Email: info@kokshopoth.com
February 19, 2026
Kokshopoth

শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়

Feb 18, 2026

প্রবন্ধ/ নিবন্ধ

শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়

আবহমান জলের গান

 

২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পরবর্তী বাংলাদেশ। আগুন জ্বলছিল বহু বাড়িতে। যেকোনো

ক্রান্তিকালে অথবা সাজানো ক্রান্তিকালে বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অথবা পড়শিদেশে কোনও  ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। তার মধ্যে একটি বাড়ির কথা না বললেই নয় কারণ সে বাড়িটি ছিল ‘জলের গান’-এর বাড়ি। জলেও আগুন লাগে!

“সেই কবে থেকে জ্বলছি

জ্বলে জ্বলে নিভে গেছি বলে

তুমি দেখতে পাওনি”    (হুমায়ুন আজাদ)

তবে বাড়িটিতে যারা আগুন লাগিয়েছিল তারা মহৎ বলতে হবে। শিল্পী রাহুল আনন্দ এবং তার পরিবারকে তারা বাইরে আসার সুযোগ দিয়েছিল। না দিলেও  আইনত তারা যে খুব  সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তাও হয়তো নয়। তাই এই বদান্যতার জন্য তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য।কিন্তু পুড়েছিল তিন সহস্রাধিক বাদ্যযন্ত্র।পুড়েছিল সুর, গান। বিশেষ কিছু প্রতিক্রিয়া দেয়ার মত মনের অবস্থা বা সুযোগ বা সামর্থ্য শিল্পীর ছিল না।বাংলাদেশের মতো একটি ইসলামিক দেশে থাকাটা দস্তুরও নয়। ছিল না কোনওদিনও।পরবর্তী ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি আগুন লাগার নানান ব্যাখ্যা।আগুন যে পাশের কোনও বাড়ি থেকে ছিটকে এসে লেগেছিল, রাষ্ট্র বুদ্ধি করে সেই ভাষ্য ঠিক করে দেয়। কিন্তু আমরা জানি এই আগুন সম্ভবত সুদূর নালন্দা থেকে দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে জলের গানকে স্পর্শ করেছে এবং সভ্যতার অন্তিম পর্যন্ত করেও যাবে।

তবু তো রাহুল আনন্দ এক সুপরিচিত শিল্পী, কিন্ত যখন,  ঘটনার অভিঘাত খুব ছোট ছোট মাপের মানুষকে আঘাত করে –যাঁরা উদ্বাস্তু হয়ে, নিহত হয়ে, সংখ্যাগুরুর দ্বারা গণধর্ষিতা হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানবেতর জীবনযাপন ক’রে অনেকক্ষেত্রেই একজন  সাহিত্যিকের সাহিত্যের রসদ জোগানোর কাজ করে, একজন কবিকে কবি, একজন

চিত্রপরিচালক বা চিত্রশিল্পীকে খ্যাতিমান, একজন প্রগতিশীলকে প্রগতিশীল করে তোলে, ভাবতেও শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে। তবু সেইসব দুর্ভাগাদের মৃত্যুও বোধহয় স্বস্তির। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে তাদের সংখ্যালঘু জীবনের পরিসমাপ্তি তো হল ;সে কম সৌভাগ্য নয়।আর, ভেবে দেখলে, তাঁদেরই  পাহাড়প্রমাণ দুর্ভাগ্যের আড়ালে দাঁড়িয়ে হয়তো আমিও শান্ততা ও দার্শনিকতার চর্চা করে থাকি। আমাকে ধন্যবাদ।

মনে পড়ে রবি রুইদাসের কথা। না, রবি রুইদাস একজন মেয়ে, পুরুষ নয়। গণধর্ষিতা হওয়ার পর অভিযোগ জানোনোর অপরাধে ফের গণধর্ষণ এবং শেষে নিহত হওয়া। কিন্ত এতসবের পরেও সাক্ষী মেলে না। আঠাশ শতাংশ থেকে পাঁচ শতাংশে নেমে আসা এক ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ক্রমঅবলুপ্তির সাক্ষ্য দিতে ভয় পায় ইতিহাসও।ইতিহাসের সত্যকথনের দায় সবসময় থাকতে নেই ;কখনও কখনও নিছক তত্ত্বের দাসত্ব করে যেতে হয় তাকে। কয়েক দশক আগে, স্নেহ কুমার চাকমা এসেছিলেন কলকাতায়। মিনতি করেছিলেন চট্টগ্রামকে ভারতের অংশ করে নেওয়ার জন্য।কিন্তু কর্ণপাত করেননি স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শ্রী জহরলাল নেহেরু।পন্ডিতজি তখন ‘সুঠাম ও অভিজাত ‘মেঘের দলের সম্মাননীয় সদস্য। ‘পিছিয়ে পড়া ‘মেঘগুলির কথা ভাবার সময় তার কই? স্নেহ কুমার কি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন একদিন “চাকমা “জনগোষ্ঠীর গায়ে স্থায়ীভাবে “শরণার্থী ” তকমা জুটে যাবে!

আজ বলতে দ্বিধা নেই, লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ এবং আরও অগণিত মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার ইতিহাস  ও বর্তমান আমার সহোদর, শুধু আজ আমার প্রতিনিধি হয়ে অগ্রিম ভস্মীভূত হচ্ছেন দিপু চন্দ্র দাস, এই যা।

শুধু পরিবারের সকলকে আগে বা পরে একই শ্মশানে দাহ করার রেওয়াজের কথা অবচেতনে উঁকি দেয়।

2 Comments

Leave a Reply to কবিতা – Kokshopoth Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *