Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা

Dec 12, 2025

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

#৭

নিমস্তক, হাঁকাই, খাওনদার

 

দাদুর মুখেই প্রথম শুনি শব্দটা। পরে মা দাদুর মুখ থেকে তুলে নিয়েছিল। দাদুর ছেলেপুলেরা নিজেদের ইচ্ছে মতো, বাবাকে জিগ্যেস না করে কোন কাজ করলেই দাদু চিৎকার করে বলত- ‘নিমস্তক হয়েছ? নিজেকে কী ভেবেছ কি? খুব লায়েক? একবার পরামর্শ করার প্রয়োজন নেই?’ মোদ্দা কথা, নিমস্তক মানে মাথা না থাকা, অর্থাৎ অনাথ অভিভাবকশূন্য  অবস্থা, সেরকম অবস্থাতেই লোকে একাএকা সব সিদ্ধান্ত নেয় কিনা। একবার কৈশোরে একটি বাড়িতে উপনয়নের নেমন্তন্নে গিয়ে    মিছি মিছি ‘দন্ডীঘরের’ মধ্যে থাকা (যেহেতু কারো মুখ না দেখা ইত্যাদি অনুশাসন ছিল না) দেখেছিলাম সদ্য ন্যাড়া হওয়া ছেলেটিকে নিয়ে তার তুতো ভাই বোনেরা  বেজায় মজা করছিল। একটি সামান্য বড় দিদি তার মাথায় হাত বুলিয়ে কৃত্রিম সহানুভূতির সঙ্গে বলেছিল ‘আহা রে! আজ থেকে তোর মাথার ওপর কেউ রইল না!’ আমার মনে হয়েছিল  ছেলেটা নিমস্তক হয়েছে।

 

মা চলে যাবার পর এই চমৎকার  শব্দটা  আর কারো মুখে শুনিনি।  এক দ্বীপে  পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম ভাষা বিকিয়া বলার শেষ মানুষটি মারা যেতে, পৃথিবীতে ঐ ভাষা বলার আর কেউ থাকল না।  এরকম আমরা খেয়ালই করি না, এমন এমন শব্দ  আছে যা শুধু বিশেষ একটি জনগোষ্ঠীতেই বলা হয়। এমন অনেক শব্দ আছে যা একটি ছোট অঞ্চলে বা একটি পরিবারের মধ্যে চলে,  সে শব্দগুলো হয়তো অশ্লীল নয়, তবে সবসময় শিষ্ট বাঙ্গালাও নয়। তবে ভাষার শব্দের শ্লীলতা, শিষ্টতা নিয়ে বসে থাকলে  প্রায়শই ভাষার সবাভাবিক চলন ও মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায়। গাছ কোমর দিয়ে শাড়ি পরত যে মেয়েটি, যার চুল খোলাই থাকত, তাকে শহুরে ধরনে শাড়ি পরিয়ে পাতা কেটে চুল বেঁধে দিলে তার সৌন্দর্য কোথায় যে  উধাও হয়ে যায়! 

 

এরকম আরও আরও শব্দ যা শুনেছি, তা পরে আর কোথাও শুনিনি। আমার দাদু, সেইসময়ের অনেক মানুষের মতোই খাদ্যরসিক ছিলেন। ঘুম থেকে উঠেই মাখা সন্দেশ দিয়ে চা, একটু পরে পাটে পাটে খুলে যাওয়া পরোটা , সঙ্গে সাধারণত আলুর ছেঁচকি (সেসময় লোকে এত আলুর দোষ দেখত না, তাছাড়া একটি গড়ে বার জনের পরিবার প্লাস নিত্য কম করেও জনা তিন চার অতিথিসংকুল সংসার তো  আলু-লায়িত হবেই। ) দুপুরেও পাতে মাছে আসার আগে তিন চাররকম তরকারি থাকতই, শুক্ত পোস্ত লাউ, মোচা ইত্যাদি ইত্যাদি, মাঝে মাঝে উঠোনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো অগস্ত্য ইয়ে মানে বকফুলের বড়া। রাতে সাধারণত নিরামিষ, এবং রুটি, তবে তরকারির পর দুধ এবং মিষ্টি মাস্ট, শীত হলে এক জামবাটি ভর্তি তরল নলেন গুড়। এর কম হলে দাদু বলত ‘কুন্নম’ করে খাওয়া সারলাম। বহুবছর ভেবেছি কুন্নমটা কী? পরে বিশ্লেষণ করে দেখলাম ওটা হচ্ছে ‘কোনরকম’-র সংকুচিত রূপ!

 

 এই খাওয়া সংক্রান্ত কত শব্দ আছে। কেউ যদি প্রচুর খাবে ভেবে পাতে একগাদা জিনিস নেয়, তারপর আর খেতে না পারে , ফেলে নষ্ট করে, তখন বলা হয় ‘‘হাঁকাই’  করে এত নেওয়ার কী ছিল?? খেতে পারবি না যদি।‘ এই লোভ যদি খাওয়া না হয়ে কোন পার্থিব বস্তু, টাকার প্রতি হয়, তবে শব্দটি কিন্তু হাঁকাই না হয়ে হবে খাঁই। ‘ছেলের বাপের কী খাঁই, এত টাকা নিচ্ছে, আবার  টু হুইলার ফ্রিজ এসব চাইছে।‘

 প্রচুর ভাত নিলে বলা হত বেড়াল ডিঙ্গোতে পারবে না এমন ভাত। সেটা অবশ্য বেশ প্রচলিত ইডিয়ম। আর খিদেও ছিল অনেকরকম, জেনুইন খিদে, বা সত্যি খিদে, দুষ্টু খিদে আর দৃষ্টি খিদে।

সত্যি খিদে খুব সিরিয়াস ব্যাপার তা পেটে কিল মেরে পড়ে থাকা ক্যাংলাস পার্টি ছাড়া আর কে জানে? দুষ্টু খিদে মানে যেটা আমার হত, একে স্পেশাল ফুড ড্রিভন খিদেও বলা যায়। বাড়িতে রোববার রোববার খাসির মাংস হত। সেদিন আমার ঘন ঘন খিদে পেত। দুপুর দেড়টায় বোরোলিনের সংসার শুনতে শুনতে এক পেট মাংস ভাত খেয়েছি, খিদে পাবার কথাই নয়, তবু চারটে বাজলেই ‘মা খিদে পেয়েছে’! মা বিরক্ত মুখে  ঘুম থেকে উঠে পাঁউরুটি সেঁকে দেয়, সঙ্গে আলু ঝোল, এক পিস মাংসও কি দেবে না?  

 

 আর দৃষ্টিখিদে হচ্ছে কোন খিদে নেই, খাবার কোন আশু সংকল্পও নেই, কিন্তু  কেউ খাচ্ছে দেখলে খিদে পায়। এদের দেখেই বোধহয় লেখা হয়েছিল-

 

যদু বাবু সব ভুলে যান ভোলেন না কো খেতে

খাওয়া দেখলে বসে পড়েন কলাপাতা পেতে।

 দুষ্টু খিদের থেকেও বিপদ ছিলে এই দৃষ্টিখিদে নিয়ে। এদের লোকসমাজে বার করাই যেত না। বাইরের কেউ এলে বাড়ির বাচ্চাটি  লোলুপ চোখে অতিথিদের প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকত। অতিথি বাধ্য হয়ে তাকে একখানা সিঙ্গাড়া বা রসগোল্লা দিতে এলে মাকে মরিয়া হয়ে বলতে হত ‘ও এসব একদম খায় না’ কোন কোন মা চরম অবস্থায় এমনকি বলেছেন ‘আমার ছেলে একটু ট্যারা জানেন তো? আপনি ভাবছেন ও আপনার দিকে (আপনার প্লেটের দিকে ) তাকিয়ে আছে, তা কিন্তু না, ও দেয়ালে রবি ঠাকুরের ক্যালেন্ডার দেখছে। আসলে ও রবি ঠাকুরের খুব ভক্ত কিনা। দাও তো বাবু ওঁকে সেই কবিতাটা শুনিয়ে, ঐ যে পরের কারণে সবার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও’ ছেলে  তেরিয়া ভাবে বলে ‘দূর ওটা তো কামিনী রায়ের লেখা। আমার খিদে পেয়েছে। আমাকে রসগোল্লা সিঙ্গাড়া দাও’

সেই মা  এরপর নিশ্চয় পাতাল প্রবেশ করেছিলেন!

ফারহান আখতার একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন বাড়িতে অতিথি এলে সামোসা গুলাবজামুন যদি অল্প আসত, শুধু অতিথিদের জন্যে, তখন তাঁর মা বলতেন সি এইচ বি, যার মানে হচ্ছে চিল্ড্রেন হোল্ড ব্যাক, এতেই বাচ্চারা বুঝে যেত তাদের বরাতে কিছুই নেই, তারা আর ওদিকে তাকাত না, আর যদি সবার জন্যে যথেষ্ট খাবার থাকত, তো মা চাপা স্বরে বলতেন সি সি এফ’ চিল্ড্রেন কাম ফরোয়ার্ড। এই সঙ্কেত বাক্য শুনলে তাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আহহা সেসব সুশিক্ষিত বাচ্চা কি আর ক্যাংলাস প্রজাতিতে জন্মায়?  বাচ্চা তো বটেই, আমাদের বাড়িতে মার ফিজিওথেরাপি করতে আসা এক ধেড়ে দাদা  একবার যা করেছিল, তা কহতব্য নয়।  সে সম্ভবত সপ্তায় দুদিন আসত। তার সারাদিনের খাটনি ও খাদ্য প্রীতির কথা বিবেচনা করে তাকে চা বিস্কিটের অতিরিক্ত হেভি টিফিন দিত মা। তবে তা তার ভাষায় ‘ফেন্সি খাবার’ নয়। পেট ভরার মতো রুটি তরকারি, বা জামবাটি ভরতি মুড়ি চানাচুর চপ ইত্যাদি, বা পাঁউরুটি মিষ্টি এইরকম। কখনো সকালের ‘ফেন্সি খাবার’ মানে চিঁড়ের পোলাও নুডলস থাকলে তাকে দিলেও তার তাতে শানাত না। (অনেক দিলেও যার খাওয়া কম হয়, তার জন্য  শানায় না শব্দটি।  ওর তো এক প্লেট বিরিয়ানিতে শানায় না মানে হল এক প্লেট ওর পক্ষে যথেষ্ট নয়।)

 একবার সে এসেছে,  ফিজিওথেরাপি অন্তে মা তাকে তার রুটি তরকারি দিয়েছে, সেইসময় বাড়িতে একগাদা অতিথিও হঠাৎ করে এসেছে, তার মধ্যে দুটি শিশুকন্যা ছিল, তাদের সেইসময়ের  খুব চালু টিফিন অমলেট করে দেওয়া হয়েছে। সেই দাদা অমলেট দেখে ওদের বলল ‘আয় একটা মজার গল্প বলি। একটা না খরগোশ ছিল, সে খুব ডিমভাজা খেতে ভালবাসত।‘ (শিশুরাও সেই সময়ের। এখনকার হলে বলত র‍্যাবিট তো ক্যারট খায়) এই বলে সে পৃথুল শরীরে খরগোশের মতো লাফঝাঁপ করল। বাচ্চা দুটি খুব মজা পেল। ‘এসো খরগোশ তুমি আমার থেকে ডিম খাও।‘

দুজনের মধ্যে রীতিমত কমপিটিশন লেগে গেল খরগোশকে খাওয়ানোর। তারপর শিশুদুটির মায়ের হতভম্ব  এবং আমার মায়ের জ্বলন্ত চোখের সামনে সেই খরগোশ দুজনের সব অমলেট খেয়ে নিল। সেদিন আমরা সবাই খুব বিরক্ত হলেও আজকাল মনে হয় বেচারি অভাবের সংসারে একটা আস্ত ডিম খেতে পায়নি কখনো। তাই লোভ সামলাতে পারেনি। বাচ্চা দুটি খুব আনন্দ পেয়েছিল সেটাও তো ঠিক।

 

 

 

ভালো খেতে পারলে তার নাম হয়ে যেত খাওনদার।- শব্দটির মধ্যে  বেশ শ্রদ্ধা সম্মান মেশানো আছে।  এর সঙ্গে পেটুক, হ্যাংলা, পেটসর্বস্ব এমনকি খাদ্য রসিকের একটা সূক্ষ্ণ তফাত আছে, ।  খাওনদার হচ্ছে  দমদার ধ্রুপদী গায়কের মতো, মানে রাত বারোটায় দরবারী কানাড়া ধরলে ভোর তিনটে অব্দি তা টেনে নিয়ে যাবার ক্ষমতা রাখে।  ভাল খাওনদার কখনো সব মাঠে তার সেরা খেলাটা খেলবে না। যদি শোনে  গৃহকর্তা খুব কষ্ট করে আয়োজন করেছে, মাছটা বা মাংসটা টান আছে, তবে গড়পড়তা লোকের খাওয়া খেয়ে উঠে যাবে। পেটুক ,  হ্যাংলাদের সেই মাত্রা জ্ঞান থাকে না, আবার খাদ্য রসিকরা হচ্ছে ভাল স্পিনার বা ভাল ওপেনিং ব্যাটসম্যানের মতো, যেখানে খাওনদার হচ্ছে অলরাউন্ডার। তারা মাছ মাংস মিষ্টি সমান ভালবেসে খায়, কারো প্রতি পক্ষপাত করেনা। আমার কৈশোর অব্দি, যখন বিয়েবাড়িতে  স্কুলের হাই বেঞ্চ টাইপ সরু টেবিলে সাদা ফিনফিনে কাগজের রোল পড়ত, (যে রোল পাতার ইচ্ছে গোপনে লালন করেছি কত) আর পাড়ার কাকা দাদারা খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে ছিল, তখন এক একজন খাওনদার একসঙ্গে তিরিশটা মাছ, চল্লিশটা রসগোল্লা সমান দক্ষতায় খেতে পারত।

কোন বিয়েবাড়ি তো বটেই, কারো বাড়ি এমনি ঘুরে এলেও বাড়িতে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করত ‘খাইদাই কেমন হল?’

বিশেষ্য হিসেবে এই খাইদাই শব্দটির  এমন প্রয়োগ আর দেখিনি। মনে পড়া মার মুখে শোনা একটি ছড়া

‘খাই দাই পাখিটি/ বনের দিকে আঁখিটি।‘  

এতে ইঙ্গিত করা হচ্ছে এমন কোন আত্মীয় বা পরিচিতের প্রতি, কিংবা সে গৃহকর্ম  সহায়িকাও হতে পারে, যাকে হাজার খাইয়ে দাইয়েও বেঁধে রাখা যাবে না, বনের পাখির মতোই সে ফুড়ুত করে উড়ে যাবে!

1 Comment

  • একটি অসম্ভব সুন্দর লেখা পড়লাম। পড়তে পড়তে চোখের সামনে ঘটনাটি ফুলে উঠেছে।

Leave a Reply to Dukhananda Mandal Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *