অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৭
তিস্তা-র ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৭
তিস্তার নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এবং হচ্ছেনও না। উপভোগ করছেন। এ’টুকুই আমাদের প্রাপ্তি।
ওয়েটিং রুম
আজ একটা প্যাথলজির রিপোর্ট নেওয়ার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কাউন্টারে রসিদটা দেখাতে মেয়েটি নাম লিখিয়ে আমাকে কিছুক্ষণ বসতে বলল।
ওয়েটিং রুমটা খুব বড় নয়। দেওয়ালের পাশে সারি করে রাখা হালকা রঙের আরামদায়ক চেয়ার। প্রত্যেকটার মাঝখানে সামান্য ফাঁক, যাতে পাশাপাশি বসা দুজনের খুব বেশি গা ঘেঁষাঘেঁষি না হয়। একটা কৃত্রিম সামাজিক দূরত্ব যেন আগে থেকেই হিসেব করে তৈরি করা। দেওয়ালে দু-একটা ফ্রেমে শান্ত ধরনের ছবি— কোনোটায় সমুদ্রের পাড়, কোনোটায় শিশিরভেজা পাতা। কোণের টবে একটা মানিপ্ল্যান্ট। খুব বড় নয়, কিন্তু বেশ যত্নে রাখা। মেঝের মার্বেল চকচকে ও পরিষ্কার। কোথাও কোনো ধুলোর চিহ্ন নেই। মাথার ওপর এসি চলছে, ঘরটাও বেশ ঠান্ডা। একটা মৃদু সুগন্ধ পুরো ঘর জুড়ে—সম্ভবত কোনো দামি রুম ফ্রেশনারের। সামনে কাচঘেরা একটা কাউন্টার। কাচের ওপারে একজন ভদ্রমহিলা নীরবে কম্পিউটারে কাজ করছিলেন। কাউন্টারের সামনে একটা ছোট লাল রঙের টোকেন মেশিন। তার পাশে দেওয়ালে একটা নির্দেশিকা—‘টোকেন নিয়ে অপেক্ষা করুন।’
নতুন কেউ দরজার লক ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই মেশিনটা থেকে খসখস শব্দ করে এক টুকরো সাদা কাগজ বের হয়ে আসছে। টোকেনের সেই ছোট্ট কাগজটার ওপর ছাপা কালো হরফের সংখ্যাটা হাতে নিয়ে মানুষগুলো ভিড়ের দিকে তাকাচ্ছে। কাচের ওপারে বসে থাকা মেয়েটির চেহারায় কোনো আবেগ নেই। হাজার হাজার মানুষের চিন্তা, উৎকণ্ঠা আর অসুখের খতিয়ান প্রতিদিন তাঁর সামনে এসে জমা হয়। সম্ভবত রোজ এই দৃশ্য দেখতে দেখতে তাঁর কাছে এই অনিশ্চয়তাগুলো স্রেফ একটা সিরিয়াল নম্বর ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ ও ভদ্রমহিলার মাঝখানে কাচের বিভাজকটা যেন খুব নিঃশব্দে একটা সীমান্ত ভাগ করে দিয়েছে।
অত্যাধুনিক হাসপাতালের এই শান্ত, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের একটা অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক শক্তি আছে। চারপাশে কোনো গোলমাল নেই, চিৎকার নেই— একটা নীরব থমথমে ভাব। মানুষ যত চাঙ্গা মন নিয়েই ভেতরে ঢুকুক না কেন, এই মেপে দেওয়া মেজাজটার মুখোমুখি হতেই ভেতরের জোরটুকু কোথাও যেন একটু আলগা হয়ে যায়। ঘরে এতগুলো মানুষ একসঙ্গে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, অথচ বাতাসটা থমকে দাঁড়িয়ে থাকা জলের মতো নিথর। কেউ জোরে কোনো শব্দ করছে না। মানুষ যখন ভীষণ কোনো অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড়ায়, তখন বোধহয় চারপাশের সাজানো নীরবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজের শরীরটাকেও যতটা সম্ভব গুটিয়ে আর শব্দহীন করে রাখতে চায়।
ওয়েটিং রুম। এই নামটা আমার বরাবরই অদ্ভুত লাগে। ঘরটার নিজের কোনো কাজ নেই, কোনো নিজস্ব গল্প নেই। সেখানে সবাই অন্য কোথাও যাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকে। ঘরটা কেবল কিছু অস্থায়ী মানুষকে কয়েক মিনিটের জন্য ধারণ করে রাখে।
আমার পাশের চেয়ারে একজন লোক বারবার ফোন বের করে দেখছিল। সম্ভবত সময় দেখছিল। একবার সাইড বাটন চেপে স্ক্রিন জ্বালিয়ে সময়টা এক পলক দেখছে, আবার স্ক্রিন নিভিয়ে ঊরুর ওপর রাখছে। একটু পরে অধৈর্য হয়ে আবার একই কাজ করছে। যেন বারবার স্ক্রিন জ্বালালেই সময়টা একটু দ্রুত গড়িয়ে যাবে।
সামনের দিকে একজন মহিলা একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের ফাইল কোলে নিয়ে বসেছিলেন। ফাইলের ভেতর রাখা প্রেসক্রিপশন আর টেস্টের কাগজগুলো বারবার গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। কাগজগুলো একদম ঠিকই সাজানো ছিল, একটির ওপর আরেকটি। তবু তিনি হাত দিয়ে আবার খুলছেন, আবার কোণগুলো মেলাচ্ছেন, আবার ভাঁজ করে ভেতরে রাখছেন। হাতের আঙুলগুলো কেমন যেন কাঁপছিল।
একটু দূরে একজন বৃদ্ধ একমনে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটাটা খুব ধীরে চলছিল, নাকি আমাদের ভেতরের এই অস্বস্তিকর অপেক্ষার সময়টাই বাস্তবে বেশি ধীরে চলে, কে জানে!
প্রথম দশ মিনিট ঠিকই ছিল। আমরা নিজেদের সভ্য আর শান্ত প্রমাণের চেষ্টা করছিলাম। তারপর থেকে সময়টা যেন কেমন একটু অন্যরকম হয়ে গেল। কেমন যেন চটচটে আর ভারী।
বারবার মনে হচ্ছে, কাচের ওপাশ থেকে আমার নামটা হয়তো ডেকে ফেলল। আমি কান খাড়া করছি। বারবার কাউন্টারের দিকে তাকাচ্ছি। দরজার মাথার ওপর বসানো ছোট লাল আলোটা জ্বলছে কি না খেয়াল করছি। একবার মনে হলো, কেউ বুঝি আমার নামের মতো কিছু একটা বলল। উঠে দাঁড়িয়েও পড়েছিলাম। কিন্তু নাহ্, ভুল ভাঙতেই আশপাশের মানুষগুলোর দিকে আড়চোখে চেয়ে আবার চুপচাপ বসে পড়লাম।
হাতের ফাইলটা খুললাম। প্রথম পাতাটা দেখলাম। দ্বিতীয় পাতাটা দেখলাম। তারপর আবার প্রথম পাতাটা। কাগজের ওপর নীল কালিতে লেখা আমার নিজের নামটাও যেন সেই মুহূর্তে অপরিচিত মনে হচ্ছিল।
পাশের লোকটা এখনও ফোন বের করে সময় দেখছে। সামনের মহিলা ফাইলের কাগজ গুনেই যাচ্ছেন। বৃদ্ধ লোকটা একইভাবে দরজার দিকে তাকিয়ে। কেউ কারও সাথে একটা কথা বলছি না। সবাই নিজের ভেতরের একটা অদৃশ্য খোপে বন্দি হয়ে আছি।
শুধু ভেতরের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে মাঝে মাঝে একটা ধাতব ট্রলির শব্দ আসছে। তারপর ভারী দরজাটা শব্দ করে খুলছে। কেউ বেরিয়ে আসছে, কেউ ঢুকছে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সবাই একবার করে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। তারপর আবার যে যার মতো নিজের শূন্যতার দিকে ফিরে যাচ্ছে।
আমিও একইভাবে তাকাচ্ছিলাম। অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ মনে হলো, এই ওয়েটিং রুমে বসে থাকা মানুষগুলোর প্রত্যেকের কাছে সময়ের আলাদা একটা হিসেব আছে। সময়ের দৈর্ঘ্য তো আসলে সবার জন্য সমান নয়। কারও পাঁচ মিনিট খুব দীর্ঘ এবং অসহ্য মনে হতে পারে। কারও কাছে আবার হয়তো এক ঘণ্টার সময়টাও খুব ছোট, কারণ দরজা খুললেই যে খবরটা আসবে, সে তার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে। একই ঘরে বসে থেকেও আমরা প্রত্যেকে আলাদা কিছুর অপেক্ষা করছি।
কেউ হয়তো এমন একটা টেস্ট রিপোর্টের ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন, যা তিনি কোনোদিন শুনতে চান না। কেউ হয়তো অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকের মুখের আশ্বাসের দু-টো কথার জন্য, যা তাঁর ভেতরের মৃত্যুভয়টুকুকে সাময়িকভাবে হলেও একটু মুছে দেবে।
কোণের ওই তরুণটি! সে হয়তো অপেক্ষা করছে এমন একটা খবরের জন্য—যা তাকে বলবে যে তার ভালোবাসার মানুষটি অপারেশন থিয়েটারের দরজা পেরিয়ে আবার সাধারণ কেবিনে ফিরে এসেছে। আর অন্যপাশের ওই মধ্যবয়সী ভদ্রলোকটি হয়তো স্রেফ একটা সাধারণ সই বা নথির অপেক্ষায় বসে আছেন, যাতে তিনি এই অস্বস্তিকর হাসপাতালের পরিবেশ ছেড়ে দ্রুত বাইরে নিজের দৈনন্দিন চেনা ফুটপাথে ফিরে যেতে পারেন। আর আমি অপেক্ষা করছি—কিছু একটা বদলানোর জন্য। কী বদলাবে, সত্যি জানি না।
কিন্তু এই একইভাবে নিশ্চল হয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না আর। নিজ থেকে উঠে যে অন্য কোথাও চলে যাব, সে কথাও ভাবতে পারছি না। সামনের দরজার লাল আলোটা এখনও নিঃশব্দে জ্বলছে। হঠাৎ মনে হলো, এই হাসপাতালটার বাইরে পুরো জীবনটাই কি একটা বিশাল ওয়েটিং রুম নয়?
বসে থাকতে থাকতে মাথার ভেতর চিন্তার সুতোটা আরও জড়িয়ে যাচ্ছিল। আমরা প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে তো অলক্ষে কিছু না কিছুর অপেক্ষা করে চলেছি। কেউ একটা সুযোগের অপেক্ষায়, কেউ একটুখানি উপশমের অপেক্ষায়, কেউ আবার কোনো একটা ফোনকলের অপেক্ষায় যা তার থমকে থাকা পৃথিবীর মোড় ঘুরিয়ে দেবে। আমরা সবাই কোনো না কোনো অদৃশ্য কাউন্টারের সামনে একটা অদৃশ্য নম্বর হাতে ধরে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি জীবনের ওয়েটিং রুমে। ঠিক এই ঘরটার মতোই—কোন মুহূর্তে দরজার মাথার ওপর লাল আলোটা জ্বলে উঠবে, আর কোন মুহূর্তে আমাদের নম্বর আসবে, তা আমরা নিজেরাও জানি না।
শেষ পর্যন্ত আমার নাম ডাকা হল। উঠে দাঁড়িয়ে ফাইলটা হাতে নিলাম। যাওয়ার আগে একবার পিছন ফিরে দেখলাম—আমার চেয়ারটা খালি হতেই সেখানে অন্য একজন এসে বসে পড়ল। ওয়েটিং রুমে কোনো চেয়ার বেশিক্ষণ খালি থাকে না। শুধু মানুষ বদলে যায়।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই থমকে গেলাম। মনে হল, কিছু কি ফেলে এলাম ওয়েটিং রুমে!
সুইং ডোরটা বন্ধ হয়ে গেল…।