Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

নাহিদা আশরাফী: জাদুবাস্তব সম্মোহনের কথাকার

Oct 31, 2025

এমরান হাসান-এর প্রবন্ধঃ
নাহিদা আশরাফী: জাদুবাস্তব সম্মোহনের কথাকার

জন্ম, যশোর. বাংলাদেশ। কবিতা ও গদ্য দুটিতেই সমান স্বচ্ছন্দ।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। গবেষণা করছেন আদি ও আখড়াই ঘরানার লালনসংগীতের সুর ও ভেদতত্ত্ব নিয়ে। 

প্রকাশিত গ্রন্থ :

হাওয়াঘরের মৃত্যুমুদ্রা (২০২১),

মোহনীয় মৃত্তিকাগণ (২০২৪),

লালনপর্ব (২০২৫), 

পুরস্কার : অনুপ্রাণন তরুণ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার (২০২৪)

 

এমরান হাসান

 

বর্তমান বিশ্বসাহিত্য তথা বাংলাসাহিত্যের অনন্য এক জনপ্রিয় মাধ্যম গল্প। এই মাধ্যমে স্বকীয় অবস্থান তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন যারা তাদের মধ্যে নাহিদা আশরাফীর অবস্থান পৃথক অলংকরণে অলংকৃত। বাংলাদেশ তথা বিশ্বসাহিত্যে বর্তমান সময়ের গল্পের আদল এবং নান্দনিক প্রেক্ষাপট বিচারে বাংলাদেশের গল্পে তাঁর আলাদা অবস্থান ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে এটি নির্বিকারচিত্তে স্বীকার করে নিতেই হয় বাংলাদেশের গল্পের রচনাশৈলীতে পরিবর্তন এসেছে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকেই। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সমগ্র সাহিত্যকে চরমভাবে নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল। বাদ পড়েনি ছোটগল্পও। এসময়ের অনেকেই তাদের রচনাকে, যাপিত জীবনের গল্পের আদলে তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে, আবার অনেকেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি—পেশার মানুষের জীবনাচারকে তাদের গল্পের ভেতর সুনিপুণভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন একবিংশ শতকের শুরুতে অর্থাৎ নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকের শুরুতে বাংলা কথাসাহিত্য আরো একবার বাঁকবদল করে চরম উৎকর্ষের পথে এই সময়ের ছোটগল্পে রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনৈতিক ভিন্ন দর্শন আরো নিপুণভাবে ফুটে ওঠার পাশাপাশি চমৎকার ভঙ্গিমায় উঠে এসেছে জীবনবোধের বয়ান। এরপর সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলেছে সমাজের প্রয়োজন, বদলেছে সমাজের মানুষের চিন্তার প্রকরণ এবং এসবের সাথে সাথেই বদলেছে গল্পকারদের গল্প লেখার ভঙ্গিমা, উপকরণ এবং অনুষঙ্গ। এই বিবর্তিত অনুষঙ্গের ভেতর যারা বর্তমান কথাসাহিত্যে অগ্রগণ্য নাহিদা আশরাফী তাদের একজন। তার গল্পগ্রন্থ ‘জাদুর ট্রাংক ও বিবর্ণ বিষাদেরা’তে সূচিবদ্ধ চৌদ্দটি গল্প বাংলাদেশের ছোটগল্পের পাঠক এবং লেখক সমাজের মাঝখানে তৈরি করে দিয়েছে একটি অসম্ভব সুন্দর মেলবন্ধন। বস্তুত এই গ্রন্থের গল্পগুলোকে নাহিদ আশরাফী একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকে সাজিযেছেন। তার নিজস্ব চিন্তা,সময়ের দোলাচালের বিভিন্ন ঘরানা এবং সময়ের দাবি মাথায় রেখে তিনি তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র এক গল্পভাষাশৈলী যা পাঠকের মনে তীক্ষ্ণভাবে দাগ কাটতে সক্ষম।

একজন লেখক এর দায় তার সমাজের প্রতি শতভাগ বললেও ভুল হবে বরঞ্চ তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি। সেই দায় থেকেই নাহিদা আশরাফী তৈরি করেছেন তাঁর এই গ্রন্থের চৌদ্দটি গল্প। গল্পগুলোতে স্বাভাবিকভাবে দেখতে গেলে নারীবাদী চিন্তার স্বতন্ত্র ছায়া চোখে পড়ে কিন্তু আরো গভীর পাঠকের মগজ দিয়ে প্রতিটি গল্পের প্রতিটি চরিত্র বিশ্লেষণ করলে খুব সাবধানী চিন্তায় ভেসে ওঠে পুরুষ শাসিত সমাজের ভালোচিন্তার মুখোশের আড়ালে শত সহজ নোংরা মুখচ্ছবি।এই প্রেক্ষাপটকে গল্পকার তার নিজস্ব ঘরানায় সাজিয়েছেন।তিনি দেখিয়েছেন সমাজের নানা অসঙ্গতি ভেতরে কয়েকজন প্রতিবাদী মানুষের বেঁচে থাকার সাহসী চিত্র।সে চিত্রগুলো আমাদের সবার পরিচিত।আমাদের সমাজে প্রতিদিন তাদের দেখা মেলে বিভিন্নভাবে। আমরা আপ্লুত হই তাদের কথায়,কখনোবা প্রতিবাদী হয়েও ওঠি সমাজের ওইসব নোংরামির বিরুদ্ধে।কিন্তু কন্ঠ ছেড়ে বা সরাসরি কোন প্রতিবাদে সামিল হতে পারি না।একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই জায়গাটিতে আমরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি প্রতিনিয়ত। নাহিদা আশরাফী বিষয়গুলোকেই চোখে আক্সগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তার এইগ্রন্থের পাঠকদের। তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে আঘাত করেছেন সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির গায়ে।’জাদুর ট্রাংক ও বিবর্ণ বিষাদেরা’ গ্রন্থের প্রতিটি গল্প সাবলীল ভাষায় রচিত হলেও এর গভীরতা এবং ভাবগাম্ভীর্য একেবারেই অন্য মাত্রায় আঘাত করেছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি—পেশার অনৈতিকতার বিরুদ্ধে।গল্পের ছলে— কৌশলে নাহিদা আশরাফী খুব স্বাভাবিক ভাবেই এঁকেছেন জীবনের চলচ্চিত্র।’হাওলাদার সাহেবের বিশ টাকা’ গল্পে খুব সাবধানে তিনি দেখিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মধ্যবয়সী মানুষের মনস্তাাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে।বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতা ব্যবহারের এক চরম উদাহরণ এসব গল্প।আমাদের চারপাশের সমাজে এই ধরনের ঘটনা অহোরহো ঘটে চলছে কিন্তু এই দেশের অর্থাৎ বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে এই সমস্ত ঘটনাগুলোকে গল্পের আদলে তুলে আনার প্রচেষ্টা করেছেন খুব কম সংখ্যক গল্পকার।এ মন্তব্য অত্যুক্তি হবে না বোধকরি।নাতিদীর্ঘ এই গল্পের প্রতিটি অংশ পাঠককে তীব্র বাস্তবতার সামনে দাঁড় করাবে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলা যায়।সারাদিনের যাবতীয় খরচ শেষ হয়ে যাবার পর এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা যখন হিসেবের গোলমালে নিজের সমস্ত চিন্তা এবং ভাবনাকে নিয়োজিত করেন তখন পাঠকের মগজের হয়তো অন্যরকম ভাবনা ও দ্যূতি ¯পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।একথা সর্বৈব সত্য যে,একজন গল্পকার যখন কাগজ—কলমের নিবিড় প্রেমে লিখতে বসেন তার নিজস্ব অনুভূতিগুলো তখন রাত জাগা কোন এক ভাবনা থেকেই প্রস্ফুটিত হতে থাকে,উজ্জ্বল হতে থাকে কাগজ কলমের সান্নিধ্যে। এই পরিস্থিতির ব্যতিক্রম ঘটেনি নাহিদা আশরাফীর ছোটগল্পগুলোতে। তিনি জীবনকে যেভাবে দেখেছেন এবং যেভাবে যাপিত জীবনের নানা ঘাত—প্রতিঘাতকে উপলব্ধি করেছেন হয়তো হুবহু সেগুলোই তিনি তুলে এনেছেন তাঁর প্রতিটি গল্পে।পাঠকের চিন্তা ঠিক অন্য জায়গায় অব্যক্ত আঘাত করবে এই গ্রন্থের প্রতিটি গল্প পাঠের পর। এই জায়গায নাহিদা ্আশরাফী চরমমাত্রায় সার্থক।অজানা এক রহস্যের দিকে পাঠক সমাজকে টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম ‘জাদুর ট্রাঙ্ক ও বিবর্ণ বিষাদেরা’ গ্রন্থটি। গ্রন্থটির প্রথম গল্পের চরিত্র সবিতা।’সাদা বাস কালো গাড়ি’ শিরোনামের এই গল্পের সবিতার মতো হাজারো সবিতা আমাদের সমাজের টিকে রয়েছেন যারা সাংসারিক টানাপড়েন আর জীবনের অসহ্য নোংরা অভিজ্ঞতাগুলোকে কোনদিন প্রকাশ করতে পারেননা কেবলমাত্র ব্যক্তিক,পারিবারিক সম্মান এবং ভরণপোষণের দিকে তাকিয়ে।সময়ের প্রয়োজনে জীবনের বাস্তবতার কাছে হার মেনে তারা সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করেন।আশ্চর্য রকমের সত্য তুলে ধরেছেন নাহিদা আশরাফী এই গল্পের প্রতিটি বাঁকে।তাঁর প্রতিটি গল্পই যেন জাদুর ট্রাংক থেকে উঠে আসা একেকটি বিবর্ণ বিষাদ!নাহিদা আশরাফী এই গ্রন্থের অন্য গল্পগুলোয় পাঠক তার নিজস্ব চিন্তার সাথে মিলিয়ে নিতে পারবেন,সহমত পোষণ করে পাঠ করতে পারবেন,কেননা মানবজীবনের চরম বাস্তবতার নিরিখে রচিত এই গল্পগুলো অনেক অপ্রিয় সত্য এবং সমাজের মুখোশধারী মানুষের সত্যিকার চরিত্রকে উন্মোচন করেছে এমন মন্তব্য নির্দ্বিধায় করা যায় তার গল্পগ্রন্থ স¤পর্কে।এই গ্রন্থের সবগুলো গল্পের ভেতর লুকিয়ে আছে খুব সাধারণ মানুষের গোপন দীর্ঘশ্বাস এবং তাদের আত্মজৈবনিক টানাপোড়নের ইতিকথা বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশের ছোটগল্পের ভেতরে নাহিদা আশরাফী নাগরিক জীবনকে এঁকেছেন ঠিকই তবে মধ্যবিত্ত জীবনের নানামুখী টানাপোড়েনের মাধ্যমে যে জটিলতা তৈরি হয় তাকে উপজীব্য করে,এই বিষয়টিকে তিনি এড়িয়ে যাননি একেবারেই বরং তার সাথেই তিনি নান্দনিক জাদুবাস্তবতাকে মিশিয়েছেন চমকপ্রদ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে।নাহিদা আশরাফীর এই গ্রন্থের একটি ব্যতিক্রম গল্প ‘দ্বিতীয় ও শেষ চিঠি’।এই গল্পের প্রেক্ষাপট সাধারণ পরিস্থিতিতে মানুষের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বের সাথে সামাজিক অবস্থানের বিরোধ। আপাতদৃষ্টিতে গল্পটি পড়ার পর মনে হতে পারে কোনো রোমান্টিক সিকুয়েন্স নিয়ে গল্পটি বয়ে চলেছে এক সুন্দর সমাপ্তির দিকে,আবার পরমুহুর্তেই পাঠকের মনে হতে পারে গল্পটির শেষ এইভাবে না হলেও হয়তো ভালো হতো।একজন পাঠক হিসেবে যে কেউ গল্পের মানদণ্ড বিচার করতে পারেন খুব সহজেই সে অধিকার অবশ্যই পাঠকসমাজের রয়েছে। জীবনের নানামুখী সুরকেই নাহিদা আশরাফী ফ্রেমবন্দি করতে পেরেছেন তার গল্পে।একজন জাত কথাশিল্পী মাত্রই এই গ্রন্থটি পাঠের পর উপরোক্ত মন্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করবেন তার নিজস্ব ভাবনার জায়গা থেকে এ মন্তব্য জোড় দিযেই করা যায়।স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই গ্রন্থের প্রতিটি গল্প পাঠের পর পাঠক তার মনোজাগতিক ভাবনার অনেক গভীরে গিয়ে হোঁচট খেয়ে যাবেন অকস্মাৎ।হয়তো ভাবতে পারেন যেভাবে তিনি পড়তে শুরু করেছিলেন প্রতিটি গল্প,সে গল্প পাঠ শেষ করার পর তার ভাবনা ভিন্ন এক জগতের পথে হাঁটতে শুরু করেছে।সে জগত বাস্তবিক চিন্তা থেকে আরো গভীরে জাদুবাস্ববতার পথে,অস্তিত্ববাদী কন্ঠের আর্তচিৎকারের পথে।বস্তুত প্রতিটি মানুষই অস্তিত্ববাদী চিন্তার ভেতরেই বসবাস করে এ কথা সর্বজন বিদিত পাশাপাশি একটি সার্থক ছোটগল্প তৈরির ক্ষেত্রে একজন গল্পকার কিভাবে,কী কৌশলে তার চিন্তাকে সুনিপুন হাতে সার্বজনীন করে তুলতে পারেন সেটি এই গ্রন্থ থেকে খুব সহজেই প্রমাণ করে দেখিযেছেন নাহিদা আশরাফী।একজন গল্পকার তার লেখার মাধ্যমে সমাজ জীবন,রাষ্ট্রীয় জীবন,পারিপার্শ্বিক জীবনকেই কথার ফ্রেমে বন্দী করতে চাইবেন— এটি খুব স্বাভাবিক,তবে নাহিদা আশরাফী এই পথে হেঁটে যাননি মোটেও।তিনি তার নিজস্ব অভিব্যক্তি প্রকাশ এর স্বার্থেই কাগজ কলম নিয়ে বসেছিলেন হয়তো খুব স্বাভাবিক কোন চিন্তা কিংবা কাগজ—কলমের ভ্রমণের সাথে নিজের হৃদয়কে সঙ্গী করতে,অথচ তার এই গ্রন্থের প্রতিটি গল্প একজন সচেতন পাঠককে খুব সহজে টেনে নিয়ে যাবে অনন্ত এক অস্তিত্ব বিজড়িত বোধ এবং জীবনকল্পের দিকে।এই গ্রন্থের অন্যান্য গল্পগুলোর সাথে ‘বৃষ্টি ও শাড়ীর গল্প’,’তালেব বুড়োর বিজয় দর্শন’,’পার্সেল’, ‘মেয়েটি ও একটি অস¤পাদিত গল্প’,’ধারা বহমান’, ‘অমল ধবল শিউলি খালা, ‘আলো কথা’, ‘ডায়রি’ শীর্ষক গল্পগুলো বাংলা ছোটগল্পের বাগানে একেকটি প্রস্ফুটিত পু®প যা প্রতিনিয়ত সৌরভ ছড়াবে পাঠক—মনোভূমির নিজস্ব উদ্যানে।

ঊনিশ শতকের শেষদিকে বিশ্বসাহিত্যের ছোটগল্পে সোনা ফলিয়েছেন টমাস হার্ডি,নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক রুডিয়ার্ড কিপলিং, রহস্যগল্পের অনন্য পুরোধা আর্থার কোনান ডয়েল,এইচ.জি.ওয়েলস,হেরমেন মেলভিল, মার্ক টোয়েন,হেনরী জেমস প্রমুখ।তাদের পর আসেন ছোটগল্পের যাদুকরদের একজন, অঁরি রেনি আলবেয়র গী দ্য মোপাশা। তাঁর লেখা নেকলেস (ডায়মন্ড নেকলেস),বোল দা সৌপ (চর্বির বল),ইন দা ি¯প্রং,এন ওল্ড ম্যান,রাস্ট, টু ফ্রেন্ডস, কনজারভেটরী, দা ম্যাটার উইথ আন্দ্রে। ইত্যাদি গল্প আবার একদিক থেকে অবিস্মরণীয়।যদিও সেসময় রাশিয়ায় গল্পের পশরা সাজিয়েছিলেন ইভান তুর্গেনেভ, ফিওদর দস্তয়েভস্কি,লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি এবং ছোটগল্পের শীর্ষ ঋঝি আন্তন চেখভ।গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে গল্প লিখেছেন হেক্টর হিউ মুনরো (সাকী), উইলিয়াম সমারসেট মম, ভার্জিনিয়া উলফ, গ্রাহাম গ্রীন,আর্থার সি. কার্ক,জেমস জয়েস, নোবেল বিজয়ী লেখক উইলিয়াম ফকনার,আরেক নোবেল বিজয়ী আর্নেস্ট হেমিংওয়ে,বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর পুরোধা আইজাক আসিমভ, নোবেলজয়ী জার্মান লেখক টমাস মান, ফ্রান্স কাফকা প্রমুখ।এদিকে বাংলাদেশের ছোটগল্পে গত শতকের ষাটের দশকে সংখ্যায় যেমন বৃদ্ধি পেয়েছিল,পাশাপাশি বৈচিত্রও চরম মাত্রায় ঋদ্ধ হয়েছিল।নানা পরীক্ষা—নিরীক্ষায় মনোযোগী হয়েছিলেন সেই সময়ের গল্পকাররা।ঐ সময়ে যাঁরা গল্পরচনায় সক্রিয় ছিলেন তাঁরা একদিকে যেমন জীবনঘনিষ্ঠ গল্প রচনায় মনোযোগী ছিলেন তার পাশাপাশি তারা নতুন গল্পভূমিরও জন্ম দিয়েছেন। সেসময়ের গল্পকারগণ তাঁদের গল্পে ক্ষুধিত,গ্রামীণ সমাজজীবনের নানা সমস্যা বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরেন।এরকম গল্পের মধ্যে শাহেদ আলীর একই সমতলে,সরদার জয়েনউদ্দীনের বীরকণ্ঠীর বিয়ে, নয়ান ঢুলি ইত্যাদি উল্লেখ্য।গ্রামীণ জীবনচিত্রণের সাথে অনেকেই নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবন—জটিলতা,আশা—নৈরাশ্য, কামনা—অপ্রাপ্তি, যন্ত্রণা—তৃপ্তি ইত্যাদি মানবিকবোধ নিয়ে গল্প রচনায়ও আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন সেইসময়।যেসব গল্পগ্রন্থে নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবন বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।আবদুল গাফফার চৌধুরীর সম্রাটের ছবি (১৯৫৯), কৃষ্ণপক্ষ (১৯৫৯), সুন্দর হে সুন্দর (১৯৬০); সৈয়দ শামসুল হকের শীত বিকেল (১৯৫৯),রক্তগোলাপ (১৯৬৪),আনন্দের মৃত্যু (১৯৬৭)প্রভৃতি বিশেষ আলোচ্য।স্বাধীনতাউত্তোরকালে সত্তরের দশকের পর আলোকোজ্জ্বল হয় আবারো আশির দশকে। এই দশকেই স্বৈরাচারী সামরিক শাসন চেপে বসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়।প্রচণ্ড মাত্রায় নৈরাজ্য ও হতাশার পাশাপাশি প্রযুক্তির উৎকর্যের সঙ্গে বিশ্বায়নের বিচিত্র প্রেক্ষিত কথাসাহিত্যের ভূগোলে নতুনমাত্রা যুক্ত হয় যা এক অমিয় উজ্জ্বল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।এই দশকে ছোটগল্পের ভুবনে বেশ কিছু নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটে তাদের মধ্যে মামুন হোসাইন,শহীদুল জহির, জাকির তালুকদার,নাসরীন জাহান,সেলিম মোরশেদ অন্যতম।

যাপিত জীবনাচারের সর্বত্র এক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে নান্দনিক ও মানবিক প্রতিবাদ চলে পুরো শতকের শেষের দিকে অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকে। এইসময়ে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকরা স্বাভাবিক জীবনযাপনের অন্তপ্রাবণ থেকে উঠে এসে এসে আপন ভুবন গোছাতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন।এমন সময়ে পূর্বসূরীদের সকল অর্জনকে স্বীকার করে নিয়েই যারা ছোটগল্প লিখতে শুরু করেছেন তাদের মধ্যে—আহমাদ মোস্তফা কামাল, আকমল হোসেন নিপু, প্রশান্ত মৃধা,শাহাদুজ্জামান,আকিমুন রহমান, জাকির তালুকদার,স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন।নাহিদা আশরাফী ্এই দীর্ঘ পথ চিনে হেঁটে যেতে চাওয়া এক যোগ্য পথিক।বর্তমান সময়ে অর্থাৎ নতুন শতাব্দীর পঁচিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাবার পরও একই বোধ আরো সুবিস্মৃত পর্যায়ে নাহিদা আশরাফীর ছোটগল্পে ধরা পড়ে। এই ধরনের গতিপ্রকৃতির ছবি নাহিদা আশরাফী তার গল্পে খুব সূক্ষ্মভাবে তুলে এনেছেন এবং পূর্ব গল্পকারগণের রেখে যাওয়া কিছু চিহ্ন,পূর্বসূরীদের ভাবনার এক দুর্দমনীয় বহিঃপ্রকাশ তার লেখনীকে আলাদা মর্যাদায় ভূষিত করেছে ইতোমধ্যেই।গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনচিত্রণের সাধারণ প্রবণতার বাইরে সমাজ—বাস্তবতাকে অনন্য এক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে অবলোকন ও চিত্রণের চেষ্টা করেছেন নাহিদা আশরাফী তার ছোটগল্পের মাধ্যমে।নাহিদা আশরাফী’র অপর গল্পগ্রন্থ ‘ঝুলবারান্দা তিনটি মাছ আর বিন্দুবর্তী জলাশয়’।এই গ্রন্থের গল্পগুলো অন্য এক আদব নিয়ে হাজির হয়েছে পাঠকের সামনে।এই গ্রন্থের রক্তজবা, বারবারা ও কালো ফুলদানি,অথচ যেখান থেকে গল্পটা শুরু হতে পারত,খুনী,ঝুলবারান্দা,তিনটি মাছ আর একটি বিন্দুবর্তী জলাশয়, মোনঘর, হাওয়াজীবন,প্রত্যাশিত প্রেমিক ও একটি মৃত্যুচুম্বন,হাওয়াকলের গান,জয়নাল মিয়ার ৫৭০ অনন্য সাধারন গল্প। নাহিদা আশরাফী তার ছোটগল্পের প্লট এবং চরিত্র বিশ্লেষণে যে খুব সাবধানী সেটি তার গল্পের বুনন থেকেই প্রমাণিত হয় বারবার। জয়নাল মিয়াকে নাহিদা কেবল এজন ভাস্কর্য হিসেবেই পরিচয় করিয়েছেন বিষয়টি এমন নয বরং তিনি কতোটা আপ্লুতভাবে এই চরিত্রকে সাজিয়েছেন একেবারেই অন্য এ দৃশ্য থেকে।এরকম অনেক চরিত্র রয়েছে যাদের তিনি একেবারেই হাতে ধরে ধরে বসিয়েছেন দক্ষ প্রকৌশলীর মতো।]এই বিষয়টির পাশাপাশি বিপরীতমুখী এক কাহিনী বিবৃতিতেও তিনি সিদ্ধহস্ত।‘জয়নাল মিয়ার ৫৭০’ শীর্ষক গল্পের দিকেই চোখ ফেরালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়বে-জব্বার মুন্সির বোনের জামাই তখন নব্য চলমান রাজনীতির ক্ষ্যাপা পাতি নেতা। এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে জয়নাল মিয়াকে তারা তিন—চার জন মিলে প্রচণ্ড মার মেরে ধান খেতে ফেলে যায়। পরের দিন গ্রামবাসী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয় বটে কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ সে আর হতে পারে না।তীব্র মাথার যন্ত্রণায় পাগলের মতো করতে থাকে।একেক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।সবাই বোঝে,সবাই জানে এসব কার কাজ, কাদের কাজ কিন্তু মুখ খোলার সাহস পায় না।সামান্য সুস্থ হয়েই সে আবার পুরানো ভিটায় ফিরে যায়।দরজা আটকে সারা দিন কী করে কে জানে।এক গভীর রাতে সায়রা বানুকে ডাকে সে। চোখ কচলে বাইরে এসে যা দেখে তোতে তার চোখ ছানাবড়া। পনেরো বিশটা ৫৭০ সাবান হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জয়নাল মিয়া

– নে সালমার মা । এডিন গুছোয়ে রাখ। পরে কাজে দিবিনে

সালমা কথা বাড়ায় না। সাবানগুলো হাতে নিয়ে টের পায় সাধারণ সাবানের চেয়ে অনেক ওজন। অথচ দেখে একবারও টের পায়নি যে সাবানগুলো বালু আর সিমেন্ট দিয়ে বানিয়ে রং করা। আঁচল পেতে সাবানগুলো নিতে নিতে সায়রা বানু আরো শুনতে পায়…

শোন রে বউ আমি মইরে গেলে সাবানের জইন্যে তোর য্যান ছুইটে বেড়াতি না হয় তাই এগুন বানায়ে রাখলাম।এরপর ধর কাফনের কাপড়ড়া যদি বানায়ে রাইখে যাতি পারি তাহলে পরে আর চিন্ত নাই। ঘরের পেছনের খালি জায়গায় আমার কব্বরখানও খুইড়ে রাখি যাব। তালি পরে তোমাগের আর কোনো পেরেশানিতে পড়তি হবে না নে। লাশ যেম্বা পাস, যেইখানে পাস আনি গোসলডা করায়ে শোয়াই দিবি।

সায়রা বানু ধপাস করে বসে পড়ে। মানুষটা কী তবে আবার পাগল হয়ে গেল! শীতের রাতে দরদর করে ঘামতে থাকা সায়রা বানুর চোখের সামনে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা হারিকেনের আলোটাও যেনো হারিয়ে গেল । এ ঘটনার বছর পাঁচেক পরে সেই খুড়ে রাখা কবরে জয়নাল মিয়াকেই নিজ হাতে শুইয়ে দিতে হলো সালমার মা কে। সেই থেকে অইটুকুন মেয়ের ঘাড়ে এসে পড়ে আধপাগলা বাবার দেখভাল, সংসার সামলানোর মতো কঠিন সব কাজ।’

তার গল্পের ভাবনায় জড়িয়ে থাকা বিস্মৃত বিষাদ সত্যিই অনন্য এক আকর বর্তমান বাংলাদেশের গল্পের উঠোনে।তার গল্পের ভাষা এবং প্রকাশ স্বাভাবিক হলেও তার আড়ালে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক আহবান, এক মতাদর্শ এবং তা হলো চিন্তার স্বাধীনতা।এই স্বাধীনতার পথেই নাহিদা আশরাফী হেঁটেছেন সবসময়।পায়ের দূরত্বে পৃথিবী গল্পের সাঈদ এক মনস্তাত্তিক চরিত্র। এই চরিত্রের সবটাজুড়েই দ্বিধা।আবার এই দ্বিধাকে এড়িয়েই জাদুবাস্তবতার এক ঘোর আহবানকে তুলে এনেছেন নাহিদা আশরাফী।তার এই ধরণের বাঁক বদল মনে করিয়ে দেয় শহিদুল জহির ,আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পগুলোকে।পায়ের দুরত্বে পৃথিবীতে বারংবার এমন দ্বিধাকে এঁকেছেন নাহিদা-

`মা লালশাকের কথা বলেছিলো। কিনেও ছিলো। কিন্তু লালশাক কালো কেন? বাড়ি ফিরে কী জবাব দেবে সে? মা না ভেবে বসে সাঈদ লালশাকই চেনে না। মায়ের ধারণা সাঈদ আরো অনেক কিছুই চেনে না। মায়েরা এমন কেন? নানা বাড়ি যাবার পথে মা কত কী শেখাতেন! কোনটা ঢোলকলমি, কোনটা নটে শাক। কোনটা ঝাকি জাল, কোনটা পাতা জাল। জোয়ার ভাটার চিহ্ন কেমন করে বুঝতে হয়। কোনটা কুমড়ার বড়ি কোনটা ডালের বড়ি। ঘুটে দেবার কৌশল, নাড়া পোড়ানোর উপকারিতা কত কী!…

 

রশিতে বাবার শুকাতে দেয়া সাদা গেঞ্জির ফুটো দিয়ে নীল আকাশ দেখা যায়। বাবাকে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি কিনে দিতে পারলে ভালো লাগতো। হঠাৎই এক টুকরো সাদা মেঘ গেঞ্জিটার ফুটো এমন ভাবে ঢেকে দেয় যেন মা মেঘ দিয়ে নিপুনভাবে রিপু করে দিয়েছে গেঞ্জিটা। মেঘ দিয়ে রিপু করা গেঞ্জিটা উড়ছে। সাঈদ খুব করে গেঞ্জিটা ধরার চেষ্টা করে। হুশ করে অন্ধকার ঠেলে গেঞ্জিটা একবার সামনে আসে পরক্ষণেই তলিয়ে যায়। ছোট বেলায় কাটা ঘুড়ি দেখলে যেমন তা পাওয়ার জন্য মনটা ছুটে যেত তেমন করেই বাবার গেঞ্জিটা ধরতে মন ছুটে গেছে। হাত বাড়ালেই হারিয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা হাত কোথায়? নিজের হাতটা দেখতে পাচ্ছে না সাঈদ। দূরের ঘুড়িটা নজরে আসছে অথচ নিজের হাতটা খুঁজে পাচ্ছে না।‘

 

অন্যান্য গল্পগুলোয় তিনি একইভাবে মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। একজন লেখকের জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন তার লেখার মূল্যায়ন।হোক সেটা বৃহৎ কিংবা ক্ষুদ্র আকারের কোন অখ্যাতজনের তবুও প্রচণ্ডভাবেই জরুরি এই মূল্যায়ন। নাহিদা আশরাফী এই সময়ের একজন নির্দণ্ড পরিশ্রমী কবি,গল্পকার এবং শক্তিমান সম্পাদক।সমস্ত অভিধা ছাপিয়ে তিনি উদ্ভাসিত একজন শক্তিমান গল্পকার পরিচয়ে।নাহিদা আশরাফীর গল্প একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ভাবনাচিত্রের সাথে ঐকান্তিকভাবে মিশিয়ে দেয়া যায় তেমনি তার গল্পকে মনস্তাত্বিকতাকেও বোধ—বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে একাকার করে দেয়া যায় সা¤প্রতিক জীবনদৃশ্যের সাথে।এই জীবনদৃশ্য আমাদের চারপাশেই বিরাজমান।নাহিদা আশরাফী তার সাহিত্যসাধনায় মগ্ন হয়ে তৈরি করে যাচ্ছেন একের পর এক চিরসুন্দর গল্প।

3 Comments

  • […] […]

  • লেখকের লেখা সম্পর্কে অসাধারণ আলোচনা
    ভেতরটা ছুঁয়ে গেল।

  • লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজ সরল ভাষায় ছোটগল্পের
    স্বচ্ছ পরিচয়,ধারাবাহিক নানা বাঁক পরিবর্তনের
    বিশদ আভাস ব্যক্ত করেছেন এমরান হাসান।
    নাহিদা আশরাফীর গল্পের শানিত,কোমল, গভীর
    ভাষাভঙ্গির পরিচয় আমরা নতুন বোধের আলোয়
    অবলোকন করি। গল্পের বিবিধ আখ্যান শৈলী উপমা ইত্যাদি রসোত্তীর্ণ। মোটের উপর নাহিদার
    গল্প পাঠকের মনে দাগ রেখে যায়।

Leave a Reply to হেনা সুলতানা Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *