Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা

Jan 9, 2026

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

 

# ৯

বিয়েবাড়ির বিলা

 

আগে একটা কোণে লাল হ্লুদের ছোপ দেওয়া বিয়ের কার্ড বাড়িতে এলে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠত। আর এখন রীতিমতো ভয় করে। কেন ? কেন? কেন? কারণ একেবারে অকুস্থল থেকে লাইভ বলছি।  

সেদিন এক বিয়েবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক ফোনে কীসব করছেন দেখে, বরের ভাই তাকে বলল ‘এখানে কী করছ মামা? এসো খেয়ে নাও’

‘যাচ্ছি রে, আগে মায়ের খাবার অর্ডারটা দিয়ে দি’

ছেলেটি আঁতকে উঠল, মামার মা মানে তার দিদা, বিয়েতে তিনিও এসেছেন,  সত্তরোর্ধ সেই মহিলার জন্য বিয়েবাড়িতে বসে খাবার অর্ডার?

সে বিস্ময়, অপমান, ক্ষোভ চেপে বলে’তুমি কেন,  আমি দিয়ে দিচ্ছি’

‘আরে না, না, তুই কেন দিবি?  মা আসলে এসব খেতে পারবে না, তাই অর্ডার দিচ্ছি’

ছেলেটির হতভম্ব মুখে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর সরে যায়, কেউ ডাকে তাকে। আমি কান পেতে থাকি, কী অর্ডার জানার জন্যে-

 

পাশে দাঁড়ানো একটি তরুণের সঙ্গে পরামর্শ করে যে অর্ডারটি দেওয়া হয় তার তুল্য উৎকট ফুড কম্বিনেশন  আমি জীবনে শুনিনি।

 

তিন প্লেট হাক্কা চাউমিন,

তিন প্লেট দইবড়া

তিন প্লেট পনির টিক্কা

আর তিন প্লেট গুলাবজামুন!!!

 

 

আমার মা  প্রতিদিন শেষ পাতে আলু সেদ্ধ দিয়ে দুধ ভাত খেত। কাউকে কাউকে সন্দেশ ডুবিয়ে চা খেতেও দেখেছি।  সে তো ভাল, বিভূতিভূষণের একটি গল্পে ক্ষেত থেকে তোলা টাটকা মুলো দিয়ে চা খাওয়ার কথা, মানে অতি আহ্লাদের সঙ্গে খাওয়ার কথা আছে।  

 

 

বলি, হ্যাঁ গা, বিয়েবাড়ির খারাপ কি এর থেকেও খারাপ?

তখন অবশ্য আমি অন্য কথা ভাবছিলাম। আমার ভেতরের সত্যান্বেষী সত্তাটা  জেগে উঠেছিল। মায়ের কথা বলে লোকটা তিনটে করে সবকিছুর অর্ডার দিচ্ছিল কেন?  

রাজার জন্যে মেরে হাঁস, গুষ্টিসুদ্ধু খায় মাস সিনড্রোম? আসলে ভদ্রলোক সপরিবারেই বিয়েবাড়ির ভোজ বয়কট করলেন, এবং তা বিয়েবাড়িতে দাঁড়িয়েই। সাহস হ্যাজ ব্রো! তার ওপর মামা সম্বোধন বলে দ্যায় তিনি এই বাড়িটির সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে বাঁধা। আংকেল বললে তো সাধারণ আমন্ত্রিত বোঝা যেত। তা আত্মীয় না হলে আত্মীয়কে মারিবে কে? তার ওপর মামা। মানবের ইতিহাসে এই মামারা অতীব খতরনাক চিজ। কংস মামা, শকুনি মামা, কালনেমি মামা ভারতের ইতিহাস আলো করে আছেন।  আর মামাদের খারাপ না হয়ে উপায় আছে? একটু নরমসরম হয়েছ কি গেছ! ভাগ্নেদের তো ট্র্যাক রেকরড ভাল নয় এদেশে।  আহা আয়ান মামার কথাটা ভাবুন একবার। সে তো ভালমানুষ ছিল মোটের ওপর। সেই সুযোগে কেষ্টা ছোঁড়া, মামীকে নিয়ে কি লীলাই না করল।  তাই না দেব অভিমান করে গাইল ‘কৃষ্ণ করলে লীলা, আমরা করলে বিলা!’

লে হালুয়া!।

তার ওপর বুজ্রুগরা বলে গেছেন নরানাং মাতুল্ক্রম। লোকে নাকি তাদের মামার মতোই হবে। তাহলেই বোঝা যাচ্ছে কুখ্যাত সব মামাদের জিন পেয়েই মানবজাতি এমন অধঃপাতে গিয়াছে। তারই একজন নিজের ভাগ্নের বিয়েতে দাঁড়িয়ে বাইরের খাবারের অর্ডার দিচ্ছেন! হায়! বিয়েবাড়ির খাবার কি এতটাই খারাপ?

 

 সত্যিই খুব খারাপ। প্রফুল্ল রায়ের স্মৃতিকথা ‘যখন যা মনে পড়ে’-তে দেশভাগের  আগের পুব বাংলার গ্রামের বিয়ের ভোজের একটা দারুণ ছবি পাই।

‘আমার সেই অল্প বয়সে বিয়ের ভোজ বলতে ছিল উৎকৃষ্ট রূপশাল কি সুগন্ধি গোবিন্দভোগ চালের ভাত, খাঁটি গাওয়া ঘি, বেগুন আলু এবং দুরকম মাছভাজা, মাছের মাথা দিয়ে ঘন সোনামুগের ডাল, তিন চার পদের মাছ, গরমকালে আম, নইলে আনারস বা আমসত্ত্বের চাটনি, দই, ক্ষীর এবং চার পাঁচরকম মিস্টি।

তখনও বিয়েবাড়িতে লাচ্ছা পরোটা, কোর্মা, কাবাব, বিরিয়ানি, আইসক্রিম ইত্যাদির কথা কেউ ভাবতেই পারত না। বাঙ্গালির মতো অনুকরণপ্রিয়, নকলনবিশ জাত ভূ-ভারতে দ্বিতীয়টি আর নেই। অনেক বছর বাদে কলকাতায় লক্ষ্য করেছি বাঙ্গালিদের বিয়ের ভোজে কিংবা অন্য অনুষ্ঠানে  মোগলাই, কন্টিনেন্টাল খানা ঢুকে পড়েছে। সেই সঙ্গে ফুচকা, জিলিপি, টিলিপি। নিজেদের ট্র্যাডিশনাল সব সুখাদ্য তাদের কাছে ব্রাত্য’ সেই বিয়েতে নতুন আমদানি হল, লুচি আর নারকেলের কুচি, কিশমিশ দেওয়া ছোলার ডাল, গ্রামের একজন ১৯৩০ সালের কলকাতার বিয়েবাড়িতে দেখেছিলেন।‘

আর এখন বিয়েবাড়ি তো আর বিয়েবাড়ি নেই, তা হয়ে গেছে জি ১৫ সম্মেলনের মতো একটা বিশ্ব মঞ্চ, বহুজাতিক খাদ্য প্রদর্শনী। সেখানে আপনি যা চাই তাই পাবেন। নিহারির সঙ্গে নলেনগুড়, রিসেটোর সঙ্গে  রসগুল্লার ফূর্তিবাজ ফিউশন। শুধু চাড্ডি খেতে পাবেন না, সোশ্যাল মিডিয়ার রিল দেখার মতো খাবার স্ক্রোল করতে করতেই টাইম ইজ আপ, এর পর আর ক্যাব পাওয়া শক্ত হয়ে যাবে, ইদিকে ভেনুর বরাদ্দ সময়ও শেষ, বর কনে সবাই উপহার পুঁটলি করে বাড়ির দিকে যাত্রা করছে। তখনো আপনি মনস্থির করতে পারেননি, ইতালিয়ান না মোগলাই, না চাইনিজ কোন প্যাভিল্যনের খাবার খাবেন। তাই বাড়ি গিয়ে সেদ্ধ ভাত চাপানোই বেস্ট অপশন। আর সাবধান, সামনে আরও খারাপ সময় আসছে। জাপানের কাঁচা মাছ, ত্রিপুরার সিঁদল শুঁটকি, আফ্রিকার কুমীরের মাংস, সবাই গোকুলে বাড়ছে।  

আগে বিয়েবাড়ির রান্নার দায়িত্ব কেটারার নয়, মহল্লার ডাকসাইটে রাঁধুনী পেতেন, আর পরিবেশনে করত পাড়ার ছেলেরা, সঙ্গে বিয়ে খেতে আসা আত্মীয়দের তরুণ, নির্ভরযোগ্য দু চারটে ছেলেপিলেও থাকত। খাবার আর পরিবেশকদের মাঝখানে  কোঅর্ডনিশন পয়েন্টে বসে থাকতেন এক জাঁদরেল চেহারার মেসমশাই বা বড় জামাইবাবু, যাঁদের এমন অনেক বিয়ে উতরে দেবার ট্র্যাক রেকর্ড আছে। একইরকম , কিংবা তার চেয়েও জবরদস্ত লোক বসানো থাকত ভিয়েনের জায়গায়। রসগোল্লা পান্তুয়ার ডোঙ্গা আর মোল্লাচকের দইয়ের হাঁড়ি পাহারা দিয়ে বসে থাকতেন যারা, তাঁদের দেখলে মনে হত কার্গিল সীমান্ত পাহারায় অতন্দ্র সৈনিক।  কারো ক্ষমতা ছিল না সেঁদোয়। কারণ সে আমলে মিষ্টিই ছিল সবচেয়ে হাই সিকিওরিটি জোন। বুড়ো তো বটেই, বাচ্চারাও মিষ্টি খেতে ওস্তাদ। তবে এইসব লৌহহৃদয় মেসো বা জামাইবাবুদের তো একদা যৌবন ছিল। সেইসময়ের কোন শিহরণ, শালী বা শালাজ যদি সেই সিকিওরিটি জোনে এসে দাঁড়াতেন, তবে এদিক ওদিক চেয়ে তাঁরাই দুটো মাছভাজা বা একপিস রসগোল্লা টুক করে দিতে কারপর্ণ্য করতেন না। হৃদয় খুঁড়লে শুধু বেদনা নয়, ফুড মেমরিও জাগে বৈকি!

 

 পরিবেশকদের তাঁরাই বলে দিতেন কোনটা কম আছে, একটু টেনে দিতে হবে, তেমন তেমন ভোজনবীর আসবে জানা থাকলে কিছু আগাম ব্যবস্থা নেওয়া থাকত। শুনেছি, মাংসে লঙ্কাগুঁড়ো বাড়তি যোগ করে কেউ কেউ গেরস্তের সাশ্রয় অব্দি করতেন।

 

যে সাগরিকাতে পিংকুমাসি তার অরসিক বরকে শোনাতে ‘আজু সখি মুহু মুহু’ গেয়েছিল বছর চল্লিশ আগের এক নষ্ট বসন্তের পূর্ণিমা রাতে, সেখানেই অনেক অনেক বছর এক বিশিষ্ট মানুষের ছেলের বৌভাতে খুব তৃপ্তি করে খাঁটি বাঙালি ভোজ খেয়েছিলাম, তারপর নদীর ধারে হাঁটা, ভারি চমৎকার, পরিতৃপ্ত  একটি সন্ধে। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতে যখন তাদের ডিভোর্সের খবর পেলাম, তখন থেকে বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন এলে ভয় করে। টিকবে তো? টিকবে কিনা সে নিয়ে প্রেমিকযুগল নিজেরাই আত্মবিশ্বাসী নয় বোধহয়, তাই এত ঘটাপটা, খরচ না করে তারা লিভ ইনের দিকেই যায়। তাতে ক্ষতি কিছু নেই। তবে সমীক্ষায় দেখা গেছে নারীর নিরাপত্তা বিয়ের থেকেও লিভ ইন সম্পর্কে  আরো কম। তবে সমাজে নানান পথ খোলা থাকা ভাল। নারী পুরুষ থেকে নারী নারী, পুরুষ পুরুষ- এসব তো  চোখ সইয়ে নিচ্ছে। এখানেই শেষ নয়। কিছুদিন আগেই এক বিখ্যাত বিদেশি কুস্তিগির এক যন্ত্রিকাকে মানে রোবট বান্ধবীকে বিয়ে করলেন। পুরুষের গর্ভধারণ এখন বাসি খবর, রোবট মা হতে পারবে নাকি যেকোন দিন।  বংকিমের সময়ের কোন প্রাচীনা যদি এসব দেখতেন, তবে নির্ঘাত বলে উঠতেন ‘ আ ছি ছি!  কালে কালে কত কী হল, কাঁচকলা দিয়ে কান বেঁধাল!’

 

 

খুব মনে পড়ে বিশিষ্ট এক কবির মেয়ের কথা। অতি উজ্জ্বল কেরিয়ার তার, স্কুলবেলার সঙ্গীকে বিয়ে করেছিল ভালবেসে। সেও খুব ব্রাইট। তবু বিয়ে ভেঙে দিল ওরা, ভালবাসার অভাবে নয়, স্রেফ কেরিয়ারে কোন আপস করবে না বলে। কাঁদতে কাঁদতে বিয়ের গাঁটছ্ড়া খুলে যে যার  জায়গায় চলে গেল। লং ডিস্ট্যান্স বিয়েতেও থাকল না তারা, দূরত্বের বিয়েতে বিশ্বাস নেই তাদের।  দুজনের কেউই কিন্তু দেবদাস হয়ে বসে থাকল না। বরং মুভ অন করল। যে যার সুবিধে মতো বিয়ে করল, ভালবেসে নয়, ম্যারেজ অব কনভেনিয়েন্স। আমার মাঝে  মাঝে মনে হয় পিংকুমাসির সেই গান, অলৌকিক রাত আর চাঁদ। সুবিধেজনক দাম্পত্যে থাকা সেই দুটি চূড়ান্ত সফল তরুণ তরুণীর নিটোল সুখের মধ্যে কখনো কি মিশে যায় না এক ফোঁটা বিষাদের নীল কালি, মনে গুনগুন করে ওঠে না ‘ তোমায় ঘরে হয়নি আনা সে কথা রয় মনে মনে , যেন ভুলে না যাই বেদনা পাই শয়নে স্বপনে’ ?’

6 Comments

  • অসাধারণ লেখা। খুব ভাল লাগল।

  • অসাধারণ

    • আমাদের পরিবারে বিয়ে,পৈতে,শ্রাদ্ধতে বাড়ি ভাড়ার কোনো চল নেই। জ্ঞানচক্ষু মেলে দেখেছি সেই পাহারাদারকে নাম অমল হলেও তাঁর নাম ঝনা মামা।অকৃতদার।জীবিত আছেন মায়ের খুড়তুত ভাই।নব্বইয়ের দোরগোড়ায়।আপনার রচনা থেকে একজন লেখক আরও নিজের মতো সূত্রানুসন্ধানে সফল হতে পারবেন।জিনিয়াস🙏

  • Just stumbled upon hitclubforum.net, looks like a place to share tips and strategies for Hit Club. Anyone active in there? Give us a shout! hitclubforum

  • Alright, 98win10… gotta say, I was a little skeptical at first, but I was pleasantly surprised. The interface is clean and easy to use. I had a good experience overall. Give it a whirl at 98win10

  • Okay, so I tried out ae66 recently. It’s pretty slick, I like the design. It’s not the best, but it isn’t bad either. Give it a look-see at ae66.

Leave a Reply to অতনু ভট্টাচার্য Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *