নুসরাত সুলতানা-র কবিতাগুচ্ছ
নুসরাত সুলতানা-র কবিতাগুচ্ছ
দ্বিতীয় দশকের কবি ও কথাসাহিত্যিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ মিলিটারী ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে সিভিলিয়ান ষ্টাফ অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ :
উপন্যাস – রাতের হাতে দিনের তসবীদানা (২০২৫)
অনার্য বৃক্ষযুগল (২০২৫)
স্মৃতি গদ্য – ফিরে দেখা কৃষ্ণচূড়া (২০২৫), গল্পগ্রন্থ -নাচের শহর রূপেশ্বরী (২০২৪), মৌতাত ২০২২, মুক্ত গদ্য- পায়রার পায়ে আকাশের ঠিকানায় -২০২১
কাব্যগ্রন্থ :
চান্দ উটলে গাঙ পোয়াতি অয় -২০২৪
মহাকালের রুদ্র ধ্বনি -২০২৩,
গহিন গাঙের ঢেউ- ২০২০,
ছায়া সহিস -২০১৯।
নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, ওয়েব ম্যাগ এবং লিটল ম্যাগে
#১
বরাবর
কোথায় খোঁজো তুমি আমাকে বলতো শ্রীয়াংশ?
শিশিরের নি:শর্ত সমর্পণ, উচ্ছন্নে যাওয়া রেল স্টেশন
কিংবা ঝরে যেতে উন্মুখ হলুদ পাতায়?
অথবা বিরহের গান কিংবা বিষন্ন পঙক্তিতে?
অতটাও বিবাগী নই আমি..
আমি গাই ফসলের গান, পরাগায়নের স্বরলিপি
আমি থাকি – কিষাণীর নতুন তাঁতের শাড়ির গন্ধে
টগবগ করে ফুটে ওঠা ভাতের হাড়ির ধোঁয়ায়
হাঁস যুগলের থইথই আনন্দ অবগাহনে
আমি ছিলাম, আছি, থাকব-
মানুষের আনন্দ আরাধনায়।
ঝরে যাবার গান আমি গাইতে শিখিনি
আমি জানি মানুষের ইতিহাস ব্যর্থতার নয় আদতে।
মানুষ প্রকৃত অর্থে যারা মানুষ
তারা জিতেছে বারবার, বহুবার বরাবর..
#২
অন্তর্গত জিজ্ঞাসা
প্রস্ফুটিত গোলাপের কাছে হাঁটু গেড়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম-
আমি কেন অমন সুরভিত, প্রস্ফুটিত হতে পারি না?
গোলাপের উত্তর – তোমরা বড় বেশি ভোগবাদের পূজো কর।
জেরুজালেমের কানে কানে জিজ্ঞেস করলাম
তুমি আমাকে বল তো – পবিত্রতা আসলে কী?
সে বলল- মায়ের আনন্দাশ্রু, বাবার বুকের মধ্যে স্বস্তি
আর প্রজন্মের স্কুল প্রাঙ্গনের দৌড়..
অত:পর গেলাম উন্নয়নের অর্থ খুঁজতে..
সমাজবিদ, শিল্পপতি, প্রফেসর, রাজনীতিবিদ
বহুজন বহুকিছু বলল
অবশেষে এক বারোবনিতা ফিক করে হেসে বলল-
এইসব বালের উন্নয়ন কোন কামে লাগে?
আমি যহন খদ্দেরের লগে শুই না, আমারে কেও
একমুঠ ভাত দেয় না..
উন্নয়ন অইল হগল মানুষের প্যাট ভইররা ভাত খাওন
আর গভীর ঘুমে তলাইয়া যাওন।
অই রাষ্ট্রের চাইতে আমার এই বারোবনিতার শরীর
অনেক সক্ষম এবং সমুন্নত ।
আমি আমার সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিই..
অবশেষে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম-
জীবন তাহলে কী??
এর ভেতর তাকিয়ে দেখি সঙ্গমরত দুটো কুকুর
অবিরাম চিৎকার করছে মুক্তির আশায়…
#৩
বক্রতার সাতকাহন
ঠোঁটে ভেংচি কেটে বলেছিল পদ্মার ঢেউ
কতটা বক্র তুমি মেয়ে?
বক্রতার পাঠ নিতে আসো আমার পাঠশালায়।
মুচকি হেসে বলেছি- বক্রতার সাতকাহন তোমার চেয়ে ঢের বেশি জানি..
শোনো তবে বলি- সরল রেখার মতোই বক্র আমি।
যে কেবল নিজেরই পথে চলে।
ট্রাম্প কিংবা কমিশনার যে পারে
যে কয় পেগ খাক..
বা পরীমনির নামে সালিসি বসাক
কিংবা সাপলুডু খেলুক কী আসে যায়..
আমি শুধু ছুটে চলি ক্ষুরধার নদীটির মতো
তারপর ও বলি কেবল একফোঁটা মায়াবী
চোখের জলে লেখা আছে আমার পরম আয়ু..
# ৪
জয়মাল্য
সমাজ একটা অনন্ত জলিল
পুত্রদ্বয়কে মাদ্রাসায় হাফেজী পড়িয়ে
স্লিভলেস পরিহিতা নায়িকা বউকে নিয়ে
জলিল সাহেব কান উৎসবে হেঁটে বেড়ান।
বাঙালি দয়াময়ী জননী যে ছেলের ঘুষ বেশি
তার জন্য ড্যাগা মোরগ জবাই করে–
তাজবীহ হাতে খাবার পরিবেশন করেন।
মাদক ব্যবসায়ী খোলে এতিমখানা।
সপ্তাহান্তে জুম্মা মোবারক বলা ভদ্রলোকটির
নারী কলিগের গায়ে শোভা পায় গোপনে–
উপহার দেয়া শাড়ি, লকেট, ডায়মন্ড নোসপিন।
নারী কলিগটি অবশ্য সন্ধ্যাবেলায় স্বামীর জন্য
নিজ হাতে চা বানিয়ে বলে–
সারাদিন কেমন কেটেছে বাবু??
আমাকে মিস করনি!!
জয় অনন্ত জলিল, জয় সমাজ
জয়মাল্য তোমাদেরই হোক..
#৫
কুশলাদি
জল্লাদ সমাজ আর যাকেই শত্রু ভাবুক বা না ভাবুক-
কবিকে ভাবে সর্বাগ্রে।
শরীরে ক্যান্সার নিয়েও কবি
দৃঢ় পায়ে হেঁটে যেতে পারে
গর্ভজাত ফসলের দিকে অমিয় প্রত্যাশা নিয়ে।
তথাপি অপ্রেমে কবি হয়ে ওঠে রুদ্র-শ্রীহীন শীতকাল।
উপেক্ষার নুনে কবি বধ হয় জোঁকের মত নিরবধি।
প্রেম পেতে – বারবার পাথরকেই ভাবে হৃদয়।
আর আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটায়।
তাই তো বলি মান্যবর,
আর যাকেই তুমি কুশলাদি শুধাও না কেন
কোনো কবিকে কখনো জিজ্ঞেস করো না-
ভালো আছ তো!
1 Comment
ভারি সুন্দর লেখাগুলো!