Email: info@kokshopoth.com
April 18, 2026
Kokshopoth

কৌশিক সেন

Apr 17, 2026

 গদ্য

কৌশিক সেন

এক যুদ্ধবাজ কবির খোলা চিঠি

 

শ্রদ্ধেয় সম্পাদক,

আপনি আমাকে আপনার পত্রিকায় যুদ্ধবিরোধী কবিতা লিখতে বলেছেন। লিখব না। কেন লিখব, বলতে পারেন! নিপুণ শব্দযোজনে একটি যুদ্ধবিরোধী কবিতা লিখলেই কি মাঝ আকাশে স্থির হয়ে যাবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলি! যুদ্ধের হিসেবনিকেশ করা গোমস্তারা খেরোর খাতা বন্ধ করে ভাসিয়ে দেবে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় শীতল স্রোতে! আমি যদি অবাক ছন্দ মিলিয়ে একটা মিষ্টি করে যুদ্ধবিরোধী কাব্য রচনা করি, অমনি রক্তলোলুপ হায়নারা ভুলে যাবে তাদের বংশপরিচয়, চেনা অন্ধকার! চোরাপথের লবণস্বাদ ভুলে লক্কাপায়রা উড়িয়ে দেবে রোদঝলমলে আকাশে! সত্যি করে বলুন দেখি, হবে তো তেমন তেমন! যদি না হয়, কেন করব মেধার অপচয়!

 

অবশ্য জানেন, ছোটবেলা থেকেই এই যুদ্ধ ব্যাপারটা মন্দ লাগত না আমার। ফেলে দেওয়া ওষুধের রাংতাকে ঝাঁটার কাঠিতে গুঁজে তৈরি হত ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র। শত্রুপক্ষ বলতে তো জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো ভাইয়েরাই! কি করে শত্রুপক্ষের দুর্ভেদ্য দুর্গকে ছত্রভঙ্গ করতে হবে, তাই নিয়ে সহোদর দুই ভাইয়ে চলতো গভীর শলাপরামর্শ। অবশ্য একান্নবর্তী পরিবারে এসব যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা গোপন থাকতনা কোনোমতেই। আসলে সবই ওই রামানন্দ সাগরের রামায়ণে দেখা রাম রাবণের যুদ্ধ বা বি আর চোপড়ার মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের আফটারম্যাথ এফেক্ট। বেচারা কিশোর বয়সের সুকুমারবৃত্তি!

 

ইতিমধ্যে পরিবারে খবর এলো আর এক কিশোরের যুদ্ধ-দুর্দশার খবর। বাবার মাসতুতো ভাইয়ের একমাত্র পুত্র মনোজ যুদ্ধযুদ্ধ খেলতে গিয়ে একটা পাটকাঠি সটান চোখের ভিতরে। ব্যাস, রক্তারক্তি কাণ্ড। মনোজের ডানচোখ যায় যায় অবস্থা। মনোজের ঠাকুমা, মানে বাবার মাসিমা ছুটে এলেন আমাদের বাড়ি। বাড়ির সন্নিকটে রঘুনাথতলায় প্রাচীন শ্রীরামচন্দ্রের মন্দিরের বিগ্রহকে সোনার চোখ মানত করে বসলেন তিনি। তাঁর যুক্তি, টিভিতে রামায়ণের যুদ্ধ দেখে যদি চোখ জখম হয়, তবে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রই সেই চোখ উদ্ধার করে দেবেন। হ্যাঁ, তাই হল বটে। মনোজ সুস্থ হয়ে গেলে রামনবমীর পুণ্যদিনে মহা ধুমধাম করে রঘুনাথতলায় মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র সোনার চোখ পরলেন। সে এক দৃশ্য বটে!

 

কিন্তু এর কোপ এসে পড়লো বাড়ির গুটিকয় যুদ্ধবাজ কিশোরের ওপর। ঠাকুমা ঝাঁটার কাঠি ভর্তি ভয়ঙ্কর সব আগ্নেয়াস্ত্র ভরা পুরো অস্ত্রাগার ফেলে দিয়ে এলেন আস্তাকুড়ে। বাড়ির বড়রা স্ট্রিক্টলি বলে দিলেন, এইসব সর্বনেশে খেলা বন্ধ।

 

আচ্ছা একটা কথা বলুন দেখি সম্পাদকমশাই, স্বয়ং জর্জ বারনার্ড’শ যখন ‘Arms and the Man’ লিখেছিলেন, তখন কী আর জানতেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের এমন লীলাখেলা! জানলে নিশ্চয় আরও রসিয়ে লিখতেন এই বীভৎসরসের পদচারণা!

 

আপনি আমাকে যুদ্ধবিরোধী কবিতা লিখতে বললেন। আচ্ছা বেশ, নাহয় লিখলামও। একদম নোবেল শান্তি পুরস্কারের মত হিমশীতল সব কবিতা। ঝকঝকে অলিভপাতায় ঢেকে গেল আপনার যুদ্ধবিরোধী সংখ্যাটি। সদ্য তরুণী তাঁর বাবাকে এসে উচ্ছ্বসিত বলবেন, “পাপা, উস কবি নে ওয়ার রুকবা দি!” তারপর! তারপর! ওঁ শান্তি! বলুনতো সত্যি করে! কি হবে! যুদ্ধের শেঠ, নায়েব, গোমস্তা, তহসিলদার, কি হবে এদের! তাঁরা কি এই যুদ্ধবিরোধী সংখ্যাটি পড়তে পড়তে গ্যালন গ্যালন H2O খেয়ে রণে ভঙ্গ দেবেন! তাই আবার হয় নাকি!

 

যদি হয়, হোক তবে! আর এই লেখাটি পাঠের শেষে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি নেমে আসুক এই নীলগ্রহ জুড়ে। কী মশাই, নামবে তো!

 

ভবদীয়

এক যুদ্ধবাজ কবি।

দোসরা চৈত্র ১৪৩২

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *