নির্মল রায়-এর গল্পঃ রাত পাহারা
নির্মল রায়-এর গল্পঃ রাত পাহারা
অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সরকারী আধিকারিক। জন্ম ১৯৬২ দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট শহরে।দেশের বাড়ি পুরুলিয়া জেলার গদিবেড়ো গ্রামে। পিতার জীবিকা- সূত্রে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে আগমন। বাল্য কৈশোরের দিনগুলি থেকে এখনও পর্যন্ত তাঁর বিষ্ণুপুরের আলো বাতাস মাটির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। প্রথমে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক ও পরে স্নাতকোত্তর বাণিজ্যে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম্প্রাপ্ত।
লিখেছেন নন্দন, গণশক্তি,যুবমানস, গল্পগুচ্ছ, কলেজ স্ট্রিট, নবকল্লোল, The Statesman ছাড়াও অসংখ্য ম্যাগাজিনে। নিয়মিত।
পেয়েছেন তন্বী সাহিত্য পত্রিকা, বাঁকুড়া জেলা কবিতা উৎসব ২০০৩, রূপকথা সাহিত্য সংস্থা, মল্লভূম সাহিত্য পত্রিকা পুরস্কার ১৯৮৯—ইত্যাদি ।
ঘুম ভাঙতে কাতুবুড়ি চোখ মেলে তাকাল। খোলা রাত। দরজাও খোলা। অমনিই থাকে। কি আছে যে চোর নেবে? লম্ফটা এখনও জ্বলছে। যেমন জ্বলছিল। ঘরের মধ্যে আলো নড়ছে। ছায়া নাচছে। সামনের ঘরে খাটটা নড়েও না চড়েও না। বালিশ মশারী চাদর যেমনকার তেমনি। কাতুবুড়ি নিজের হাতে বিছানা পেতেছিল যেমন পাতে। শুধু ঘোষকর্তাই নেই।
চল্লিশ বছরের মধ্যে আজ এই প্রথম। কাতুবুড়ি আস্তে আস্তে উঠে বসতে চেষ্টা করল।
বাইরে কোন শব্দ নেই। শুধু মাঝে মাঝে পাতায় হিমের শব্দ— টুপটাপ। পাতা নড়ছে। কুকুরগুলো বোধহয় এধার ওধার সেঁধিয়েছে। এখন কত রাত। কাতুবুড়ি ফোটা জানলার ভেতর দিয়ে ঘোলাটে চোখে চিলতে আকাশ দেখল।
জ্বরটা এখনো কমেনি। গা-গতরে ব্যথা কত। গলা শুকিয়ে কাঠ। নেমে যাবে সাহস কই। যদি পড়ে যায়। ডাকতে গিয়েও বুড়ি ডাকল না। কাকে ডাকবে? কর্তা নেই। কর্তা এল না কেন?
একটানা চল্লিশ বছর ধরে একই ঘেরাটোপে এই ঘর আর ঐ খাটে বড় শান্তিতে ঘুমিয়ে এসেছে কর্তা। নিজের বৌ ছেলেমেয়ে ঘর ছেড়ে। কেউ করবে?
বুড়ির কি? পনের বছর বয়সে তার বে’ হয়েছে। বর তার ছিল এক বুড়ো হাবড়া। পরের বছর বেধবা। তারপর এখান ওখান এথান ওথান। ঘুরে ফিরে সে খুড়তুতো ভাইপো দীনুর দোরে হত্যে দিলে। শেষে দীনু বলল—
‘নাও পিসিমা। ঘাট হয়েছে। আর লোক হাসিও নি। ভেতরে চল।’
তবেই না। ব্যস, বুড়ির গতি হল। কিন্তু কাতুবুড়ির কপালে কি আর সুখ সয় গা। বছর ঘুরতে না ঘুরতে দীনুর বৌ পোয়াতি হল। শেষে বিয়োল মরা বাচ্চা। সবাই দুষতে লাগল।
কাতু নাকি অপয়া। কি অলক্ষুণে মেয়েমানুষ গা। নিজের সোয়ামীটারে খেল এখন আবার ভাইপো- বৌ এর ছানাটারে। কাতু কেঁদে কেটে ত’ আর থৈ পায় না।
শেষে দীনু বলল— ‘ঘাট হয়েছে পিসিমা। চল, তোমাকে খামারে রেখে আসি। তুমি বরং গরু, পুকুর, চাষ সব দেখবে।’
সেই থেকে বুড়ি এখানে। আর নড়েনি। প্রথম প্রথম কি ভয়। কি ভয়। ওদিকে জঙ্গল। সেদিকে পুকুর। কি বিরাট পুকুর। উঁচু করা পাড়। পাড়ে পাড়ে ঘন গাছ। পুকুরে মাছ। নজর রাখা কি সহজ কথা?
তারপর চাষ। চাষের চাষী। লাঙ্গল বলদ। জমিতে জল দেওয়ার পাম্প।
তারপর গরু। গরুর গাড়ি। গরুর দুধ।
তারপর মুরগী। হাঁস।
সঙ্গে ডজনখানেক কুকুর।
সে এক চিত্তির!
কাতু প্রথম প্রথম কিছুতেই এসব করে উঠতে পারত না। তারপর গতরের ভয় তো ছিলই। একে মেয়েমানুষ, বয়স কম। তার ওপর একা। পুরুষের নজর, ভয় তো থাকবেই। দুটো জঙ্গল আর তিনটে ক্যানেল পেরোলে তবেই এই ঝুপসিকোঠা। কেউ নাম শুনেছে না কেউ দেখেছে। বেলাবেলি তবু ভালো। রাত পড়লে— বাবাগো!
তখন দীনু ঘোষকর্তাকে বলে কয়ে তাকে রাত্রে থাকার ব্যবস্থা করল। কাজের মধ্যে রাত পাহারা। কাতু আর খামার। সেই থেকে দিন ফুরোলেই ঘোষকর্তা নিজের সবকিছু ছেড়ে এখানে। আসলে ঘোষকর্তা কাতুবুড়ির নিজের কেউ না।
উত্তরে ওই যেখানে ফরেস্টাররা কাজুবাদামের চাষ দিয়েছে তার তিন কিলোমিটার পূবে পাঁচ ঘরের গাঁ বনময়নায় ঘোষকর্তার বাস। তবু একদিনের জন্যেও কামাই দেয়নি মানুষটা। অথচ আজ—
তবু যতই হোক, চল্লিশ বছর ধরে স্বামী স্ত্রী ছাড়া মেয়ে পুরুষ একসাথে থাকা। কেউ বিশ্বাস করবে, নাকি কেউ করে? অথচ মানষের মনের ভেতর কত কি-ই তো উঁকি মারে। রাত বিরেতে তো কথাই নেই। অথচ আশ্চর্য মানুষ এই ঘোষকর্তা।
সন্ধ্যেতে যখন জোনাকিরা আলো জ্বালে
ঝোপে ঝাড়ে, যখন বুয়ানবাঁজা আর ভেলাইয়ের জঙ্গলে অন্ধকার নেমে আসে তখন ঘোষকর্তা আর কাতুবুড়ির গল্প শুরু হয়। মাঝে মাঝে কাতুবুড়ি গিয়ে গোয়ালের গরু দেখে আসে। ঘোষকর্তা বিড়ি খায় আর কাতুবুড়িকে যাত্রার ডায়ালগ শোনায়। দীনু কাতুবুড়িকে ব্যাটারীতে চলা ছোট একটা রেডিও কিনে দিয়েছিল। ঘোষকর্তা আর কাতুবুড়ি দু’জনে তাতে গান, নাটক আর খবর শোনে।
মাঝে মাঝে পূর্ণিমার থালাচাঁদ উঠলে ঘোষকর্তা বাইরে উঠোনে কখনো দাঁড়িয়ে কখনো ব’সে গান করে। মনসামঙ্গলের গান—
বাসর জাগায় বেনে না আছে তুলনা।
দিন যেন হয় রাত্রি এমন জোছনা।।
বাসর রক্ষণ করে চাঁদ সদাগর।
বিবরিয়া কহি তাহা শুন অতঃপর।।
ময়ূর ময়ূরী জাগে বাসরের দ্বারে।
নেউল প্রহরী আছে কিঙ্কিনী যে গলে।।
ধন্বন্তরি সমগুণী জাগে কতজন।
ষোলশত বেনে জাগে করিয়া যতন।।
বাতাসে ভাসে ধানের গোড়ার আটকে থাকা জল, তার হৃদয় জড়ানো মায়া আর ঘন ঘাসমাটির নেশা- নেশা গন্ধ। কুকুরগুলো তখন আশেপাশে ঘুরতে থাকে।
কাতুবুড়ি শুধু হাসে আর বসে থাকে। বাইরে নগ্ন পৃথিবীকে ঢেকে দেয় ঢালাও জোৎস্না-শাড়ি।
মনিষ্যি বটে ঘোষকর্তা। এখন তো চুলে পাক ধরেছে। গায়ের চামড়া লোল হয়েছে। কিন্তু যখন ছিল না—যখন সটান চামড়ায় ঝিলিক মারত পাকা যৌবনের রং— যখন ওসব ছিল তখনও তো ঘোষকর্তা ঠিক এখন যেমন তেমনই ছিল। চল্লিশ বছর ধরে সারারাত। খামার— কাতু— রাত— পাহারা। অদ্ভুত।
আসলে মানুষটা তাকে খুব বেশী শ্রদ্ধা করে। খুব বেশী ভালবাসে গো। বড় ভালোবাসে। মুখে বলে না। মুখে বললেই কি সব হয় নাকি বলা যায়? কাতুবুড়ি জানে।
নিজের স্বামী কেমন ছিল সেসব তো কিছুই মনে পড়ে না। মনে থাকা বা রাখার কথাও না। তারপর মাঝখানে কত মনিষ্যি— এখান ওখান। শেষে কিনা এই ঝুপসিকোঠা— একটানা। আর ওই ঘোষকর্তা। আর তো কেউ নেই।
অবিশ্যি দু’জনকে নিয়ে লোকে যে কুৎসা, কেচ্ছা ছড়ায় নি তা না। সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। ঘোষকর্তাও নিশ্চয়ই শুনে থাকবে সে সব। কিন্তু ঘোষকর্তার কাজে কোনদিন ছেদ পড়েনি। কোনদিন মুখেও তোলেনি কোন কথা। দীনু অবিশ্যি প্রথমটায় একটু গাঁই গুঁই করলেও ঘোষকর্তার কোন ভাবান্তর না দেখে চুপচাপ হয়ে গেছিল। যাক, সেসব তো অনেকদিন আগেকার কথা।
চল্লিশটা বছর ধরে দিনগুলো এই একভাবেই গড়িয়ে গেছে। সারাদিন কাতু বুড়ি সামলেছে পুকুর— পুকুরের মাছ—লাঙ্গল— বলদ— জলের পাম্প— গরু— মুরগী— হাঁস আর সেই সন্ধ্যে নামলে ঘোষকর্তা এসেছে। গল্প আর গান করেছে। রেডিও শুনেছে। কাতুবুড়ি বিছানা পেতেছে। আজ বড় ক্লান্ত মনে হয়। কর্তা এল
না কেন?
ঠিক আলো ফুটছে। বুড়ির ঘুম ভাঙল। সামনের ঘরে কর্তার খাটটার দিকে বুড়ি ফ্যাকাসে চোখে তাকাল। বিছানাটা যেমনকার তেমনি। শুধু উঠতি সূর্যের লাল আলো জানলা দিয়ে এসে খাটটাকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। খাটটাকে বড় আপন, বড় তৃপ্ত, বড় মায়াময় লাগছে।
বাইরে প্রকৃতি জেগে উঠছে।
এই প্রথম কাতুবুড়ি তার তলপেটে আর একটি অস্তিত্বের তীব্র অভাব অনুভব করল, চল্লিশ বছরের মধ্যে যা পূর্ণ হওয়ার প্রয়োজন ছিল।
1 Comment
গল্পটা ভালো লাগলো। কলম চলতে থাকুক।