতন, , পদে পদে অপমান- অনেক নারী সেনানীকেই অবসাদ এমনকি আত্মহননের দিকে ঠেলে দেয়। লেফটেন্যান্ট সুস্মিতাকে মনে আছে তো? কেমিস্ট্রির স্নাতক মেয়েটিকে সেনাবাহিনীতে দেওয়া হয়েছিল কিচেন সামলানোর দায়িত্ব, অবসাদের শিকার সুস্মিতা বেছে নেয় আত্মহননের পথ। তবু যুদ্ধে মেয়েরা যাচ্ছেই। ইসলামিক দেশগুলির কোন কোনটিতে আপাদমস্তক বোরখায় ঢাকা নারীর হাতে স্টেন গান – এ দৃশ্য আকছার চোখে পড়ে।

 

দুটি বিশ্বযুদ্ধ, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মেয়েদের জগতটাকে অনেক বড় করে দিয়েছিল। বেশির ভাগ পুরুষ যুদ্ধে চলে যাওয়ায় কলকারখানায় খালি হয়ে যাওয়া পদে প্রচুর মেয়েরা ঢুকতে পেরেছিল। মার্কিন মুলুকে অনেক মেয়েই সরাসরি যুদ্ধের কাজ করেছিল। যদিও বেশিরভাগই সেক্রেটারি, কেরানি, ট্রাক ড্রাইভার, নার্স ও রাঁধুনী হিসেবে। নতুন প্রযুক্তি তাদের খুব কমই ব্যবহার করতে দেওয়া হত। এর মধ্যে একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ওয়াস্প  অর্থাৎ উইমেন এয়ারফোর্স  সার্ভিস পাইলটস। এখানে মেয়েদের মিলিটারি এয়ার ক্র্যাফট চালাতে হত, ছেলেরা যার ফলে নিশ্চিন্তে যুদ্ধে যেতে পারত।

তবে মার্কিন মেয়েদের তুলনায় সোভিয়েত মেয়েদের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি প্রত্যক্ষ। মারিনা রাসকোভার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল নৈশ বোমারু বাহিনী, জার্মানরা এদের ডাকত ‘রাতের ডাকিনী’  বলে । মেশিন গান চালাতে , ন্যাভিগেশনে, যুদ্ধ জাহাজ এমনকি সরাসরি রণক্ষেত্রে বিচিত্র ভূমিকায় প্রায় দশ লাখ সোভিয়েত নারী অংশ নিয়েছিল।

জাপানের মতো  রক্ষণশীল দেশেও যুদ্ধের ধাক্কায় বাইরের জগতে পা রাখার সুযোগ পায়। অস্ত্রকারখানা, ইলেক্ট্রনিক শিল্পে তারা বিপুল সংখ্যায় কাজ করতে থাকে। বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় এদেশের মেয়েদের কর্ম জগতটাও প্রসারিত হয়ে যায়, অচলায়তনে ঢুকে পড়ে খোলা হাওয়া।

কথায় আছে ‘শয়তানকেও তার প্রাপ্য দিতে হয়’। তাই ধবংস , মৃত্যুর প্রান্তর থেকে যে বারুদের গন্ধমাখা বাতাস ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে, জন্ম নিয়েছিল গ্ণ-অবসাদ, আত্ম-বিচ্ছিন্নতা,- সেই যুদ্ধের ঝুলিতে হিরোশিমা নাগাসাকি আর গ্যাস চেম্বার ছাড়াও দুটি সদর্থক জিনিসও ছিল, তা অসবীকার করা যাবে না। একটি আধুনিক কম্পিউটার (এনিয়াক দিয়ে  যার শুরু), অন্যটি নারীর কর্মক্ষেত্রের  সম্প্রসারণ যুদ্ধ আক্ষরিক অর্থেই মেয়েদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে। শুধু রণক্ষেত্রে নয়, শিল্প, কলকারখানায়, বিজ্ঞান প্রযুক্তির গবেষনায় সৃষ্টি করেছে নতুন নতুন কাজের জায়গা, যেখানে বিচিত্র ভূমিকায় মাটি কামড়ে লড়ে যাচ্ছে আজকের নারী।

 

 

তথ্য সূত্র

 

১। প্রযুক্তি ও নারী,   তৃষ্ণা বসাক, ধানসিড়ি

২।নোটন নোটন পায়রাগুলি, কেতকী কুশারী ডাইসন, আনন্দ পাবলিশার্স

৩। বিভূতিভূষণের গল্পসমগ্র

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *