তিতীর্ষা জোয়ারদার
গদ্য
তিতীর্ষা জোয়ারদার
যুদ্ধঃ ভিতরে বাহিরে
যুদ্ধ কী? যুদ্ধের নৈতিক বা রাজনৈতিক ন্যায্যতা কী? যুদ্ধের কি কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎস রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কারণে তাকে মান্যতা দিয়ে থাকে? দর্শনের গবেষক হিসেবে এই সমস্ত প্রশ্ন মাথার ভিতর ঘোরাফেরা করে। সংজ্ঞা এবং যাথার্থ্য বিচারে না গিয়েই খুব সহজ ভাষায় বলা যায়, যুদ্ধের সঙ্গে ক্ষমতা এবং বৈষম্যের জটিল সমীকরণ রয়েছে । তবে প্রাচীন কাল থেকে যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ। শত শত ক্রন্দনরত শিশুর আর্তনাদ খুব সন্তর্পণে মাটির তলায় চাপা পড়ে গিয়েছে। আমাদের সভ্যতা এবং যুদ্ধের ইতিহাস প্রায় সমসাময়িক, তবে পদ্ধতি এবং ধরণ বদলে যাচ্ছে ক্রমশ । যুদ্ধের নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্নও উঠছে ।
বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা, মধ্য-প্রাচ্য সংকট বা ইউক্রেন- রাশিয়ার প্রবল অস্থিরতা এবং তাতে আমেরিকার ভূমিকা দেখে এই মুহূর্তে আমাদের মাথায় একটাই কথা আসছে ,“যুদ্ধ চাইনা আর!” অনেকেই যদিও পাল্টা উত্তর দেবেন, “শান্তি আনতে যুদ্ধ চাই”। যেমন নীরদ সি চৌধুরী লিখেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভায়াবহ ধ্বংসলীলা যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে শান্তি আনতে সক্ষম হয়েছিল। এই দুইপক্ষের দ্বন্দ্ব দীর্ঘকালীন । তবে এই দু-পক্ষের বাইরেও একটি নতুন শ্রেণী আমাদের সমাজে বিরাজমান, যারা অরাজনৈতিক, নিশ্চুপ । অর্থাৎ এক কথায় বলা চলে কিছু সংখ্যক মানুষ উদাসীন অথবা অজ্ঞানতার অহংকারে নিমজ্জিত ।
“অন্যায়ের পরিস্থিতিতে যদি আপনি নিরপেক্ষ থাকেন, তবে আপনি অত্যাচারীর পক্ষ বেছে নিয়েছেন”— এ কথা আমাদের অজানা নয়। মানুষের নীরবতা হত্যাকারীর সাহসকে খানিকটা বাড়িয়ে দেয়, শান্তির পরিবেশকে করে ফেলে বিঘ্নিত। এই উদাসীনতার অন্যতম কারণ, মানুষের নিজের ভিতরেই সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব। দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, কোনো বিশেষ শুদ্ধ মতে উত্তীর্ণ হতে গেলে, আমাদের বিপরীতধর্মী যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন ও উত্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে । ফলে, মানুষের মনে দ্বন্দ্বমূলক ভাবনা, বা বিভিন্ন মতের ভাবনার অস্তিত্ব, নেতিবাচক দিক নয়। তা মানুষকে যেমন প্রশ্ন করতে শেখায়, তেমনই উত্তরেরও সন্ধান দেয়। তাই ভৌত জগতে যুদ্ধ থামাতে গেলে, মাথার মধ্যে আমাদের প্রশ্নের যুদ্ধকে জাগিয়ে রাখতে হবে। তাকে সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালিতও করতে হবে। বাইরের যুদ্ধ মানুষের তথা সমগ্র প্রাণের অস্তিত্বের সংকট ডেকে আনে, কিন্তু মানুষের অভ্যন্তরে যুদ্ধকে জাগিয়ে রাখলে বাহিরের শান্তি বজায় রাখা সুবিধে হবে। ইসলামে জিহাদ কথাটির অর্থ এক শ্রেণির মানুষ ব্যাখ্যা করেন এইভাবে যে, তা ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু অপর একটি ব্যাখ্যায়, তা আসলে নিজেরই ভিতরের কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। প্রকৃতই যদি জিহাদের এই অর্থকে গ্রহণ করে কেউ, তা শান্তি স্থাপনেরই সহায়ক হবে। একইভাবে হিন্দুধর্মের অচৌর্য, অস্তেয়, শৌচ ইত্যাদি দশটি পন্থা, অথবা বুদ্ধের অহিংসা নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই অর্জন করতে হয়। বিশ্বের প্রতিটি দার্শনিক ঐতিহ্যেই যে ‘ডায়ালগ’ পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা করা হয়েছে, তা কিন্তু অনেকাংশেই নিজের সঙ্গে নিজেরই কথা বলা।
“যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী? না কি কোনো ভাবে যুদ্ধকে পরিহার করা যায়?” এই প্রশ্নগুলো বিভিন্ন কনটেক্সট অনুসারে গড়ে ওঠা জরুরি। প্রতিটি ধারণার ফলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সত্য এবং মত যতক্ষণ আমাদের মাথায় ঘোরাফেরা করবে, যুক্তিশীল প্রাণী হিসেবে মানুষ, নিজেকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংজ্ঞার মান রাখতে পারবে। আমাদের মাথার ভিতর যুক্তির যুদ্ধ বন্ধ হওয়া কাম্য নয় । সমাজে ক্ষমতাপ্রিয় এক শ্রেণির মানুষ জনসাধারণের অবিবেকের সুবিধে নিয়ে পৃথিবীর বুকে যুদ্ধ তখনই ঘোষণা করবে যখন বিকল্প শক্তি হিসেবে পড়ে থাকবে অজ্ঞতা । বহুমাত্রিক বাস্তবতার সাথে মানিয়ে চলার জন্য, বুদ্ধির নমনীয়তা বৃদ্ধি করার জন্য, আবেগিক প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রশমিত করার জন্য , বিভিন্ন চিন্তার মধ্যে সমন্বয় এবং সক্রিয়তা প্রয়োজন । প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে আমাদের যুক্তি এবং আবেগকে ব্যবহার করতে হবে। যে-কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্বিতীয় ধাপ সমাধান দেওয়া, প্রথম ধাপ অবশ্যই সেই পরিস্থিতির নিরিখে সঠিক প্রশ্নগুলো করতে শেখা। বৈরিতা, নীরব শান্তির চেয়েও ভয় পায়, সুদৃঢ় প্রশ্নকে। আমাদের আরও ভাবতে হবে, ভাবা প্র্যাকটিস করতে হবে।
4 Comments
খুব খুব সুন্দর লিখেছেন কবি । অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাই আপনাকে । ভালো থাকুন । আরো আরো ভালো লিখুন । এগিয়ে চলুন ।
এই লেখায় বলা হয়েছে – ভিতরের যুক্তির যুদ্ধ চালু থাকলেই বাইরের যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব। শুনতে আকর্ষণীয়, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এর ফাঁকটা বেশ বড়।
প্রথমত, মানুষ কেবল যুক্তিশীল প্রাণী নয়। মানুষের সিদ্ধান্তের বড় অংশই তৈরি হয় ভয়, স্বার্থ, পরিচয়বোধ এবং ক্ষমতার লড়াই থেকে। ইতিহাসে বহু শিক্ষিত, দার্শনিক মনস্ক মানুষও যুদ্ধকে সমর্থন করেছে,কারণ তাদের “যুক্তি” আলাদা ছিল। তাই “ভিতরের ডায়ালগ” থাকলেই শান্তি আসবে …এটা ধরে নেওয়া সরলীকরণ।
দ্বিতীয়ত, অজ্ঞতাকে যুদ্ধের প্রধান কারণ বলা হলেও, অনেক সময় যুদ্ধ ঘটে সম্পূর্ণ সচেতন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব থেকে। রাষ্ট্র, ক্ষমতা, সম্পদ…এসবের সংঘর্ষে যুক্তি নয় বরং কৌশল কাজ করে। সেখানে সাধারণ মানুষের “প্রশ্ন করার ক্ষমতা” সীমিত, সিদ্ধান্ত নেয় এক ছোট ক্ষমতাবান গোষ্ঠী। উদাহরণ হিসেবে যদি বর্তমান আমেরিকা ইরানের দিকে তাকাই তাহলে বুঝতে পারবো এটা দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে এর লড়াই এখানে সাধারণ মানুষের কোনো ভূমিকা নেই বরং দুই দেশের মানুষরাই এদের সমালোচনা করছে। ফলে সমস্যাটা শুধু “মানুষ ভাবছে না” নয়, বরং কিছু ক্ষমতাশীল মানুষ অন্যদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
তৃতীয়ত, প্রশ্ন করার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সব প্রশ্নই মুক্তির দিকে নিয়ে যায় না। প্রশ্ন কখনো বিভ্রান্তিও তৈরি করতে পারে, কখনো ভাঙনও ডেকে আনে। সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা নিজেই একধরনের জ্ঞান ও শিক্ষার ফল – যা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। তাই “প্রশ্ন করলেই সমাধান” এই ধারণাও অসম্পূর্ণ।
সবশেষে, ভিতরের চিন্তার চর্চা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেটাকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখানো বাস্তবতাকে ছোট করে ফেলে। শান্তি শুধু ব্যক্তিগত আত্মসংলাপ থেকে আসে না , এর জন্য দরকার সামাজিক কাঠামো, ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতার, সম্পদের সুষম বণ্টন। ভিতরের যুদ্ধ আর বাইরের যুদ্ধ – দুটোই আলাদা স্তরের, একটাকে দিয়ে আরেকটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
তাই বলা যায়, চিন্তা ও প্রশ্ন জরুরি…কিন্তু যথেষ্ট নয়। বাস্তব পরিবর্তনের জন্য দরকার চিন্তার সঙ্গে সংগঠন, নীতি এবং কার্যকর সামাজিক পদক্ষেপের সমন্বয়।
একদমই ঠিকঠাক লিখেছেন মূল লেখার পরিপ্রেক্ষিতে। আসলে নরম পপুলিস্ট আবেগ দেখিয়ে যুদ্ধ নিয়ে লেখা একপেশে হয়ে যায়।
লেখাটা শুধু ভালো লাগার মধ্যেই আটকে থাকে না, ভাবতে বাধ্য করে। এত জটিল বিষয়কে এত সহজ অথচ গভীরভাবে তুলে ধরা -সত্যিই মুগ্ধ হলাম।